• ব্রিটেইনের গণতন্ত্রঃ হায়, এ্যারিস্টটল ও লিঙ্কন কতো ভ্রান্ত!
    মাসুদ রানা

    এ্যারিস্টটলকে রাজনীতি-বিজ্ঞানের পিতা মনে করা হয়। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এ-পিতা বলেছিলেন, ‘In a democracy the poor will have more power than the rich, because there are more of them, and the will of the majority is supreme’, অর্থাৎ গণতন্ত্রে দরিদ্রের সংখ্যা বেশি বলে তাদের ক্ষমতা হবে বেশি এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাই সর্বোচ্চতম।

    আর, দেড়শো বছর আগে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন, ‘Democracy is the government of the people, by the people, for the people’, অর্থাৎ গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের সরকার।

    তাদের কথাগুলো শুনতে আরামদায়ক, ভাবতে স্বস্তিদায়ক। বিশেষ করে, অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনের কথাগুলোতো শতাধিক বছর ধরে বেদবাক্যের মতো রাজনীতিকদের জন-বন্দনার অমোঘ মন্ত্র হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে। যতোবার উচ্চারণ করা যায়, ততোবারই যেনো শরীর রোমাঞ্চিত হয়, মন বিমোহিত হয়। আমাদের মতো সাধারণের কাছে তাই দার্শনিক এ্যারিস্টটল ও রাষ্ট্র নায়ক অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন ‘নমস্য’।

    কিন্তু আজ সময় এসেছে, মহাপুরুষদের (কিংবা মহানারীদের) কথাগুলো একটু পরীক্ষা করে নেবার। যদি সত্য হয়, মাথায় তুলে রাখবো। মিথ্যা হলে ছুঁড়ে ফেলে দেবো, তা যতো পবিত্র পুস্তক থেকেই আসুক না কেনো।

    গণতন্ত্র ও বিজ্ঞান ধারণ আজ এতোই অমোঘ, ধর্ম প্রচারকেরা পর্যন্ত নিজ-নিজ ধর্মকে ‘গণতান্ত্রিক’ এবং তাদের বিশ্বাসগুলোকে ‘বৈজ্ঞানিক’ বলে বলে দাবী করে। আজ ‘গণতন্ত্র’ ছাড়া কোনো কিছুই বৈধ নয় এবং ‘বিজ্ঞান’ ছাড়া কোনো কিছুই সত্য নয়।

    ব্রিটেইন গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পৃথিবীর অনেক দেশের কাছে মডেল। ‘কনস্টিটিউশন্যাল মনার্কী’ কীভাবে গণতন্ত্রের মধ্যে সোনার পাথরবাটি হয়ে থাকে, সে-প্রশ্নে না গিয়েও ব্রিটেইনকে গণতান্ত্রিক বলা হয় এ-কারণ যে, এখানে জন-সম্পর্কিত বিষয়গুলো প্রস্তাবাকারে আলোচিত হয়, নানা মত মনোযোগ প্রাপ্ত হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বা আইন আকারে গৃহীত হয়।

    কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জনগণের চাওয়া প্রকাশিত এবং সে-চাওয়াকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রতিফলিত ও কার্যে পরিণত করার মধ্যে আছে এক বিশাল ফাঁক। উদাহরণ স্বরূপ, লন্ডনের পূর্ব-প্রান্তে যেখানে বাঙালীরা ঘণীভূত, সেখানকার এক সময়কার এমপি উনা কিং পার্লামেন্টে ইরাক যুদ্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন তার কনস্টিটুয়েন্সীর মানুষের স্পষ্ট প্রকাশিত মতামতকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেই।

    পরবর্তী নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রায় পৈত্রিক তালুকের মতোই বাঙালী অধ্যুষিত ঐ কন্সস্টিটুয়েন্সীতে হেরে গেলেন কিং। বিজয়ী হলেন বিদ্রোহী জর্জ গ্যালোওয়ে। বাঙালী পরিবৃত স্কটল্যান্ড-পুত্র বিজয়ী গ্যালওয়ে প্রথম ভাষণেই গেইলিক উচ্চারণে বললেন, ‘দিস ইজ ফর এরাক’, অর্থাৎ, এটি ইরাক যুদ্ধের ফল।

    ইরাক-যুদ্ধ শুরু করার জন্য সে-সময়কার প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার শুধু যে মিথ্যা কথা বলেছিলেন তাই নয়, ব্রিটেইনের জনসাধারণের ইচ্ছাকেও সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষা করেছিলেন। অথচ, গণতন্ত্রের বেদবাক্য আউড়েই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই ব্লেয়ার তার মিত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ইরাক আক্রমণ করেছিলেন।

    এখনও টন-টন মিথ্যা বলে, মিথ্যা প্রচার করে লিবিয়ার মরুভূমির নিচে থাকা উন্নত মানের তেল ও বিশুদ্ধ পানি এবং প্রচুর সম্ভাবনাময় কৃষিকে দখল করার জন্য ফ্রান্সের সাথে মিলে আমেরিকার সমর্থনে লিবিয়া আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে ব্রিটেইন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডেইভিড ক্যামেরোনের নেতৃত্ব। এবং এটি গণতন্ত্রের নামেই হচ্ছে।

    প্রশ্ন হলো, কে তাদেরকে বলে দিয়েছে লিবিয়ার আক্রমণ করতে? লিবিয়া আক্রমণে প্রতিদিন শতো-শতো মিলিয়ন পাউন্ড খরচ হচ্ছে। অথচ এ-দেশে অর্থের অভাব দেখিয়ে উচ্চশিক্ষাকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল করা হয়েছে। জাতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ব্যক্তিগত মুনাফা-লোভী বাণিজ্যের হাতে তুলে দেবার পরিকল্পনা হচ্ছে। কার সম্মতিতে এগুলো হচ্ছে? জনগণের?

    না। জনগণের কোনো সম্মতি নেই তথাকথিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারের কাজে। এ-সপ্তায় ঘটা গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ঘটনা এ-সত্যই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দেশবাসীকে এবং সারা বিশ্বকে।

    প্রথমতঃ এ-দেশের গণ্যমান্য ৫৮ জন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ একত্রে স্বাক্ষর করে একটি চিঠিতে চ্যান্সেলর অফ এক্সচেকার জর্জ ঔসবর্নকে বলেছেন, তিনি যে অর্থনীতি অনুসরণ করছেন, তা ভুল ও ক্ষতিকর। তারা তাকে সৎপরামর্শ দিয়েছেন ভুল পথ পরিহার করে জনগণের ভালোটাকে মাথায় রেখে অর্থনীতি প্রণয়ন করতে। তাঁরা তাঁকে একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখাও দিয়েছেন। কিন্তু মনে হয় না, তিনি তাঁদের কথায় কর্ণপাত করবেন।

    দ্বিতীয়তঃ ইতিহাসে নজিরবিহীন ভাবে অক্সফৌর্ড ইউনিভার্সিটির আইন-সভা কনগ্রেগেশন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকারের উচ্চশিক্ষানীতির প্রতি অনাস্থা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে। তারা বলেছেন, সরকারের উচ্চশিক্ষা নীতি সাধারণ মানুষকে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে শুধু ধনীক শ্রেণীর সন্তানদের জন্য ক্রয়যোগ্য পণ্যে রূপান্তরিত হবে। সুতরাং তারা অনাস্থা জানাচ্ছেন উচ্চশিক্ষা মন্ত্রীর উপর। অক্সফৌর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটেইনের গর্ব। সেই অক্সফৌর্ডের শিক্ষকদের গৃহীত অনাস্থা প্রস্তাব যা-তা কথা নয়। কিন্তু এর মূল্য দেবে কি ক্ষমতাসীন জোট সরকার? কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

    অবশেষে, আর্চবিশপ অফ ক্যান্টারবারী ডঃ রৌয়ান উইলিয়ামস দ্য স্টেইটম্যান ম্যাগাজিনে অতিথি সম্পাদকীয় লিখে তার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, জনগণ ভীত। তাদের জীবন সঙ্কটগ্রস্ত। কোথাও কোনো আলোচনার সুযোগ নেই। মানুষের মতামতের মূল্য নেই। পার্লামেন্টকে চালিকী করে কাজে লাগিয়ে মানুষের মতামতের তোয়াক্কা না করে এমন সব আইন তৈরী করা হচ্ছে, যার জন্য জনগণ ভৌট দেয়নি।

    সম্ভবতঃ কোটি-কোটি মানুষের মনের কথা প্রতিফলিত করে তিনি লিখেছে, ‘At the very least, there is an understandable anxiety about what democracy means in such a context’, অর্থাৎ ‘এহেন প্রেক্ষাপটে ন্যূনপক্ষে গণতন্ত্র কাকে বলে তা নিয়ে বোধগম্য উদ্বেগ দেখা দিয়েছে’।

    প্রথম প্রবর্তন করা হলো টিউশন ফী ‘সামান্য’ ও ধনীদের জন্য প্রযোজ্য বলে। তারপর এই টিউশন-ফী বিস্তৃত ও বৃদ্ধি করা হলো, সুদহীন ঋণ দেয়া হবে বলে। তারপর টিউনশন-ফী তিনগুণ বাড়ানো হলো - ৯,০০০ পাউন্ড পর্যন্ত - ন্যায্যতার কথা বলে। এখন বলা হচ্ছে, সবাইকে ঋণ দেয়া হবে না, কৌটা করে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অর্থাৎ, একমাত্র নগদ অর্থ থাকলে উচ্চশিক্ষা পাওয়া যাবে।

    যার একটি সন্তান, তার ফার্স্ট ডিগ্রী পর্যন্ত পড়াতেই শুধু টিউশন ফী-ই লাগবে বছরে ৯,০০০ পাউন্ড। অন্যান্য খরচ ধরা গেলো ৬,০০০ পাউন্ড। অর্থাৎ বছরে ১৫,০০০ হাজার পাউন্ড। তাহলে তিন বছরে ৪৫,০০০ পাউন্ড। দুটি সন্তানের জন্য এটি হবে ৯০,০০০ পাউন্ড। মা-বাবা দুজন পেশাজীবী ও পূর্ণকালীন কর্মরত হলেও বছরে ৩০,০০০ পাউন্ড সঞ্চয় করা সম্ভব নয়। তাহলে কী ভবিষ্যত আছে মধ্যবিত্ত মা-বাবার সন্তানদের? আর যারা নিম্নবিত্ত, তাদের ছেলে-মেয়েদের কী হবে?

    শিক্ষার সর্বজনীন অধিকার তো বাস্তবে গেছে সেই কবে! সরকারী শিক্ষা-ঋণেরও সুযোগও যেতে বসেছে। আজকের স্কুলগামী অবুঝ শিশুরা হয়তো জানেও না, কী অন্ধকার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে তাদের জন্য!

    আপনি কীভাবে জানাবেন আমার উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা? কী ভাবে কার্যকর করবেন আপনার ও আপনার মতো কোটি-কোটি নাগরিকের আশা আকাঙ্খা?

    সেই যে পড়েছিলাম এ্যারিস্টটলের গণতন্ত্রে দরিদ্রের ক্ষমতাই বেশি ও সর্বোচ্চতম, সে কি তবে আজ মিথ্যা নয়? সেই যে শুনেছিলাম বেদবাক্য-সম ‘ডেমোক্র্যাসী ইজ দ্য গভর্নমেন্ট অফ দ্য পিওপল, বাই দ্য পিওপল, ফর দ্য পিওপল’, সে কি তবে আজ অর্থহীন নয়? হায়, এ্যারিস্টটল! হায় অ্যাব্রহাম লিঙ্কন! কী ভ্রান্ত তোমরা আজ এ-যুগে!

    আজ মনে হচ্ছে, আইরিশ সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ডই সঠিক ভাবে বুঝেছিলেন গণতন্ত্রের অর্থ। তিনি বলেছিলেন,  ‘Democracy means simply the bludgeoning of the people by the people for the people’, অর্থাৎ সহজ কথায় গণতন্ত্র হচ্ছে মানুষের জন্য মানুষের দ্বারা মানুষের উপর মুগুর মারা!

    ব্রিটেইনের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সমাজে আমার ভৌটের অধিকার আছে, কিন্তু কোটি জনতার মাতামত কার্যকর করার কোনো উপায় নেই। আপনি ভৌট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচিত করবেন উনা কিংয়ের মতো, আর হাউস অফ কমন্সে গিয়ে ওরা ‘কমনার’দের আশা-আকাঙ্খার ও মতামতের বিপরীতে সিদ্ধান্ত নিবে অত্যন্ত উচ্চে বসা ও অদৃশ্য মুনাফো-লোভী ধনীদের স্বার্থে। কোথায় তবে আমার মতো সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা?

    প্রসঙ্গতঃ মনের পড়ে লেনিনের কথা, যিনি বলেছিলেন, ‘Freedom in capitalist society always remains about the same as it was in ancient Greek republics: Freedom for slave owners’, অর্থাৎ পুঁজিবাদী সমাজে স্বাধীনতা বিরাজ করে অনেকটা প্রাচীন গ্রীক জনতন্ত্রের মতোইঃ স্বাধীনতা দাস-মালিকদের জন্য।

    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যান্ড
    রোববার, ১২ জুন ‘১১
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন