• ভারত-মার্কিন দ্বন্দ্ব ও বাংলাদেশ
    মাসুদ রানা

    পৃথিবী একটি মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে প্রবেশ করেছে। কারণ, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে চীনের উত্থান ও রাশিয়ার পুনরুত্থান এবং বিশ্বব্যাপী এদের বর্ধিষ্ণু প্রভাব পৃথিবীতে পূর্বস্থিত দু'দশকের একমেরুতাকে চ্যালেইঞ্জ করেছে। বস্তুতঃ গত বছরের ১৪ই সেপ্টেম্বর থেকে এ-একমেরুতা কার্যতঃ ভেঙ্গে পড়েছে। আর, এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে বর্তমান ভূ-রাজনীতির শক্তি-সমীকরণ নতুনভাবে বিন্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

    এ-পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রধান তিন শক্তির - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ান ফেডারেশন ও চীনের - সাথে ভারতও উদিত হয়েছে সম্ভাব্য বিশ্বশক্তি হিসেবে। বিশেষতঃ দক্ষিণ এশিয়া বা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারত গণরাজ্য একটি অদম্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

    সোভিয়েত-মার্কিন ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগে ভারত নিজেকে জোট-নিরপেক্ষ ঘোষণা দিলেও বাস্তবে সোভিয়েত-পক্ষের ছিলো। এ-সত্য বিশ্বের সামনে মূর্ত হয়ে দেখা দিয়েছিলো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে, যা শেষ পর্যন্ত পাক-ভারত যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়।

    সে-সময় মার্কিন সপ্তম নৌবহর পাকিস্তানের সমর্থনে ভারত মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা শুরু করলে, সোভিয়েত নৌশক্তি অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ভারতের পক্ষে মার্কিনীদের পথরোধ করে যুদ্ধের গতি ঘুরিয়ে দেয়। এর পরিণতিতে বাংলাদেশে পাকিস্তানী বাহিনীর পরাজয় ঘটে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

    দু'দশক পর, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, ভারত তার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বিদেশনীতি পরিবর্তন করে, পরবর্তী দু'দশকে মার্কিন-বান্ধব হয়ে ওঠে। এ-সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ভারতের ওপর প্রয়োজনীয় আস্থা স্থাপন করে। এ-ব্যবস্থাধীনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ‘ভারতের চোখ’ দিয়ে দেখে এসেছে গত দু'দশক ধরে।

    কিন্তু বাংলাদেশের নবজ্ঞাত খনিজ সম্পদের উপস্থিতি, বিরাট জনসংখ্যার বিশাল বাজার, সস্তা শ্রমের যোগান, চীনের উত্থান নিরিখে বঙ্গোপসাগরের রণকৌশলিক গুরুত্ব এবং সর্বোপরি রাশিয়া ও চীনের সাথে ভারতের ব্রিকস গঠন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আর ‘ভারতের চোখ’ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখার স্থানে রাখেনি।

    এ-ছাড়া ভারতও তার বিকাশমান অর্থনীতির জ্বালানী চাহিদা পূরণ, নিষ্কণ্টক বাণিজ্যিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট তৎপরতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন রণকৌশলিক অবস্থন গ্রহণ করে। সম্প্রতি ফাঁস হয়ে যাওয়া মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এ্যাজেন্সি বা এনএসএ’র তালিকাতে যে ব্রিকস-দেশের মধ্যে ভারতের স্থান শীর্ষে, তাতে ভারত-মার্কিন সম্পর্কের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায় (পড়ুন দ্য হিন্দু ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩)।

    পশ্চিমা শক্তি-সমূহ প্রধানতঃ মার্কিন নেতৃত্বাধীন হলেও সেখানে ইংরেজিভাষী ফাইভ-আঈজ বা পঞ্চচক্ষুর - ব্রিটেইন, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যাণ্ডের - সাথে জার্মানী, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেইন-সহ অন্যান্য ভাষাজাতির একট সাধারণ দ্বন্দ্ব আছে (ফাইভ আঈজ সম্পর্কে পড়ুন বিবিসি সংবাদ, ২৯ অক্টোবর ২০১৩)। এক দিন হয়তো রাশিয়ার নেতৃত্বে ইংরেজি-ভাষী শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যে নতুন মেরুকরণ হতে পারে। কিন্ত বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ইউরোপীয় ও ন্যাটোভূক্ত দেশগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছে।

    গত তিন বছর ধরে বিশ্বের প্রধান শক্তিসমূহ সামরিক উপকরণের উৎপাদন ও ক্রয়-বিক্রয় এবং বিভিন্ন দেশের সাথে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর ও রণকৌশলিক অবস্থান গ্রহণ করে চলেছে। এরই আলোকে, পৃথিবীর রাজনৈতিক-ভূগোলে বাংলাদেশের অবস্থান রণকৌশলিক গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট শক্তিসমূহের কাছে তীব্রতর মাত্রায় অনুভূত হচ্ছে।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ‘পিভোট’ বা ‘রিব্যালেন্সিং’ নীতি ঘোষণা করে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার রণকৌশলিক অবস্থান পুনরুজ্জীবিত ও বিস্তৃত করায় তৎপর হয়েছে। রাশিয়ান ফেডারেশন এশিয়াতে তার নৌশক্তি বৃদ্ধি করেছে। চীন সাগরে চীনের শক্তিবৃদ্ধি প্রতিবেশী অনেক দেশকে ভীত করে তুলেছে। ভারত তার ‘লূক ঈষ্ট’ রণকৌশলিক নীতির তৃতীয় সংস্করণ করে অদম্য ও সুদূরপ্রসারী হয়ে উঠেছে।

    এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব বস্তুতঃ চীনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রতিফলিত ও প্রকাশিত হচ্ছে। স্পষ্টতঃ চীনের সাথে লড়তে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন চীনের চারপাশের ও নিকটবর্তী সমূদ্রে রণকৌশলিক নৌশক্তির অবস্থান।

    আমরা যদি চীনের মানচিত্র লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবো দেশটির উত্তরে আছে মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়া; পশ্চিমে কাজাকিস্তান, কিরঘিজস্তান, তাজিকিস্তান, কিঞ্চিৎ আফগানিস্তান ও ভারত-পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মির; দক্ষিণে ভারত, নেপাল, ভূটান, বার্মা, লাওস, ভিয়েতাম, দক্ষিণ চীনসাগর ও ফিলিপাইন্স; এবং পূর্বে পীতসাগর, উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান সাগর, জাপান, পূর্বচীন সাগর ও তাইওয়ান।

    চীনের সমুদ্রসীমা বিবেচনা করলে আমরা দেখি, চীনকে স্পর্শ করে থাকা পীতসাগর, জাপান সাগর, পূর্বচীন সাগর ও দক্ষিণচীন সাগর। কিন্তু আমাদের দৃষ্টি চীনকে কেন্দ্র করে আরও প্রসারিত করে আমরা দেখি, উপরের এই চার সাগরের পরই দেশটির সবচেয়ে নিকটবর্তী সাগর হচ্ছে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। সম্ভাব্য চীন আক্রমণের প্রশ্নে রণকৌশলিক গুরুত্বপূর্ণ এ-পাঁচ সমুদ্রে মার্কিন সামরিক অবস্থান কী?

    পীত সাগরে রয়েছে মার্কিন মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া। পঞ্চাশের দশকে কোরিয়া যুদ্ধের পর দেশটিকে বিভক্ত করা হয়েছে উত্তরে ও দক্ষিণে। তখন থেকে দক্ষিণ কোরিয়াতে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে শক্তিশালী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি।

    জাপান সাগরে রয়েছে মার্কিন অধীনস্থ মিত্র জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। কোরিয়াতে মার্কিন সামরিক অবস্থান আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জাপানের অপমানজনক আত্মসমর্পণের পর থেকেই রয়েছে মার্কিন সামরিক নিয়ন্ত্রণ।

    পূর্ব-চীনসাগর ও দক্ষিণ-চীনসাগর মূলতঃ উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত কিন্তু পূর্বদিকে ধনুকের পিঠের মতো বেঁকে যাওয়া অভিন্ন চীনসাগর, যার মাঝখানটা বিঘ্নিত দ্বীপদেশ তাইওয়ানের ভৌগলিক অবস্থানের কারণে।

    চীন সাগরের উত্তরে তথা পূর্ব-চীনসাগরে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। আর, দক্ষিণ-চীনসাগরে রয়েছে মার্কিন পুরনো মিত্র ফিলিপাইনস ও নতুন মিত্র ভিয়েতনাম।

    ফিলিপাইন্সের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৫১ সালের সম্পাদিত পারষ্পরিক সামরিক সহযোগিতার চুক্তি সমাপ্ত হয়ে গেলেও, সম্প্রতি চীনের নৌশক্তির বৃদ্ধিতে ভীত ফিলিপাইন্স মার্কিন সহযোগিতায় তার নৌশক্তি বৃদ্ধির প্রকল্প হাতে নিয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত এ-সংবাদ চীনকে উদ্বিগ্ন করেছে।

    ভিয়েতনাম ১৯৮৯ সালে চীনের সাথে সীমান্ত যুদ্ধ এবং ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পার্মানেণ্ট নর্মাল ট্রেইড রিলেশন্স চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে সবচেয়ে বড়ো মার্কিন-মিত্র হয়ে উঠেছে।

    তাইওয়ানের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও আমেরিকান ইনস্টিটিউট ইন তাইওয়ানের মাধ্যমে বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য সম্পর্ক বজায় রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আইন তাইওয়ান রিলেশন্স এ্যাক্টের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অঙ্গীকার করেছে, ‘তাইওয়ানের জনগণের নিরাপত্তার স্বার্থে আত্মরক্ষামূলক অস্ত্র দিবে’।

    যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে উপরে উল্লেখিত সামুদ্রিক অবস্থান থেকে আক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু সেখানে চীনেরও রয়েছে শক্তিশালী উপস্থিতি। সাম্প্রতিক কালে দক্ষিণ-চীনসাগরে চীনের শক্তি বৃদ্ধির সাথে-সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও তার এতদঞ্চলের মিত্রদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।

    চীনের ওপর উত্তর থেকে আক্রমণের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান হচ্ছে বঙ্গোপসাগর, কারণ বঙ্গোপসাগর থেকে চীনের দূর্বলতম স্থান তিব্বত হচ্ছে সবচেয়ে নিকটে। বঙ্গোপসাগরের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে তিব্বতের রাজধানী লাসার দূরত্ব মাত্র ৫০৭ মাইল। তাই, চীনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধের ক্ষেত্র বাংলাদেশের রণকৌশলিক গুরুত্ব অপরিসীম।

    চীনও তার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার জন্য বঙ্গোপসাগরকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বৃহত্তর ভারত মহাসাগরের বঙ্গোপসাগরে ও আন্দামান সাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতি আছে বলে অপ্রমাণিত কানাঘুষা প্রচলিত আছে। 

    বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সর্ব-দক্ষিণ সীমান্তের নীচে বার্মার রাখাইন প্রদেশের সিতিউইতে এবং আন্দামান সাগরে আন্দামান দ্বীপুঞ্জের নিকটে বার্মার কোকো দ্বীপে চীনের রণকৌশলিক নজরদারী সুবিধাষ্ঠান রয়েছে বলে মনে করা হয়।

    সম্প্রতি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে চীনের তৈরী ২টি মিং-ক্লাস টাইপ ০২৫জি সাবমেরিন বিক্রির সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে (পড়ুন এ-বিষয়ে সংবাদঃ নিউ এইজ, ২০ ডিসেম্বর ২০১৩)। আর, এতে বিচলিত বোধ করেছে ভারত। ভারতের ধারণা, চীনের সাবমেরিন ইতোমধ্যে নিয়মিত বঙ্গোপসাগরে আনাগোনা করছে (পড়ুন ভারতের উদ্বেগের সংবাদঃ ডিপ্লোম্যাট, ২২ ডিসেম্বর ২০১৩)।

    এ-পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান দুই পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী। এক্ষেত্রে রাশিয়ার ঐতিহ্যগত সমর্থন আছে ভারতের প্রতি। চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের ব্যাপারে ভারত সন্দিগ্ধ।

    তাই সে কখনও চীনকে হুমকি মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এবং কখনও যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি মনে করে চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। আর, এ-দোলচালের মধ্যে ভারত যে-রণকৌশলিক অবস্থানটা স্থির রাখতে চায়, তাহলো বঙ্গোপসাগরে নিজেকে ছাড়া অন্য কোনো বৃহৎশক্তিকে প্রবেশ করতে না দেওয়া।

    বাংলাদেশ যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চীন আক্রমণের জন্য। তেমনি চীনের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ আত্মরক্ষার জন্য। আর, ভারতের কাছে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ শুধু একটি নয়, তিনটি কারণে। প্রথমতঃ চীনের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা, দ্বিতীয়তঃ চীনকে পালটা আক্রমণ করা; এবং তৃতীয়তঃ পূর্বাঞ্চালীয় রাজ্যগুলোকে ভারতীয় ফেডারেশনের মধ্যে ধরে রাখা।

    ভারত তাই বঙ্গোপসাগরে ও বাংলাদেশে মার্কিন বা অন্য যেকোনো শক্তির উপস্থিতি সহ্য করবে না। ভারতের পক্ষে ভাবা এটি সম্ভব যে, বঙ্গোপসাগরে মার্কিন উপস্থিতি এবং বাংলাদেশে মার্কিন প্রভাব ভবিষ্যতে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতর ধরে রাখার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

    ভারতের মনে এমন ভীতি থাকাও বিচিত্র নয় যে, একদিন খোদ বাংলাদেশও পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে দখল করে নিতে পারে কিংবা এদের সাথে মিলে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্র বা যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে। ইতিহাস বলে, ব্রিটিশ আগমনের আগে বাংলার স্বাধীন সত্ত্বা এবং এতদঞ্চলে বাংলার আধিপত্য নিয়ে দিল্লির সাথে বাংলার বার-বার সংঘর্ষ বেঁধেছে।

    বাঙালী বৌদ্ধ পাল সাম্রাজ্য আসাম থেকে শুরু করে আফগানিস্তান পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার শতাব্দী সমগ্র ভারত শাসন করার পর উত্তর ভারতীয় শক্তির কাছে বাংলার শক্তি দূর্বল হয়ে পড়লেও বাংলা বারবার দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন অবস্থা নিয়েছে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাও দিল্লীর মনোনয়নের বিরুদ্ধে স্বাধীন অবস্থান নিয়ে নিজেকে অদম্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ইংরেজদের শায়েস্তা করেন, যদিও পরবর্তীতে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে পরাস্ত ও নিহত হন।

    বাঙালী জাতি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নৃভাষিক জাতি এবং নিঃসন্দেহে এটি ভারতীয় উপমহাদেশের সর্ব-বৃহৎ জাতি। ইতিহাসের কোনো এক সুবিধাজনক লগ্নে, বিশেষতঃ বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতিতে, যদি বাঙালী তার স্টেইক ও স্টেইটাস দাবী করে বসে, তাহলে হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ততো বটেই, সমগ্র অঞ্চলেই এ-জাতি তার নায্য ভূমিকা পালনের দিকে ধাবিত হবে। ঐতিহাসিক, ভৌগলিক, জনমিতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক উপাদান সমূহের মিথষ্ক্রিয়ায় এটি ঘটতে পারে ব্যক্তির ইচ্ছানিরপেক্ষভাবেই।

    মোটকথা, বিবিধ বিবেচনায় ভারত বাংলাদেশের ব্যাপারে অন্য কোনো বহিঃশক্তির সাথে আপোষ করতে চাইবে না, বিশেষ করে এই মুহূর্তে, যখন কি-না পৃথিবীতে একটি মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব চলছে। গত ফেব্রুয়ারীতে আমি ‘শাহবাগ আন্দোলনঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ’ প্রবন্ধে লিখেছিলামঃ

    বাংলাদেশের কাছে ভারতের কাম্য হতে পারে ৫টি বিষয়ঃ (১) বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের চীন-সীমান্ত পর্যন্ত সামরিক ও রসদ পরিভ্রমণের উপযোগী অবকাঠামো, (২) ভারতীয় শান্তি ও যুদ্ধকালীন অর্থনীতির পরিপূরক স্থানীয় অর্থনীতি, (৩) ভারতের কাছে স্বচ্ছ ও সহযোগী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (৪) ভারত-বান্ধব সরকার এবং (৫) ভারত-মৈত্রীর সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

    গত বছর বাংলাদেশের প্রধান কয়েকটি দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব আলাদাভাবে ভারত সফরে গিয়ে সে-দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে সাক্ষাত করেছেন। ধারণা করা যায়, তখন তাঁদের প্রত্যেকেই ভারতের পাঁচ-প্রত্যাশা পূরণের প্রার্থীতায় নিজ-নিজ যোগ্যতা ব্যাখ্যা করেছে।

    এটিও ধারণা করা যায়, ভারত-বিরোধী মনোভাব না চাগিয়ে যদি কেউ এই পাঁচ-প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তাতে ভারতের খুশী হওয়ারই কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেঃ বিশ্বযুদ্ধ-পরিস্থিতিতে ভারত কতোটুকু ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক?

    সম্ভবতঃ ভারত মনে করে, তার পাঁচ-প্রত্যাশা সর্বাধিক বিশ্বস্ততার সাথে সঙ্কটকালেও পূরণ করতে পারে একমাত্র আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের উপযোগিতা, উপকারিতা ও বিশ্বস্ততা ভারতের সরকার থেকে শুরু করে ভারতীয় রাজনীতিক, ভারতীয় গণমাধ্যম ও ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত সততার সাথে উল্লেখ করে থাকেন।

    সুতরাং আগামী পাঁচ বছরের জন্য আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা ভারতের রণকৌশলিক অবস্থান সুসংহত করার জন্য আবশ্যক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রশক্তিসমূহ তা মানবে কেনো?

    একটি জাতি কতো বড়ো সেটি বড়ো কথা নয়, জাতিটা কতোটা আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন এবং কতোটা ঐক্যবদ্ধ ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, তার ওপর নির্ভর করে জাতীয়, স্থানীয় ও বৈশ্বিক সঙ্কট-কালে সে টিকে থাকবে না-কি বিধ্বংসিত হবে।

    আমি শঙ্কিত যে, বাংলাদেশ তার চলমান সঙ্কটের কারণে আন্তর্জাতিক পরিসরে মর্যাদার দিক থেকে খুব নীচে নেমে এসেছে এবং আজকের অনুষ্ঠিত নির্বাচন এ-মানকে আনুষ্ঠানিকতা দেবে মাত্র। আজকের অনুষ্ঠিত নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান ও আগামী সরকার গ্রহণযোগ্য - এ যুক্তি ভারত যতোই বিশ্বকে বুঝতে চাক না কেনো, তাতে সে সফল হবে না।

    আমি আশঙ্কা করছি, বিশ্বসংস্থাসমূকে ব্যবহার করে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের ওপর আগামীতে কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ আসবে। প্রশ্ন হচ্ছেঃ বাংলাদেশকে রক্ষা করার কূটনৈতিক ক্ষমতা কি ভারতের আছে? চীন ও রাশিয়া কি ভারতের সমর্থনে দাঁড়াবে?

    রোববার ৫ জানুয়ারী ২০১৪
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

আওয়ামি লীগ কি এই চতুর্মুখী চাপ মোকাবেলা করে ৫ টি বছর টিকে থাকতে পারবে? ইতিহাসতো বলে চরম ভংগুর সময়ে আওয়ামি লীগের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রমুখী শক্তি সব কিছু নস্যাত করে দিয়ে পশ্চিমা আনুগত্য গ্রহণ করে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন