• ভাতা-টুপিঃ মাথার সাথে সম্পর্কহীন?
    মাসুদ রানা

    ‘বেনিফিট ক্যাপ’-এর বাংলা অনুবাদ হতে পারে ‘ভাতা-টুপি’। মাথা-টুপির সাথে এর ছান্দিক মিল থাকলেও বিষয় দুটোর মধ্যে বিস্তর ফারাক। ভাতা-টুপির সাথে দৃশ্যতঃ মাথার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু গভীরে ভেবে দেখলে, দেখা যাবে, আছে। বিলক্ষণ আছে।

    প্রথমেই ব্যাখ্যা করা যাক ‘বেনিফিট ক্যাপ’ বা ভাতা-টুপি বিষয়টি কী। সরকার আইন প্রস্তাব করেছেঃ একটি পরিবারের বার্ষিক বেনিফিট-প্রাপ্তি যেনো কোনোক্রমেই ২৬ হাজার পাউণ্ডের উপরে না যায়।

    কেনো? সরকারের যুক্তিহচ্ছে, যে-পরিবারটির বাবা বা মা চাকুরী করছেন, ট্যাক্স দিচ্ছেন, তাঁদের গড় আয় হচ্ছে বার্ষিক ২৬ হাজার পাউণ্ড। কিন্তু প্রচলিত ওয়েলফেয়ার বা কল্যাণ ব্যবস্থায় শিশু-ভাতা, বেকার-ভাতা, বাড়ীভাড়া-ভাতা ইত্যাদি যোগ করে দেখা যায়, কর্মহীন অনেক পরিবারে আয় ২৬ হাজার পাউণ্ডের চেয়ে অনেক-অনেক বেশি।

    সরকারের আরও বক্তব্য, যে-কর্মঠ মানুষগুলো ট্যাক্স দিচ্ছেন, তাঁরা যদি দেখেন অন্য একটি পরিবার কোনো কাজ না করেও বেনিফিটের উপর নির্ভর করে বেশি টাকা পাচ্ছে, তখন কি তাঁদের খারাপ লাগবে না? সকারের বক্তব্য, এটি ‘আনফেয়ার’ - অন্যায্য। সুতরাং ভাতার মাথায় টুপি পরিয়ে দাও। অর্থাৎ ভাতার অর্থের একটি পরিমাণ ঠিক করে দাও, কোনো পরিবার যেনো যার বেশি না পায়।

    ‘ন্যায্য কথা’, বললেন ক্ষমতাসীন, আধা-ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাহীন সকল রাজনৈতিক দলের প্রায় সব এমপি। ভাতা-টুপিকে আইনে পরিণত করার উদ্দেশ্য জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হাউস অফ কমন্সে সংখ্যা-গরিষ্ঠ ভৌট দিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অফ লর্ডসে এই আইন প্রস্তাবকে সংখ্যগরিষ্ঠ ভৌট পেতে হবে।

    গত সোমবার প্রস্তাবটি যখন হাউস অফ লর্ডসে গেলো, তখন লর্ড-সভার সদস্য এক বিশপ, রেভেরেণ্ড জন প্যাকার, বললেন, ‘এটি অন্যায্য’। চাইল্ড বেনিফিট বা শিশু-ভাতাকে এই টুপির নীচে নিয়ে আসা ঠিক হয়নি। এতে শিশু-দারিদ্র বৃদ্ধি পাবে। তাঁর এ-কথায় অনেই সায় দিলেন। ‘ভাতা-টুপি’কে হাউস অফ লর্ডস ফেরৎ পাঠালো কমন্সে। আর বললো, চাইল্ড বেনিফিট বা শিশুভাতা যেনো টুপির নীচে রাখা না হয়।

    ওয়ার্ক এ্যাণ্ড পেনসন সেক্রেট্যারী ইয়ান ডানক্যান-স্মিথ বললেন, ‘শিশুভাতাকে যদি ভাতা-টুপির অন্তর্ভুক্ত করা না যায়, তাহলে আইন করার কোনো মানেই হয় না’। তাঁর মন্তব্য থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, ভাতা-টুপির আসল উদ্দেশ্য তবে শিশু ভাতা থেকে প্রাপ্ত আয়কে সীমাবদ্ধ করা। তাঁর এহেন তত্ত্বই ভাতা-টুপিকে মাথার সাথে সম্পর্কিত করের ভাবনার জন্ম দিয়েছে,  যা হয়তো কারও কারও কাছে একটি নিছক ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব বলে মনে হতে পারে।

    শিশু-ভাতাকে ভাতা-টুপির মধ্যে নিয়ে এলে এটি দেখানো সম্ভব যে, একটি পরিবারে শিশুর সংখ্যা যতো বেশি, সে পরিবারের আয়ের পরিমাণও বেশি। এটি হচ্ছে অনেকটা ম্যাক্রো-ইকোনমিক্সে ‘গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট’ বা ‘জিডিপি’র মতো পরিসংখ্যান, যেখানে জনসংখ্যা বা জন-সদস্যদের আর্থিক অবস্থা নির্বিশেষে শুধু একটি দেশের উৎপাদিত মোট বার্ষিক সম্পদকে দেখানো হয়।

    কিন্তু অর্থনীতিতে 'পার ক্যাপিটা ইনকাম' বলেও একটি পরিসংখ্যানিক ধারণা আছে, যা ব্যবহার করে একেকটা দেশের জন-সদস্যগণ কতো ধনী বা গরীব দেখানো হয়। ভাতা-টুপি বা বেনিফিট ক্যাপের হিসেবে সরকার যে-চালাকিটা করছে, তা হচ্ছে ‘পার ক্যাপিটা ইনকাম’-এর ধারণা ব্যবহার না করে ‘জিডিপি’র ধারণা ব্যবহার করে কর্মহীন ও বেনিফিট গ্রহীতা পরিবারকে কর্ম- নিযুক্ত পরিবারের চেয়ে অধিকতর স্বচ্ছল করে দেখাবার সফল প্রয়াস।

    পরিসংখ্যানকে যতো সাধু হিসেবে দেখানো হয়, বাস্তবে এগুলো ততো সাধু নয়। তবুও ধরা যাক, একটি অসুস্থ ও বেকার বাঙালী দম্পতির ৪টি শিশু নিয়ে মোট ৬ জনের সংসার। আর এর বিপরীতে সুস্থ ও কর্মরত একটি ইংরেজ দম্পতির ২টি শিশু সমেত চার জনের পরিবার। আরও ধরা যাক, বর্তমানে শিশু-ভাতা-সহ বিভিন্ন ভাতা মিলে বাঙালী পরিবারটি ‘আয়’ হচ্ছে ৩০  হাজার পাউণ্ড। বিপরীতে, ইংরজ পরিবারটিরও শিশুভাতা ও স্বামীর কাজ থেকে প্রাপ্ত বেতন-সহ আয় হচ্ছে  ২৫ হাজার পাউণ্ড।

    আমরা যদি ‘জিডিপি’র ধারণা প্রয়োগ করে পরিবার দুটোর সম্পদ দেখতে চাই, তাহলে বাঙালী পরিবারটিকে ইংরেজ পরিবারটি থেকে স্বচ্ছল মনে হতে পারে। সোজা তুলনাঃ ইংরেজ পরিবারটির স্বামী কাজ করেন, স্ত্রী সংসার দেখেন, ভাতার মধ্যে শুধু পাচ্ছেন শিশু-ভাতা, আর তাদের আয় হচ্ছে মাত্র ২৫ হাজার পাউণ্ড । অথচ, কোনো কাজ না করে, বেনিফিট নিয়ে বাঙালী পরিবারটি পাচ্ছে ৩০ হাজার পাউণ্ড । আপাতঃ দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত অনায্য।

    আর আমরা যদি ‘পার ক্যাপিটা ইনকাম’-এর ধারণা প্রয়োগ করে বিবেচনা করি, তা হলে পাউণ্ড দেখবো ইংরেজ পরিবারটির মাথা পিছু আয় হচ্ছে ৬,২৫০ পাউণ্ড এবং বাঙালী পরিবারটির মাত্র ৫,০০০ পাউণ্ড। অর্থাৎ, দুটো দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বাঙালী পরিবারটির প্রতিটি সদস্য গড়ে ইংরেজ পরিবারটি প্রতিটি সদস্যের চেয়ে ১,২৫০ পাউণ্ড দরিদ্র।

    এখন সরকারের ‘বেনিফিট ক্যাপ’ বা ভাতা-টুপি প্রস্তাব যদি আইনে পরিণত হয় এবং বাঙালী পরিবারটি যদি সম্পূর্ণভাবে বেনিফিট নির্ভর হয়, তাহলে এর আয় নেমে আসবে মাত্র ২৬ হাজার পাউণ্ডে। তখন পরিবারটিতে ‘পার ক্যাপিটা ইনকাম’ বা মাথা-পিছু আয় হবে মাত্র ৪,৩৩৩ পাউণ্ড। অর্থাৎ, ইংরেজ পরিবাটির সদস্যদের তুলনায় বাঙালী পরিবারটির প্রতিটি সদস্য প্রায় দ্বিগুণ দরিদ্র।

    ব্রিটেইন ইতোমধ্যে ইউরোপের মধ্যে শিশু-দারিদ্রের জন্য কুখ্যাত হয়ে উঠেছে। বাঙালী অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসে শিশু-দারিদ্রের মাত্রা অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি। যেভাবে হাউস অফ কমন্সে পাস হয়েছে, ঠিক সেভাবেই যদি চাইল্ড বেনিফিটকে অর্ন্তভুক্ত করে ‘বেনিফিট ক্যাপ’ বা ভাতা-টুপি প্রয়োগ করা হয়, তাহলে এ-সমস্ত পরিবারের শিশুদের দ্রারিদ্র কোন পর্যায়ে যাবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

    বিশপ সাহেব নিজেই বলেছেন, তিনি সম্পূর্ণভাবে ভাতা-টুপির বিরুদ্ধে নন। কিন্তু তিনি মনে করেন, এই ভাতা-টুপির মধ্যে শিশু-ভাতা অর্ন্তভুক্ত থাকলে, শিশুরা কষ্ট ভোগ করবে। বিশপের ধারণা ঠিক। এমনকি, শিশু-ভাতা প্রস্তাবিত ভাতা-টুপি থেকে বাদ দিলেও শিশু-সহ পরিবারের সবাই কষ্ট ভোগ করবেন এবং এখনও করছেন।

    তারপরও কেনো এই ভাতা-টুপির প্রস্তাব? কেনো-ই বা মন্ত্রী বললেন, ভাতা-টুপি অর্থহীন হয়ে পড়বে যদি না তার মধ্যে শিশু-ভাতা থাকে?

    এখানেই আসে ভাতা-টুপির সাথে মাথার সম্পর্ক। এ-সম্পর্কটি বুঝতে গেলে সংবাদপত্র পিছনের দিকে উল্টাতে হবে। আমরা দেখবো কীভাবে বেরোনেস ফ্ল্যাদার বলেছিলেন, বাংলাদেশী (ও পাকিস্তানী) পরিবারগুলো বেশি বাচ্চা পয়দা করে ভাতা লুটে খাচ্ছে এবং কীভাবে তিনি এগুলো বন্ধ করার জন্য সুপারিশ করেছিলেন।

    মাথার সংখ্যা যে-বাড়ছে, এটি একটি ‘উদ্বেগ’। পৃথিবীতে একজাতির মাথার সংখ্যা বেড়ে গেলে অন্য জাতি চিন্তিত হয়ে পড়ে। এটি নতুন নয়। নাবালক জাতির লোকেরা এটি বুঝেন না। তাঁরা ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণ’ করে গর্বিত হন। আর, যাঁরা সাবালক জাতির লোক, তাঁরা জনগণকে সংখ্যা বাড়াবার জন্য অনুরোধ করেন। জাপান থেকে শুরু করে ইউরোপের অনেক দেশ সে-দলে রয়েছে।

    বাঙালী জাতি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এথনোলিঙ্গুয়িস্টিক গ্রুপ (এ-সত্যটি বার-বার বলা হচ্ছে, গভীর উপলব্ধির স্তরে আবেদন তৈরী করার জন্য)। চৈনিক হান-গোষ্ঠীর পরই বিশ্ব-বাঙালীর স্থান। এর ‘ইমপ্লিকেশন’ বা নিহিতার্থ যে কী তা বাঙালী না বুঝলেও, যাঁরা বুঝার তাঁরা বুঝেছেন।

    মাটি ১৭৫৭ সালে বাংলার মাটি ইংরেজ বণিক কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণে আসার পর মোট ৩ কোটি বাঙালীর মধ্যে ১ কোটি বাঙালী মেরে ফেলা হয়েছিলো কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরী করে।

    আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলা কালে এক হিসেবে ৫০ লক্ষ এবং অন্য হিসেবে ৭৫ লক্ষ বাঙালীকে একই কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরী করে মেরে ফেলা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার এক ইহুদি বংশোদ্ভূত অধ্যাপকের দাবীঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে যে-প্রাণহানি হয়েছে, তার ৯০% হচ্ছে বাঙালী (এটিও গত ১২ বছর ধরে বলা হচ্ছে উপলব্ধির স্তরে নিয়ে যাবার জন্য)।

    ১৯৭০ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালীর সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে গণতন্ত্রিক নিয়মে ক্ষমতা চলে যাচ্ছিলো বাঙালীর নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। তাই পাকিস্তানী শাসকদের ভীষণ রাগ ছিলো বাঙালীর সংখ্যাটার উপর। আর সে-কারণেই ১৯৭১ সালে নির্বিচারে লক্ষ-লক্ষ বাঙালী নিধন করা হয়েছে। সে-সময় সেনাপতিরা বলেছিলেন, তাঁরা মানুষ নয় মাটি চান বাংলার।

    টাওয়ার হ্যামলেটসে বাঙালী সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এখানকার দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। পরিণতিতে, বাঙালীর হাতে এসেছে এমপিত্ব, মেয়রত্ব ও খানিকটা স্থানীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব।  ভবিষ্যতে আর কী-কী যাবে, তা কে বলতে পারে?

    বুদ্ধিমান ও চালাক জাতির মানুষ কয়েকশো বছর দূরের চিন্তা করতে পারে। সুতরাং তত্ত্বায়ণ করা সম্ভব যে, সেই দূরদৃষ্টি থেকেই এসেছে শিশু-ভাতা অর্ন্তভুক্ত করে ভাতা-টুপি আইন তৈরী করার তাগিদ। আর এজন্য মন্ত্রী বলেন, চাইল্ড বেনিফিট বাদ দিয়ে বেনিফিট ক্যাপ অর্থহীন।

    অর্থ সহজ -  অর্থনীতির সহজ সূত্র। ব্যারোনেস ফ্ল্যাদার এবং একই অবস্থান ও চিন্তার মানুষেরা বিশ্বাস করেন, শিশু-ভাতা পাচ্ছেন বলেই শিশুর সংখ্যা বাড়াচ্ছেন বাংলাদেশীরা। সুতরাং, শিশু-ভাতায় টুপি পরাও, শিশুর মাথা আপনিতে কমে আসবে এবং পরণতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও হ্রাস পাবে।

    আর এখানেই হচ্ছে ভাতা-টুপির সাথে মাথার সম্পর্ক, অর্থাৎ ‘বেনিফিট ক্যাপ’-এর সাথে ‘হেড-কাউন্ট’-এর সম্পর্ক। এই সম্পর্ক বুঝার জন্যও মাথার প্রয়োজন, যদিও এ-‘মাথা’ সে-‘মাথা’ নয়।

    রোববার, ২৯ জানুয়ারী ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

I do appreciate Mr Rana's analytical analysis on Benefit Cap.
I recommand everyone to read this article for their own enrichment.

Again mant thnx to Mr Rana for such brillaint article

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন