• ব্রিটেইনে বাঙালী নারীর সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ
    মাসুদ রানা

    ব্রিটেইনে বাংলা সাংবাদিকতার-যে কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে, তা দৃশ্যমান। তবে, এর কতোটুকু প্রকৃত সাংবাদিকতা আর কতোটুকু ‘কপি এ্যাণ্ড পেইস্ট’ দক্ষতা, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। শেষ বিচারে, ‘কিছু তো হচ্ছে’র পক্ষেই লোকদের রায় যায়। ‘মান’ ঝুলে থাকে শূন্য ডালে, ভবিষ্যতের আশায়।

    ইচ্ছের ডানা উড়ছে না আর,
    ডানারও থাকে নিজস্ব ভার।
    ধরা-ছোঁয়ার বাইরে শূন্য পাহাড়ঃ
    ইচ্ছের ডানা, তুমি আসলে কার?

    উপরের চমৎকার অভিব্যক্তির লেখিকা ‘নারী’র সম্পাদিকা শাহনাজ সুলতানা। লেখার সাথে সম্পর্ক-হীন অনেক বাঙালী পুরুষ যেখানে সাংবাদিকতার কার্ড দেখিয়ে দাপিয়ে বেড়ান, এই নারী-সম্পাদিকা লণ্ডনের বাংলা সাংবাদিক সঙ্ঘে আবেদন করে সদস্যত্ব পাননি।

    অন্যায্য অস্বীকৃতি বিদ্রোহ ঘটায়। তবে বিদ্রোহ মানেই ধ্বংসাত্মক নয়। বিদ্রোহও হতে পারে ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে কাঁপা’। শাহনাজ ধ্বংসের পথে না যেয়ে, গিয়েছেন সৃষ্টির পথে। নারীদের মধ্যে সাংবাদিক সৃষ্টি করার প্রয়োজন-বোধে সৃষ্টিশীল হয়েছেন তিনি।

    কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই শাহনাজের। অভিযোগ থাকলেও, তার কোনো প্রকাশ নেই। বরং একদল নারী নিয়ে তিনি ব্রতী হয়েছেন প্রকৃত অর্থে সাংবাদিক হতে। তিনি আয়োজন করেছেন ৮ সপ্তাহের সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণঃ ‘এ্যা শর্ট কৌর্স অফ জার্নালিস্টিক রাইটিংস’। তিনি নিজেও এতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন বিনম্র চিত্তে।

    প্রথম দিবসে প্রশিক্ষক ‘পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন’-এর মাধ্যমে ১০টি ‘টপিক’-এ ভাগ করে সাংবাদিকতার একটি রূপরেখা উপস্থাপন করে একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেছেন প্রশিক্ষার্থীদের সামনে। সেদিন সম্ভবতঃ ‘উদ্বোধনী’ উপাদান থাকার কারণেই সংবাদ নিতে এসেছিলেন  বিভিন্ন মাধ্যমের অনেক পুরুষ সাংবাদিক।

    উপস্থাপিত রূপরেখার বিষয়সমূহ থেকে অনেক সাংবাদিক সযত্নে ‘নৌটস’ নিয়েছেন। তাঁদের দুয়েকজন তাৎক্ষণিকভাবেই কৌর্সে ভর্তি হয়ে গিয়েছেন। শাহনাজ ও তাঁর সাথীরা উদারভাবে পুরুষ সাংবাদিকদেরও গ্রহণ করে নিয়েছেন। বলেছন, তাঁরা আবদ্ধ নন, উন্মুক্ত মনের।

    শাহনাজ বলেছেন, প্রাথমিক ভাবে তিনি চান ‘রিপৌর্টিং’, ‘ফিচার রাইটিং’ ও ‘ইন্টারভিউয়িং’-এর উপর প্রশিক্ষণ নিতে। তাই, দ্বিতীয় দিবসে শুরু হয়েছে রিপৌর্টিংয়ের তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ।

    খবর কী, খবর কাকে বলে, খবরের উপাদান-সমূহ কী-কী, খবরের কাঠামো কেমন, খবর লিখতে হয় কী ভাবে, খবরে প্রদেয় তথ্যের অগ্রাধিকারের ধারণা কী, বস্তুনিষ্ঠতা কী ভাবে নিশ্চিত করতে হয়, খবরের ব্যবহৃত ভাষার কলা-কৌশল কী, ইত্যাদি বিষয়ের উপর আলোকপাত করে শুরু হয়েছে রিপৌর্ট রাইটিং-এর তাত্ত্বিক ক্লাস।

    কিন্তু তত্ত্বেই সীমিত থাকবে না এই প্রশিক্ষণ। ক্লাসে লেকচার ও প্রশ্নোত্তর শেষে প্রশিক্ষার্থীদের দেয়া হয়েছে ‘এ্যাসাইনমেন্ট’। যা তত্ত্বরূপে বলা হলো, শেখা গেলো, তার প্রয়োগ করে লিখতে হবে একটি ‘নিউজ রিপৌর্ট’।

    পরবর্তী ক্লাসটি হবে ওয়ার্কশপ ধরনের। সে-দিন লেকচার থাকবে না। থাকবে সংবাদ-পাঠ, পঠিত সংবাদের মূল্যায়ণ এবং তার ভিত্তিতে হবে ‘রিপৌর্ট রাইটিং’-এর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার সংহতকরণ।

    নারী সাংবাদিকগণ বেশ উৎসাহী। প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্দেশ্য থেকে। তাঁদের ধারণা, ব্রিটেইনের বাঙালী কমিউনিটিতে পুরুষ-প্রাধান্যের সাংবাদিকতা সমাজের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে পারছে না। সমাজের মধ্যে - বিশেষ করে বাঙালী কমিউনিটির মধ্যে - ‘মেইল-ডাইমেনশন’ বা পুরুষ-মাত্রার সমান্তরালে যে ‘ফিমেইল-ডাইমেনশন’ বা নারী-মাত্রা রয়েছে, তার প্রতিনিধিত্ব ও প্রকাশ সঠিক অর্থে একমাত্র নারীরাই করতে পারেন। আর এখানেই বাঙালী নারী-সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত।

    উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত হয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র, বাঙালী বংশোদ্ভূত লুতফুর রহমান বলেছেন, ‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকের অনেকেই নারী।’ তিনি বলেছেন, বাঙালী নারী সাংবাদিকতায় এগিয়ে আসুক, তা তিনি মনে-প্রাণে চান। তিনি অবশ্য, বাঙালী নারীদের শুধু বাঙালী কমিউনিটির মধ্যে নয়, লণ্ডন তথা ব্রিটেইনের প্রধান স্রোতধারায় এগিয়ে আসার কথাই বুঝিয়ে থাকবেন।

    পূর্ব-লণ্ডনের বাঙালী পাড়ায় নারী সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ গত দু-সপ্তাহ ধরে একটি আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়ে থাকবে। সে-কারণে বেশকিছু গুরুত্ববাহক লোক এসেছেন কী হচ্ছে, তা দেখার জন্য। তাঁরা উৎসাহিত হয়েছেন এবং উৎসাহ দান করেছেন অকাতরে।

    টিভি-চ্যানেলের মালিক-সহ টিভি-সাংবাদিকেরা এসেছেন। এসে তাঁদের জীবন কাহিনী শুনিয়েছেন। বেশ ‘আকর্ষণীয়’ সবকিছু। ফলে, ভবিষ্যতের নারী সাংবাদিকেরা নিজেরাই সংবাদ হয়ে উঠেছেন। তাঁদের দেখানো হচ্ছে টেলিভিশনের পর্দায়।

    সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ নিয়ে লণ্ডনের অগ্রণী বাঙালী নারী অন্ততঃ বাংলা-সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করবেন এবং এর মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতা পেশার মানোন্নয়ন হবে, এই আমাদের অকৃপণ শুভেচ্ছা। তবে, প্রসঙ্গক্রমে বলি, ‘বিকাশ’ ও ‘প্রকাশ’ বলে দুটো ধারণা আছে, যার মধ্যে সঠিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেনঃ প্রথমে বিকাশ হোক, তারপর প্রকাশ।

    যথার্থ বিকাশের আগের অপরিণত প্রকাশ ঘটলে তা হিতে বিপরীত হয়। তাই, নারী সাংবাদিকদের উচিত হবে প্রথমে নিজেদেরকে সযত্নে বিকশিত করা। প্রথমেই এতো প্রচার ও এতো প্রকাশ বিকাশের গতিকে ব্যাহত করতে পারে।

    শাহনাজ তাঁর চার পংক্তির কবিতা কী অনুভবে লিখেছেন, তা জানা সম্ভব নয়। জানার প্রয়োজনও নেই। কবিতা প্রকাশিত হবার পর প্রকৃত কবি-বোধিত অর্থের চেয়ে পাঠক-বোধিত অর্থই সম্ভবতঃ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই, শাহনাজের কবিতায় ব্যবহৃত রূপক ব্যবহার করে বলিঃ সত্যিই ডানার নিজস্ব ভার আছে এবং এর সাথে উড্ডয়নের একটা সম্পর্ক আছে।

    বিজ্ঞান বলে, ডানাধারী তার ডানা বিস্তার করে একটি আন্দোলনের মাধ্যমে ক্রিয়া রূপে যে-পরিমাণের বায়ু নিচের দিকে ঠেলে দেয়, গতির সূত্রানুযায়ী সেই পরিমাণ বায়ু আন্দোলিত ডানাকে প্রতিক্রিয়া রূপে উপরের দিকে ঠেলে দেয়। ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার এই সমীকরণে নিচের দিকে ঠেলে-দেয়া বাতসের ভর যদি ডানার ভরের চেয়ে বেশি হয়, তখনই ডানা উড়তে পারে, আর তা না হলে ডানাধারী মধ্যাকর্ষণের কারণে ভূতলে পতিত হয়।

    সুতরাং ডানা বিস্তৃত রেখে বিপুল বায়ু নিচে ঠেলে দিয়ে ভেসে থাকতে হবে, পেছনে ঠেলে দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আর, ডানাকে ভারমুক্ত রাখার জন্য ইচ্ছকে ভারমুক্ত রাখতে হবে। কারণ, ভারাক্রান্ত ডানা উড়তে পারে না।

    রোববার, ১৪ অক্টোবর ২০১২
    নিউবারী পার্ক,
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন