• বাম-বিকল্পঃ ভূমিকা
    মাসুদ রানা

    প্রেক্ষাপট
    বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপরিপক্কতার সঙ্কট চলছে দীর্ঘ কাল ধরে। বাঙালী, জাতি হিসেবে অপরিপক্ক। বাংলাদেশ, রাষ্ট্র হিসেবে অপরিপক্ক। ব্যর্থতার ছিন্নবস্ত্র-পরা বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল তস্য চ্যালা-দল নিয়ে জোট বেঁধে একে অন্যের দিকে ভ্রুকুটি হেনে এন্তার খিস্তি করে চলেছে বিশ্ববাজারে পাতা ভিক্ষার্থিনীর মাদুর থেকে পরস্পরকে তাড়াতে। বাজারী দাতারা বদান্য বদ-নজরে, তবুও বিরক্ত বঙ্গীয় ভিক্ষার্থিনী-খিস্তির অশ্রাব্য নিনাদে।

    এহেন বাংলাদেশের গোড়ালি-গভীর বুদ্ধির সাগরে ডুবন্ত সুশীল বুদ্ধিজীবীরা থেকে-থেকে হেঁকে ওঠেন বিকল্পের সন্ধানে। তাঁদের ‘পারে লয়ে যাও আমায়’ আর্তি অনূদিত ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ডানে, বাঁয়ে ও মধ্যে। ডানে ওহাবি ইসলামিক বিকল্প জিগির তুলে এই এলো বলে; মধ্যে হযরত ইউনূসকে সামনে রেখে গীত হচ্ছে আধুনিক ‘মোডারেইট’ গান; আর বাঁয়ে বামপন্থীদের ধ্রুপদী বাম-বিকল্পের সঙ্গীত তো আছেই।

    প্রসঙ্গ
    বিকল্পের সঙ্কল্প করে ইতিপূর্বে ব্যর্থ হওয়া বামেরা আবার মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন নতুন কর্মসূচি নিয়ে। ‘ফিফটীন-পয়েন্ট’ বা ১৫-দফা কর্মসূচি হাজির করেছেন প্রথমে ‘এক নজরে’ ও পরে বৃত্তান্ত তুলে ধরে রাজধানী ঢাকায় এক সংবাদ-সম্মেলনে। কর্মসূচির শিরোনাম ‘জনগণের বিকল্প শক্তি তথা জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের কর্মসূচি’।

    কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দুটি ভিন্ন-ভিন্ন ঐতিহ্য থেকে এক মঞ্চে আসা দুটি দলঃ একটি সিপিবি ও অন্যটি বাসদ - অর্থাৎ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল। এই দুটি দল ‘কগনিটিভ-এ্যাফেক্টিভ-বিহেভিয়ারাল লেভেলে’ অর্থাৎ বোধ-আবেগ-আচরণ পর্যায়ে ঐতিহ্যগতভাবে ভিন্ন। শূন্যমাঠে এই দুটি দলের মধ্যে শুধু ‘তোমাতে-আমাতে’ ঐক্য হওয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অভিনব ঘটনা। তবে বাম-বিকল্প গড়ে তোলার ঘোষণা মোটেও নতুন কিছু নয়।

    একটু ইতিহাস
    ১৯৮২ সালে ক্ষমতায় আসা সামরিক জান্তার প্রধান জেনারেল হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে আওয়ামী লীগ স্বাগত জানিয়েছিলো, কারণ তিনি বিএনপির গণবিচ্ছিন্ন ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারকে হঠিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। সে-দিন বাসদের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগের (তখনও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নাম নেয়নি) নেতৃত্বাধীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ডাকসু তার ‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ পালনে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রথমে গোপনে এবং পরে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে ধীরে-ধীরে গড়ে তোলে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

    কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শিক্ষার আন্দোলন ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারীতে গুলিবিদ্ধ হলে, রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে জোট বাঁধতে শুরু করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। গড়ে ওঠে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫-দলীয় জোট এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট।

    কিন্তু ১৯৮৬ সালে যখন হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করেন, তখন সে-নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না-করা নিয়ে ভেঙ্গে যায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ১৫-দলীয় জোট। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না যাবার ‘দৃঢ় অঙ্গীকার’ ভঙ্গ করে নির্বাচনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলে সিপিবি, ন্যাপ, ইত্যাদি তার অনুগামী হয়।

    তাৎক্ষণিকভাবে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার আগা-গোড়া বিরোধিতা করে ভিন্ন অবস্থান ঘোষণা করে বাসদ। তারপর ওয়ার্কার্স পার্টি খানিকটা পরে এবং জাসদ সবশেষে নির্বাচনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগের অবস্থানের বিরুদ্ধে এ-তিন বাম দলের সাথে সাম্যবাদী দল ও শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল মিলে গঠিত হয় ৫-দলীয় জোট।

    অন্যদিকে দুর্নীতি মামলার কারণে বেশ কিছু নেতার নির্বাচন করা হবে না দৃষ্টে বিএনপি শেষ মুহূর্তে নির্বাচনে না-যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর ফলে বিএনপি'র নেতৃত্বাধীন ৭-দল নির্বাচন-বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। নির্বাচন-বিরোধী আন্দোলনে আগে না এসেও ভাগে বেশি পায় বিএনপি তার আকার-আকৃতির বিশালত্বের কারণে।

    একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে দালাল ও ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া জামায়তে ইসলামী ‘এইতো সুযোগ’ বুঝে সামরিক জান্তার ছায়াতলে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সৌল-এজেন্ট আওয়ামী লীগ ও প্রগতিশীলতার প্রতিভূ সিপিবি'র গায়ে গা লাগিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এই প্রথম বারের মতো ভোট চাওয়ার মতো জায়গায় উপনীত হয়।

    ‘আই উইল মেইক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট’ বলেছিলেন জিয়াউর রহমান, কিন্তু তা করে দেখিয়েছেন হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তাঁর তৎপরতায় রাজনীতিতে যে-মেরুকরণ ঘটে, তাতে একদিকে জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলাম, কমিউনিস্ট পার্টি ‘সামরিক জান্তার অধীনে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সম্ভব’ মেনে নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। আর, অন্য দিকে ‘সামরিক জান্তার অধীনে গণতান্ত্রিক নির্বাচন অসম্ভব’ বলে বাসদ-জাসদ-ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃত্বাধীন ৫-বাম দল এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

    এ-সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সামরিক স্বৈরতন্ত্রের দালাল’ হিসেবে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ, সিপিবি'র ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন ও জামায়াতে ইসলামের ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরকে ৫-দলীয় জোটের ছাত্র সংগঠনগুলো বিএনপি'র ছাত্র সংগঠন ছাত্র দলের সহযোগিতায় ক্যাম্পাস-ছাড়া করে। এক পর্যায়ে ছাত্র লীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ক্যাম্পাসে সশস্ত্র অভিযান চালালে, তা সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হয় এবং ছাত্র ইউনিয়নের মোজাম্মিল নামের একজন কর্মী প্রাণ হারান।

    পরবর্তীতে, ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ ডাকসুর নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরুকরণে পরিবর্তন আসে। এই প্রথমবারের মতো মৌলবাদকে প্রধান শত্রু  হিসেবে চিহ্নিত করে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শক্তির সমাবেশ ঘটে। বামপন্থী ৫-দলের ছাত্র সংগঠনগুলো আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাথে মিলে পুনরায় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে সংঘবদ্ধ হয়।

    নির্বাচনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ডাকসুর নেতৃত্ব প্রথম বারের মতো আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্র লীগের করায়ত্ব হয়। পরবর্তী বছর ডাকসু চলে যায় বিএনপি’র ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্র দলের হাতে। দুবছর পরে আসে গণ-অভ্যূত্থান, যার মধ্য দিয়ে পতন ঘটে জেনারেল হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের।

    বিকল্পের ধারণা
    বাংলাদেশে বামপন্থী যে-দলগুলো আছে, সেগুলোই এখনও পর্যন্ত প্রধানতঃ দেশের মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। যদিও তারা তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক আদর্শ মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ রক্ষার্থে নিজেদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর, মেহনতি শ্রেণীর, এমনকি সর্বহারার শ্রেণীর বিপ্লবী দল বলেও দাবি ও প্রচার করে, বাস্তবে এর একটিও এখনও পর্যন্ত সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী দলে বিকশিত হয়ে ওঠেনি। কারণ, এদের নেতৃত্ব, সম্পৃক্তি, দাবী-দাওয়া, কর্মসূচি-সমাবেশ, আচার-আচরণ, আবেগ-অনুভূতি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি সবকিছুই এখনও পর্যন্ত মধ্যবিত্ত ‘ওরিয়েন্টেড’ বা অবস্থানের। এটি তাদের জন্মের ও বেড়ে ওঠার সীমাবদ্ধতা। বাংলাদেশে চলমান শ্রেণী-সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণী রক্ত ঝরিয়ে চলে আগে, আর এরা প্রায়শঃ কালি ঝরিয়ে বিবৃতিতে দিয়ে চলে পিছে। এরা শ্রমিক শ্রেণীর অগ্রগামী বাহিনী বা ‘ভ্যানগার্ড’ হয়ে ওঠেনি এখনও।

    ১৯৯০-এর গণ-অভ্যূত্থান-পরবর্তী পার্লামেন্টারী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিএনপির পর আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের পর বিএনপি'র ক্ষমতায় আসা-যাওয়ার প্রক্রিয়ায় সীমাহীন লুন্ঠনের মাধ্যমে মুষ্ঠিমেয় পরিবারের হাতে অঢেল সম্পদের পুঞ্জিভবন ও আম-জনতার নিঃস্বকরণ বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্তের মধ্যে যে-অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে, তার প্রতিফলন ঘটেছে বর্তমান বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলোর মধ্যে।

    এ-পরিস্থিতিতে, পূর্ববর্তী ৫-দলীয় বামগুচ্ছের সাথে সিপিবি-সহ আরও কয়েকটি দল মিলে গড়ে তোলে ৮-দলীয় জোট, যা আনুষ্ঠানিকভাবে বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট নাম ধারণ করে। এ-পর্যায়ে তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি মেরুকরণের বিরুদ্ধে বাম-বিকল্প গড়ে তোলাকে তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সে-লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিস্তারিত ২১-দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করে তা পুস্তিকা আকারে প্রকাশ ও প্রচার করে।

    বামফ্রন্ট তার ২১-দফা কর্মসূচি নিয়ে একনিষ্ঠ আন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে অস্থির মধ্যবিত্ত মানসের প্রতিফলন ঘটিয়ে নিরেট ‘বাম’ না থেকে বরং শ্রেণী-সীমানা অতিক্রম করে ‘দেশ প্রেমিক ও গণতান্ত্রিক শক্তি’র সাথে সংযোজিত হয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে চায়। এ-পর্যায়ে আওয়ামী লীগের ভগ্নাংশ গণ-ফোরামের মতো অ-বাম কয়েকটি দল নিয়ে বামফ্রন্ট ১১ দলীয় জোটে বিকশিত হয়, আর এতে লুক্কায়িত থাকে ভবিষ্যত-বিনাশের বীজ।

    ২০০৬ সালে নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়েতের নেতৃত্বাধীন ৪-দলীয় জোটের সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাস ও লুন্ঠনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর জোট গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করলে, ১১ দলের অন্তর্গত বেশ কয়েকটি বাম দল - সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল, ইত্যাদি - অস্থির ও উদ্দীপনশীল হয়ে ওঠে। তারা ২১-দফায় ঘোষিত বাম-বিকল্পের শ্রেণী-সংকল্প ত্যাগ করে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়’ ও ‘জাতীয় স্বার্থে’ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মঞ্চে একাত্মতা ঘোষণা করে। শুরু হয় মহাজোট গঠনের প্রক্রিয়া।

    বৃহত্তর ঐক্যের করাঘাতের প্রত্যুত্তরে  আওয়ামী লীগের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নিয়ে বাসদ প্রশ্ন তুললে আওয়ামী লীগ ক্ষুব্ধ হয়ে ফিরে যায়। বাসদ-বিহনে বামপন্থীদের পক্ষে ‘বামফ্রন্ট’ নামে আওয়ামী লীগের মহাজোটে যোগ দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, সাম্যবাদী দল, ইত্যাদি স্থির-চিত্তে যোগ দান করে। এমনকি, প্রাক্তন স্বৈরশাসক হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি ও কিছু ইসলামপন্থী দল নিয়ে বৃহত্তর মহাজোট গঠিত হয়।

    মহাজোটের চৌকাঠে মুখ থুবড়ে পড়ে ১১-দলীয় জোট, আর এর মধ্য নিখোঁজ হয়ে যায় বামফ্রন্ট তথা ২১-দফা কর্মসূচির বাম-বিকল্পের সংকল্প। বামফ্রন্টের ডাক-সাঁইটে নেতা জাসদ-সভাপতি হাসানুল হক ইনু, যিনি এরশাদের বিরুদ্ধে অবৈধ ক্ষমতা দখলের মামলা করেছিলেন এবং এরশাদ যাঁকে ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে গালি দিয়েছিলেন, তিনিই ‘ইরশাদকে নিয়ে মহাজোট’ গঠনের শক্তিশালী তাত্ত্বিক হয়ে ওঠেন।

    বামফ্রন্ট-পরবর্তী সময়ে সিপিবি একটি মধ্যবর্তী অবস্থান গ্রহণ করে এবং বাসদ ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র বাম দল ও বিভিন্ন বাম-মনা সংগঠন নিয়ে গণতান্ত্রিক বামমোর্চা গড়ে তোলে। সিপিবি একদিকে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের পাশা-পাশি কর্মসূচি দিয়ে একাত্মতা বজায় রাখে, আবার অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করে বাসদের নেতৃত্বাধীন বাম-মোর্চার সাথেও সম্পৃক্ততা রক্ষা করে চলে। সাম্প্রতিক কালে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতায় বাসদ অগ্রগামী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বিশেষতঃ ২০১১ সালে বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী আন্তর্জাতিক সম্মেলন করে এবং ভারতকেও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে বাসদ সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার চ্যাম্পিয়ান হয়ে উঠেছে।

    বিগত দিনগুলোতে সিপিবি ও বাসদের মধ্যে যুগপৎ আন্দোলন-কর্মসূচি চলছিলো থেকে-থেকে। তবে, আওয়ামী লীগের সাথে সিবিপি’র ঘনিষ্ঠতার কারণে বাসদের পক্ষ থেকে বিকর্ষণ, আবার বাম মোর্চার অন্তর্গত ‘অতি-বামদের’ সাথে বাসদের সম্পৃক্ততা হেতু সিপিবি'র বিরক্তির কারণে এ-দুই দলের মধ্যে স্থির ঐক্য গড়ে উঠছিলো না। কিন্তু সম্ভবতঃ সাম্প্রতিক বিশ্বের দেশে-দেশে বামপন্থীদের নব-জাগরণ এবং প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা পাবার পর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট ও সৌশ্যালিস্ট দল দুটির মধ্যে আবার বিকল্প হয়ে গড়ে ওঠার বাসনা সবলে উত্থিত হয়ে থাকবে। তাই তারা ‘সময়ের দাবি’ উল্লেখ করে গত ৩রা জুলাই এক সংবাদ-সম্মেলনের মাধ্যমে ১৫-দফা হাজির করেছে।

    কর্মসূচির ভূমিকায় তারা যথারীতি ‘১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের’ মধ্য দিয়ে শুরু করেছে কিন্তু তাদের পূর্ব-প্রতিশ্রুত ২১-দফার কী হলো, বামফ্রন্ট কোথায় হারালো, ইত্যাদি বেমালুম চেপে গিয়েছে। বাংলাদেশে ডানে-বামে কোথাও কোনো জবাবদিহিদার সংস্কৃতি পর্যবেক্ষিত হয় না এখনও পর্যন্ত। (পরের কিস্তিতে আসছে ‘কর্মসূচি-বিশ্লেষণ’)।

    রোববার, ৮ জুলাই ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড


পাঠকের প্রতিক্রিয়া

পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন