• ভারতের খবরদারিঃ সামান্য বিতর্ক
    মাসুদ রানা

    ফেব্রুয়ারীতে বাংলাদেশে শাহবাগ-আন্দোলন লক্ষ্য করে আমি পাঁচ সপ্তাহ ব্যাপী একটি পেণ্টালজি লিখি। সেই পেণ্টালজির দ্বিতীয় পর্বে দেখিয়েছিলাম বিশ্বরাজনীতির কোন্ প্রেক্ষাপটে শাহবাগ আন্দোলনটি সংঘটিত হচ্ছে এবং বিশ্বশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তি ভারত রাষ্ট্রের সম্ভাব্য কী-কী অবস্থান ও ভূমিকা থাকতে পারে।

    অদ্য, সে-লেখাটির প্রধান অংশকে সামান্য পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশে কী হতে যাচ্ছে, কেন এই সব হচ্ছে’ শিরোনামে ইণ্টারেন্টে ‘উন্মোচন’ ব্লগে প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক-শিক্ষক-লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য। লেখার একস্থানে বর্ণিত আছেঃ

    “ভারত যেভাবে বাংলাদেশকে চায়, মার্কিন-নেতৃত্বধীন পশ্চিমী পুঁজিবাদী জোটও বাংলাদেশকে সেভাবেই পেতে  চায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভিত্তি-করে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহরের অবস্থান চায়, যা ভারতের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। চীনকে ‘কণ্টেইন’ করার প্রশ্নে মার্কিন-ভারত সমঝোতা থাকলেও মার্কিন-কেন্দ্রিক একমেরুর বদলে বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা গড়তে চীনের সাথে ভারতের একটি সমস্বার্থতা আছে।

    সম্প্রতি, বঙ্গোপসাগরীয় দেশ বার্মাতে বর্ধিষ্ণু মার্কিন প্রতিপত্তিতেও ভারতের অস্বস্তি বাড়ছে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা হচ্ছে,বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাউকে ভাগ দিতে রাজি নয় ভারত। অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দিলেও সামরিক ক্ষেত্রে মোটেও নয়। এমনকি পাকিস্তানের আক্রান্ত হওয়াটাও ভারত মেনে নেবে না। কারণ,ভারতীয় রাষ্ট্র-নিরাপত্তা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যে-ইতিহাসের মধ্যে অখণ্ড ভারতবর্ষের ধারণা গভীরে প্রোথিত।”

    লেখাটি পাঠ করে একটি আকর্ষণীয় মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও ডাক্তার সুমন নাজমুল হোসেন। তিনি শুরু করেছে এভাবেঃ

    “লেখাটি পড়লাম। তত্ত্বগতভাবে সুন্দর রচনা, কিন্তু বাস্তবতার সাথে অনেক ফারাক।”

    ‘তত্ত্বগতভাবে সুন্দর’ বলতে তিনি কী সৌন্দর্য নির্দেশ করেছেন, তা অস্পষ্ট। তবে, কণ্টেণ্ট বা বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে তিনি ‘ফারাক’ নির্দেশ করেছেন অন্ততঃ তিনটি বিষয় উল্লেখ করে। বক্ষ্যমান প্রবন্ধটি রচিত হয়েছে ডাক্তার হোসেনের মন্তব্যে উল্লেখিত তিনটি বিষয়ের বিশ্লেষণকে ঘিরে।

    এক।।
    ডাক্তার হোসেনের মতে, ডাক্তার ভট্টাচার্যের পুনরুৎপাদিত আমার ঐ লেখাটা বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। কেনো? তাঁর মতে, আগামী বছর ভারতে যে-নির্বাচন হবে, সেখানে জাতীয় ভিত্তিক কোনো দলই এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। এ-পরিস্থিতিতে, তাঁর মতে, আঞ্চলিক দলগুলোর সম্মিলনে সরকার গঠিত হবে। তিনি মনে করেনঃ

    “ফলে আগামী দশকে ভারতকে তার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে - প্রতিবেশীদের ওপর খবরদারী অতীতের মতো করা অতো সহজ হবে না।”

    ডাক্তার হোসেনের এ-ভবিষ্যতবাণী আগ্রহোদ্দীপক বটে, কিন্তু এর কিছু দুর্বলতা আছে। নীচে আমি সে-দুর্বলতাগুলো আলোচনা করতে চাই। আশা করি হোসেন মনক্ষুণ্ণ হবেন না।

    ডাক্তার হোসেনের প্রথম ভুল হলো যে, তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্র-সমূহের ওপর ভারত রাষ্ট্রের “খবরদারী” “অতীতের” ফেনোমেনন মনে করেছেন। এটি একটি গ্রস মিস্টেইক বা মারাত্মক ভুল। তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে এ-ভুল বুঝাতে গেলে বিতর্কের অবকাশ থাকবে। তাই তাঁকে বলবো, আজকের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা লক্ষ্য করতে। ‘দ্য হিন্দু’ লক্ষ্য করলে, তিনি দেখবেন কীভাবে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঢাকা-দিল্লি-ঢাকা-ওয়াশিংট শাটল করছেন বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়ে ভারতের সাথে একটি বুঝাপড়ায় পৌঁছুবার জন্য (বিস্তারিত পড়ার জন্য এখানে কিক করুন)।

    অর্থাৎ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ওপর ভারত রাষ্ট্রের খবরদারির বিষয়টি অতীত তো নয়ই, বরং কঠোরভাবে বর্তমান এবং আশঙ্কাজনকভাবে ভবিষ্যেতেরও। বাংলাদেশের নির্বাচন হওয়ার কথা আগামী বছরের জানুয়ারীতে, যা অতীত নয় বরং ভবিষ্যতে ঘটিতব্য, আর মার্কিন-ভারতের এ-দরদস্তুরও সে-ভবিষ্যতকে নিয়েই।

    ডাক্তার হোসেনের মন্তব্যের দ্বিতীয় ভুল হচ্ছে রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর প্রদর্শিত তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা জনিত। তিনি ধরে নিয়েছেন যে, ২০১৪ সালে ভারতে নির্বাচনের পর কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন রাজ্য-ভিত্তিক দল নিয়েই গঠিত হবে এবং এর ফলে সরকারের মধ্যে টেনশন থাকবেই, আর সে-কারণে ‘অতীতের’ মতো ভবিষ্যতে প্রতিবেশীদের ওপর ভারত আর খবরদারিতে পারঙ্গম হবে না।

    এতো বেশি প্রিসাম্পশন বা পূর্ব-ধারণার ওপর ভিত্তি করে এতো নিশ্চিতি-বোধক পূর্বোক্তি মোটেও বিজ্ঞানসম্মত হয়নি। সমাজবিজ্ঞানে পূর্বোক্তি এতো রিজিড ভাষায় করতে নেই। এটি এক অণু অক্সিজেনের সাথে দুই অণু হাইড্রোজেনের মিলনের ফলে নির্দিষ্ট চাপে-তাপে নিশ্চিত পানি উৎপাদিত হওয়ার মতো বিষয় নয়। সমাজবিজ্ঞানে পূর্বোক্তি করতে হয় প্রোবেবিলিটি বা সম্ভাব্যতার ভাষায়।

    ভারতের মতো রাষ্ট্র, যাকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসি বলা হয়, তার স্থিতিশীলতা এতো দূর্বল নয় যে, সেটি সরকার পরিবর্তনের সাথে কিংবা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরকারের মধ্যে টেনশন তৈরী হলে আঞ্চলিক ও বিশ্বপরিসরে তার অবস্থান ও স্বার্থ উপেক্ষা করবে। কারণ, একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র যে-কোনো পরিস্থিতিতে সরকার পরিবর্তন-জাত টেনশনকে উইথস্ট্যাণ্ড বা কণ্টেইন করতে পারার মতো করে তৈরি। রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে সম্পর্কটাই এমন।

    মানবদেহ যেমন অস্থিতন্ত্র, পেশীতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র, ধমনীতন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, ইত্যাদি সিস্টেমের একটি জটিল মেগাসিস্টেম, যা ছোটো-খাটো অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যা মোকাবেলা করার মতো একটি ইনবিল্ট বা অন্তর্গঠিত ইমিউন সিস্টেম দ্বারা সুরক্ষিত, রাষ্ট্রও রূপতঃ সে-রকম।

    রাষ্ট্রদেহ পরিচালনার জন্য শক্তিশালী আইনসভা, আমলাতন্ত্র, বিচারবিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ আছে। আর রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, উদ্দ্যেশ্য ও স্বার্থ যদি হুমকির সম্মুখিন হয়, তাহলে তা রার জন্য রয়েছে বিশাল এক সেনাবাহিনী ও বিপুল অস্ত্রসম্ভার। বলাই বাহুল্য, ভারতের অস্ত্রসম্ভারে যুক্ত হয়েছে পারমাণবিক অগ্নি ১-৫, পৃথ্বি ১-৩, সূর্য, সাগরিকা, ইত্যাদি।

    গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংজ্ঞানুসারেই সরকার ক্ষণস্থায়ী - ভারতের ক্ষেত্রে যার মেয়াদ মাত্র পাঁচ বছর। আর রাষ্ট্র হচ্ছে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রতিষ্ঠান, যা গৃহযুদ্ধ বা বিপ্লব কিংবা বহিরাক্রমণ ছাড়া বিধ্বংসিত হওয়ার কথা নয়। রাজনীতি বিজ্ঞানের এই মৌলিক বিষয়টি চিকিৎসা বিজ্ঞানী হোসেনকে একটু কষ্ট করে হলেও বুঝতে হবে।

    ডাক্তার হোসেনের তৃতীয় ভ্রান্তি হচ্ছে টেম্পোরাল বা সময় সংক্রান্ত। ভারতে ২০১৪ সালের অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের ফলাফল, যা এখনও ভবিষ্যতের ব্যাপার, তার ওপর নির্ভর করে তিনি আমার লেখায় নির্দেশিত বর্তমানের বাস্তবতা ও ঘটমানতাকে অস্বীকার করেছেন। তাঁর এ-অবস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবতা বিবর্জিত এবং অতিমাত্রায় কাল্পনিক। কল্পনার আতিশয্যে ডাক্তার হোসেন লিখেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের ফলে যে-সরকার গঠিত হবে তাতেঃ

    “আগামী দশকে ভারতকে তার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকতে হবে - প্রতিবেশীদের ওপর খবরদারী অতীতের মতো অতো সহজ হবে না।”

    তিনি বুঝতে চাইছেন না যে, যে-নির্বাচনের ফলাফল পাঁচ বছরের জন্য বৈধ, তার মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার এক দশক বা ১০ বছর ধরে ‘ব্যতিব্যস্ত’ থাকা তো দূরের কথা, তার অস্তিত্বই সেখানে অসম্ভব।

    দুই।।
    আমাদের লেখায় ‘বিএনপির পায়ের তলায় মাটি নেই’ লক্ষ্য করে ডাক্তার হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছেন। তাই তিনি তাঁর শিকক্ষ সুলভ গাম্ভীর্য্য পরিত্যাগ করে লঘুমতি বালখিল্যতায় আবেগ প্রকাশ করে লিখেছেনঃ

    “বহূদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাদের আস্থা প্রশ্নসাপে, মস্কো বা বেইজিং বৃষ্টি হলে যারা ছাতা খুলে ধরে তাদের কাছে এমনটা মনে হতে পারে।”

    উপরের মন্তব্যে বিজ্ঞানের এই সহযোগী অধ্যাপকটি আর বিজ্ঞানাশ্রয়ী থাকতে পারেননি। তিনি আমার ‘কেইস স্টাডি’ না করে আমাকে মস্কোপন্থী ও বেইজিংপন্থী বলে ধরে নিয়েছেন এবং আমার হাতে একটি ছাতাও ধরিয়ে দিয়েছেন।

    প্রসঙ্গক্রমে মনে পড়ে গেলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ কালে আমরা যে-রোগেই মেডিক্যাল সেণ্টারে যেতাম, আমাদের ডাক্তার পেরাসিট্যামল ধরিয়ে দিতেন। একদিন জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন,

    “প্যারাসিটামল ছাড়া দেওয়ার মতো আর কিছু নেই আমাদের।”

    ডাক্তার হোসেনও তেমনি আমার ‘রোগটা’ মস্কো-বেইজিংয়ের ছাতাধরা বলেই ধরে প্যারাসিটামল দাওয়াই দিয়েছেন। কিন্তু তিনি আমার লেখা তথা ইণ্টিলেকচ্যুয়াল ডিসচার্জ পরীক্ষা করলে দেখতে পেতেন, আমি তথাকথিত মস্কো-ছত্রধর বা বেইজিং-ছত্রধর ও বহুদলীয় ব্যবস্থায় আস্থহীন তথা বাকশালী লেখক নই। আমি বরং তাঁদের সমালোচনা করি বলে তাঁরাও ডাক্তার হোসেনের মতোই প্রায়শঃ ক্ষিপ্ত হয়ে নিজস্ব বচনে গালি দেন।

    তাঁরা সাধারণতঃ আমার শ্রেণীচরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন ও সন্দেহ প্রকাশ করে অভব্য শব্দে গালি দেন। অবশ্য, এতে আমি বিচলিত হই না। কারণ, গালি হচ্ছে ভীতুদের নিজের মনের ভয় তাড়াবার মন্ত্র।

    তবু তর্কের খাতিরে ধরা যাক, আমি মস্কো কিংবা বেইজিংয়ে বৃষ্টি হলে লণ্ডনে বসে ছাতা খুলে ধরি। তো, এর সাথে বিএনপির তলায় মাটি নেই প্রত্যক্ষ করার সম্পর্ক কী? বিষয়টির কার্য-কারণ কিংবা সহ-সম্পর্ক উল্লেখ করে বললে সকলের উপলব্ধির জন্য ভালো হতো। সম্ভবতঃ ডাক্তার হোসেন কথাটি বলেছেন আমার গায়ে একটি লেবেল সেঁটে বা স্টিগমাটাইজ করার জন্য। 

    বিএনপির ব্যাপারে আমি রূপতঃ ‘পায়ের তলায় মাটি নেই’ কথাটা আমি বলেছি এ-দলটির রানি সমতূল্য শীর্ষনেত্রী খালেদা জিয়ার একটি কর্মকে উল্লেখ করে। আর সে-কর্মটি হচ্ছে আত্মমর্যাদা বিস্মৃত হয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অভিযোগ করে ও  ওয়াশিংটন টাইমস পত্রিকায় কমেণ্ট্যারি লেখা। কিন্তু হায়, অধ্যাপক হোসেন খালেদা জিয়ার ওয়াশিংটনে ‘ছাতা খুলে’ধরার বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়েছেন।

    আমি শুধু বিএনপি প্রসঙ্গেই বলিনি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো দল, যারা মূলতঃ জনগণের উপায়হীনতার কারণে একটির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অন্যটিকে বাধ্য হয়ে নেতিবাচক ভৌট দিয়ে ক্ষমতায় আসতে দেন, তাদের কারও প্রকৃত প্রস্তাবে পায়ের তলায় মাটি নেই। আমার লেখায় আমি স্পষ্ট নিরূপণ করেছিঃ

    “বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের গঠন, সংস্কৃতি ও কর্মসূচির কারণেই জনগণের উপর নির্ভরশীল নয় কিংবা ও আস্থাশীলও নয়। এদের নির্ভরতার জায়গা হচ্ছে (১) নেতাদের সামন্ত-সম্মোহনী শক্তি, (২) কর্মীবাহিনীর পেশীশক্তি,(৩) অর্থায়কদের অর্থায়ন শক্তি,(৪) সামরিক বাহিনীর অনুমোদন,(৫) আমলাতন্ত্রের আনুগত্য, (৬) বিশ্বশক্তির সমর্থন ও (৭) বিকল্পহীন নির্বাচন। বাংলাদেশের প্রায় সব দলই টিকে থাকে উপরের প্রথম ৩টি উপাদানের উপর; ক্ষমতায় যাবার যোগ্যতা অর্জন করে পরবর্তী ৩টির উপর নির্ভর করে; আর ক্ষমতায় আসীন হয় শেষেরটি হাতিয়ে নিয়ে।”

    ডাক্তার হোসেন তাঁর সমর্থিত দলটির পদতলের মৃত্তিকাহীনতা রোগের সিম্পটম বা লক্ষণ না বুঝতে পেরে অনেকটা ওঝা বৈদ্যের ভঙ্গিতে ভূতকে গাল দেওয়ার মতো আমাকে গাল দিয়েছেন। তাতে তিনি হয়তো খানিকটা নিরাপদ বোধ করে থাকতে পারেন। যাক, তাতে আমার কোনো ক্ষতি নেই, কারণ আমি কোনো দলেরই সমর্থক নই এবং এটি লাউড এ্যাণ্ড ক্লীয়ার - অর্থাৎ উচ্চকিত ও স্পষ্ট।

    তিন।।
    ডাক্তার হোসেন আমাকে তথাকথিত বাম-বিকল্পের সমর্থক ধরে নিয়ে মশকরা সহকারে সতর্ক করে লিখেছেনঃ

    “তৃতীয়তঃ বিকল্প শক্তির উত্থানের খোয়াব বহুদিন ধরেই দেখা এবং দেখান হচ্ছে, কিন্তু জনসমর্থণ এবং সাংগঠনিক শক্তির বাস্তবতা থেকে এখনও তা বহুদূর।”

    হোসেন আমার লেখার সাথে পরিচিত নন। দোষ তাঁর নয়। দোষ আমার। কারণ, আমার লেখাদ্য এমনই ঝাল যে, বাংলাদেশের সুরিচিপূর্ণ পত্রিকাগুলোর মুখে সেগুলো রুচে না। তবে, লণ্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকায় এবং ইণ্টারনেট ভিত্তিক ইউকেবেঙ্গলি নিতান্ত উপায়হীন হয়ে আমার যে-লেখাগুলো প্রতি সপ্তাহে প্রকাশ করে, তাতে বিকল্পবাদী বামপন্থীদের কঠোর সমালোচনা থাকে।

    এটিই বাস্তব যে, ২০১২ সালে সিবিপি-বাসদের ‘জনগণের বিকল্প সরকার গঠণের কর্মসূচি’ ঘোষিত হলে, আমি তার সমালোচনায় একটি ট্রিলজি লিখেছি। ডাক্তার হোসেন সে-লেখাগুলো পড়তে চাইলে গূগোলে খাঁটি বাংলায় ‘মাসুদ রানা + বাম বিকল্প’ লিখে সার্চ করলেই পেয়ে যাবেন।

    ডাক্তার হোসেন দৃশ্যতঃ শুধু বিএনপির শুভানুধ্যায়ীই নন, স্পষ্টতঃ তিনি শ্রেণী সচেতনও বটেন। তাই দেখি, তিনি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি সখ্যতার প্রত্যাশী। আর সেই মহৎ আকাঙ্খায় তিনি লিখেছেনঃ

    “বাংলাদেশের এ মুহুর্তের বাস্তবতা হচ্ছে বিদ্যমান দল দুটিকে সুশোভন, নিয়মতান্ত্রিক, সুশীল গণতান্ত্রিক আচরণের কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ রাখা, বিকল্প শক্তির উত্থানে মতা গ্রহনের স্বপ্ন বহুদূর।”

    হায়, সহযোগী, অধ্যাপক! আপনার প্রত্যাশার গুড়ে বালি! দেখলেন তো আপনার সেই পছন্দনীয় দল দু’টির শীর্ষ নেত্রী - শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া - দূরালাপনীতে কেমন সুশোভন ব্যবহার করেছেন পরস্পরের সাথে? এ-বিষয়ে আমার বিশেষ কিছু বলার প্রয়োজন আছে? মনে হয় নেই। কারণ, সামাজিক মাধ্যমগুলোর পাতা জুড়ে রয়েছে দু’নেত্রীর অশোভন ফৌনালাপ এবং তাঁদের ভক্তবৃন্দের তুমুল খিস্তির বিপুল বিস্তার।

    তবে একটি বিষয়ে ডাক্তার হোসেনের প্রশংসা প্রাপ্য। আর, তা হচ্ছে সিপিবি-বাসদের রাজনৈতিক কর্তব্যবোধের উপলব্ধি। তিনি তাঁর মন্তব্যে লিখেছেনঃ

    “তবে দেশ ও জাতির স্বার্থে বিকল্প শক্তিসমূহ যদি এই দল দুটির আচরনে গুনগত পরিবর্তনে কিছু অবদান রাখতে পারে সেটাই হবে বাস্তবভিত্তিক বিরাট এক প্রাপ্তি।”

    স্পষ্টতঃ সিপিবি-বাসদ এ-চেতনাকেই ধারন করে আজ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাত করেছেন। খবরে প্রকাশ, আগামী কাল তাঁরা সাক্ষাত করবেন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সাথে।

    সুতরাং দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক বোধে ও আকাঙ্খায় আমি নই, বরং ডাক্তার হোসেনই তাঁর কথিত মস্কো ও বেইজিংয়ের বৃষ্টিতে ছত্রধরদের নিকটবর্তী। নন কি?

    মঙ্গলবার ২৯ অক্টোবর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন