• মতিঝিল ম্যাসাকারঃ আচার্যীর দুষ্ট প্রশ্নের জবাব
    মাসুদ রানা

    বিতর্ক
    বাংলাদেশে ঢাকার মতিঝিলে সংঘটিত ৬ই মে’র হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ব্রিটেইনের বিশ্ব-বিখ্যাত সাপ্তাহিকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ তার ১১ই মে ইস্যুতে লিখেছেঃ ‘What happened in Dhaka and beyond in the early hours of May 6th looks like a massacre.’

    ঢাকাবাসী বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের প্রত্যক্ষণ ও বিবরণ থেকে এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার রাজপথের অভিজ্ঞতা থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ৬ই মে তারিখে আমার একটি লেখাতে ঘটনাটিকে আমিও ‘ম্যাসাকার’ আখ্যায়িত করে লিখেছিলামঃ

    ‘বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মতিঝিলে, ধর্মবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ডাকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা, ধর্মানুগত গ্রামীণ সাধারণের সমাবেশের উপর, ৫ই মে রোববার মধ্যরাত পেরিয়ে, ৬ই মে সোমবার ভোর পৌনে ৩টার দিকে, সমগ্র অঞ্চলের আলো ‘ব্ল্যাক আউট’ করে, রাষ্ট্রের তিনবাহিনী - পুলিস, বিজিবি ও র‍্যাব -তিন দিক থেকে সাঁড়াশি রচনা করে, গুলিবর্ষণের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে, যেভাবে তা ‘পরিষ্কার’ করে দিলো, তা যে-কোনো বিবেচনায় একটি ‘ম্যাসাকার’ বা নির্বিচার হত্যাকাণ্ড।’

    দ্য ইকোনমিস্টের লেখা পড়ে, কিংবা সে-লেখা সম্পর্কে শুনে, কী প্রতিক্রিয়া হবে বাঙালী সুধিজনের, তা আমি জানি না। তবে আমার লেখা পড়ে যে কতিপয় উচ্চ ও মধ্যবিত্ত  পাঠক ভীষণ গোস্বা হয়েছেন, তা বিলক্ষণ জানি। একজন লিখেছেন, তিনি ‘ক্ষুব্ধ’। কিন্তু কেনো, তিনি ক্ষুব্ধ তার ব্যাখ্যা দেননি। আরেকজন লিখেছেন, তিনি ‘বিরক্ত’। কেনো তিনি বিরক্ত, তার কারণ অনুল্লেখিত। তৃতীয় আরেকজন জানালেন, তিনি ‘স্তম্ভিত’ এবং জানতে চাইলে এরকম লেখার ‘উদ্দেশ্য’ কী। তিনিও উল্লেখ করেননি, তিনি কেনো স্তম্ভিত এবং কেনোই বা লেখার বিষয়বস্তু ছেড়ে লেখকের উদ্দেশ্য জানতে চান।

    প্রথম ব্যক্তি - নামে সৈকত আচার্যী ও পেশায় আইনজীবী -  ইন্টারনেটে তাঁর ফেইসবুকে একটি পুরোদস্তুর লেখা লিখে এক জবরদস্ত শিরোনাম দিলেনঃ ‘পুলিশ-বিজিবির মতিঝিল অভিযানঃ মাসুদ রানা’র জালিয়ানওয়ালাবাগ তত্ত্ব এবং চিন্তার দেউলিয়াত্ব’।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ, তিনি তাঁর লেখার কোথাও আমার চিন্তার ‘দেউলিয়াত্ব’র ব্যাখ্যা বা প্রমাণ করা তো দূরের কথা, নির্দেশ পর্যন্ত করলেন না। তিন ভাগে বিভক্ত সৈকত আচার্যীর সে-লেখার প্রথম অংশে তিনি আমার অতীত রাজনীতির, বর্তমান পেশা ও ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।  দ্বিতীয় অংশে তিনি উদ্ধৃতি টেনেছেন আমার লেখা থেকে এবং এর মধ্যে একটি উপসংহার-বাক্য থেকে ৬৪% বাদ দিয়ে, আমার চিন্তার একটা বিকৃত চেহারা দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছেন। পরিশেষে, তৃতীয় অংশে, আমাকে ৬টি দুষ্ট প্রকৃতির প্রশ্ন করেছেন।

    পাঠক লক্ষ্য করে থাকলে (উপরে দেয়া লিঙ্কে ক্লিক করে) দেখবেন যে, সৈকত আচার্যী তাঁর লেখার কোথাও আমার চিন্তার দেউলিয়াত্ব নিরূপণ করে দেখাননি, কোনো বিবরণ দেননি, কিংবা কোনো ব্যাখ্যাও দেননি। অথচ লেখার শিরোনামে আমার নামের সাথে ‘চিন্তার দেউলিয়াত্ব’ কথাটা জুড়ে দিয়েছেন তিনি। যেনো রামের কাহিনী ছাড়া রামায়ন লিখেছেন সৈকত আচার্যী। আমি ভাবিঃ এটি কি কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাজ হতে পারে?

    সৈকত আচার্যী আইনের লোক - সলিসিটার। তিনি নিশ্চয় আইন শাস্ত্রের ‘প্রিসাম্পশন অফ ইনৌসেন্স নীতি’র এই ডিক্টামটি জানেন যে, ‘A person is innocent until proven guilty’ - অর্থাৎ, দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত একজন ব্যক্তি নির্দোষ। এটি শুধু কৌর্টে চর্চিত হওয়ারই বিষয় নয়, পৃথিবীর সভ্য সমাজে জীবনের সর্বক্ষেত্রেই সবাই এই নীতির চর্চা করেন।

    একজন শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত ও সনদপ্রাপ্ত আইনজীবী হিসেবে সৈকত আচার্যী নিশ্চয় উপরের কথাগুলো পড়েই এসেছেন। অথচ এহেন আইনজীবী সৈকত আচার্যী আমার চিন্তার দেউলিয়াত্ব ঘোষণা করে দিলেন তার কোনো হিসেব-নিকেশ ও প্রমাণ প্রদর্শন না করেই।

    শুধু তাই নয়, তিনি দেউলিয়া রায় ঘোষণা করে আমাকে প্রশ্ন করেছেন উত্তর দেবার জন্য। অর্থাৎ, তিনি শিরোনামে আমার ‘চিন্তার দেউলিয়াত্ব’ ঘোষণা করে পুনরায় আমাকে প্রশ্ন করে সুযোগ দিয়েছেন উত্তরের মাধ্যমে আমার ‘চিন্তার দেউলিয়াত্ব’ ঘুচাবার। কী চমৎকার আইনবোধ ও ন্যায়বোধ আইনজ্ঞ সৈকত আচার্যীর!

    আবার সেই আইনশাস্ত্র নির্দেশ করেই বলতে হয়, যেখানে ‘The burden of proof lies with who declares, not who denies’ -অর্থাৎ, প্রমাণের ভার দাবিকারীর অস্বীকারকারীর নয়, সেখানে আইনজ্ঞ সৈকত আচার্যী অভিযোগকারী হয়ে নিজেই নিজেকে বার্ডেন অফ প্রূফ থেকে মুক্তি দিয়ে আমার নির্দোষিতা প্রমাণের বোঝা আমার উপর চাপিয়েছেন।

    যদিও অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে উপস্থাপিত প্রমাণ ছাড়া অভিযোগের উত্তর দিতে অভিযুক্ত আমি বাধ্য নই। তবু বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক গড়ে তোলার স্বার্থে আমি অভিযোগকে প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করে এর উত্তর দিতে প্রবৃত্ত হলাম।  

    প্রশ্ন-১
    হেফাজতের সমাবেশকে  "ধর্মানুগত গ্রামীণ সাধারণের সমাবেশ" বলে একটা নিরীহ চেহারা দাঁড় করালেন। আপনি কি দেখেননি, আপনার কথিত এই গ্রামীন লোকদের সাধারন সমাবেশ থেকে সেদিন কি করা হয়েছিল, সেদিনের পত্রিকা/ব্লগ/টুইটার/ফেসবুক এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো কি আপনি ফলো করেছিলেন? যদি করে থাকেন, তাহলে এটাকে একটা কেবলমাত্র একটা গ্রামীণ সাধারণের সমাবেশ বলে আপনি এদের ভয়ংকর চেহারাটা যেটা নাকি সেদিন গোটা দেশবাশী প্রত্যক্ষ করেছে, তাকে আড়াল করার দায়িত্ব নিলেন কেন?

    উত্তর-১
    আচার্যীর প্রথম প্রশ্নের প্রথম বাক্য কোনো প্রশ্নই নয়। তিনি অভিযোগ করছেন যে, আমি ‘ধর্মানুগত গ্রামীণ সাধারণের সমাবেশ’ বলে নিরীহ চেহারা দাঁড় করিয়েছি। কিন্তু আমি যে এই সমাবেশকে ‘ধর্মবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ডাকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা’ বলে ধর্মবাদীদের হাতে গ্রামীন সাধারণ ব্যবহৃত হয়েছে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছি, আচার্যী তা বাদ দিয়ে দিলেন কেনো? এখানেই প্রশ্নের পেছনে উদ্দেশ্যের অসততা পরিষ্কার।

    আচার্যী তাঁর দ্বিতীয় বাক্যে আমার লেখা ‘গ্রামীণ সাধারণের সমাবেশ’-এর স্থলে ‘আপনার কথিত গ্রামীণ মানুষের সাধারণ সমাবেশ’ বলে আমার কথা বদলে দিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি আমার কথাকে কখনো কেটে, কখনো বদলে, জিজ্ঞেস করলেন যে, সেদিনের সমাবেশ থেকে কী করা হয়েছিলো তা আমি ফলো করেছি কি-না।।

    আচার্যী তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে আমার উত্তর ‘হ্যাঁ’ ধরে নিয়ে, তৃতীয় বাক্যে তিনি আবার অভিযোগ করলেন যে, আমি তাদের ‘ভয়ঙ্কর চেহারাটা’ আড়াল করে একটা ‘নিরীহ চেহারা’ দাঁড় করাবার চেষ্টা করেছি এবং আমাকে প্রশ্ন করলেন যে, আমি এ-দায়িত্ব নিলাম কেনো।

    আমি উত্তরে বলবো, একজন আইনজীবী হিসেবে আচার্যী নিশ্চয় জানেন যে, অভিযোগকারী হিসেবে অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব তাঁর, অভিযুক্ত হিসেবে আমার নয়। আচার্যীর প্রশ্নটি তাঁর অভিযোগের উপর নির্ভরশীল; আর তাঁর অভিযোগ তাঁর হাতে আমার বক্তব্যের বিকৃতির উপর নির্ভরশীল; সুতরাং আচার্যীর অভিযোগ ভিত্তিহীন ও অসৎ।

    প্রশ্ন-২
    আপনার লেখাটিতে হেফাজতের সেদিনের নারকীয় তান্ডব নিয়ে একটা শব্দও উল্লেখ করেননি---এর কারন কি?

    উত্তর-২
    আমার লেখা যেহেতু কোনো রিপৌর্টিং নয় বরং একটি কমেন্টারি, তাই আমি আলোকপাত করবার চেষ্টা করেছি নাগরিকের প্রতি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আচরণের উপর। বস্তুতঃ ঔপনিবেশিক কাল থেকে অদ্যাবধি রাষ্ট্রযন্ত্রের যে চারিত্রিক পরিবর্তন হয়নি, তা বুঝাতেই লেখার শিরোনাম দিয়েছি ‘মতিঝিল ম্যাসাকারঃ ঢাকার জালিয়ানওয়ালা বাগ’।

    জালিয়ানওয়ালা বাগ ম্যাসাকারের দু’দিন আগে, পুলিসের সাথে সংঘর্ষে ১২ ব্যক্তি নিহত হলে, বিক্ষোভ বৃদ্ধি পায় এবং বিক্ষোভীরা সরকারী অফিস ও ব্যাংক আক্রমণ করে আগুন জ্বালিয়ে দেন। বিক্ষোভকারীরা এক পর্যায়ে অন্ততঃ ৪ জন ইউরোপীয়কে পিটিয়ে হত্যা করেন। আচার্যীর মতো সেদিনের সরকার-সমর্থক ইউরোপীয়রা জালিয়ানওয়ালা বাগের আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভকেও ‘নারকীয়’ বলে নিন্দা করে সরকারের ম্যাসাকারে স্বস্তি ও উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন।

    কিন্তু সে-বিক্ষুব্ধ উশৃঙ্খল জনতার নারকীয় কাণ্ডের তুলনায় সুসংগঠিত রাষ্ট্রের সুশৃঙ্খল বাহিনীর পদ্ধতিগত ম্যাসাকার নৈতিকভাবে এতোই সাংঘাতিক যে, জালিয়ানওয়ালা বাগের বিবরণ-কালে আন্দোলনকারীদের দ্বারা সংঘটিত ধ্বংস ও হত্যার বিবরণ উল্লেখ করা অত্যাবশ্যকীয় মনে করা হয় না।

    আচার্যী তাঁর লেখার শুরুতে আমার সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়েছেন, সে-হিসেবে আমার সম্পাদিত ইউকেবেঙ্গলিতে কী রিপৌর্ট লেখা হয়েছে, তা তিনি লক্ষ্য করে থাকবেনঃ

    'দিনব্যাপী পুলিসের সাথে তাদের সংঘর্ষ চলে; মতিঝিল ও সন্নিহিত এলাকায় স্থানে-স্থানে অগ্নিসংযোগ করে তারা। নিকটবর্তী কমিউনিস্ট পার্টির অফিসেও তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিস টীয়ার গ্যাস, সাউণ্ড গ্রেনেইড, জলকামান, রবার বুলেট ও লাঠি ব্যবহার করে। দিনভর সহিংসতায় অন্ততঃ ৫জনের প্রাণহানি ও শতাধিক ব্যক্তির আহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে।'

    সুতরাং, আচার্যী যে আমাকে হেফাজতের পক্ষের লোক বলে চিত্রিত করার চেষ্টা করছেন, তা মোটেও ঠিক নয়। কারণ, আমার লেখাতেই আমি লিখেছিঃ

    ‘আমি আমার মনুষ্য আত্মপরিচয়ের জায়গা থেকে লিখছি, আমি আমার বোধ-প্রেষণা-আবেগ-আচরণ দিয়ে সর্বতোভাবে ধর্মবাদী হেফাজতে ইসলামের দর্শন, কর্মসূচি ও আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করার পরও, শুধু বিশ্বাস ভিন্ন হবার কারণে, তাঁদের উপর রাষ্ট্রীয় ম্যাসাকারে আমি নীরব থাকতে পারি না।’

    প্রশ্ন-৩
    আপনি পুলিশ-বিজিবি'র অভিযানকে "নির্বিচার হত্যাকাণ্ড" বলেছেন। দেশের ইলেকট্রনিক মিডিয়া/পত্রিকার সাংবাদিক থেকে শুরু করে সবার সামনেই এই অভিযান চলেছে, মিডিয়াতে লাইভ কাভারেজও হয়েছে। এতকিছুর পরেও "নির্বিচার হত্যাকান্ড" হতে পারলো? নির্বিচার হত্যাকান্ডের সংজ্ঞা দিবেন কি দয়া করে?

    উত্তর-৩
    হ্যাঁ, আমি পুলিস-বিজিবি-র‍্যাবের অভিযানকে ম্যাসাকার বা নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বলেছি, এখনও বলছি এবং ভবিষ্যতে আমার কথাই টিকে থাকবে। গতকাল ব্রিটেইন থেকে প্রকাশিত দ্য ইকোনমিস্টও একে ‘ম্যাসাকার’ বলেছে।

    আচার্যী ‘দেশের ইলেকট্রোনিক মিডিয়া ও পত্রিকার সাংবাদিক থেকে শুরু করে সবার সামনেই এই অভিযান চলেছে’ বলে যে দাবি করেছেন, তা সর্বৈব মিথ্যা। এটি সরকারী মিথ্যা ভাষ্য।

    প্রথমতঃ সবার সামনে এ-অপারেশন হয়নি। কোনো-কোনো সাংবাদ-মাধ্যমকে যেতে দেয়া তো হয়ইনি, এমনকি তাদের প্রচার পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। আমরা ঐসব মিডিয়া পছন্দ করি কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন, কিন্তু সত্য ঘটনা হচ্ছেঃ সবার সামনে অপারেশন হয়নি।

    দ্বিতীয়তঃ যে-সমস্ত মিডিয়াকে এম্বেড করে নেয়া হয়েছে, তাদেরকে অপারেশনের শুরু থেকে নেয় হয়নি। অপারেশনের শুরু এবং সংবাদ-মাধ্যমকে এম্বেড করার মধ্যবর্তী সময়ে কী ঘটেছে তা আমরা জানি না।

    তৃতীয়তঃ রাতের অন্ধকারে আলো ব্ল্যাক আউট করে অপারেশন করলে কীভাবে সবাই দেখতে পায়? আচার্যী আইনজীবী হিসেবে যদি কোনো খুনের ঘটনার সাক্ষী নিয়ে এসে বলেন যে, রাতের বেলায় আলোহীন অবস্থায় এ-সাক্ষী খুন হতে দেখেছে, তাহলে কি তাঁর এ-যুক্তি গ্রহণীয় হবে?  আচার্যী, মানুষকে সম্ভবতঃ বোকা মক্কেল ছাড়া কিছুই ভাবেন না। তিনি সরকারের পক্ষ নিচ্ছেন, নিন। কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলা তো ঠিক নয়।

    আচার্যী নির্বিচার হত্যার সংজ্ঞা চেয়েছেন। আমার লেখায় আমি ‘নির্বিচার হত্যাকাণ্ড’ বলতে ‘ম্যাসাকার’ বুঝিয়েছি এবং নির্বিচার হত্যাকাণ্ড কথাটার আগে ‘ম্যাসাকার’ শব্দটি ব্যবহার করেছি। এই ‘ম্যাসাকার’ বা ‘নির্বিচার হত্যা’র অর্থ হচ্ছে বাছ-বিচার না করে মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা।

    প্রশ্ন-৪
    আপনার লেখার ২য় প্যারাগ্রাফটি বেশ ইংঙ্গিতপূর্ন  (উস্কানীমূলকও মনে হয়েছে)। এটাতে যেভাবে তুলনা দিয়েছেন তাতে "কত অগণিত মানুষ মারা গেছে তার কোন ইয়ত্তা নাই" এ জাতীয় একটা ধারনা  দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকান্ডের সাথে ৫ মে'র ঘটনার সাদৃশ্য কোথায় একটু ব্যাখ্যা করবেন দয়া করে?

    উত্তর-৪
    আমার লেখার দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফে আমি লিখেছি, ‘আর, গতরাত ঢাকার মতিঝিলে, কয়েক লক্ষ মানুষের সমাবেশের উপর তিন বাহিনীর সমন্বিত ১০,০০০ সদস্যের কতোজন কতো মিনিট গুলিবর্ষণ করে কতো মানুষ হত্যা করে থাকতে পারেন, সে-হিসেবের গাণিতিক নকশা আমার জানা নেই।’

    নীতিগত কারণে আমি আমার লেখার মধ্যে কখনও আনইনফর্মড ক্লেইম করি না। অনেক খেটেখুটে লিখি। মৃত মানুষের সাথে আমার মোলাকাতের রেফারেন্স দিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে লিখি না। আমি অবজেক্টিভ ধরনের লেখা লেখি। আমি আমার লেখায় মৃতের সংখ্যার ব্যাপারে কোনো সংখ্যাই দিইনি। কেনো? কারণ, আমি তা জানি না এবং কাউকে এখানে রেফারও করতে চাইনি। বলেছি, মৃতের সংখ্যা কতো হতে পারে তা হিসেব করার দক্ষতাও আমার নেই।

    আচার্যী আমার সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্যকে ইঙ্গিতপূর্ণ ও উস্কানীমূলক মনে করলেন! আমি জানি না, আচার্যী অর্থ বুঝে শব্দ ব্যবহার করেছেন কি-না। ‘উস্কানী’ শব্দের অর্থ কী? কাউকে কোনো অনুচিত কাজ করতে প্ররোচিত করা তো? আচার্যীকে প্রমাণ দেখাতে হবে আমার লেখায় কাকে, কী করতে প্ররোচিত করা হয়েছে? এটি প্রমাণ করা অভিযোগকারী আচার্যীর দায়িত্ব।

    আমার লেখায় কোনো ইঙ্গিতে নয়, বরং সরাসরি বলেছি কী করতে হবে এবং কাকে তা করতে হবে, আমার লেখার শেষ বাক্যে তা পরিষ্কারঃ

    ‘আমি আহবান করছি সমস্ত মুক্তমনা, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকেঃ হেফাজতে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করুন, কিন্তু তারপরও এদের উপর  রাষ্ট্রের এই বর্বর হামলার প্রতিবাদ করুন।’

    তারপরও আচার্যী কী বলতে চান? তাঁকে চ্যালেইঞ্জ করছি, তিনি দেখান কাকে কী উস্কানী দিয়েছি। আমি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, যত্নের সাথে আমার লেখা লিখি। তিনি লক্ষ্য করলে দেখতেন, আমি এমনকি ‘দেশবাসী’র প্রতিও আহবান জানাইনি। কারণ আমি জানি, দেশবাসী এতে রিএ্যাক্ট করতে পারে ধর্মীয় অনুভূতি থেকে। তাই আমি এগিয়ে আসতে বলেছি সেক্যুলার ও প্রোগ্রেসিভ ফৌর্সেসকে। আমি এ-ব্যাপারে অত্যন্ত ক্যাটেগোরিক্যাল।

    আমার লেখার ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আচার্যী প্রকৃত প্রস্তাবে আমার বিরুদ্ধে মানুষকে উস্কে দিয়েছেন এবং এতে তিনি খানিকটা সফলও হয়েছেন। আচার্যীর চট্টগ্রামের প্রাক্তন কমরেডদের কয়েকজন ইতোমধ্যে আমার বিরুদ্ধে তাঁদের নেতিবাচক মন্তব্য প্রকাশ করেছেন তাঁরই ফেইস বুকের থ্রেডে। জনৈক সুরজিত বড়ুয়া লিখেছেনঃ

    ‘তোমার পোস্টটা দেখে ভেবেছিলাম ওর লেখা পুরোটাই পড়বো। কিন্তু ওর লেখার যে উদ্ধৃতিগুলি তুমি দিলে তাতে চমকে উঠলাম, ভাবলাম মাসুদ রানার সাথে লুঙ্গি মাজহারের দেখা হলো কবে? যদি সম্ভব হয় একটু জেনে নিও প্লিজ।’

    সুতরাং, কে কার বিরুদ্ধে কাকে উস্কে দিচ্ছে? বিচারের ভার আমি পাঠকের হাতেই ছাড়ছি।

    প্রশ্ন-৫
    ‘‘নির্বিচার হত্যাকান্ড’’ তত্ত্বটি কি আপনার মণগড়া নাকি এর সমর্থনে কোন রেফারেন্স আপনি দিতে পারেন? বাংলাদেশের কয়টি পত্রিকা/চ্যানেলে এই ‘‘নির্বিচার’’ হত্যাকান্ডের পক্ষে বক্তব্য ছাপাতেলতে দেখেছেন, বলবেন কি?

    উত্তর-৫
    এ-প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়াসে প্রথমেই প্রশ্ন জাগে, আচার্যী ‘তত্ত্ব’ শব্দের অর্থ বুঝে ব্যবহার করেছেন কি-না। ৬ই মে’র মতিঝিলে তিন বাহিনীর অভিযান এবং মানুষ হত্যাকে কেনো ম্যাসাকার বা নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বলেছি, তার ব্যাখ্যা ৩নং প্রশ্নের উত্তরে একবার দিয়েছি। তবে, আচার্যীর কথিত এ-‘তত্ত্ব’ আমার মনগড়া কি-না, এর উত্তরে বলবোঃ তত্ত্ব মানেই মনগড়া। একটি বিষয় বা ঘটনা ব্যাখ্যা করার জন্য এক বা একাধিক ব্যক্তির ধারণা। ধারণা তো আর গাছেও ধরে না, কিংবা ফ্যাক্টরীতেও তৈরী হয় না। ধারণা গড়ে ওঠে মানুষের মনে। তাই, তত্ত্ব মানেই মনগড়া। তত্ত্বের কার্যকারিতা ও উপযোগিতা হচ্ছে তার ব্যাখ্যা করার কিংবা প্রেডিক্ট করার ক্ষমতা।

    ‘মণগড়া নাকি এর সমর্থনে কোনো রেফারেন্স আপনি দিতে পারেন?’ প্রশ্ন থেকে দেখা যাচ্ছে তিনি ‘মনগড়া’ ও ‘সমর্থনে কোনো রেফারেন্স’ দিতে পারা বিষয় দু’টিকে মিচ্যুয়ালি এক্সক্লুসিভ হিসেবে ধরে নিয়েছেন। অর্থাৎ, তিনি ভেবে নিয়েছেন যে, তত্ত্ব যদি মনগড়া হয়, তা হলে এর সমর্থনে কোনো রেফারেন্স পাওয়া সম্ভব নয়। অথবা তত্ত্বের সমর্থনে কোনো রেফারেন্স পাওয়া গেলে, তত্ত্ব তখন আর মনগড়া থাকে না। স্পষ্টতঃ আচার্যী এমন বিষয়ের অবতারণা করেছেন, যা সম্পর্কে তাঁর ধারণা দৃশ্যতঃ পরিষ্কার নয়। তাই তাঁকে আর অপ্রস্তুত করতে চাই না।

    শুধু আচার্যীর লেম্যান ধারণার সাথে মিলিয়ে বলি, ৬ই মের হত্যাকাণ্ডকে ‘ম্যাসাকার’ বা ‘নির্বিচার হত্যাকাণ্ড’ বলতে গিয়ে কোনো দেশের কোনো পত্রিকারই রেফারেন্স দিতে বা নিতে হয়নি আমার। কারণ আমি জানি ম্যাসাকার ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড কাকে বলে। তবে আমার এ-দাবির সমর্থনে তখন প্যারালেল টেনেছিলাম ঐতিহাসিক জালিয়ানওয়ালা বাগ ম্যাসাকারের। আর লেখার শুরুতে আজ দেখিয়েছি, আমার লেখার ৬ দিন পরে দ্য ইকোনমিস্টও ঘটনাটিকে ম্যাসাকার হিসেবে উল্লেখ করেছে।

    প্রশ্ন-৬
    ‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খোলামেলা তর্ক করতে বলেছেন। পুলিশি অভিযান নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়াটুকু বিশেষ করে ‘‘নির্বিচারগণহত্যা তত্ত্ব’’ এবং ‘‘জালিয়ানওয়ালাবাগ তত্ত্ব’’ এই দু'টি বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত আপনি টেনেছেন সেটি কি ‘‘বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি’’ অনুসরন করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। থাকলে কিভাবে? পদ্ধতিটি কি ছিল?’

    উত্তর-৬
    সামাজিক ঘটনার গবেষণায় যে-সকল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, তার মধ্যে অবজার্ভেশন, পার্টিসিপেশন, সার্ভে, কোয়াসি-এক্সপেরিমেন্ট, ইন্টারভিউ, কেইস স্টাডি, ডিসকৌর্স এনালাইসিস, প্রাইমারী এ্যাণ্ড সেকেণ্ডারী এ্যানালসিস অফ হিস্টোরিক্যাল এ্যাকাউন্টস, ইত্যাদি প্রধান।

    আমার লেখার জন্য আমি ৫ তারিখ সারা রাত কাজ করেছি। আমাকে সাহায্য করেছেন দু'জন বন্ধু। একজন আমাকে খুব দ্রুততার সাথে তথ্য ও ভিডিও ফুটেইজ দিয়ে সাহায্য করেছেন এবং অন্যজন আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের হেফাজতে ইসলামীর লোকদের ইন্টারভিউ করে আমাকে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য জানিয়েছেন।

    আমি নিজে নতুন করে বেশ কয়েকটি সেকেণ্ডারী ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ করে দেখেছি, জালিয়ানওয়ালা বাগ ম্যাসাকারের সাথে মতিঝিল ম্যাসাকারের বেশ কিছু মিল আছে, যাদের মধ্যে কমপক্ষে ৫টি হচ্ছেঃ

    (১) রাজনীতিক নেতার মুক্তির দাবিতে হরতাল দিয়ে শুরু
    (২) পুলিসের সাথে সংঘর্ষ, হত্যা ও পাল্টা হত্যার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির অবনতি
    (৩) সরকারী বিধি নিষেধ অমান্য করে ধর্মানুগত গ্রামীণ সাধারণের সমাবেশ
    (৪) সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
    (৫) নির্বিচার হত্যা

    উপরের পাঁচটি মিলের দিক সবিস্তারে আলোচনা করার উপযুক্ত স্থান এটি নয়। কিন্তু যে-কোনো ব্যক্তি উপরের পয়েন্টগুলো ধরে নিরাসক্ত বৈজ্ঞানিক মন নিয়ে অনুধ্যান করলে, মোটামুটি একই সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন বলে আমি মনে করি।

    বিতর্কের উপসংহার
    আমার বিশ্বাস, উপরের ভূমিকা আলোচনায় আমি সৈকতের অভিযোগের ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করতে পেরেছি এবং তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছি। আমার চিন্তার দেউলিয়াত্ব দাবি করে শিরোনাম লিখলেও, যেহেতু তিনি সে-সম্পর্কে কিছু প্রদর্শন করতে পারেননি, তাই আমি আর দায় বোধ করছি না, বরং দুর্বলের গালি হিসেবে অগ্রাহ্য করছি।

    কিন্তু আমি গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য করছি যে, পেশাগত বিদ্যা, বুদ্ধি ও নৈতিকতা ভুলে গিয়ে কিংবা এর প্রয়োগ করার ক্ষমতা হারিয়ে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের কুরুক্ষেত্রে সৈকত আচার্যী যেনো উদিত হয়েছেন মহাভারতের সেই ঘটোৎকচের মতো, যিনি সহস্র বর্ষের সাধনায় কাঙ্খিত বিদ্যা অর্জন করলেও শেষ পর্যন্ত বিদ্যা কাজে লাগাতে না পেরে শুধু তার ভারবাহী হয়ে থেকেছিলেন।

    রোববার, ১২ মে ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

    [বিভাগীয় সম্পাদকের নৌটসঃ ইউকেবেঙ্গলিতে ৬ই মে ২০১৩ তারিখে প্রকাশিত মাসুদ রানার 'মতিঝিল ম্যাসাকারঃ ঢাকার জালিয়ানওয়ালা বাগ' শীর্ষক মন্তব্য প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া লেখেন জনৈক সৈকত আচার্যী। এতে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু বিতর্কটিকে ইউকেবেঙ্গলিতে না রেখে অপ্রত্যাশিতভাবে ফেইসবুকে নিয়ে যান তিনি। ইউকেবেঙ্গলিতে এটিকে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করা হলেও তাতে সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই, মাসুদ রানার জবাবমূলক লেখাটিও ফেইসবুকেই প্রকাশিত হয়েছিলো। ঘটনা এবং এর প্রত্যক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে সে-লেখাটি সামান্য পরিমার্জিত আকারে ইউকেবেঙ্গলিতে আজ পত্রস্থ করা হলো। মাসুদ রানার ফেইসবুকে লিখিত জবাবের একাংশে সৈকত আচার্যীকে মধ্যম পুরুষে সম্বোধন করা হয়েছিলো, যাতে দু'জনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঘনিষ্টতা প্রতিফলিত হয়েছে। বিতর্কের নৈর্ব্যক্তিকতা রক্ষার্থে এখানে তার বদলে তৃতীয় ও নাম পুরুষ ব্যবহৃত হলো, তবে মূল বক্তব্য সম্পূর্ণ অবিকৃত রয়েছে। - ২৭ মে ২০১৩।]


আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন