• ব্রিটিশ সিটিজেনশিপঃ পরীক্ষা কঠিনতর
    মাসুদ রানা

    অভিবাসীদের জন্য ব্রিটিশ নাগরিকত্ব প্রাপ্তি বা অর্জনের বিষয়টি ক্রমশঃ কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আজকের খবর হচ্ছে এই যে, ব্রিটিশ সিটিজেনশিপের ন্যাচারালাইজেশনের পরীক্ষা আরও কঠিন করা হয়েছে।

    পশ্চিমা বিশ্বের আইনতত্ত্বে নাগরিকত্বের দুটি উৎস আছে। ল্যাটিন ভাষায় যার একটিকে বলা হয় Jus Soli (ইউস্‌-সলি) বা মাটির অধিকার’ আর  অন্যটিকে বলা হয় Jus Sanguinis (ইউস্‌-সাঙ্গুইনিস) বা রক্তের অধিকার। একটি দেশের নাগরিকত্ব যাঁদের রক্তের অধিকারে প্রতিষ্ঠিত নয়, তাঁদের জন্য প্রযোজ্য হচ্ছে মাটির অধিকার, যা সে-মাটিতে জন্মগ্রহণের ভিত্তিতে কিংবা দীর্ঘকালীন বসবাসের ভিত্তিতে স্বাভাবিকভাবে জন্মে বলে স্বীকার করা হয়। সেই থেকেই উদ্ভূত হয়েছে নাগরিকত্বের ‘ন্যাচারালাইজেশন’।

    আইন হচ্ছে ‘সুপারস্ট্রাকচার’, যার ‘বেইস’ বা ভিত্তি হচ্ছে অর্থনীতি -  এই মার্ক্সীয় তত্ত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। অর্থনৈতিক ক্ষমতার সাথে-সাথে কীভাবে আইন বদলে যায়, যা আমরা সাদা চোখেই দেখতে পাই ব্রিটিশ নাগরিকত্বের বিধানে।

    ব্রিটেইনের অর্থনীতির যখন বর্ধিষ্ণু চাহিদা ছিলো, তখন ব্রিটেইনের নাগরিকত্ব ছিলো সহজলভ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন দেশের পুনর্গঠনের জন্য যথেষ্ট শ্রমশক্তি ছিলো না ব্রিটেইনের, তখন প্রাক্তন উপনিবেশ ও সদ্য স্বাধীন দেশগুলো থেকে শ্রমশক্তি আমদানির প্রয়োজন ছিলো তার। তাই, নাগরিকত্বের বিষয়টি ছিলো অনেকটা ‘চাহিবা মাত্র দিতে বাধ্য থাকিবেক’ প্রবচনের মতো চর্চিত।

    ব্রিটেইনের পুঁজিবাদী অর্থনীতি বিশ্ব-পুঁজিবাদী অর্থনীতির অংশ হিসেবে গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের পর আবার মহাসঙ্কটে পড়েছে। অর্থাৎ, ‘বেইস’ বা ভিত্তি সঙ্কটগ্রস্ত হয়েছে। তাই, তার উপরিকাঠামো বা সুপারস্ট্রাকচারে দেখা দিয়েছে প্রতিক্রিয়া।

    ব্রিটেইনে অভিবাসীদের জন্য নাগরিকত্ব লাভের ‘ন্যাচারালাইজেশন’ বিধানের স্বাভাবিকতায় পরিবর্তন আনা হলো ২০০২ সালে। আইনের মাধ্যমে। আইনটির শিরোনাম ‘ন্যাশনালিটি, ইমিগ্রেশন এ্যাণ্ড এ্যাসাইলাম এ্যাক্ট ২০০২’। এই আইনের অধীনে ২০০৫ সালের ১লা নভেম্বর থেকে প্রবর্তিত হলো তথাকথিত ‘সিটিজেনশিপ টেস্ট’ অর্থাৎ নাগরিকত্বের পরীক্ষা।

    অভিবাসীদের পক্ষে প্রকৃত অর্থে দাঁড়াবার কেউ নেই বলে, এই আইনকে কেউ চ্যালেইঞ্জ করলেন না। পরীক্ষার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টির কোনো আইনতাত্ত্বিক ভিত্তি আছে কি নেই, তার পরীক্ষা হলো না।

    নাগরিকত্ব বিষয়ে আইনতত্ত্বের ‘ইউস্‌-সলি’ বা মাটির অধিকার নীতির সাথে নাগরিকত্বের পরীক্ষা প্রবর্তনের বিষয়টি কি ‘ভ্যালিড’ বা বৈধ? একটি ভূখণ্ডে দীর্ঘকাল বাস করার পর যদি কোনো অধিকার জন্মে বলে আইনতত্ত্ব স্বীকার করে নেয়, তাহলে এর সাথে জ্ঞানের পরীক্ষার কী সম্পর্ক থাকতে পারে?

    কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রশ্ন হচ্ছেঃ এই জ্ঞান পরীক্ষার প্রয়োজন কেনো? জ্ঞানের উপযোগিতা যদি হয় অভিযোজের ক্ষমতা, তাহলে তো একটি নির্দিষ্ট কাল (ধরা যাক ১০ বছর) টিকে থাকার মধ্যেই সেটি স্ব-প্রমাণিত হয়ে যায়। সেখানে পরীক্ষার দরকার কী?

    কঠিনতর পরীক্ষা
    শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে, নাগরিকত্বের পরীক্ষা আরও কঠিন করা হয়েছে। এই মার্চ মাস থেকেই নতুন পরীক্ষার প্রবর্তন হবে এবং এর উপযোগী নতুন বই আগামীকাল বাজারে ছাড়া হচ্ছে।

    নতুন বইয়ে থাকবে ব্রিটেইনের প্রস্তর যুগের ইতিহাস থেকে শুরু করে রৌম্যান-নরম্যান বিজয়ের ইতিহাস। থাকবে, আধুনিক ব্রিটেনের ইতিহাস। আরও থাকবে, সাংস্কৃতিক, প্রকৌশলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের ইতিহাস। এটি যেনো অনেকটা নতুন করে জিসিইসি বা এ-লেভেলের পাঠক্রমকে কঠিনতর করার মতোই প্রয়াস।

    অভিবাসনের মন্ত্রী মার্ক হ্যারপার বলেছেন, ‘Instead of telling people how to claim benefits it encourages participation in British life’ -

    অর্থাৎ, ‘কীভাবে বেনিফিট দাবি করতে হয় তা বলে দেবার বদলে এটি ব্রিটিশ জীবনে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে।’

    দীর্ঘ-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা অধিকার ও অর্জনগুলো একে-একে ধ্বংস করে সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ সঙ্কুচিত করা হচ্ছে একদিকে, অথচ অন্যদিকে বলা হচ্ছে অংশগ্রহণে উৎসাহ-দানের কথা। বাস্তবে কোনটি সত্য?

    তেমন অনুসন্ধানের প্রয়োজন নেই, হৌম অফিসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে সংশ্লিষ্ট মিনিস্টারকে উদ্ধৃত করেঃ 'We have made radical changes to the immigration system and are determined to reduce net migration from the hundred of thousands into the tens of thousands by the end of the Parliament. The latest figures show these reforms are working, with net migration falling by a quarter in the last year.’

    অর্থাৎ, ‘আমরা অভিবাসনের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন তৈরি করেছি (বর্তমান) পার্লামেন্টের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার আগে অভিবাসনের মোট সংখ্যা কয়েক লক্ষ থেকে কয়েক অযুতে নামিয়ে আনার উদ্দেশ্য। আমাদের সর্বশেষ হিসাব দেখাচ্ছে যে, আমাদের সংস্কার কাজ করছে - গত বছর মোট অভিবাসনের সংখ্যা এক-চতুর্থাংশ হ্রাস পেয়েছে।’

    সন্দেহ নেই, নতুন পরীক্ষা কঠিনতর করা ফলে এই হ্রাসের হার বৃদ্ধি পাবে। পরীক্ষার প্রশ্নোত্তরের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে গ্রথিত ইংরেজি ভাষার  যে-মান নির্ধারণ করা হয়েছে, তার কাঠিন্যের মাত্রা হচ্ছে ‘ইংলিশ ফর স্পীকার্স অফ আদার ল্যাঙ্গুয়েইজেস’ বা ‘ইসল’-এর ‘লেভেল থ্রী’। সুতরাং, অভিবাসীদের জন্য নাগরিকত্বের বিষয়টি কঠিন ও ব্যয়সাপেক্ষ হতে বাধ্য।

    বাঙালী প্রসঙ্গ
    ব্রিটেইনের বাঙালী সম্প্রদায় এখনও বিকাশমান অনেকাংশে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন প্রক্রিয়ায়। ব্রিটেনের বাঙালীদের একটি বিরাটাংশ এখনও ব্রিটিশ নাগরিক হতে পারেননি। হবার প্রতীক্ষায় আছেন। তাই, নতুন বাঙালী অভিবাসীদের জন্য সরকারের নতুন প্রবর্তিত পাঠ্যসূচি ও পরীক্ষার বিষয়টি বুঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    এ-কথা আমি বারংবার বিভিন্ন লেখাতে উল্লেখ করেছি যে, এদেশে বাঙালীদের অগণিত সংগঠন থাকলেও দৃশ্যতঃ কোনো ‘পলিসি স্টাডি’ জাতীয় সংগঠন নেই। বাঙালীদের জন্যে এমন একটি সংগঠন প্রয়োজন, যেটি সরকারী পর্যায়ে নব-নব নীতি কিংবা নীতিগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও অনুধ্যান করে নিজেদের কমিউনিটির জন্য সঠিক স্ট্র্যাটেজিক পথ নির্দেশ করবে।

    বিভিন্ন অঞ্চলের বাঙালী বংশোদ্ভূত রাজনীতিকগণ যেভাবে বাঙালীত্বের দোহাই দিয়ে স্থানীয় সরকারে নির্বাচিত হন একচেটে বাঙালী ভৌট পেয়ে, তাঁদের অনেকেই বাস্তবে বাঙালী স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হন। অবশ্য, তাঁদের এই ব্যর্থতা যতোটুকু না মানসিক কারণে সৃষ্ট, তার চেয়েও বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক কারণে ঘটিত। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, জনপ্রিয় বাঙালী প্রতিনিধিদের স্ট্র্যাটেজিক লেভেলে ভাবার চর্চা কিংবা ক্ষমতা কিংবা কোনোটাই নেই। স্পষ্টতঃ তাঁদেরকে পরমার্শ দেবার জন্যেও এ-রকম একটি সংস্থার প্রয়োজন অপরিহার্য্য।

    ব্রিটেইনে বাঙালী সম্প্রদায়ের উন্নয়নে ‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’ ও ‘নিবেদিত’ যে-সংগঠনগুলো আছে, তাদের উচিত হবে, ক্ষুদ্র আঞ্চলিকতা, সাম্প্রদায়িকতা ও বঙ্গীয় রাজনীতির অর্থহীন চর্চা না করে, ব্রিটিশ সমাজের মধ্যে ইতিবাচক আইডেন্টিটি বা আত্মপরিচিতি নিয়ে ইন্টিগ্রেশন বা সংহত হবার প্রক্রিয়ায় সচেষ্ট হওয়া।

    সিটিজেনশিপ ও ইংরেজি জ্ঞানের পরীক্ষা শুধু একটি দৃশ্যমান দিক মাত্র। এমন অনেক দিক আছে, যা ততো দৃশ্যমান নয়। এ-রকম অসংখ্য দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ‘হার্ডল’ বা প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাবার জন্য ব্রিটেইনের বাঙালীদের নতুন মাত্রায় ভাবতে হবে। কিন্তু কে বা কারা ভাববেন এই ভাবনাটি?

    রোববার, ২৭ জানুয়ারী ২০১৩
    নিউবারী পার্ক, এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন