• ব্লেয়ারের শিক্ষা-নিরাপত্তা তত্ত্ব ও আমার উদ্বেগ
    মাসুদ রানা

    গত শনিবারের অবজার্ভারে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার একটি আর্টিকেল লিখেছেন পৃথিবীতে আসন্ন যুদ্ধের চরিত্র কী হবে তার ভবিষ্যতবাণী করে। আর্টিকেলের শিরোনাম “রিলিজিয়াস ডিফারেন্সেস, নট আইডিওলজি, উইল ফিউয়েল দিস সেঞ্চুরিস এপিক ব্যাটেলস”।

    ব্লেয়ার প্রথমে উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করতে চাইলেন সিরিয়া থেকে নাইজেরিয়া এবং ফিলিপাইন্স থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত দেশে-দেশ চলছে ধর্মীয় চরমপন্থী সহিংসতা। তাঁর মতে, এ-সহিংসতা চলছে ধর্মের বিকৃতি ও ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে।

    দ্বিতীয়তঃ তিনি মনে করেন এ-সমস্ত ভ্রান্ত ও সহিংস ধারণা-সমূহ ধর্মের নামে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে দেশে-দেশে বিবিধ প্রতিষ্ঠানে। এর মধ্যে ধর্মালয় থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ও অন্তর্ভূক্ত। তাঁর মতে, আজকের যুগে বিশ্বব্যাপী ইণ্টারনেট ভিত্তিক যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নতির কারণে এই শিক্ষা ব্যাপক বিস্তৃতি পাচ্ছে।

    তৃতীয়তঃ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনে করেন বর্তমান কালে শিক্ষার সাথে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত হয়ে গেছে। তিনি স্পষ্টভাষায় বলেছেন,  “একবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষা একটি নিরাপত্তা ইস্যু।” অর্থাৎ, শিক্ষাকে আর আগের মতো এক্সেসিবল বা প্রবেশ্য হিসেবে দেখা যাবে না।

    চতুর্থতঃ টনি ব্লেয়ার মনে করেন, গত শতাব্দীর মতো আর রাজনৈতিক আদর্শগত পার্থক্য নয় বরং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণেই পৃথিবীতে ব্যাপক যুদ্ধ বাঁধবে। কিন্তু সেই যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের জোরে জেতা যাবে না। অস্ত্রের সাথে-সাথে ‘আইডিয়া’ লাগবে।

    শেষতঃ তিনি তাঁর নিজের গড়া ফাউণ্ডেশন ও ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠার তথ্য দিয়ে জানালেন যে, সেখান থেকে দেশে-দেশে উপযুক্ত শিক্ষা বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই প্রচেষ্টা স্কুল পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত।

    আপাত দৃষ্টিতে টনি ব্লেয়ার লেখা বা ভাবনার মধ্যে দোষের কিছু নেই। কারণ, তিনি তাঁর মূল বক্ত্যের ফাঁকে-ফাঁকে গণতন্ত্র, সহশীলতা, ইত্যাদির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। এমনকি তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা-কালে ২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেণ্ট জর্জ বুশের সাথে মিলে সেক্যুলার ইরাকের প্রেসিডেণ্ট সাদ্দাম হুসেইনের বিরুদ্ধে ইউপেন্স অফ মাস ডেষ্ট্রাকশনের মিথ্যা অভিযোগে তাঁর দেশটাকে আক্রমণ করে শিয়া-সুন্নির অন্তহীন সংঘাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, সেখানকার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ধর্মীয় সহিংসতার কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে বলে তিনি দুঃশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন।

    কিন্তু ব্রিটেনবাসী ও পৃথিবীর মানুষ জানেন প্রেসিডেণ্ট বুশের সাথে মিলে প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার সভ্যতার সংঘাতের কথা বলে আফগানিস্তান ও ইরাকের ওপর যে আক্রমণ করেছিলেন, তার সাথে সভ্যতা ও সংস্কৃতির কোনো সম্পর্কে নেই। এর সাথে পেছেনে ছিলো তেল সম্পদ দখল ও লুণ্ঠনের বাণিজ্য।

    আজ যখন টনি ব্লেয়ার শিক্ষাকে নিরাপত্তা ইস্যু বলে এই শতাব্দীর যুদ্ধকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পার্থ্যকজাত যুদ্ধ বলে অস্ত্রের সাথে-সাথে ‘আইডিয়া’ ব্যবহারের কথা বলছেন, তখন আমি এদেশের একজন শিক্ষক ও বিশ্বনাগরিক হিসেবে বিচলিত না হয়ে পারি না। শিক্ষাকে নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে চিহ্নিত করার মধ্যে আমি অন্ততঃ দু’টি বিপদ দেখতে পাচ্ছি।

    প্রথমতঃ তিনি শিক্ষাকে পরোক্ষভাবে রেজিমেণ্টেড্‌ করার প্রস্তাব করছেন। এই রেজিমেণ্টেশনের দু’টি দিক – কণ্টেণ্ট ও ডেলিভারি। তিনি যে অস্ত্রের সাথে ‘আইডিয়া’ দিয়ে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে শিক্ষার পঠ্যাসূচিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব ইঙ্গিত করেছেন। অন্যদিকে শিক্ষার ডেলিভারিতে তিনি ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে পরির্তন ইঙ্গিত করে থাকবেন।

    দ্বিতীয়তঃ বর্তমানে শিক্ষাকে উচ্চ মূল্যের পণ্যে পরিণত করে যেভাবে সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক শ্রেণীর উচ্চশিক্ষার অধিকার হরণ করা হয়েছে, টনি ব্লেয়ার তাকে আরও সঙ্কুচিত করতে চাইছেন। ব্লেয়ার সম্ভবতঃ শিক্ষাকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক লাইনে বিভক্ত করার প্রস্তাব করেছেন। অর্থাৎ, পাশ্চাত্যের উন্নত প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের শিক্ষাকে তিনি কোনো-কোনো সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর জন্য অপ্রবেশযোগ্য করার প্রস্তাব দিচ্ছেন।

    উপরের আশঙ্কা দু’টি আমার প্রাথমিক ধারণা মাত্র, যা টনি ব্লেয়ার আর্টিকেল পড়ে আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু এমনও হতে পারে যে, তিনি এ-লেখাটি লিখেছেন তাঁর শিক্ষা ফাউণ্ডেশন ও শিক্ষা কার্যক্রমের বাণিজ্যিক সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে। কারণ, 'আইডিয়া' ও অভিজ্ঞতা বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের লিপ্সার জন্য টনি ব্লেয়ার ইতোমধ্যে বিশ্বখ্যাত হয়ে উঠেছেন।

    সোমবার ২৭ জানুয়ারি ২০১৪
    জুবিলী ষ্ট্রীট, স্টেপনি
    লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন