• বাম-বিকল্পঃ সাধারণ বিশ্লেষণ
    মাসুদ রানা

    শুরু করা যাক শিরোনাম থেকে। যে-কোনো পাঠের ক্ষেত্রে শিরোনাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিরোনাম হচ্ছে একটি পাঠের ‘এক কথায় প্রকাশ’। তাই শিরোনামকে হতে হয় ‘আনইক্যুভৌক্যাল’ ও ‘ডিসাইসিভ’ - অর্থাৎ, দ্ব্যর্থহীন ও নিশ্চায়ক।

    সিপিবি-বাসদের ঘোষিত কর্মসূচির শিরোনাম হচ্ছেঃ ‘জনগণের বিকল্প শক্তি তথা জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি’। স্পষ্টতঃ এটি একটি দুর্বল শিরোনাম। কারণ, এর ভাষা দ্ব্যর্থবোধক ও অনিশ্চায়ক। এই দ্ব্যর্থতা ও অনিশ্চয়তার ভাষাগত কারণ হচ্ছে শিরোনামে ‘তথা’ অব্যয়ের প্রয়োগ, ‘জনগণের বিকল্প’ বিশেষণটির বাচাল পুনরাবৃত্তি এবং ‘শক্তি’ ও ‘সরকার’ বিশেষ্য দু’টির সম্পর্কহীন সমান্তরাল ব্যবহার। 

    শব্দ-কন্টকিত না করে সোজা বাংলায় এটি হতে পারতোঃ ‘ভবিষ্যত বাম সরকারের কর্মসূচি’, অথবা ‘বাম-বিকল্পের প্রতিশ্রুতি’। স্পষ্টতঃ একই শিরোনামের মধ্যে ‘জনগণের বিকল্প’ কথাটি দু’বার এলেও মূল থিম্‌ ‘বাম-বিকল্প’ আসেনি এক বারও। কারণ অজ্ঞাত।

    ভাষা যেহেতু একই সাথে চিন্তার বাহন ও প্রতিফলক। তাই, বাম-বিকল্পের কর্মসূচি ঘোষণায় ব্যবহৃত ভাষার সমস্যার মধ্যে বাম-বোধের সমস্যাও উৎকট হয়ে উঠেছে। নিচের ব্যাখ্যায় তা পর্যবেক্ষিত।

    প্রথমেই বুঝা দরকার ‘কর্মসূচি’র অর্থ কী? ইংরেজি শব্দ ‘প্রোগ্রাম’-এর বাংলা হচ্ছে কর্মসূচি। আর এর অর্থ হচ্ছে কাজের তালিকা। যে-কোনো কর্মের যেমন কর্তা লাগে, কর্মসূচিরও ‘ইমপ্লিমেন্টার’ বা বাস্তবায়ক লাগে। বাম-বিকল্পের কর্মসূচিতে বুঝার উপায় নেই এর ইমপ্লিমেন্টার কে। ‘জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি’র অধীনে প্রতিটি কাজ বা ক্রিয়াকে লক্ষ্যণীয়ভাবে কর্তা-শূন্য করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

    নিঃসন্দেহে বামেরা এই প্রথম বারের মতো নিজস্ব সরকার গঠনের কথা বলার সাহস দেখিয়েছে। যদিও ১৯৭৪ সালে সিপিবি নিজেকে বিলুপ্ত করে শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসনের অংশীদার হিসেবে মনে করেছিলো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু তারা নিজেকে কখনও কর্তা ভেবে সরকার পরিচালনার কর্ম-ভাবনার সাহস দেখাতে পারেনি। বাসদ শ্রেণী-বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে তারাই ‘সর্বহারা শ্রেণীর একমাত্র বিপ্লবী দল’ দাবি করে, তিন দশকের অধিক কাল কাটানোর পর, এবার বিপ্লব বিহনেই সরকার গঠনের যৌথ কর্মসূচি ঘোষণা করলো।

    কর্মসূচির প্রথম দফায় ১৯৭২ সালের সংবিধানে উল্লেখিত মূল চার নীতির একটি হিসেবে সমাজতন্ত্রের ‘চেতনা সমুন্নত রাখা’র উল্লেখ এবং এর ব্যাখ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতনা সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা’ ছাড়া সমাজতন্ত্রের কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বা করণীয় হাজির করতে পারেনি সিপিবি ও বাসদ।

    বস্তুতঃ সিপিবি যেমন সরে এসেছে তার পুরনো মিত্রদের কাছ থেকে, বাসদও তেমন সরে এসেছে তার পুরনো বিপ্লবের কর্মসূচি থেকে। দৃশ্যতঃ বাসদ জয় করেছে সিপিবির হৃদয়, আর সিপিবি জয় করেছে বাসদের মস্তিষ্ক। এবার বিজয়ী ও বিজিতের হৃদয়-মস্তিষ্ক জুড়ে বেজে উঠেছে এক ঐক্যের তান, আর এর লক্ষ্য হচ্ছে ‘জনগণের বিকল্প সরকার গঠন’।

    বামেরা সাধারণতঃ ‘দিতে হবে, মানতে হবে’ জাতীয় ‘ডিমাণ্ড’ (দাবি), ‘মানি না, মানবো না’ ধরনের ‘ডিফায়েন্স’ (বিরুদ্ধাচারণ) এবং ‘ধ্বংস হোক, নিপাত যাক’ প্রকারের ‘কার্স’ (অভিশাপ) উচ্চারণ করার মধ্যেই নিজেদেরকে নিযুক্ত রাখতো। কিন্তু এবারে তারা তাদের পর্যবেক্ষিত ‘সময়ের দাবি’ মেটাতে ‘বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্য কর্মসূচি’র ঘোষণা করেছে। তাই, ১৫-দফার একটিতেও আর আগের মতো ঐ ‘ডিমাণ্ড-ডিয়াফেন্স-কার্স’ সূচক ‘ভার্ব’গুলো লক্ষ্য করা যায় না।

    বামেদের সাহস বেড়েছে বটে, কিন্তু তাই বলে এতোটুকু বাড়েনি যে, তারা ‘ফার্স্ট পার্সনে’ ও ‘এ্যাক্টিভ ভয়সে’ ‘আমরা করবো’ বলতে সক্ষম হয়েছে। তারা বরং  ‘ভার্ব’-এর ‘ইনফিনিটিভ’-নির্ভর ‘টু-ডু’-জাতীয় ‘করা’, ‘রাখা, ‘তোলা, ‘দেয়া’, ‘ঘটানো, ‘করণ’, ‘প্রণয়ন’ ইত্যাদি কর্তা-হীন ক্রিয়া সম্বলিত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। অধিকন্তু, তারা সম্ভবতঃ নিজের অজান্তেই পরবর্তীতে সেই ‘কর্মসূচি’ পালনের আহবান জানিয়েছে।

    সরকার গঠনের লক্ষ্যে প্রণীত কর্মসূচি পালন করে কীভাবে? উদাহরণস্বরূপ, ‘জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি’র ১০ম দফায় যেখানে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্রীয় খরচে সকলের জন্য বৈষম্যহীন শিক্ষা এবং সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা’। ভালো কথা। তো, এই কর্মসূচি ‘পালনের আহবান’-এর প্রতি কে সাড়া দেবে এবং কীভাবে দেবে? কিন্তু তারও আগে বুঝা দরকার ‘সকল নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা’ কর্মসূচি পালন করার অর্থ কী? এখানে কি ‘ডিমাণ্ড’ করা, না ‘ডেলিভার’ করা বুঝানো হচ্ছে? ‘ডিমাণ্ড’ করলে তো এটি সরকার গঠনের কর্মসূচি হতে পারে না। আর ডেলিভার করতে গেলে তো সরকারে যেতে হবে।

    উপরেরটি বিভ্রান্তির একটি উদাহরণ মাত্র। সমগ্র কর্মসূচিতে এ-রকম বিভ্রান্তি প্রচুরই আছে। কিন্তু আলোচ্য কর্মসূচির সাধারণ বিভ্রান্তি হচ্ছে উপায় ও ফলাফলের পার্থক্য উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থেকে সৃষ্ট। ‘সরকার গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি’ কথাটার ভাষাগত অর্থ হচ্ছে, যে-কর্মাদি সম্পাদন করার মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করা হবে, তার তালিকা। স্পষ্টতঃ বাম-বিকল্প’র কর্তা-হীন পঞ্চদশ দফায় বর্ণিত ক্রিয়া-সমূহের যে-কোনোটি সম্পাদন করতে গেলে হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা লাগবে। অর্থাৎ, এ-কাজগুলো করতে গেলে সরকার গঠন করতে হবে। অথচ, বাম-বিকল্পের কর্মসূচি সরকারী কর্মসূচি নয়, বরং সরকার গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি। স্পষ্টতঃ সরকার গঠন হচ্ছে লক্ষ্য, আর করণীয় ক্রিয়াগুলো হচ্ছে তার উপায়।

    কিন্তু বাস্তবে, ঐ কর্মসূচি হওয়া উচিত ছিলো তাদের লক্ষ্য, আর বিপ্লবের পথে সরকার গঠন করা ছিলো তাদের উপায়। না, বামেরা ফলাফলকে উপায় ধরে, আর উপায়কে ছেড়ে দিয়ে অভিনব এক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, যাকে গাড়ীর আগে ঘোড়া না দিয়ে ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দেয়ার সাথে তুলনা করা যায়।

    সিপিবি-বাসদের যৌথ কর্মসূচি হাজির করা হয়েছে দু’টি ‘ফর্মেট’ বা অবয়বে। এর প্রথমটি হচ্ছে ‘এক নজরে’ ১৫ দফা, যার প্রতিটি দফা আবার শিরোনাম হিসেবে হাজির করা হয়েছে অনুগামী বৃত্তান্ত সহযোগে। বুঝা যায়, এদের আশা ছিলো একটি কম্প্রিহেনসিভ বা সমন্বিত কর্মসূচি দেবার। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে আমূল রূপান্তরের প্রত্যাশাও লক্ষ্যণীয়। যেমন, ‘আমূল ভূমি সংস্কার’-এর বহু পুরনো কথাটিও বলেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই কর্মসূচি বোধে, বুদ্ধিতে ও প্রকাশে দরিদ্র।

    পূর্ব কিস্তির ‘বাম-বিকল্পঃ পদ্ধতি’ লেখায় দেখানো হয়েছে জনগণের কাছে না যেয়ে, তাঁদের সাথে আলোচনা পরামর্শ না করে জনগণের কর্মসূচি বিকশিত করা যায় না। এই কর্মসূচি যে-রূপে ঘোষণা করা হয়েছে, সে-রূপে ঘোষণা না করে পলেমিক্সের জন্য ব্যবহার করে, সর্বস্তরের নেতা-কর্মী ও জনগণের ‘ফীডব্যাক’ নিয়ে, একটি উন্নততর ও কার্যকর কর্মসূচি হিসেবে বিকশিত করা যেতো।

    বর্তমান কর্মসূচির চোখে পড়ার মতো দূর্বলতা হচ্ছে এর অসম্পূর্ণতা। সরকার গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি ঘোষণা করলেও বুঝা যায় যে, বামেরা এটিকেই তাদের ভবিষ্যৎ সরকারের কর্মসূচি হিসেবেও ব্যবহার করবে। সত্যিই যদি বামেরা সরকার গঠনে সক্ষম রূপে একটি বিকল্প হিসেবে জনগণের সমানে আসতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সক্ষম হিসেবে তাদেরকে সংশ্লিষ্ট সবার সামনে আর্বিভূত হতে হবে।

    বাম-বিকল্প কর্মসূচির অসম্পূর্ণতা হচ্ছে, এটি সংবিধানে বর্ণিত  রাষ্ট্রের তিনটি ‘অর্গান’ বা অঙ্গ  ‘লেজিসলেটিভ, ‘এক্সিকিউটিভ’ ‘জুডিশিয়্যারি’র মধ্যে শুধুমাত্র প্রথমটির বিষয়ে ১ম দফায় এক ধরণের সংস্কার-মূলক বিকল্পের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু প্রশাসন ও বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন ও মেধার যোগ্যতা ইত্যাদি সাধারণ কথা ছাড়া গণতান্ত্রিক চেতনা সম্পন্ন কোনো নতুন কথাই শোনাতে পারেনি। অথচ, এই বামেরাই প্রায়শঃ ঔপনিবেশিক আমলাতন্ত্র বলে বাংলদেশ রাষ্ট্রটির এক্সিকিউটিভ ব্রাঞ্চের সমালোচনা করে থাকে।

    কেউ পছন্দ করুন বা না-করুন, প্রশাসন হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনের সচেতন-সবাক-সক্রিয় যন্ত্র। এর সম্পর্কে মৌলিকভাবে উন্নততর কিছু না-ভেবে, না-বলে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিপ্লব বিহনে যাওয়া যাবে ভাবটা একটি অলীক কল্পনা। সিপিবি-বাসদ প্রণীত ‘জনগণের বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে কর্মসূচি’র মধ্যে প্রশাসন বিষয়ে বিস্তারিত কোনো কিছু না থাকাটা একটি বিরাট অসম্পূর্ণতা এবং সে-হিসেবে দূর্বলতাও বটে।

    একই ভাবে, জুডিশিয়ারী বা বিচার বিভাগেরর বিষয়ে তেমন কিছু বলতে পারেনি বাম-বিকল্পের কর্মসূচি প্রণেতাগণ। সারা জীবন আইনের শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পক্ষে বলে-বলে সম্ভবতঃ ক্লান্ত হয়ে এবার যখন সরকার গঠনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে গেলো, তখন বামেরা শুধু কালো আইন বাতিলের কথা বলে বহু উচ্চারিত পূর্ব-কালের কথাগুলো বেমালুম চেপে গেলো।

    অসম্পূর্ণতার দিক অনেক, যার বিস্তারিত উল্লেখ স্থানাভাবে সম্ভব নয় এখানে। তবে তালিকা আকারে যা উল্লেখ করা যায়, তার মধ্যে আছে, আইন-শৃঙ্খলা ইস্যু এবং অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা বিষয়। এই দুটো বিষয়ে বিস্তারিত না-ভেবে, না-বলে কর্মসূচি দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া যাবে ভাবাটা একটা ছেলেমানুষি ছাড়া আর কিছুই নয়। বাম-বিকল্পের কর্মসূচিতে এ-বিষয় দু’টো বিস্তারিত ভাবে আসা উচিত ছিলো।

    বামদেরকে জনগণ সাধারণতঃ আন্তর্জাতিকতাবাদী মনে করেন। ‘মস্কোতে বৃষ্টি হলে ঢাকায় ছাতা মেলে’ বলে একটি বদনাম ছিলো সিপিবি’র। আগের একটি কিস্তিতে বলা হয়েছে, বাসদ সম্প্রতি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ-আগ্রাসন ইত্যাদির বিরুদ্ধে অগ্রণী হয়ে উঠেছে। গত বছর নভেম্বর মাসে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক সম্মেলনও তারা করেছে, যেখানে সিপিবিও অংশগ্রহণ করেছে। অথচ এই দু’টি দলের মিলিত কর্মসূচির ১২ নম্বর দফার এক নজর ভার্সনে বলা হয়েছেঃ ‘বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ চক্রান্ত ও আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা। জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্র অনুসরণ।’

    ‘প্যাসিভ’ হলেও উপরের কথাগুলো একভাবে ১৫-দফার ‘এক নজরে’ বলা হয়েছে। কিন্তু আশ্চার্যজনক ভাবে এ-কথাগুলোও ১৫-দফার বিস্তারিত সংস্করণে সম্পূর্ণভাবে তুলে দেয়া হয়েছে। অন্যান্য দফার ক্ষেত্রে ‘এক নজরে’ সংস্করণ যেখানে বিস্তারিত সংস্করণের শিরোনাম হিসেবে এসেছে, ১২ নম্বর দফার ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি, সেখানে বিষয়টি পরিবর্তন করে ‘জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা’ বলে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ব্যাপারে মুখে কুলুপ আঁটা হয়েছে।

    আমেরিকার সাথে ‘জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী সকল চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ’ করার কথা বললেও ‘ট্রানজিট, বিভিন্ন নদীর পানি বন্টন, অভিন্ন নদী শাসন এবং টিপাইমুখ সহ বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণ সম্পর্কিত চুক্তি’র কথা বলতে ভারতের নামটি পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। এটি নিঃসন্দেহে একটি সিপিবি-সিন্ড্রোম, যার সাথে আপোস করতে হয়েছে 'ভারতীয়-সাম্রাজ্যবাদ' বলা বাসদকেও।

    গত এক বছর যাবৎ পৃথিবীতে যখন ভয়ঙ্কর-ভাবে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে এবং এই যুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতোই বাঙালীর ভোগার আশঙ্কা রয়েছে, তখন বাম-বিকল্পের কর্মসূচিতে যুদ্ধ-বিরোধী অবস্থানের প্রতিফলন না হওয়াটা রীতিমতো দুর্ভাবনার বিষয়।

    বাম-বিকল্পের কর্মসূচির অসম্পূর্ণতা ছাড়াও আছে ধারণার সাংঘর্ষিকতা। যেমন ১০ নম্বর দফার শিরোনামে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্রীয় খরচে সকলের জন্য বৈষম্যহীন শিক্ষা ও সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা’। কিন্তু এর নিচে আবার বেসরকারী স্কুল-কলেজ ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এবং শুধুমাত্র সুনির্দিষ্টভাবে ‘দরিদ্র সাধারণ রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ঔষধসহ চিকিৎসা নিশ্চিত করা’ কথা বলা হয়েছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, শিরোনামে ‘ইউনিভার্স্যাল’ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কথা বললেও কর্মসূচি প্রণেতাগণ বস্তুতঃ এর অর্থ বুঝতে পারেননি। তাই, আগের কথাগুলোর সাথে পরের কথাগুলো সাংঘর্ষিক হয়ে গিয়েছে। এ-রকম আরও সাংর্ষিকতা রয়েছে।

    তৃতীয়তঃ অনেক ধারণা বা ‘কনস্ট্রাক্ট’ কর্মসূচিতে এসেছে, যা অতিমাত্রায় সাবজেক্টিভ। যদিও বামপন্থীরা বৈজ্ঞানিকতার কথা বলেন, কিন্তু তাঁদের ব্যবহৃত শব্দে-বাক্যে-ধারণা কখনও কখনও এতো সাবজেক্টিভ হয় যে, সন্দেহ হয় তাঁরা বৈজ্ঞানিকতার মর্মবস্তুটুকু বুঝেন, না-কি অন্য আরেক ধরণের অন্ধ বিশ্বাসকে ‘আদর্শ’ নাম দিয়ে চর্চা করেন।

    বাম-বিকল্পের কর্মসূচিতে ব্যবহৃত কয়েকটি সাবজেক্টিভ ‘কনস্ট্রাক্ট’-এর মধ্যে একটি হচ্ছে সংবিধানকে ‘গণমুখী’ করা। ‘গণমুখী’ কথাটা শুনতে ভালো হলেও এটি কীভাবে অর্জন করতে হয়, তার বস্তুনিষ্ঠ পদক্ষেপ কিন্তু সুনির্দিষ্ট নয়। তেমনি ভাবে, ‘আদর্শবাদী রাজনীতির পুনর্জাগরণ’ও শুনতে ভালো একটি আকাঙ্খা। কিন্তু বিষয়টি কী এবং কীভাবে এটি হবে? যদি বলা হয়, ‘ঠিক আছে, জাগান’, তখন ঠিক কী কর্মটি করবেন? এগুলোতে বস্তুনিষ্ঠতা দরকার।

    তাছাড়াও আছে অদ্ভূত কিছু শব্দের ব্যবহার, যেগুলো প্রমিত বাংলার মধ্য পড়ে না এবং যেগুলো ভাষার ক্ষেত্রে নিম্ন সাংস্কৃতিক মানের পরিচায়ক। ‘টেণ্ডারবাজ’ ও ‘তোলাবাজ’-এর বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ছায়াছবিতে অপসংস্কৃতির প্লাবন শুরু হবার কালে ‘রংবাজ’ নামে একটি শব্দের অনুপ্রেবেশ ঘটেছিলো। এখন রাজনীতির ভাষায় ‘বাজ’ ও ‘বাজি’ ‘সাফিক্স’-যুক্ত শব্দের বেশ প্রাবল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দলবাজি, চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি, তোলাবাজি, ইত্যাদি কয়েকটি উদাহরণ।

    উন্নত চিন্তার জন্য উন্নত ভাষার ব্যবহার প্রয়োজন। বিকশিত রাজনৈতিক চিন্তায় বিকশিত ভাষার ব্যবহার জরুরী।  দুর্ভাগ্যবশতঃ বাম-বিকল্পের কর্মসূচির ভাষা, বাক্যা-কাঠামো, বানান, ‘পাংচুয়েশন’ বা যতি চিহ্নের ব্যবহার অত্যন্ত দুর্বল। এই দুর্বলতা নিয়ে বাম রাজনৈতিক শক্তি বিরাজ করছে অকার্যকর হয়ে। এদের যদি সত্যি-সত্যি বিকল্প শক্তি হিসেবে উদ্ভব হতে হয়, তাহলে তাদের মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে। বামদের গুরু কার্ল মার্ক্সই বলে গিয়েছেন ‘টু চেইঞ্জ দ্য ওয়ার্ল্ড ওয়ার্কার্স উইল হ্যাভ টু চেইঞ্জ দেমসেলভস ফার্স্ট।’

    স্থানেভাবে কর্মসূচির দফাসমূহের প্রতিটির বিশ্লেষণ সম্ভব হলো না। পরবর্তীতে ‘সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ’ লেখার ইচ্ছা রাখি।

    রোববার, ২২ জুলাই ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

১৫ দফার বিস্তারিত বিশ্লেষন হলে ভালো হতো। পরবর্তী লেখার অপেক্ষায়র রইলাম।

বানান, ভাষা শব্দ ইত্যাদি নিয়ে কচকচানি বেশী হইছে। চাদাবাজি, টেন্ডারবাজি শব্দে সমস্যা কি? তবে অভারঅল ভালো বিশ্লেষণ। বামপন্থিগো তেমন আশা নাই।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন