• ব্যাকরণে ভুল করেও নীল আর্মস্ট্রং চন্দ্রপুরুষ
    মাসুদ রানা

    নীল আর্মস্ট্রং গতকাল চলে গেলেন। বয়স হয়েছিলো ৮২ তাঁর । ১৯৬৯ সালের ২০শে এ্যাপ্রিল এ্যাপোলো ১১তে চড়ে আরও দুই নভোচারীর সাথে তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন চাঁদে। চন্দ্রপৃষ্ঠে প্রথম পদার্পণ করে একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন ভুল ইংরজিতে।

    ভুলটা ছিলো ব্যাকরণগত। প্রয়োজনীয় একটি ইণ্ডিফিনিট আর্টিকল - ‘এ্যা’ - ব্যবহার করেননি ‘ম্যান’-এর আগে। বলেছিলেন, ‘দিস ইস ওয়ান স্মল স্টেপ ফর ম্যান, এ্যা জায়ান্ট লীপ ফর ম্যানকাইণ্ড’।

    ওই যে ‘ম্যান’ আগে ‘এ্যা’ আর্টিকল যোগ করে ‘এ্যা ম্যান’ বললেন না, তাতে কিন্তু তার অর্থ ‘ম্যানকাইণ্ড’ হয়ে গেলো। বিষয়টির অর্থই ন্যাসৎ হয়ে গেলো। তাই, আমরা একটি ‘এ্যা’ যুক্ত করে শুধরে বলি, ‘দিস ইস ওয়ান স্মল স্টেপ ফর এ্যা ম্যান, এ্যা জায়ান্ট লীপ ফর ম্যানকাইণ্ড।’

    আমাদের এডুকেশন সেক্রেট্যারী ইংরেজি জিসিএসই’র গ্রেইডে অন্যায্য কাঠিন্য এনে যে-অগণিত তরুণ-তরুণীর ‘লাইফ চ্যান্স’ সঙ্কুচিত করে দিলেন এ-বছরের গ্রীষ্মের পরীক্ষার ফলাফলে, সে-মানদণ্ডে বিচার করলে হয়তো নীল আর্মস্ট্রংয়ের জীবনের কোনো ‘চান্স’ই থাকতো না। কিন্তু আমরা জানি, চন্দ্রপৃষ্ঠে প্রথম ধ্বনিত মানব উচ্চারণের ইংরেজি ব্যাকরণগত ভুল সত্ত্বেও নীল আর্মস্ট্রং মানব জাতির গর্ব। যাঁর বাংলায় সম্মানীত করা যায় ‘চন্দ্রপুরুষ’ বলে।

    স্পষ্টতঃ মাইকেল গৌভের রাজনৈতিক দৃষ্টিবোধের অনুবর্তী হয়ে হঠাৎ করে জিসিএসই ইংরেজি পরীক্ষার গ্রেইড প্রদানে কাঠিন্য আনা হয়েছে। অত্যন্ত আন্যায়ভাবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদেরকে না জানিয়েই কাঠিন্য আরোপিত করা হয়েছে। কারও অজ্ঞাতসারে ‘ক্রাইটেরিয়া’ বা মানদণ্ড নির্ধারণ করে বিচার বা পরীক্ষা করাকে তাঁদের মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত।

    ইংল্যাণ্ডের প্রধান-শিক্ষকদের সংগঠন সরকারের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়েছে। প্রধান-শিক্ষকগণ দাবি তুলেছেন, সকল পরীক্ষার্থীর ইংরেজি উত্তরপত্রের পুনর্মূল্যায়ণ বা রি-মার্ক করতে হবে। বস্তুতঃ সরকার বিপাকে পড়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ন্ত্রণক সংস্থা ‘অফকোয়াল’ দ্রুত সাড়া দিয়ে সঙ্কট নিরসনের চেষ্টা করছে।

    বিষয়টি চিন্তার উদ্রেগ করেছে। রাজনীতিকগণ রাজনৈতিক কারণে শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাটি ‘ডিক্টেইট’ বা নির্দেশ করবেন, আর এ্যাকাডেমিক সংস্থাগুলো তা তামিল করবেন এবং এর ফলে তরুণ শিক্ষার্থীগণ তাঁদের জীবন সম্ভাবনা হারাবেন - বিষয়টি রীতিমতো ভয়ঙ্কর।

    বিশেষভাবে আরও যা ভীতিপ্রদ সংবাদ হলো যে, ইংরেজি গ্রেইড-কাঠিন্যের ফলে যে-কচিপ্রাণগুলোর জীবন-সুযোগ সঙ্কুচিত হলো, তাঁদের প্রায় সবাই দরিদ্র ও সংখ্যালঘু জনজাতির, যাদের মধ্যে বাঙালী বংশোদ্ভূতরাও পড়ে।

    বাঙালীর মতো সম্প্রদায়গুলো থেকে ব্যাপক-হারে উচ্চ-শিক্ষায় যাওয়া, উচ্চ-শিক্ষিত হওয়ার  সাথে দল-নির্বিশেষ সরকারগুলোর টিউশন-ফীর প্রবর্তন, বৃদ্ধি, আরও বৃদ্ধি এবং সর্বশেষ ইংরেজির গ্রেইডকে বিশেষভাবে কঠিন করে তোলার কি কোনো সম্পর্ক নেই?

    সেই থেকে বলে আসছিঃ আছে, বিলক্ষণ আছে। শ্রেণীগত ও বর্ণগত পার্থক্যের ভিত্তিতে যে সামাজিক-প্রক্রিয়ায় প্রায় সহজাত প্রবৃত্তি বা ‘ইনস্টিংক্ট’ গড়ে ওঠে, তাতে উচ্চশ্রেণী ও উচ্চবর্ণের কাছে দরিদ্র শ্রেণী ও সংখ্যালঘুদের সাফল্য ও শ্রেষ্ঠত্ব পীড়াদায়ক হিসেবে অনুভূত হয়।

    ইংরেজি জিসিইসি গ্রেইডে কাঠিন্য এনে ব্রিটেইনের শাসকশ্রেণী ভিন্ন সংস্কৃতির শিক্ষার্থীদেরকে সম্ভবতঃ বাই-ডিফিনেশন পশ্চাদপদ করে রাখতে চান। বিষয়টি অতি সূক্ষ্ম ও সুদূর প্রসারী, যা প্রান্তিক শ্রেণীর পক্ষে লালিত ভালোবাসা-জাত দার্শনিক বোধ ছাড়া বুঝা প্রায় অসম্ভব।

    পৃথিবীতে ভাষাগুলো হচ্ছে মুদ্রা বা ‘কারেন্সী’র মতো মূল্যমানে পার্থক্যপূর্ণ। যে-জাতির কারেন্সীর মূল্য যতো বেশি, তার ভাষার মর্যাদাও ততো উচ্চে। এতে কোন্‌টি কারণ আর কোন্‌টি ফল, সে-আলোচনায় না যেয়ে, শুধু বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায়, এরা কো-রিলেইটেড বা সহ-সম্পর্কিত। ‘রিগোরাস সাইয়িন্টিফিক’ গবেষণার মাধ্যমে হয়তো তার ‘কো-ইফিশিয়েন্ট’ও নির্ণয় করা সম্ভব, যাকে ইনফারেনশিয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্সে ‘আর’ বলা হয়।

    নিশ্চয় পৃথিবীর ভাষাসমূহের অগ্রবর্তী ও পশ্চাৎবর্তী অবস্থান রয়েছে জাতি-সমূহের অসম বিকাশের জন্য। আবার, একই জাতির মধ্যেও শ্রেণীতে-শ্রেণীত ল্যাঙ্গুয়েইজ এ্যাকুইজেশন বা ভাষাগত অর্জনের ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী ও পশ্চাৎবর্তী অবস্থান রয়েছে। ভাষা-শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সমন্বিত সাধারণ শিক্ষা তার চেয়ে অধিক কিছু।

    তাই, নীল আর্মস্ট্রংয়ের ল্যাঙ্গুয়েইজ এ্যাকিউজেশনের শ্রুতিকটু দুর্বলতা থাকার পরও, তাঁর আনীত মানব-সাফল্য তাঁকে বিখ্যাত করে রেখেছে। ইংরেজির ভুলের জন্য গৌভীয় পরীক্ষা-কাঠিন্যে তাঁকে তরুণ বয়সে নাকচ করে দিলে তিনি আজ চন্দ্রপুরুষ হিসেবে বিখ্যাত হয়ে উঠতে পারতেন না।

    নীল আর্মস্ট্রং নিঃসন্দেহে প্রজন্মান্তরে তরুণদের কাছে প্রেরণা পুরুষ হয়ে থাকবেন। এবং তার পরিবার সদস্যগণ যথার্থই বলেছেনঃ

    ‘আমরা আমাদের ভগ্ন-হৃদয়ে এই সংবাদে সকলকে শরিক করছি যে, কার্ডিওভাসকিউল্যার প্রক্রিয়া উদ্ভূত জটিলতার পরিণতিতে নীল আর্মস্ট্রং চির বিদায় নিলেন। নীল ছিলেন আমাদের প্রেমময় স্বামী, পিতা, পিতামহ, ভাই ও বন্ধু। নীল আর্মস্ট্রং ছিলেন একজন নির্বিকার অ্যামেরিকান বীর, যিনি সব সময় বিশ্বাস করতেন তিনি কেবলই তাঁর কর্তব্য পালন করছেন। অতিশয় ভালো এই মানুষটিকে হারিয়ে আমরা যখন শোক করছি, তখন আমরা পাশাপাশি তাঁর উল্লেখযোগ্য জীবনটিও উদযাপন করছি, আর আশা করছি, তাঁর এই জীবন বিশ্বজুড়ে তরুণ-তরুণীদের স্বপ্ন-সার্থকে কঠোর কর্মপ্রয়াসে, সীমান অতিক্রম ও আহরণের ক্ষেত্রে ও নিঃস্বার্থভাবে নিজেদের চেয়ে বৃহত্তর একটি উদ্দেশ্যের প্রতি নিবেদিত হতে উদাহরণ হিসেবে কাজে লাগবে।’

    মাইকেল গৌভ, ভেবে দেখুন, কোন্‌ গ্রেইড দেবেন নীল আর্মস্ট্রংকে? আপনার উদ্দেশ্য অপ্রকাশিত, কিন্তু অবোধগম্য নয়। কিন্তু অগণিত নীল আর্মস্ট্রংয়ের ‘লাইফ চান্স’ ধ্বংস করে কী লাভ করতে চান আপনি? ভেবে দেখুন ব্রিটেইন কী হারাবে!

    রোববার, ২৬ অগাস্ট ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন