• বিহারী-নিধনের প্রতিকারঃ আত্মধিক্কারে নয় আত্মমর্য্যাদায়
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মীরপুরে বিহারী বংশোদ্ভূত ১০ ব্যক্তিকে পুড়িয়ে হত্যা করার ঘটনার আমি তীব্র প্রতিবাদ করি। এই হত্যাকাণ্ডে ভাগ্যাহতের জাতিগত পরিচয় একটি প্রসঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

    হত্যার পেছেনে জাতি-বিদ্বেষ থাকা অসম্ভব নয়, কিন্তু প্রকৃতই তা কি-না তা আমি নিশ্চিত নই। তবে বিষয়টি সন্দেহ আকারে আসুক বা না আসুক, একমাত্র সংখ্যালঘু হওয়ার কারণেই হত্যার মৌটিভ হিসেবে জাতিগত বিদ্বেষকে বিবেচনায় রেখে তদন্ত করা দরকার।

    আমি বাংলাদেশে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ে জন্মাবার কারণে সংখ্যালঘুর মর্মবেদনা যুক্তি দিয়ে বুঝলেও মর্ম দিয়ে বুঝিনি। কিন্তু ব্রিটেইনে সংখ্যালঘু বাঙালীর অংশ হিসেবে গত ২৪ বছরে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেইনের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের প্রদর্শিত মনোভাব, উচ্চারিত মন্তব্য, আচারিত ব্যবহার লক্ষ্য করে বাঙালী-সাধারণকে সংখ্যালঘু হওয়ার যন্ত্রণা সইতে দেখেছি।

    তাই আমি আমার জন্মভূমি বাংলাদেশে আমার জাতির লোকদের প্রতি অনুরোধ করবো, দয়া করে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন ও ধর্ষণ-নিধনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। বাঙালীর দেশে যদি কোনো অবাঙালী জাতিগত ভিন্নতার কারণে নিগৃহীত হন, তাহলে বাঙালী জাতির জন্য তা খুবই হীনতা, দীনতা ও লজ্জার বিষয়। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিগৃহীত হওয়া একটি নৈমিত্তিক ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছে।

    অদ্য ১০ বিহারী-নিধনের ঘটনায় অনেকে যেভাবে বাঙালীত্বকে দায়ী করে আত্মধিক্কার দিচ্ছেন, তাতে আমার মনে হচ্ছে আজকের প্রজন্মের তরুণদের বাংলাদেশে বিহারী-বিদ্বেষের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে এর প্রতিকারে সচেষ্ট হওয়া দরাকার। আর এ-বোধ থেকেই আমি নীচের লেখাটি নিবেদন করছি।

    বাংলাদেশের বিহারী অভিবাসন

    মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব-বাংলা, পশ্চিম-পাঞ্জাব, সিন্ধু-প্রদেশ, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পূর্ব-বাংলা নামায়িত হয় পূর্ব-পাকিস্তান হিসেবে আর সহস্র মাইল দূরবর্তী চার প্রদেশের সামষ্টিক নাম হয় পশ্চিম পাকিস্তান হিসেবে।

    সে-সময় ‘অপশন’ দেওয়া হয় ধর্মের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নাগরিকত্ব নির্ধারণ করার। ফলে, সারা ভারত জুড়ে এক গণ-অভিবাসনের ঘটনা ঘটে এবং তার সাথে যুক্ত হয় গণ-দাঙ্গা। এই গণ-অভিবাসনের সর্বাধিক অভিঘাত পড়ে বাংলায়।

    পূর্ব-বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বিরাট অংশ পশ্চিম বাংলায় অভিবাসিত হলেও পশ্চিম বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়ের অতি ক্ষুদ্রাংশ আসে পূর্ব-বাংলায়। কিন্তু পার্শ্ববর্তী বিহার থেকে বিহারী মুসলমানদের একটি বিশাল অংশ পূর্ব-বাংলায় অভিবাসন গ্রহণ করে।

    বাঙালী-বিহারী বিদ্বেষ

    বিহারী মুসলমানদের আনুষ্ঠানিক ভাষা উর্দূ হওয়ার কারণে তাঁরা পূর্ব-পাকিস্তানে অভিবাসিত বিহারীরা বাঙালী-সাধারণের চেয়ে অধিকতর রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য লাভ করে। কারণ, সমগ্র পাকিস্তানের ক্ষমতাশালী শ্রেণীর ভাষাও ছিলো উর্দূ।

    পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালীরা সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতি হওয়া সত্ত্বেও যখন জাতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছিলো, বিহারীরা তখন আপেক্ষিকভাবে জাতিগত আনুকূল্য লাভ করছিলো। ফলে, পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালী জাতির বৈষম্য-বিরোধী সংগ্রামে বিহারী জাতির লোকেরা প্রধানতঃ অনুপস্থিত থাকে এবং কোনো-কোনো ক্ষেত্রে বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করে। এর প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে অভিবাসিত বিহারীদের বাঙালী-সাধারণের মনে বিরক্তি, অসন্তোষ ও বিদ্বেষের উদ্ভব হয়।

    ১৯৭১ সালের বাঙালী জাতি আক্রান্ত ও গণহত্যার শিকার হলে অধিকাংশ বিহারী পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর পক্ষাবলম্বন করে বাঙালী নিধনে সহায়তা করে। বাংলাদেশে পাক-হানাদার বাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমর্পণের পর বিহারীরা প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়ে এবং অনেক প্রতিশোধাত্মক বাঙালী মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের হাতে বিহারী নিধনের ঘটনা ঘটে।

    মুক্তিযুদ্ধের দ্বৈত-চেতনা

    বাঙালী জাতির মুক্তিযুদ্ধের উচ্চ আত্মমর্য্যাদা ও উন্নত নৈতিক মান না থাকার কারণে, বিহারীদের ওপর এই প্রতিশোধের বিরুদ্ধে বাঙালী জাতীয়তাবাদী থেকে শুরু করে সাম্যাবাদী পর্যন্ত কেউই বিশেষ কোনো প্রতিবাদ করেননি।

    বিহারীদের প্রতি বাঙালীদের জাতিগত ঘৃণা এতো তীব্র যে, বাঙালী জাতির “প্রগতিশীল” বুদ্ধিজীবীরা প্রায়শঃ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও বিহারীদের বিরুদ্ধে বাঙালীদের উৎপীড়ন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রায় নীরবই থাকেন।

    তাঁদেরকে পাহাড়ী ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ওপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও বাঙালী জাতির স্থানীয় লোকদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রায়শঃ সভা-সমিতি ও প্রতিবাদ-বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা গেলেও বিহারী-নিপীড়নের বিরুদ্ধে তা করতে দেখা যায় না।

    প্রগতিশীলদের এই দ্বৈতনীতির কারণ কী? কারণ হচ্ছে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা”। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক বোধ, যেখানে না আছে প্রকৃত জাতীয় আত্মমর্য্যাদাবোধ, না আছে বিশ্বজনীন মানবিক মর্য্যাদাবোধ; শুধু আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-ভিত্তিক অনড় পক্ষ-বিপক্ষের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার একচ্ছত্র মালিকানা-বোধ।

    তাই শুধু বিহারী ম্যাসাকারে নির্বিকার নয়, স্বজাতির লোকদের ওপর ম্যাসাকার হলেও তাঁরা শুধু নির্বিকারই থাকেন না, এমনকি তা সমর্থন পর্যন্ত করেন। এঁরা কিন্তু জাতীয়তাবাদী নন। এঁরা তার চেয়েও ‘অগ্রসর’ - তাঁদের অধিকাংশই নিজেদেরকে ‘সাম্যবাদী’ ও ‘আন্তর্জাতিকতাবাদী’ এবং সাধারণভাবে বাম-প্রগতিশীল বলে দাবী করেন।

    আত্মমর্য্যাদাশীল বাঙালীর করণীয়

    আমি মনে করি, প্রকৃত জাতিগত আত্মপরিচয়ে জাগ্রত ও আত্মমর্য্যাদায় উত্থিত প্রতিটি বাঙালীর উচিত হবে বিহারী-সহ সকল জাতিসত্তার মানুষের ওপর জাতিগত উৎপীড়নের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়ানো। একটি জাতি কখনও একটি মর্য্যাদাবান জাতি হতে পারে না, যদি সে তার দেশের সংখ্যালঘু জাতিসত্তার লোকদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন ও ধর্ষণ-নিধনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারে।

    আমি তাই বাঙালী নবজাগরণ-আকাঙ্খী প্রতিটি ব্যক্তিকে অনুরোধ করবো, আপনারা জাতিগত, ধর্মগত, বিশ্বাসগত ও লিঙ্গপছন্দগত লংখ্যালঘুদের ওপর সব ধরণের নির্যাতন-নিপীড়নে ও ধর্ষণ-নিধনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন, সভা-সমাবেশ করুন এবং দেশের জনগণের মধ্যে প্রকৃত আত্মপরিচয় ও আত্মমর্য্যাদা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করুন।

    আমাদের বাঙালী আত্মপরিচয়ের উচ্চারণ কোনো প্রকারের জাত্যাভিমান নয়। কারণ, আমরা বার-বার বলছি, বাঙালী হিসেবে আমরা যেমন লজ্জিতও নই, তেমনি গর্বিতও নই। আমরা কারও চেয়ে যেমন ছোটো নই, তেমনি কারও চেয়ে বড়োও নই। আমরা অবিমিশ্র বর্ণ সংরক্ষণের কথা বলছি না, আমরা বহুবর্ণের মিশ্রিত বাঙালীত্বের বিকাশের কথা বলছি।

    মনে রাখতে হবে, আত্মপরিচয় বিস্মৃত ও আত্মধিক্কার সঞ্চারিত করে নয়, বরং আত্মপরিচয় ও আত্মমর্য্যাদায় বলীয়ান করেই একটি জাতিকে  সুসভ্য সাম্যের বিধানে মহীয়ান ও বিশ্বমানবিক ভূমিকা পালনে ধীমান করা সম্ভব।

    সোমবার, ১৬ জুন ২০১৪
    নিউবারী পার্ক, এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন