• ব্রিক্সিট বিষয়ক বিশ্লেষণ
    মাসুদ রানা

    ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেইনের এক্সিট বা বেরিয়ে আসার প্রস্তাবকে বলা হচ্ছে ‘ব্রিক্সিট’। এই প্রস্তাবের ভাগ্য নির্ধারণের জন্যে বৃহস্পতিবার ২৩শে জুন অনুষ্ঠিত হবে রেফারেণ্ডাম বা গণভৌট।

    গণভৌটের ফলাফল কী হবে, তা আগে থেকে আন্দাজ করা যায় হয়তো, কিন্তু নিশ্চিত বলা যায় না। আর, আন্দাজটাও আন্দাজকারীর নিজস্ব বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায়, যাকে সমাজ-মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণায় বলা হয় ‘আর্টিফ্যাক্টস’ এবং যা গবেষণা পদ্ধতির বৈধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই, আমি ফলাফল সম্বন্ধে কোনো আগাম কথা না বলে, বরং ব্রিক্সিট সম্পর্কে কিছু বিশ্লেষণাত্মক কথা বলি।

    আমার মতে, রাষ্ট্র তথা রাজনীতিতে তিনটি স্তর আছে। এদেরকে বলা যেতে পারে আউটার লেয়ার বা বহিঃস্তর, মিড লেয়ার বা মধ্যস্তর ও ডীপ লেয়ার বা গহীনস্তর, যাকে ডীপ-ষ্টেইটও বলা হয়।

    বাইরে থেকে জনগণ যা রাজনীতি বলে দেখেন ও করেন, যেমন বিতর্ক শোনা, সমর্থন করা, বিরোধিতা করা, ভৌট দেওয়া, বিক্ষোভ করা, ইত্যাদি হচ্ছে রাজনীতির বা পাবলিক ফেইস বা বহিঃস্তর।

    রাজনীতির মধ্যস্তর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তাদের কর্মীবাহিনী নিয়ে গঠিত। এখানে আছে উপরের স্তর ও নিম্নস্তর। উচ্চস্তরে থাকে কেন্দ্রীয় কমিটী ও নিম্নস্তরে সাধারণ র‍্যাঙ্ক। এখানে তারা রাজনীতির আদর্শ, নীতি, কৌশল, কর্মসূচি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

    কিন্তু রাজনীতির আছে প্রায় অদৃশ্য ও অনানুষ্ঠানিক একটি গহীনস্তর। এই স্তর গঠিত রাষ্ট্রের এলিটদের নিয়ে। এতে থাকে সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক ক্ষেত্রসমূহের বিশিষ্ট ব্যক্তি, যার রাজনীতির দৈনন্দিন কাজে মাথা ঘামায় না, কিন্ত মোটাদাগে রাজনীতির সীমানা ও লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়। এটিকে অনেক সময় গহীন-রাষ্ট্র বা ডীপষ্টেইট বলা হয়।

    রাজনীতির তিন স্তর কখনও অভিন্ন চিন্তার এবং কখনও বিভিন্ন চিন্তার হতে পারে। চিন্তার বিভিন্নতার একটা সহনীয় মাত্রা আছে। সেই মাত্রা অতিক্রম করলে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    গহীনস্তর যখন অসহনীয় ওঠে, তখন একনায়কতন্ত্র বা ফ্যাসিজম দেখা দেয়। মধ্যস্তর অসহনীয় উঠলে সংস্কার হয়। আর, বহিঃস্তর অসহনীয় উঠলে অভ্যূত্থান ও বিপ্লব সঙ্ঘটিত হয়।

    ব্রিক্সিটের ব্যাপারে গহীনস্তর বা ডীপষ্টেইট কী ভাবছে, তার ওপর নির্ভর করে বাস্তবে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে ব্রিটেইন থাকবে কিনা। গহীনস্তর ব্রিক্সিট না চাইলে, গণভৌটের ফল যাই হোক না কেনো, তাতে কিছুই আসবে যাবে না। প্রয়োজন হলে গণভৌটের ফল পরিবর্তন করে দেখানো হবে। আর, চাইলে ব্রিটেইনকে রাখা যাবে না।

    আমি যে-তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে বিশ্বকে দেখি, তাতে আমার কাছে বিশ্বটা জাতিময় ও জাতিতে বিভক্ত। আর, আমি জাতিকে দেখি মানুষের এমন একটি প্রকার ও পরিচিতি রূপে, যা একদিকে প্রাকৃতিভাবে প্রাপ্ত ও অন্যদিকে ঐতিহাসিকভাবে রপ্ত বৈশিষ্ট্যের দ্বারা গঠিত এবং অন্যের ও নিজের দ্বারা বৈষম্যমূলকভাবে স্বীকৃত।

    আমার এই সংজ্ঞার সবিস্তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন, কিন্তু এই বিস্তারিত ব্যাখ্যার স্থান এটি নয়। তবে বর্তমান প্রসঙ্গে এটুকু বলবো যে, জাতি সংজ্ঞানুসারে বৈষ্যমূলক বলে একটি ‘সভ্য’ জাতি নিজের মধ্যে আন্তরিক ও সততার সাথে ‘মানবিক’ হওয়ার পরও অপেক্ষাকৃত দুর্বল জাতির প্রতি ঠিক বিপরীত অমানবিক আচরণ করতে পারে কোনো প্রকারের ‘সভ্যতার সঙ্কট’ অনুভব ব্যতিরেকেই।

    জাতীয়তাবাদকে যাঁরা প্রতিক্রিয়াশীল বলে আন্তর্জাতিকতাবাদের জয়গান করেন, তা তাঁরা সর্বহারা শ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদী হোক কিংবা ইসলামিক উম্মাহ্‌বাদীই হোন, তাঁরাও বৈষম্যমূলকভাবে নিজেদের প্রকারকে শ্রেষ্ঠত্ব ও সুবিধা দেন অন্যান্য প্রকারের চেয়ে।

    এমনকি মানবজাতিও প্রাণী জগতের মধ্যে অন্যান্য প্রাণীর ‘ভৌট’ ছাড়াই, শক্তির জোরে নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে এবং কোনো প্রকার অপরাধবোধ ছাড়াই তা নিজদের মধ্যে আত্মতৃপ্তি সহকারে প্রচার করে। কোনো মানুষই এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করে না, কারণ সে মানুষ।  যে-মানুষ তার শাবকের মৃত্যুতে আহাজারি করে, ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে, শোকে সঙ্গীত রচনা করে, সৌধ নির্মাণ করে, সে-মানুষই নির্দ্বিধায় মুরগীর ছানা কিংবা মেষশাবকদের হত্যা করে ভক্ষণ করে তৃপ্তি সহকারে মানবতার ঢেকুর তোলে।

    মূল কথায় ফিরে বলি, মানুষের মধ্যে জাতি হচ্ছে সবচেয়ে স্থিতিশীল প্রকার ও আত্মপরিচয়। কারণ, এর ভিত্তিতে অন্যেরা তার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করে এবং সেও এর ভিত্তিতেই অন্যের প্রতি বৈষম্য করে। আর, এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে যারা অবৈষম্যের কথা বলে বৈষম্য ভাঙ্গতে চান, তাঁরাও আরেকটি ভিন্নমাত্রার বৈষম্য সৃষ্টির জন্যেই তা বলেন।

    আমার ‘স্কার্সিটী-আইডেণ্টিটী করেসপণ্ডেন্স থিওরী’ অনুসারে, মানুষের সংবোধে সর্বনিম্নে ব্যক্তি-পরিচয় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চে মনুষ্য-পরিচয়ের মধ্যবর্তী স্থানে আছে নানা প্রকারের পরিচয়ের একটি হায়ারার্কি বা উলম্ব বিন্যাস। এই পরিচয় হতে পারে পারিবারিক পরিচয়, বংশ পরিচয়, জ্ঞাতি পরিচয়, সাম্প্রদায়িক পরিচয়, আঞ্চলিক পরিচয়, ধর্মপরিচয়, ভাষা-পরিচয়, জাতি-পরিচয় ইত্যাদি। এটি একটি কণ্টিনিয়াম।

    পাশাপাশি, মানুষের আছে অভাববোধ। সেই অভাববোধ গড়ে ওঠে জীবন টিকিয়ে রাখার জন্যে খাদ্য থেকে শুরু করে মহাশূন্য ভ্রমণ পর্যন্ত অনেক কিছুই চাওয়ার মধ্য দিয়ে। এই যে প্রয়োজন মেটাতে কিছু চাওয়া কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্বাস নেওয়ার মতো না পাওয়া, সেই কাঙ্ক্ষিত অথচ অপ্রতুল বস্তু বা বিষয়কে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘স্কার্স’।

    আমি বলি, মানুষের স্কার্সিটী বোধ ও আত্মপরিচয় বোধ দু’টি ভ্যারিএবল বা চল হয়ে এক্স-এ্যাক্সিস ও ওয়াই-এ্যাক্সিস ধরে পরস্পরের সাথে করেসপণ্ড বা সংযোগাযোগ করে। অর্থাৎ,  একজন মানুষ কখন কী পরিচয়ে সহযোগিতা কিংবা প্রতিযোগিতা করবে, তা নির্ভর করে তার স্কার্সিটী কী, তার ওপর।

    আবার, তার কোন পরিচয় নির্দেশ করে অন্যেরা তার সাথে সহযোগিতা বা প্রতিযোগিতা করছে, তাও তার স্কার্সিটী নির্ধারণ করে। ফলে, এখানে দ্বন্দ্ব ও মিথষ্ক্রিয়া বর্তমান। আর, এর ভিত্তিতেই রচিত হয় ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে জাতি পর্যায় পর্যন্ত সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা। এর রূপ হতে দুই বা ততোধিক জাতির মধ্যে ঐক্য ও মিলন আবার তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ।

    বর্তমানে আমরা দেখছি, ইংরেজভাষী আমেরিকা ও তার জুনিয়র পার্টনার ব্রিটেইন মিলে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নকে বাধ্য করেছে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ জারি রাখতে। কিন্তু আজ থেকে  ২১০ বছর আগে, ১৮০৬ সালে ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্তে রাশিয়া-সহ ইউরোপীয় অন্যান্য শক্তিকে নিয়ে ব্রিটেইনের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ তৈরি করেছিলেন।

    পরবর্তীতে, রাশিয়া এই অবরোধ মান্য না করার কারণে ১৮১২ সালে নেপোলিয়ান অন্ততঃ ১২ জাতির সম্মিলিত ৬ লক্ষ ৮০ হাজার সৈন্যে ‘গ্রাণ্ড আর্মি’ গঠন করে রাশিয়া আক্রমণ করেন। কিন্তু ১৮১৩ সালে জার আলেক্সাণ্ডার পাভলোভিচ সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্তেকে রাশিয়া থেকে বিতাড়িত ও পিছু ধাওয়া করে যখন প্যারিস দখল করেন, তখন ফ্রান্সের একাধিক মিত্র দেশ পক্ষ পরিবর্তন করে ছয় জাতির মৈত্রীতে যোগ দেয়।

    সর্বশেষ বিশ্বযুদ্ধে জোসেফ স্তালিনের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া এ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানীর সাথে অনাক্রমণ চুক্তি করার পরও জার্মানী রাশিয়া আক্রমণ করলে জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধজোট গড়ে তোলে রাশিয়া, ব্রিটেইন ও ফ্রান্স মিলে বিশ্বজুড়ে ১৭টি দেশের সমন্বয়ে।

    আবার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়ার নজিরবিহীন আত্মত্যাগ ও অকল্পনীয় বিজয়ের পর যখন বিজিত জার্মানীর অর্ধেক সহ পূর্ব-ইউরোপ নিয়ে সমাজতান্ত্রিক ব্লক বা আদর্শিক সাম্রাজ্য গড়ে তুললো, তখন কার্যতঃ সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে সম্ভাব্য বিপ্লব রফতানি আটকানোর জন্যে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ভিত্তি গড়ে তোলে ১৯৫০ সালে ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানী,  ইতালী, বেলজিয়াম, নেদারল্যাণ্ডস ও লুক্সেমবার্গ মিলে। তার ২৩ বছর পর ১৯৭৩ সালে যুক্ত হয় ব্রিটেইন, আয়্যারল্যাণ্ড ও ডেনমার্ক।

    ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন আজ ২৮ দেশের সম্মিলনে এক অভিনব রাজনৈতিক সত্তা যা স্বয়ং রাষ্ট্র না হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আইন-কানুন-সহ বহু কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীনে এই ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের নামেই আজ রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ জারি রাখা হয়েছে, যা জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালী-সহ অধিকাংশ দেশ মানতে চাইছে না।

    আমরা দেখি, ইউরোপের ইতিহাস হচ্ছে একজাতির সাথে অন্য জাতির রূপতঃ ব্যাকরণবিহীন ঐক্য ও যুদ্ধের ইতিহাস। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক তত্ত্বসমূহের একেকটি একেক অবস্থানের সমর্থন কিংবা সমালোচনামূলক ব্যাখ্যা দিলেও কোনো তত্ত্বই ইউরোপীয় জাতিসমূহের মধ্যে সমগ্র ঐতিহাসিক জুড়ে পরিবর্তনশীল মৈত্রী ও যুদ্ধের ফেনোমেনাটাকে সমন্বিতরূপে ব্যাখ্যা করতে পারে না।

    আমি মনে করি, আমার ‘স্কার্সিটী-আইডেণ্টিটী করেসপণ্ডেন্স থিওরী’র ফ্লেক্সিবিলিটী বা নমনীয়তা জাতিসমূহের মধ্যে পরিবর্তনশীল মৈত্রী ও যুদ্ধ সঙ্ঘটিত হওয়ার অনুমোদন করে। কারণ, এখানে যুদ্ধের কারণ যে স্বার্থ বা স্কার্স ও মৈত্রীর ভিত্তি যে সম-আত্মপরিচয়, তা অনায়াসে এক্স-এ্যাক্সিস ও ওয়াই-এ্যাক্সিস ধরে এক বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে সরে পরস্পরের সাথে করেসপণ্ড বা সংযোগাযোগ করতে পারে।

    ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ভিত্তি যে সোভিয়েত ভীতির জন্যে মূলতঃ নিরাপত্তা মৈত্রী হিসেবে গড়ে উঠেছিলো, সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার আদর্শিক সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়লে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ নামে একচ্ছত্র ‘আদর্শিক’ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এই পরিস্থিতিতে যে-ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ছিলো ইউরোপীয় জাতি রাষ্ট্রগুলোর জন্যে স্বস্তির সাম্রাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ধানে, দেশে-দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামারিক ঘাঁটির উপস্থিতির কারণে সেই ইউরোপীয়ান ইউনিয়নই হয়ে উঠলো জাতিরাষ্ট্রগুলোর ভীতির কারণ, যা তার মুখ ফুটে বলতেও পারছে না এবং সইতেও পারছে না।

    ইতিমধ্যে রাশিয়া সোভিয়েত ব্যবস্থার সাথে তার বিশ্বভূমিকা ও গৌরব হারিয়ে বিপদ অনুভব করে দুই দশকের মধ্যেই সোভিয়েত-সম ভূমিকা ও গৌরব পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় উঠে দাঁড়িয়ে গেলো তার সোভিয়েত আমলে অর্জিত বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও ব্যববস্থাপনার সংস্কার ও উন্নয়ন ঘটিয়ে। বিগত কয়েক বছর ধরে বিশ্বমঞ্চে রাশিয়ার পুনরাবির্ভাব এবং নির্ধারণী ভূমিকা নিরিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেইন ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে পুরনো ভীতির পুনঃপ্রত্যক্ষণ সৃষ্টি করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ এবং ন্যাটৌকে ব্যবহার করে সামরিক অবোরোধ তৈরিতে তৎপর হয়ে ওঠে।

    কিন্তু ইংরেজিভাষী ব্রিটেইন এবং তার ভাষাজ্ঞাতিসত্তা যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যাণ্ড যেভাবে বিশ্বকে দেখে, ইউরোপের পুরনো শক্তি জার্মানী, ফ্রান্স, স্পেইন, ইতালী, নেদারল্যাণ্ডস-সহ ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ সেভাবে দেখে না। বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণেও এই রাশিয়ার সাথে এই দেশগুলো সম্পর্ক ছেদ করতে চায় না। 

    এটিই খুব স্বাভাবিক যে, জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালী, স্পেইন ইত্যাদি দেশগুলো নিজ দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি রেখে নিজেকে খুব স্বাধীন ভাবতে পারছে না। তারা চায় এমন ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, যা হবে মার্কিন প্রভাবমুক্ত। আর, ইংরেজিভাষী ব্রিটেইন চায় মার্কিন প্রভাবাধীন ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন।

    ব্রিটেইন জানে, মার্কিন উপস্থিতি ছাড়া ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে সে একটি “ছোট্ট দ্বীপ” ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্রিটেইনের ভাবনা হচ্ছে এই যে, ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে যে জার্মানী ও ফ্রান্স হয়ে ওঠে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, এই ইউনিয়ন রাখার চেয়ে না রাখাই শ্রেয়। এই হচ্ছে ব্রিক্সিটের স্কার্সিটী আইডেণ্টিটী করেসপণ্ডেস সিচুয়েশন।

    কিন্তু বিষয়টা সাদা-কালো রং-বিভাজনের মতো স্পষ্ট নয় বলে এবং ইউরোপীয়ান ইউনিয়নকে কাজে লাগাবার আশা পুরোপুরি নিঃশেষিত না হয়ে যাওয়ার কারণে দ্বিধা রয়ে গিয়েছে। সর্বশেষ জার্মানীর পররাষ্ট্র মন্ত্রী যেভাবে রাশিয়ার সীমান্তে ন্যাটৌর সামরিক উপস্থিতি ও মহড়ার বিরোধিতা করেছেন এবং তার আগে রামষ্টেইনে মার্কিন বিমানঘাঁটির বিরুদ্ধে জার্মান জনগণের যে প্রতিবাদ প্রদর্শিত হয়েছে, তাতে ব্রিটেইন-আমেরিকা জার্মানীর রুশ ঘেঁষার প্রবণতা আঁচ করতে পারছে। 

    তার আগে, সিরিয়ার প্রশ্নে ফ্রান্স, বিশেষ করে প্যারিসে সন্ত্রাসী হালমার পর, মার্কিন নীতির চেয়ে রাশানদের লাইনেই অবস্থান নিয়েছে। গ্রীসতো সরাসরি বলেছেই, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিপক্ষে তারা। ইতালীও তাই। 

    সাধারণভাবে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নও এই ভেবে খুশি নয় যে, যেখানে ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থে লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়ার প্রতিষ্ঠিত অর্ডার ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে ইউরোপের দিকে যে-শরণার্থী প্রবাহ শুরু হয়েছে, তার ঝামেলা ও ঝঞ্ঝাট পোহাতে হচ্ছে ইউরোপকে। ব্রিটেইন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হওয়ার কারণে সেই ঝামেলা থেকে মুক্ত এবং সে-কারণে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ভুক্তভোগী মেইনল্যাণ্ড দেশ ও জাতিগুলো ব্রিটেইনের ওপর অসন্তুষ্ট।

    এছাড়াও ব্রিটেইনের ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে থেকেও ইউরোজৌনে না-থাকা এবং ইউরো গ্রহণ না করে নিজস্ব ষ্টার্লিং মুদ্রা অটুট রাখা ইত্যাদি সব মিলিয়ে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের দৃষ্টিভঙ্গি ব্রিটেইনের প্রতি ইতিবাচক নয়। আর, ব্রিটেইনও এটি বুঝতে পারে বলে, সেও নিজেকে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে আত্মপ্রত্যয়ী, শক্তিশালী ও সক্ষম মনে করতে পারছে না। ফলে, ব্রিটেইনের কাছে খুব আরামদায়ক স্থান নয়।

    ব্রিটেইনের রাষ্ট্রের গহীনস্তর বা ডীপষ্টেইট যদি ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়ে থাকে যে, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন তার কাজে লাগবে না, তাহলে আজ না হলেও কাল ব্রিটেইন ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসবেই।
    আমি আগেও বলেছি এবং এখনও বলছি, পৃথিবী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুদ্ধের সম্ভাবনা এখন এতোই প্রবল যে, আক্রমণ ও পালটা আক্রমণ এখন বিশ্ব-নেতৃত্বের রাজনৈতিক ভাষার প্রায় প্রাত্যাহিক শব্দে পরিণত হয়েছে। ফলে, বিশ্ব এখন জাতীয়তাবাদের ঝুঁকছে এবং ব্রিটেইন এর বাইরে নয়।

    বুধবার ২২শে জুন ২০১৬
    লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন