• বাসদের ইতিহাস, তাত্ত্বিক বিতর্ক ও শিবদাস ঘোষ প্রসঙ্গে
    মোস্তফা ফারুক

    [বাসদের ভাঙ্গন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে গণ-মাধ্যম পর্যন্ত বিভিন্ন মাত্রার রাজনৈতিক বিতর্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বক্ষ্যমান প্রবন্ধটি আমরা সংগ্রহ করেছি এর লেখক মোস্তফা ফারুকের কাছ থেকে। তিনি বাসদের ছাত্র সংগঠন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিন মেয়াদে সভাপতি ছিলেন। বাসদ-ভাঙ্গন বিতর্কে তাঁর মতামতের প্রাসঙ্গিকতা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে তা পত্রস্থ করা হলো - সম্পাদক]

    শুরু থেকে আমার সিদ্ধান্ত ছিলো যে, পার্টির চলতি বিতর্কে প্রকাশ্যে অংশ নেবো না। আমি যেভাবে একটা বিপ্লবী পার্টি বুঝি, তাতে এ-রকম একটা মতাদর্শগত বিতর্ক পার্টির
    বিভিন্ন ইউনিট এবং বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পরিচালিত হওয়া উচিত। এটি বিপ্লবী আন্দোলন ও পার্টি নির্মাণের কারিগরদের মতাদর্শ। যাঁরা এ-সংগ্রামের মধ্যে
    নিয়োজিত রয়েছেন ও হাতে-কলমে কাজ করছেন, তাঁদের ভূমিকাই এখানে হবে মুখ্য। এর আদর্শগত সমস্যার উত্তর বা সমাধান এ-আন্দোলনের ভিতর থেকেই আসতে হবে এবং আসবে। তত্ত্ব কথা জানা একদল কনসাল্টেন্ট বা বিশেষজ্ঞ এর সমাধান দিতে পারবেন না। যদিও তাঁরা আমাদের নেতা কর্মীদের তত্ত্বগতমান ও শিক্ষা নিয়ে ইতিমধ্যে অনেক কথা বলেছেন। মার্কসবাদ intellectualism নয়। এর নির্মাণ ও বিকাশ শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী আন্দোলনের মধ্য থেকেই হয়েছে। অবশ্যই আমি এ-কথা অস্বীকার করছি না যে, যাঁরা প্রতক্ষ্যভাবে আজ এ-সংগ্রামে নেই, তাঁদের মতামতের কোনো ভূমিকা বা মূল্য নেই। আমি এ-আন্দোলনের একজন শুভানুধ্যায়ী হিসেবে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ এখানে তুলে ধরতে চাই।

    ১৯৭৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যাই সার্বক্ষণিক রাজনীতি করার জন্য। তখন যশোরে জাসদের একটা সেলের সদস্য ছিলাম। এ-সময় জাসদ COC (Central Organising Committee) নামে একটা কেন্দ্রীয় কাঠামো তৈরী করে। তার অংশ হিসেবে এ-সেল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো। পরে অবশ্য সিওসি ভেঙে দেয়া হয়। আমাদের সেল পরিচালনা করতেন সালেহা বেগম। তাঁর কাছেই প্রথম মুবিনুল হায়দার চৌধুরীর নাম শুনি। জাসদের খসড়া থিসিসের ওপর আলোচনা করার জন্য তাঁর ওই অঞ্চল সফরের কথা ছিলো।

    ১৭ মার্চ কেশবপুর থেকে পুলিস সালেহা বেগম ও আব্দুল গফ্ফার-সহ আমাকে গ্রেফতার করে। বিশেষ ক্ষমতা আইনে সাত মাস বন্দী ছিলাম যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। সে-সময় জেইল ভর্তি ছিলো জাসদের নেতা-কর্মী দিয়ে। সেখানেই প্রথম জাসদের ভুল-ভ্রান্তি নিয়ে নানা আলোচনার সাথে পরিচিত হই। জেইলের ভেতর বিশেষ ক্ষমতা আইনে বন্দীদের জন্য ছিলো আলাদা ওয়ার্ড। এর উদ্দেশ্য ছিলো রাজনৈতিক বন্দীদেরকে সাধারণ বন্দীদের সাথে মেলামেশা করা থেকে বিরত রাখা। এটি আমাদের জন্য সুযোগ করে দিয়েছিলো রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা করার – বিশেষ করে পাঠচক্র গড়ে তোলার। আমার জন্য এটি ছিলো মার্কসবাদ-লেনিনবাদের অ-আ-ক-খ শেখার পর্যায়। সাতক্ষীরার প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমান আমাদের পাঠচক্র পরিচালনা করতেন। পরবর্তীতে, তিনি বাসদ-প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হয়েছিলেন।

    জুন-জুলাই কিংবা এ-রকম একটা সময় কুমিল্লা জেল থেকে বদলী হয়ে ফিরে এলেন যশোরের জাসদ নেতা প্রয়াত আবদুল হাই, ইকবাল আনোয়ার ফারুক ও অশোক রায়। তাঁদের কাছে প্রথম খালেকুজ্জামানের কথা শুনলাম। শুনলাম, তিনি সেখানে কীভাবে জেইলের অভ্যন্তরে যৌথজীবন গড়ে তুলেছেন সে-সব গল্প। সব থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিলো ওঁরা কুমিল্লা জেইল থেকে ‘কেন এস ইউ সি আই ভারতবর্ষের মাটিতে একমাত্র সাম্যবাদী দল’ বইটা খাতায় লিখে নিয়ে এলেন। জেইলে রাজনৈতিক বই নিষিদ্ধ ছিলো। ওই খাতা থেকে আমরা আবার কপি করে নিলাম। ওই লেখাটা জেইলে বন্দী জাসদের নেতা কর্মীদের মধ্যে ঝড় তুলেছিলো। আমরা কেনো জাসদ করছি ... জাসদ কোন শ্রেণীর দল ... ইতিমধ্যে খসড়া থিসিস প্রকাশিত হয়েছে ... যেখানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতি-রণকৌশল ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কিন্তু পার্টি কোথায় ... এসব প্রশ্ন প্রতিদিন পাঠচক্রগুলোতে আলোচিত হতো। ‘কেন এস ইউ সি আই’–এই লেখা ছিলো আমাদের সর্বহারা শ্রেণীর পার্টি সংক্রান্ত ধারণা গড়ে ওঠার ভিত্তি।

    জেইল থেকে বেরিয়ে যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেলাম। জেইলের বাইরেও তখন ব্যাপক বিতর্ক চলছে। জাসদের অতীত কার্যক্রম ও শ্রেণী পার্টি ছিলো বিতর্কের মূল বিষয়বস্তু। ১৯৭৮ সালে ছাত্রলীগের এক কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভায় অভিযোগ নিয়ে আসা হলো যে, সাতক্ষীরার মুস্তাফিজুর রহমান ভারত থেকে এস ইউসিআই-এর কয়েক বস্তা বই ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। এই শুরু হলো জাসদ নেতৃত্বের এসইউসিআই-বিরোধী অবস্থান। এ-সময় মান্না-আখতারের নেতৃত্বে আমরা জাসদের অতীত ভ্রান্ত রাজনীতির সমালোচনা এবং বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার প্রশ্নে সোচ্চার। অন্যদিকে মুনির-হাসিবের নেতৃত্বে অন্যরা জাসদের সে-সময়কার অফিশিয়্যা পোজিশনের পক্ষে। তাঁদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিলো এসইউসিআই। সে-সময়কার একটা দেয়াল লিখনের কথা এ-প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই। তখন ঢাকসু অফিস ছিলো কলা ভবনের নিচ তলায়। সে-অফিসের উল্টো দিকের দেয়ালে মুনির-হাসিবের কর্মীরা লিখেছিলোঃ ‘বঙ্গভবনে থাকেন গাই, তার যে বাছুর মান্না ভাই, এসইউসি‌-র নাতজামাই, বলেন নতুন পার্টি চাই’। এ-সময় এমন একটা আবহাওয়া তৈরী হয়েছিলো যেনো শিবদাস ঘোষ পড়ে আমরা সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছি। গোপনে লুকিয়ে শিবদাস ঘোষের বই এক হাত থেকে আর এক হাতে ঘুরতো।

    ১৯৭৯ সালের শেষ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযে ভর্তি হয়ে ঢাকায় চলে এলাম। সে-সময় প্রতিটা দিন ছিলো ভীষণ উত্তপ্ত। জাসদ ছাত্রলীগ তখন কার্যতঃ দু’ভাগে বিভক্ত। নিউ মার্কেটের বলাকা ভবনকে কেন্দ্র করে মুনির-হাসিব আর ডাকসু অফিসকে ঘিরে মান্না-আখতারের নেতৃত্বে আর একটা ধারা। মধুর ক্যান্টিনে আর ঢাকসু অফিসে মতবাদিক বিতর্কের ঝড় বইতো সারাদিন। আর সে-বিতর্কে আমাদের যুক্তি-তর্কে শিবদাস ঘোষের চিন্তা ও শিক্ষা ছিলো আমাদের হাতিয়ার। নিজের জন্য এক সেট শিবদাস ঘোষের লেখা বই সংগ্রহ করতে সাতক্ষীরায় মুস্তাফিজুর রহমানের বাড়ী পর্যন্ত গিয়েছিলাম।

    আমি এখানে যা বলতে চাইছি তা হচ্ছে, মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আন্দোলনের যে-ধারা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আমরা জাসদের অভ্যন্তরে শুরু করেছিলাম, সেখানে আমাদের আদর্শগত instrument (হাতিয়ার) ছিলো শিবদাস ঘোষ। কিন্তু আমরা কখনই স্বাচ্ছন্দ্যে SUCI বা শিবদাস ঘোষ রেফার করতে পারতাম না। ভারতকে ঘিরে যে-সংষ্কার বা সঙ্কীর্ণতা আমাদের দেশে রয়েছে তার প্রভাব প্রবলভাবে জাসদের মধ্যেও ছিলো। যার রেশ এমনকি বাসদ প্রতিষ্ঠার সময়ও ছিলো।

    জাসদ-অভ্যন্তরে সেদিন মতবাদিক সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণীর একটা পার্টি গড়ে তোলার নীতিগত ও পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গী যে আমরা শিবদাস ঘোষ থেকে নিয়েছিলাম, তার প্রমাণ হচ্ছে ‘সর্বহারা শ্রেণীর দল গঠনের সমস্যা প্রসঙ্গে’ প্রকাশিত ১৯৮১ সালের পুস্তিকা। কিস্তু দেখুন, কোথাও তাঁকে উল্লেখ করা হয়নি। তাঁর ব্যাখ্যাই হুবহু বলা হচ্ছেঃ যেমন, সংবিধানের ভিত্তিতে দলের চূড়ান্ত সাংগঠনিক রূপ দেয়ার পূর্বে তিনটি অপরিহার্য প্রাথমিক শর্ত পূরণের ধারণা। একইভাবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতা ও নেতৃত্ব সম্পর্কিত ব্যাখ্যা শিবদাস ঘোষ থেকে নেয়া। যেহেতু ওখানে শিবদাস ঘোষের কোনো উল্লেখ নেই তাই আজ এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সহজেই বলা হচ্ছেঃ আমরাতো আমাদের ৮০/৮১ সালের ঘোষণায় কোথাও বলিনি যে শিবদাস ঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে পার্টি গড়ে তুলেছিলাম। আমরা যারা একদিন ‘কেন এস ইউ সি আই’ বইটির প্রতিটা বর্ণ খাতায় লিখে পাঠ করেছিলাম তাদের একজন হিসেবে এই ইতিহাস বিকৃতি কখনই মেনে নিতে পারবো না।

    ১৯৮৩ সালেও SUCI ও শিবদাস ঘোষ অনুসরণের জন্য আমাদের অন্ধত্ব/গোড়াঁমীর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো। এতোদিন আমার ধারণা ছিলো ১৯৮৩ সালে মাহবুব-মান্নাদের দল ত্যাগের মধ্যদিয়ে SUCI ও শিবদাস ঘোষ সংক্রান্ত জড়তা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পেরেছি এবং শিবদাস ঘোষের শিক্ষা-চিন্তা চর্চার পথে আর কোনো বাধা নেই। এর প্রমাণও আছে। ১৯৮৩ সালের পর পার্টি প্রকাশনায় শিবদাস ঘোষ রেফার করতে কখনই কোনো সমস্যা হয়েছে বলে আমার কাছে ধরা পড়েনি। খালেকুজ্জামানের বহু বক্তৃতায় ও প্রকাশনায় তার প্রমাণ আছে। আমাদের পার্টির আদর্শগত পরিমণ্ডল নির্মাণে শিবদাস ঘোষের চিন্তার গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা বিবেচনায় নিয়ে তাঁর মৃত্যু বার্ষিকীতে আলোচনা সভা করা হতো। কিস্তু বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছি, ৩২ বছর পর সেই সংষ্কার আবার ফিরে এসেছে। এবার তা এসেছে একটু ভিন্ন ভাবে। একদিকে বলা হচ্ছে, ‘আমরা শিবদাস ঘোষ থেকে শিক্ষা নিয়েছি, নিচ্ছি এবং নেব’, আবার তাঁরা একই সঙ্গে এখন পড়াশুনা করে আবিষ্কার করছেন যে, শিবদাস ঘোষের শিক্ষা বলে জগতে কিছুই নেই। কেনো আজ এই পরিণতি, তার কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে আমি যাবো না। যদিও তা জরুরি ভবিষ্যৎ পথ চলার প্রশ্নে। এবং আশা করি, আজ যাঁরা পার্টি নির্মাণের সংগ্রামে নিয়োজিত আছেন, তাঁরা এর উত্তর সন্ধান করবেন।

    আমাদের পার্টির জন্ম ও বিকাশের পথে শিবদাস ঘোষের মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সম্পর্কিত চিন্তা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছিল আমাদের পাথেয়। ব্রিটিশ বিরোধী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস, সমাজ বিশ্লেষণ, পার্টি কনসেপ্ট থেকে শুরু করে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি সম্পর্কিত পুরো জ্ঞানের পরিমণ্ডলটা শিবদাস ঘোষের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের আধারে গড়ে উঠেছে। রামমোহন-বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্র-শরৎ-নজরুল সম্পর্কে আমাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ গড়ে উঠেছিলো শিবদাস ঘোষের ‘ভারতবর্ষের সংস্কৃতিক আন্দোলন ও আমাদের কর্তব্য’ বই পড়ে। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। দুনিয়ার দেশে-দেশে যখন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো ভেঙ্গে পড়ছে এবং তার ঘাত-প্রতিঘাতে কমিউনিস্ট নামধারী পার্টিগুলির দিশেহারা অবস্থা, সে-সময় সংশোধনবাদ সম্পর্কিত শিবদাস ঘোষের শিক্ষার ভিত্তিতে আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। এখন আমি বলতে শুনি, শিবদাস ঘোষ কেনো, চীন ও আলবেনিয়াও তো সোভিয়েত শোধনবাদের বিরুদ্ধে বলেছিল। আজকে যারা এ-ভাষায় যুক্তি করছেন তাঁরা খুব দক্ষ বিতার্কিক। যুক্তির জাল বুননে তাঁদের দক্ষতা আছে।

    সোভিয়েত শোধনবাদ সম্পর্কে চীন-আলবেনিয়ার বিশ্লেষণ আমরা কখনই গ্রহণ করিনি। তাঁরা সোভিয়েত শোধনবাদী নেতৃত্বের বিরোধিতা করলেও তাঁদের বিশ্লেষণ সোভিয়েতকে 'সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ' হিসেবে আখ্যায়িত করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পর্যায়ভুক্ত শত্রু-শিবিরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলো। শোধনবাদ প্রসঙ্গে শিবদাস ঘোষের বিচারধারা ও বিশ্লেষণ পদ্ধতিই আমাদের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়েছিলো। যারা এখন গুগল করে ইতিহাসে কে কোথায় কী বলেছিলো খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তাঁদের পক্ষে এর তাৎপর্য বুঝা সত্যি দুষ্কর।

    গত ১৯ এপ্রিল ডিডিএস-এ দেয়া রাজেকুজ্জামান রতনের দেয়া বক্তব্য শোনার সুযোগ হয়েছে। সেখানে তিনি জাসদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতি-রণকৌশল প্রনয়ণে শিবদাস ঘোষের প্রভাব ও ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করেন। জাসদে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনীতি-রণকৌশল প্রনয়ণের অতীত ইতিহাস এবং এটি যে একটি অকস্মাৎ ঘটনা না তার এক ব্যাখ্যা দিলেন। আলোচনা করলেন পাকিস্তান প্রস্তাব ও শরৎ বোসের ইউনাইটেড সৌশালিস্ট বেঙ্গলের প্রস্তাব। সুবাস বোসের চিন্তার মধ্যেও যে সমাজতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা ছিলো এবং রবীন্দ্র-নজরুলের মধ্যে রুশ-বিপ্লবের প্রভাবের কথাও বললেন বেশ সময় নিয়ে। বাংলাভাষা আন্দোলন ও বাঙালী জাতি গঠনের ইতিহাস-সহ ছাত্রলীগের মধ্যে '৬২ সালের নিউক্লিয়াস এবং ১৯৭০ সালে নেয়া সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রস্তাবের কথা বললেন। এর পর শুরু করলেন চীন বিপ্লব-ভিয়েতনাম বিপ্লব প্রসঙ্গ। প্রায় ২১ মিনিট পর বললেন, স্বাধীনতার মাত্র ১১ মাস পর জাসদ প্রতিষ্ঠিত হয় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের শ্লোগান দিয়ে। ফলে, এটা কোনো অকস্মাৎ ঘটনা নয়। যাঁরা একে অকস্মাৎ ঘটনা মনে করেন, তাঁদের দ্বন্দ্বতত্ত্ব সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাব আছে। এখানে অকস্মাৎ ঘটনা বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারণাটা শিবদাস ঘোষের মাধ্যমে হঠাৎ করে আসেনি। এর একটা পটভূমি রয়েছে। কিন্তু কে কোথায় একে অকস্মাৎ ঘটনা বলেছেন বা অতীত ইতিহাস অস্বীকার করেছেন, তা তিনি নির্দিষ্ট করে বললেন না। অতীত ইতিহাস অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের ভাবাদর্শের ভিত্তিতে আন্দোলনের জমি যে তৈরী হয়েছিলো এটাতো বাস্তব। একেই তো বলে অবজেকটিভ কণ্ডিশন। রণনীতি ও রণকৌশল প্রনয়নে শিবদাস ঘোষের অবদান হচ্ছে, একটা সদ্য স্বাধীন দেশে লেনিনের ‘এপ্রিল থিসিস’-এর আলোকে বিপ্লবের স্তর নির্ধারণ করার শিক্ষা জাসদ পেয়েছিলো শিবদাস ঘোষ থেকে। এ-বিষয়ে কিছু না বলে, শেষ অস্ত্র হিসেবে বললেন, জাসদের থিসিস রচনায় যদি শিবদাস ঘোষের ভূমিকা থাকবে, তবে ওতে ওঁর নাম নেই কেনো? ওখানে (থিসিসে) বলা হয়েছে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সে-তুং-এর চিন্তাধারার কথা। একেই বলে বিতার্কিক দক্ষতা! ১৯৭৪ বা ১৯৭৬ তো দূরের কথা, আমি এর আগে বলেছি ১৯৮০-'৮১ সালেও আমরা শিবদাস ঘোষের নাম কোথাও উল্লেখ করতে পারিনি।

    তাঁর পুরো বক্তব্য শুনে আমার মনে হয়েছে, মুবিনুল হায়দার চৌধুরী ৩২ বছরের কতক অন্ধ মানুষের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়ে নিজে আজ অন্ধ হয়ে গেছেন। অথচ এই অন্ধ মানুষেরা গত ৩২ বছর আমাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বাংলাদেশে একটা সঠিক সর্বহারা শ্রেণীর দলও গড়ে তুলেছিলেন! কিন্তু দেখুন, এই সদ্য দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া নেতা ‘সোভিয়েট ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতি কংগ্রেসের রিপৌর্ট প্রসঙ্গে’ শিবদাস ঘোষের বক্তব্যের কী ব্যাখ্যা দিলেন। তিনি ওই লেখার প্রথম প্যারার শেষ তিনটি লাইন উদ্ধৃত করলেন। যেখানে বলা হয়েছে, "মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও প্রকৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই রিপৌর্টকে বিশ্লেষণ করা দরকার। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার শুধু যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি করেনি তাই নয়, দুনিয়ার কোনো কমিউনিস্ট পার্টিই এখনও পর্যন্ত করেনি। ভবিষ্যতেও কেউ তা করবে কি-না, আমরা জানি না।” এ ক’টা লাইন পাঠ করে তিনি প্রশ্ন তুললেন, কেউ করেনি এভাবে বলা কি ঠিক? এর আগে চীন ও আলবেনিয়া এর বিরোধিতা করেছে এবং ভারতীয় দুই কমিউনিস্ট নেতার নাম উল্লেখ করে বললেন, তারাও সেদিন বিরোধিতা করেছিলেন। এখন পুরো প্যারাটা এক সাথে পড়ুনঃ

    ‘সোভিয়েট ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতি কংগ্রেস সম্পর্কে কেবল বুর্জোয়া দুনিয়ায় নয়, এমনকী কমিউনিস্ট মহলেও তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু যত আলোড়নই হোক না কেন, যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও যতটা গুরুত্ব দিয়ে একে বিচার করা উচিত ছিল, তা বাস্তবে করা হয়নি। যাঁরা বিরোধিতা বা সমর্থন করেছেন কোন পক্ষই তা আবেগমুক্ত পথে করেননি। অন্ধ আবেগ বা বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হতে না পারলে কোন বিষয়েই সত্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও প্রকৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এই রিপোর্টকে বিশ্লেষণ করা দরকার। এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার শুধু যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি করেনি তাই নয়, দুনিয়ার কোন কমিউনিস্ট পার্টিই এখনও পর্যন্ত করেনি। ভবিষ্যতেও কেউ তা করবে কিনা, আমরা জানি না।’

    উপরের প্যারা পড়ে কি আপনার মনে হচ্ছে যে, কেউ বিরোধিতা করেনি, এ-কথা শিবদাস ঘোষ বলেছেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, পক্ষে বা বিপক্ষে অনেকেই বলছে। কিস্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সঠিক দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তিতে কেউ করেছে কি-না। আবার এখানে রাজেকুজ্জামান এক ভয়ঙ্কর (?) স্ববিরোধিতাও আবিষ্কার করলেন। বলছেন, শিবদাস ঘোষ একদিকে এই রিপোর্ট শোধনবাদের সিংহদ্বার উন্মুক্ত করে দেবে বলছেন, আবার ওখানেই তিনি সোভিয়েত পার্টির প্রতি সমর্থনও ব্যক্ত করছেন। ওই লেখার ৩ থেকে ৬ নম্বর টীকায় এসইউসি কিন্তু তার ব্যাখ্যা দিয়েছেঃ

    '৩. সিপিএসইউ-র চরিত্র সম্পর্কে ১৯৫৬ সালে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনের সামনে যে অভিজ্ঞতা মজুত ছিল তার ভিত্তিতে এটাই ছিল সেদিন আমাদের দলের মূল্যায়ন। কিস্তু চিন্তাগত ও সাংগঠনিক পদ্ধতির ক্ষেত্রে যান্ত্রিকতাকে প্রতিহত করতে না পারার ভুল সংশোধনের পরিবর্তে ক্রমাগত ভুল পদ্ধতি অনুসরণের পথ বেয়ে সি পি এস ইউ-এর নেতৃত্ব যে পুরোপুরি শোধনবাদী নেতৃত্বে পরিণত হয়েছে, পরবর্তীকালে কমরেড ঘোষের নেতৃত্বে আমাদের দলের কেন্দ্রীয় কমিটি তা তুলে ধরে। তবে নেতৃত্ব পুরোপুরি শোধনবাদী নেতৃত্বে পরিণত হল বলে গোটা পার্টিটা সঙ্গে সঙ্গে একটি অমার্কসবাদী পার্টিতে পরিণত হয়েছে – এমন সিদ্ধান্ত করা যায় না। কারণ যথার্থ শ্রমিক শ্রেণীর দলের নেতৃত্ব শোধনবাদী নেতৃত্বে পরিণত হলেই শ্রমিক শ্রেণীর দলের মূল শ্রেণীগত বৈশিষ্ট্য সাথে সাথে নষ্ট হয়ে যায় না।

    ৪. শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের নীতিটি যে একটি কূটনৈতিক প্যাঁচ নয়, বিংশতি কংগ্রেসের এই বক্তব্যটির সঙ্গে আমরা একমত হলেও পরবর্তী কালের সমস্ত ঘটনা একথা নিঃসংশয়ে প্রমাণ করেছে যে, সোভিয়েট কমিউনিস্ট পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতিটির বৈপ্লবিক তাৎপর্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু তাই নয় – এই নীতিটির সঠিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ হওয়ায় এরা কার্যত এ নীতিটিকে peaceful capitulation বা শান্তিপূর্ণ আত্মসমপর্ণের নীতিতে পরিণত করেছেন।

    ৫. এঁদের এই উদ্দেশ্য পরে আরও স্পষ্ট হয়ে যায় যখন ক্রুশ্চেভের পরিচালনায় সি পি এস ইউ'র শোধনবাদী নেতৃত্ব কমরেড স্ট্যালিনের সিদ্ধান্তগুলির বিরুদ্ধে প্রকাশ্রে আক্রমণ শুরু করেন। ১৯৬২ সালে 'ভেপ্র্রসি ইকনমিকি'র ১নং সংখ্যায় একদল সোভিয়েট অর্থনীতিবিদ 'দি বেসিক ইকনমিক ল' (মূল অর্থনৈতিক নিয়ম) নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে যখন কমরেড স্ট্যালিনের নানা আর্থিক নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রচার করতে থাকেন, তখন কমরেড শিবদাস ঘোষ ঐসব অর্থনীতিবিদদের ভ্রান্ত চিন্তা ও ধ্যানধারণাকে পুরোপুরি  উদ্‌ঘাটিত করে 'এ ফিউ ইকনমিক প্রব্লেমস্' (কিছু অর্থনৈতিক সমস্যা) নামে একটি রচনায় তাঁদের জবাব দেন। এই লেখাটি প্রথমে সোস্যালিস্ট ইউনিটিতে (ভল্যুম-৩, নিউ সিরিজ, সেপ্টেম্বর'৬২) ও পরে প্রলেটারিয়ান এরা-তে (ভল্যুম-৮, সংখ্যা-২০, ১ আগস্ট '৭৫ এবং ভল্যুম-৯, সংখ্যা-১, ১৫ আগস্ট' ৭৫) প্রকাশিত হয়।

    ৬. আগেই বলা হয়েছে, কমরেড শিবদাস ঘোষের নেতৃত্বে আমাদের দলের কেন্দ্রীয় কমিটি, পরবর্তীকালে সোভিয়েট পার্টি নেতৃত্বকে শোধনবাদী বলে বর্ণনা করে।’

    রাজেকুজ্জামান এমনও প্রশ্ন তুলেছেন যে, গোটা আলোচনায় শিবদাস ঘোষ সংশোধনবাদ প্রসংঙ্গে কোনো কথাই বলেননি অথচ দাবি করা হচ্ছে তিনি সংশোধনবাদের সিংহদ্বার উন্মোচনের কথা বলেছিলেন। এখন দেখুন ওই আলোচনায় শিবদাস ঘোষ কি বলেছিলেনঃ

    ‘শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ক্রুশ্চেভ বলেছেন যে, "যদি পুঁজিবাদীরা রাস্তা ছেড়ে দেয়, কোন প্রকার বলপ্রয়োগ না করে তাহলে কমিউনিস্টরাও বলপ্রয়োগ করবে না। কিন্তু যেহেতু একথা নিশ্চিত যে, তারা বলপ্রয়োগ করবেই তাই আমাদেরও তৈরি থাকা দরকার।" 'কমিউনিস্টরা রক্তচোষা' (blood thirsty) এই মিথ্যাপ্রচারের জবাবে তাঁর এই যুক্তি খুবই উপযুক্ত সন্দেহ নেই। তিনি যদি একথা বলেই থামতেন তাহলে ভাল হ'ত। কিন্তু তিনি আরো বলেছেন যে, বর্তমান পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক অবস্থায় অনেকগুলি পুঁজিবাদী এবং পূর্বেকার ঔপনিবেশিক দেশে নাকি শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিপ্লব সংগঠিত হতে পারে! আমরা এই চিন্তার সাথে একমত হতে পারিনি। মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে একথা আদপেই গ্রহণ করা যায় না। কোন সন্দেহ নেই যে, ক্রুশ্চেভের এই চিন্তা বিভিন্ন দেশের সাম্যবাদী আন্দোলনে শোধনবাদী-সংস্কারবাদী প্রবণতার জন্ম দিতে সাহায্য করবে। প্রত্যেক দেশের কমিউনিস্টরাই এর দ্বারা ভাবতে সুরু করতে পারেন যে, তাদেঁর দেশেই শান্তিপূর্ণ বিপ্লব সংগঠিত হবে। ফলে বিপ্লবী প্রস্তুতি দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

    রাজেকুজ্জামান তার বক্তব্যে বারবার বলছেন, এতো দিন ভালো করে কিছুই পড়া হয়নি, এখন যে পড়ছেন তা-ও কিন্তু এখানে প্রতিফলিত হয়নি। আবার যদিও বলছেন এতোদিন শুধু শিবদাস ঘোষ পড়েছেন, কিন্তু পড়ে কী বুঝেছেন, সে-প্রশ্নও এখানে থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বেশ জোর দিয়ে বলছেন, শিবদাস ঘোষ থেকে শিখেছেন, শিখছেন এবং শিখবেন। এমনকি এসইউসি ও মুবিনুল হায়দার চৌধুরীর হাত থেকে শিবদাস ঘোষকে উদ্ধার করে তাঁকে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবেন।

    কিন্তু দেখুন, ১০ জুলাই ২০১২ তে প্রকাশিত ‘সর্বহারা শ্রেণীর দল গঠন প্রসঙ্গে’ পুস্তিকায় খালেকুজ্জামান শিবদাস ঘোষের ‘বিংশতি কংগ্রেসের রিপোর্ট প্রসঙ্গে’ লিখেছেন,

    ‘সেই সময়ে একটা ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায় ভারতের এসইউসিআই [সোশ্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অব ইন্ডিয়া (বর্তমানে SUCI (c))] এর প্রতিষ্ঠাতা কমরেড শিবদাস ঘোষ এর প্রতিক্রিয়া এবং মূল্যায়ন বিশ্লেষণ এর মধ্যে। সোভিয়েত পার্টির বিংশতিতম কংগ্রেসের ৩ মাস পর ১৯৫৬ সালের ২০ মে শিবদাস ঘোষ একটা বক্তৃতা করেছিলেন যার সার সংক্ষেপ তাদের পার্টি পত্রিকা গণদাবী ২৪ জুলাই সংখ্যা ১৯৫৬ সালে ছাপা হয়েছিল। তাতে দেখা যায়, ক্রুশ্চেভ এর নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত পার্টিকে প্রধানত: সঠিক বললেও (অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আবার সংশোধনবাদী বলে চিহ্নিত করেছিলেন) কংগ্রেসের সিদ্ধান্তমুলক কিছু বিষয়বস্তু উল্লেখ করে যে আলোচনা করেছেন তাতে ছোট পার্টি হিসাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে এবং ব্যাপক জাতীয় পরিমন্ডলে তেমন কার্যকারিতা সৃষ্টি করতে না পারলেও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও রয়েছে বলে আমরা মনে করি।’(পৃ: ৫৬)

    ওই পুস্তিকা পড়ে দেখুন রাজেকুজ্জামান যে, শোধনবাদের উল্লেখ শিবদাসের ঘোষের আলোচনায় খুজেঁ পাননি  খালেকুজ্জামান কিন্তু সেদিন পেয়েছিলেন। অথচ দেখুন, মতবাদিক বিতর্ক–৩ এর ২৯ পৃষ্ঠায় খালেকুজ্জামান ১০ মাস আগে তাঁর নিজের লেখা ‘সর্বহারা শ্রেণীর দল গঠন প্রসঙ্গে’ যা বলেছেন, তা পাল্টে দিয়ে রাজেকুজ্জামানের ভাষায় কথা বলছেন। হয় রাজেকুজ্জামান এই পার্টির মতাদর্শগত নেতা হিসেবে আজ আর্বিভূত হয়েছেন অথবা মতাদর্শগত হিস্টিরিয়ায় তারা সবকিছু তালগোল পাঁকিয়ে ফেলছেন।

    এক ঘণ্টা আঠারো মিনিটের বক্তব্যের শেষে তিনি শেষপর্যন্ত অসততার দায়ে দুষলেন শিবদাস ঘোষকে। তিনি দাবি করলেন, চীন তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহের জন্য ঢালাওভাবে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা কখনও বলেনি। অথচ চীন যা বলেনি তা চীন বলেছে বলে বলা এবং তার জন্য চীনকে দোষারোপ করা এ-রকম দু’টি অপরাধের জন্য শিবদাস ঘোষকে অপরাধী সাব্যস্ত করলেন। এখন দেখুন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির দশম কংগ্রেস সম্পর্কিত আলোচনায় শিবদাস ঘোষ কি বলছেনঃ

    ‘চীনের পার্টি তাদের এই দশম কংগ্রেসে নয়া স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্তত অনেক দেশকেই, বা কতকগুলো দেশকে স্বাধীন বুর্জোয়া রাষ্ট্র বলে মনে করে – যা আসলে লেনিনের ভাষায় পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র ছাড়া আর কিছু হতে পারে না, তা সেসব দেশগুলো পুঁজিবাদের অর্থে যতই পিছিয়ে-পড়া হোক না কেন।

    সুতরাং সমস্ত নয়া স্বাধীনতাপ্রাপ্ত নবজাগ্রত জাতীয়তাবাদী দেশগুলো ঢালাওভাবে People's Democratic Revolution- এর স্তরে রয়েছে বলে চীনের পার্টির দোহাই দিয়ে একদল তথাকথিত মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীরা যেসব কথা বলছেন, তার যথার্থ কোনও ভিত্তি নেই। আসলে এইসব তথাকথিত মাক্সবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদীরা কমিনফর্মের ঝ্ধানভ কর্তৃক উপস্থাপিত People's Democratic Revolution-এর ঢালাও তত্ত্ব এবং চীনের পার্টির বক্তব্যকে স্থান-কাল-নির্বিশেষে অন্ধের মতো অনুকরণ করার প্রবণতার দরুণই এইরূপ ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে। দশম কংগ্রেসে চীনের পার্টির এই বক্তব্যটি ভারতবর্ষের রাষ্ট্রকাঠামোকে আমাদের পার্টি যে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই অনগ্রসর পুঁজিবাদী দেশ হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় বুর্জোয়া রাষ্ট্র, অর্থাৎ পুজিঁবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে, তারই সন্দেহাতীত জোরালো সমর্থন।’

    এখানে স্পষ্টতই শিবদাস ঘোষ চীনের পার্টিকে কোনো কিছুর জন্যই অভিযুক্ত করেননি। বরং তিনি বলেছেন, অন্যান্যরা অন্ধের মতো চীনের পার্টিকে অনুকরণ করতে চেয়েছে। (যদি কেউ জানতে চান চীনের পার্টির কোনো বিশ্লেষণগুলিকে অনান্যরা অনুকরণ করেছেন, তারা ৩০ মার্চ ১৯৬৩ সোভিয়েত পার্টিকে লেখা চীনের পার্টির চিঠি ‘A Proposal Concerning the General Line of the International Communist Movement’ পড়ে দেখতে পারেন। এ-লেখাটা ও সময়কার প্রকাশিত অনেক লেখার একটি।)

    আজ এখানে শেষ করছি। হাতে যে-লেখাগুলো আছে, তা পড়ে আবার লিখবো। বিশেষ করে, আমরা বাংলাদেশের ছাত্র ও শিক্ষা আন্দোলনে শিবদাস ঘোষের শিক্ষা ও চিন্তার ভিত্তিতে যে-নতুন মাত্রা যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলাম, তার ওপর আলোকপাত করার ইচ্ছা রইলো।

    ৮ মে ২০১৩

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন