• মনমোহনের মন-মোহনে ব্যর্থতা ও দুটো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশের মানুষের মন মোহিত করতে ব্যর্থ হলেন মনমোহন সিং। শক্তিশালী প্রতিবেশী  ভারতের প্রধানমন্ত্রী ডঃ সিং গত সপ্তায় বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলেন বিরাট প্রত্যাশা তৈরী করে। প্রত্যাশার বাস্তব ভিত্তি যা-ই থেকে থাকুক, প্রচারটা ছিলো বিশাল। তারপর, আবার ১২ বছরের মধ্যে এই প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে আসা!

    উৎসাহের আতিশয্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা - ভারতের আনন্দ বাজার পত্রিকার ভাষ্য অনুসারে - কূটনৈতিক ‘প্রটোকল ভেঙ্গে’ মনমোহন সিংকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়েছিলেন।

    বিশাল বহর নিয়ে এসেছিলেন সিং। সাথে ছিলেন বাংলাদেশকে তারকাঁটা দিয়ে ঘিরে-রাখা রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীগণ, শুধু একজন ছাড়া। তিনি পশ্চিম বাংলার মমতা ব্যানার্জী। ‘হঠাৎ’ করে সিংয়ের সহচরী হতে অস্বীকৃতি জানালেন তিনি। কিন্তু কেনো?

    ভূটানের ফোন্টশলিং থেকে উৎপন্ন হওয়া এবং ভারতের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ-করা আন্তর্জাতিক নদী তিস্তার পানির হিস্যা নিয়ে নারাজ মমতা ব্যানার্জী। শীর্ষ পর্যায়ে সম্মত তিস্তা-চুক্তি তাঁর রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থের পরিপন্থী বলে তিনি মনে করেন। তাই এলেন না। বাকীদের কোনো অসম্মতি নেই। কারণ, তাঁরা এসেছিলেন বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে পরিবহনের জন্য ট্র্যানজিটের সুবিধা নিতে।

    মমতা এলেন না, তাই তিস্তা-চুক্তিও সম্ভব নয়। কারণ, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুসারে সেই রাজ্য-সরকারের সম্মতি ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার বিদেশের সাথে এমন কোনো চুক্তি করতে পারে না, যা ঐ রাজ্যের স্বার্থকে ব্যাহত করে।

    খুব ভালো বিবেচনাপূর্ণ বিধান। জয়তু সংবিধান! কিন্তু কথা হচ্ছে, এ-বিধান কি ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা এবং সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী জানতেন না?

    নিশ্চয় জানতেন। বলিউডের অভিনেতা ওমপুরী ক’দিন আগে ভারতীয় এমপিদের ‘আনপড়’ বলে বিপাকে পড়েছিলেন। কোনো কোনো এমপি’র ক্ষেত্রে এ-কথা সত্য হলেও পিএম ডঃ মনমোহন সিংয়ের ক্ষেত্রে তো তা নয়। তবে কেনো এই অপ্রস্তুতি?

    ভারতের মতো কূটনৈতিকভাবে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশের একটি শীর্ষ কূটনৈতিক সফর এতো ‘ইল-প্রিপেয়ার্ড’ হওয়া কি সম্ভব? না, প্রায় অসম্ভব। আর এখানে আসে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব - অন্ততঃ দুটো - একটি ‘বাকী তত্ত্ব’ অন্যটি ‘ফাঁকি তত্ত্ব’।

    বাকী তত্ত্বটি খুব সরল, যেখানে আদান-প্রদান একই সাথে না হয়ে, ‘নেয়া’র সাথে ‘দেয়া’র সময়ের গ্যাপ তৈরী করে পারলে না-দিয়েই সারা অথবা দেবার আগে আরও কিছু আদায় করে নেয়ার কৌশল।

    ফাঁকি তত্ত্বটি তাৎক্ষণিকভাবে বোধগম্য নাও হতে পারে। এখানে আদান-প্রদানে ‘দেয়া’র কাজটি কঠিন করে দেখিয়ে ‘নেয়া’র ব্যাপারটিকে সহজ করে ফেলা হয়।

    প্রথমেই ‘মন পরিবর্তন’ তত্ত্ব নাকচ করছি। মমতা ব্যানার্জীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে মনমোহন সিং দেশে ছেড়ে কূটনৈতিক সফরে চুক্তি করতে বেরিয়েছেন, তা প্রায় অসম্ভব। এটি বন্ধু সমভিব্যাহারে থিয়েটার দেখতে যাওয়া নয়, যে হঠাৎ করে এক আবেগী বন্ধু ‘যা তোরা, আমি যাবো না’ বলে দিয়েছেন।

    এটি দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি। এর পিছনে কাজ করেছেন বহু মাথা, বহু মেধা। রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপে ব্যক্তির ভূমিকা থাকলেও ব্যক্তির হেঁয়ালির কোনো স্থান সেখানে খুব কমই থাকে। আধুনিক ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে সে-হেঁয়ালিপনা নেই বললেই চলে। ভারতের পদক্ষেপ অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। তাই, তিস্তা চুক্তি না করার বিষয়টি ‘কেনো যে, মমতা জী মন পরিবর্তন করলেন!’ বলার ঘটনা নয়।

    প্রথম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব মতে, ভারতীয় পক্ষ ভেবেছিলো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলে সব কিছুই তাদের জন্য সহজ। কারণ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে এর নেতৃত্ব থাকা দল আওয়ামী লীগের সাথে সাহায্যাকারী প্রধান দেশ ভারতের একটি যৌক্তিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে।

    এ-ছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন দ্বি-দলীয় পাল্টা-পাল্টি ‘ল্যাং মারা’র রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ভারতের সমর্থন নিশ্চিত করতে একটু বেশিই উদগ্রীব থাকবে।

    সর্বোপরি, এতদ্বঞ্চলের প্রধান শক্তি ভারত রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অতিথি হয়ে যাবার পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যা দেবার, তার বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকে যা পাবার, তা পুরোপুরি না পেলেও বাংলাদেশ ‘না’ বলার মতো ‘সাহস’ বা ‘অসৌজন্যতা’ দেখাবে না। ফলে, ভারতের যা পাবার পেয়ে আপারহ্যান্ডে থাকবে, আর বাংলাদেশ ভারতের পিছনে ‘জো ওয়াদা কীয়া হো নিভানা পরেগা’ গেয়ে পিছু-পিছু ঘুরবে।

    কিন্তু আওয়ামী লীগের নিজস্ব স্বার্থ-বোধের কারণেই হোক, অথবা রাষ্ট্রীয় আমলাদের প্রভাবের কারণেই হোক, কিংবা সম্ভাব্য তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার আশঙ্কায়ই হোক, ভারতকে ট্র্যানজিট বিষয়ে নিশ্চিত করার পরও আনুষ্ঠানিক চুক্তিটি সাক্ষর করেনি।

    এ-পরিস্থিতিতে ভারত বস্তুতঃ অবাক হয়েছে বাংলাদেশের ‘বেঁকে-বসা’ আচরণের কারণে, কিন্তু ভাব দেখাচ্ছে মমতা ব্যানার্জির মন পরিবর্তনের কারণে।

    ‘বাকী তত্ত্ব’ সম্পূর্ণটাই ভুল হতে পারে। আবার এটি ‘ফাঁকি তত্ত্ব’র প্রথম অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। ‘ফাঁকি তত্ত্ব’র মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিস্তার পানি হিস্যা ও ট্র্যানজিটকে এক পাল্লায় সমান করে ফাঁকি তৈরী করা।

    আন্তর্জাতিক ও ঐতিহাসিক আইন ও বিবেচনা অনুসারে ভারত যেভাবে ভাটির দেশ বাংলাদেশকে তিস্তার পানির হিস্যা দিতে বাধ্য, বাংলাদেশ কিন্তু ভারতকে সেভাবে সড়কপথে ট্র্যানজিট বা সামুদ্রিক বন্দর ব্যবহার করতে দিতে বাধ্য নয়। কিন্তু ভারতে এ-দুটোকে একই পাল্লায় একই দরে বিনিময়যোগ্য হিসেবে দেখাতে যাচ্ছে।

    এ-তত্ত্ব অনুসারে, প্রথমে আশা এবং পরে নিরাশা তৈরী করে তিস্তার পানির হিস্যাকে এমন একটি মহার্ঘ্যে পরিণত করা যে, শেষ পর্যন্ত এটি পাওয়ার বিনিময়ে ট্র্যানজিটের মূল্য কতো তা না বিবেচনা করেই শিশুর মতো অল্প মূল্যের পানীয় পেয়ে বহু মূল্যের স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে দিবে বাংলাদেশ।

    বাংলাদেশের মানুষের প্রধান মনোযোগ থাকবে ‘তিস্তার পানি পাবো কি না’র মধ্যে, আর সে- ফাঁকে ট্র্যানজিটের পরিণতি কী হতে পারে, তা হয়ে যাবে গৌণ।

    এ-তত্ত্ব ঠিক হলে ভারতীয় শাসক শ্রেণীর সাথে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর একই ষড়যন্ত্রের শরিক হওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

    রোববার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১১
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যান্ড

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

muktomona.com e e niye valo ekta lekha likhechhen Biplab Pal: http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=18619

মমতা তাঁর রাজ্যের কথা ভাববে এটাই স্বাভাবিক। তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে মমতা বাধা দিয়েছে বলে অনেক বাংলাদেশী তার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে নেমে পড়েছে। তিস্তার পানি বন্টন মমতার একার বিষয় নয়। ভারত কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সাথে এ নিয়ে চরম প্রতারনা করার প্লেন করেছিলো। এটা ষড়যন্ত্র তত্ব নয় বাস্তব। দেখুন আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদঃ

""অবস্থা বুঝে এর পর দিনই শিবশঙ্কর মেননকে মমতার সঙ্গে কথা বলতে পাঠান প্রধানমন্ত্রী ও প্রণববাবু। মেনন মমতাকে বলেন, আগে চুক্তিটা হয়ে যাক। তার পর আপনি প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে আপনার আপত্তির কথা জানাবেন। বলবেন এতটা জল দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রীও আপনাকে চিঠি দেবেন। গোটা বিষয়টা তখন ঠিক হবে। কারণ, এটা একটা অন্তর্বর্তী চুক্তি। মমতা তাতে রাজি হননি। তিনি বলেন, সে ক্ষেত্রে তো আপনারা চুক্তিটাই সৎ ভাবে করছেন না। তখন জলবণ্টন নিয়ে মেনন ও মমতার মধ্যে একটা রফা হয়েছিল বলে রাজ্য সরকারি সূত্রের দাবি। যে রফা শেষপর্যন্ত মানা হয়নি বলেই তাদের অভিযোগ।""
সুত্রঃ http: http://www.anandabazar.in/archive/1110905/5raj1.html

রাগ যদি করতে হয় মমতার উপর নয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের উপর করা উচিত। কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সাথে প্রতারনা করতে চেয়েছিলো।

আর তিস্তা চুক্তি হলে বাংলাদেশের এমন কি লাভ হতো জানি না। সেদিন টেলিভিশনে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খান এই চুক্তি সম্পর্কে বলছিলেনঃ

"" bবলা হয়ে থাকে ভারতের গাজলডোবায় যে পানি আছে সেটা যখন ছাড়া হবে তার ৪৬০ কিউসেক পানি বাধের জন্য রাখা হবে, বাকি যে পানি থাকবে তার অর্ধেক বাংলাদেশ পাবে আর অর্ধেক পাবে ভারত। কিন্ত পশ্চিমবাংলার পানি বিশেষজ্ঞ কল্যানরুদ্র লিখেছেন তিস্তার সর্বনিম্ন প্রবাহ মাঝে মাঝে ৪০০ কিউসেক হয়। যদি ৪৬০ কিউসেক বাধের জন্য রাখতে হয় তাহলে কোন তিস্তার পানি বন্টন হবে?""

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন