• বিশ্ব-ঘটনাপুঞ্জ ও শীতল-যুদ্ধের হাতছানি
    যায়নুদ্দিন সানী

    আন্তর্জাতিক খবরগুলোর ভেতর এ-মুহূর্তে বাজার মাতাচ্ছে মালয়েশিয়ান বিমান আর ক্রাইমিয়া। বিমানের খবরটিতে অনেক কিছু আছে। খুব সাধারণ দর্শক পাঠকের জন্য ঘটনাটি হচ্ছে দুশ্চিন্তারঃ ‘আহারে বেচারাদের কি হলো? ফ্যামিলি মেম্বারদের কি অবস্থা?’

    আরেক জাতের পাঠক-দর্শক আছেন, যাঁরা এর মাঝে ষড়যন্ত্র খুঁজছেন। এ-তত্ত্বের মূলকথা হচ্ছেঃ কিছু একটা বাহানা করে ব্যাপারটাকে জঙ্গী হামলা বানিয়ে আবার কোনো দেশে আক্রমণের কোনো পাঁয়তারা কেউ করছে কি-না, সে-আলোকে দেখা।

    কেউ ভাবছেন নতুন কোনো টেকনোলোজি আসলো কি-না, যার মাধ্যমে অনবৌর্ড কম্পিউটারকে হ্যাক করে, পুরো প্লেইনকেই হাইজ্যাক করা যায়। আর এমনটা হলে তো সন্ত্রাসীদের পোয়া বারো। আবার সফটওয়ার প্রোগ্রামারদেরও রমরমা ব্যাবসা হতে যাচ্ছে। কারণ, তখন হবে কম্পিউটার ভাইরাস আর অ্যান্টিভাইরাসের খেলা।

    যাহোক, এখনও কিছু জানা যায়নি। সবাই চেষ্টা চালাচ্ছেন। কী হবে, আমরা কেউ জানি না। তবে খবরটার আকর্ষণ হারাচ্ছে। অচিরেই কিছু পাওয়া না গেলে আর কিছুদিনের মধ্যে খবরটি ভেতরের পাতায় চলে যাবে।

    এক খবর নিয়ে খুব বেশি মেতে থাকতে আমরা পছন্দ করি না। ইরাকের মৃত্যু আর সিরিয়ার গণ্ডগোল কোন কিছুই আমাদেরকে এখন আর স্পর্শ করে না।

    সিরিয়ার সেই তিন বছরের শিশুর আল্লাহকে নালিশ করার হুমকি কয়েকদিন খুব মার্কেট পেয়েছিলো। এখনও মাঝে-মাঝে ফেসবুকে অবোধ শিশুটির ছবি ঘোরে। আমরা ‘লাইক’ দিই। কখনও শেয়ার করি। দুঃখী দুঃখী কিছু কথা বলি। কখনও বিপ্লবী ভাষণ। আমেরিকা, সাম্রাজ্যবাদ, এসব নিয়ে কিছু সুন্দর বাণী আছে। সেসব কপি করে ছড়িয়ে দিই। ব্যাস।

    এ-মুহূর্তে দ্বিতীয় যে-খবরটি সবাই একটু মজা নিয়ে পড়ছেন, তা হচ্ছে ক্রাইমিয়া। ক্রাইমিয়ার জনগণ কিংবা তাঁদের অধিকার নিয়ে খুব একটা কারও মাথা ব্যাথা নেই। মূল চিন্তা হলোঃ আমেরিকা কী করে; রাশিয়ার সঙ্গে লাগতে যাবে কি-না; অবরোধেই থেমে থাকবে, না আরও কিছু, ইত্যাদি।

    বিশ্বজুড়ে যে-রাজত্ব এতোদিন করে আসছিল আমেরিকা, সেখানে ফাটল ধরলে বেশ সমস্যায় পরে যাবে তারা। তাদের অস্ত্র বিক্রির কী হবে। যুদ্ধ-বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র থেকে শুরু করে যুদ্ধজাহাজ, সব কিছুর বিক্রি তো বাড়ে যুদ্ধ লাগলে। আর, যুদ্ধও এমন চাই, যেখানে প্রতিপক্ষ বেজায় দুর্বল। যাদের হাতে তেমন কোনো অস্ত্র নেই। ইরাক, আফগানিস্তান এরকম হলে ভালো হয়। কিছু খরচ হয় তবে পরে উসুল হয়ে যায়।

    লিবিয়াতে নিজেদের নামতে হয়নি। ফলে, খরচও বেশ অল্প হয়েছে। মিশরে কিছুদিনের জন্য পছন্দের আর্মির কাছ থেকে ক্ষমতা ছুটে গিয়েছিলো। সেটা আবার ফেরত এসেছে।

    তবে সমস্যা করছে চীন আর রাশিয়া। ভারতও খানিকটা। পুতিন সাহেব বেশ অনেকদিনই চুপচাপ ছিলেন। ‘অবরোধ’ দিবো’ হুমকি দিয়ে অনেক দিনই আমেরিকা কাজ চালালো। জাতিসংঘের প্রায় সব কিছুতেই একচেটিয়া আধিপত্য চালাচ্ছিলো। নিজের ইচ্ছেমত যা কিছু পাস করিয়ে, যে-কোনো দেশে হামলা করা কোনো ব্যাপারই নয় যেনো।

    এবার মশাইরা পড়েছেন বিপদে। ক্রাইমিয়ার ক্ষেত্রে মনে হয়েছিলো হুমকিতেই হয়ে যাবে। ‘অবরোধ দিবো কিন্তু’ বলে প্রথমে সাবধান করাও হয়েছিলো। কিন্তু কাজ হলো না দেখে এবার দিয়েও দিলেন ওবামা সাহেব। প্রশ্ন যেটা দেখা দিচ্ছেঃ এখানেই কি ঘটনার ইতি, না থলের ভেতর আরও বিড়াল আছে?

    পুতিন সাহেব এতো শক্ত ভাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে এর আগে কখনও দাঁড়াননি। হয়তো নিজের স্বার্থ ছিলো বলে। তবে এবার মনে হয় না তিনি পিছপা হবেন। আর তা হলে সেটা হবে আমেরিকার গালে চপেটাঘাত। সেটা নির্লজ্জের মতো হজম করবে না কোন ফন্দি আঁটবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

    আরও একটি প্রশ্ন গুটি-গুটি পায়ে এগিয়ে আসছেঃ ‘শীতল-যুদ্ধ আবার শুরু হলো কী?‘ শীতল-যুদ্ধের সময়-কালটা যে-কয়টি দেশ সবচেয়ে বেশি জ্বালাতন সহ্য করেছে, তাদের একটি বিশাল অংশের অবস্থা হচ্ছে লাতিন আমেরিকায়।

    এরা সারাক্ষণই ভয়ে থাকতো, এই বুঝি কোনো-না-কোনো ছুঁতোয় এখানে ক্যু হবে। কখনও আর্মি প্রধান, কখনও কোনো বিদ্রোহী গ্রুপ - এভাবে একপক্ষ পেতো আমেরিকার সমর্থন, আর অন্য পক্ষ রাশিয়ার। দিনের পর দিন চলতো যুদ্ধ।

    তখন এসব দেশে একটি রসিকতা বেশ শোনা যেতোঃ ‘আচ্ছা বলতো, আমেরিকাতে কেনো কোনো দিন কোনো ক্যু হবে না?’ উত্তরঃ ‘কারণ ওয়াশিংটনে কোনো মার্কিন দুতাবাস নেই।’

    শীতল-যুদ্ধের কিছু নমুনা আমরা আমাদের দেশে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে দেখেছি। রাশিয়া, চীন ও ভারত নির্বাচন মেনে নিয়েছে। আমেরিকা আর ইউরোপীয়রা মানেনি। ক্রাইমিয়া নিয়েও ওরা দু’ভাগে বিভক্ত। সিরিয়া নিয়ে বিভক্তি তো আছেই। এ-বিভক্তি দিনে-দিনে বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে।

    অস্ত্র বাণিজ্যে চীন আর রাশিয়া আবার ফিরে আসছে। এভাবে চলতে থাকলে আমেরিকার পেটে লাথি পড়তে সময় লাগবে না। ফলে, এমন অবস্থা চলতে দিতে আমেরিকা চাইবে বলে মনে হচ্ছে না। একটা হেস্তনেস্ত হতে হবে। কোথা থেকে তাঁর শুরু হবে? মালয়েশিয় বিমানের মতোই দুর্বোধ্য এই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় আরও কিছুদিন দর্শকদের অপেক্ষা করতে হবে।

    sani2000bd@yahoo.com
    শনিবার, ২২ মার্চ ২০১৪
    রংপুর, বাংলাদেশ

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

বিশ্ব-ঘটনাপুঞ্জ ও শীতল-যুদ্ধের হাতছানি টাইটেল টি আরো ভাল হতে পারত । ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন