• মবিনুল হায়দার চৌধুরীকে প্রশ্নঃ 'বাসদ (ঘোষবাদী)' নয় কেনো?
    মাসুদ রানা

    দ্বিখণ্ডিত বাসদের একাংশের বিশেষ কেন্দ্রীয় সম্মেলন হয়ে গেলো চার দিন ব্যাপী মবিনুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বে ঢাকায় ২০-২৩ নভেম্বরে। এই সম্মেলনের কী করা হবে তা জানানো হয়েছিলো সম্মেলনের আগে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বিবৃতিতে, যেখানে বস্তুতঃ অর্থপূর্ণ কোনো কথাই বলা হয়নি।

    ঘোষণায় উল্লেখ না করা সত্ত্বেও আজ দু'টি উৎপাদনের কথা আজ জানা গেলো ফেইসবুক মাধ্যমে। এদের একটি হচ্ছে দলের নতুন নামকরণ এবং নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন বা মনোনয়ন। আমার বর্তমান লেখাটি নামকরণে সীমাবদ্ধ রাখবো।

    ২০১৩ সালের ৭ই এপ্রিল বাসদ দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিখণ্ডিত হওয়ার পর দুটো অংশই 'বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ' নামে ক্রিয়াশীল ছিলো। কেন্দ্রীয় কমিটীর ছয় সদস্যের মধ্যে চারজনের ম্যাজোরিটি নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান মূল বাসদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকেন।

    বিপরীতে, দুই সদ্যের মাইনোরিটি নিয়ে মবিনুল হায়দার চৌধুরী দলের একই নামের শেষে বন্ধনীর ভেতর "কনভেনশন প্রস্তুতি কমিটি"  যুক্ত করে গত দেড় বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়ে আজ তাদের নাম রাখলেন 'বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)'।

    গতকাল আমি একটি তাৎক্ষণিক ষ্টেইটাসে লিখেছি, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় বাসদের একটি স্বতন্ত্র ও স্থানীয় ধারা 'বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)' নামে নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিলো কেন্দ্রীয় বাসদ ভেঙ্গে যাওয়ার প্রায় সাথে-সাথেই। ফলে ঐতিহাসিক সত্য হচ্ছে এই যে, 'বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী)' নামটির মালিকানা মূলতঃ বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটীর, যার নেতা ছিলেন ফয়সল চৌধুরী শোয়েব।

    ফয়সল চৌধুরী শোয়েবের নেতৃত্বাধীন নবীগঞ্জ বাসদ যদি মবিনুল হায়দার চৌধুরীদের সাথে যোগ দিয়ে থাকে, তো ভালো কথা। আর তা না হয়ে থাকলে, বাসদের এই নামকরণের ঘটনাটি হবে 'নেইম হাইজ্যাকিং' বা নাম ছিনতাই।

    আজ সন্ধ্যায় আমি আমার ফেইসবুকে এ-বিষয়ে একটি ষ্টেইটাস লেখার প্রায় সাথে সাথেই নিউ ইয়র্ক থেকে অভিজিৎ রায় হালকা মেজাজের এক মন্তব্যে জানালেন, তিনি মনে করেন মবিনুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাসদের নামের শেষে বন্ধনীর ভেতর 'মার্ক্সাবাদী'র বদলে 'ঘোষবাদী' হওয়া উচিত ছিলো।

    বাসদের ঢাকা মহানগর শাখার প্রাক্তন এ্যাক্টিভিষ্ট বাঙালী মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ রায়ের হালকা মেজাজটা খারিজ করে তাঁর প্রস্তাবটা সিরিয়াসলি নিয়েছি। আমিও ভাবছিঃ 'ঘোষবাদী' হবে না কেনো?

    এই বাংলারই সন্তান শিবদাস ঘোষ সৌশ্যালিষ্ট ইউনিটি সেণ্টার অফ ইণ্ডিয়া (এসইউসিআই) নামের একটি পার্টি গড়ে তুলেছিলেন ১৯৪৮ সাল থেকে। ১৯৭৬ সালে প্রয়াত শিবদাস ঘোষ ভারতের একজন মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ হিসেবে সম্মানিত। আমি যদিও তাঁর চিন্তাকে অবৈজ্ঞানিক ও সাবজেক্টিভ মনে করি, কিন্তু তাঁর প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা আছে ট্র্যাডিশনের বাইরে তাঁর মৌলিক চিন্তা করার ক্ষমতার জন্য।

    বাসদ নামের যে-দলটি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯৮০ সালের ৭ই নভেম্বরে, তার পেছেনে ছিলো মার্ক্সবাদী বিপ্লবী দল গঠন সম্পর্কে শিবদাস ঘোষের মৌলিক চিন্তা। তাঁর চিন্তা শুধু বাসদ গঠনেই নয়, জাসদকে বিপ্লবী পার্টি হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিতে প্রত্যয় যুগিয়েছিলো (প্রমাণঃ জাসদের প্রকাশনা 'সাম্যবাদ' ৫ম সংখ্যা)।

    প্রচলিত মার্ক্সবাদী দল গঠনের চর্চার চেয়ে মৌলিকভাবে ভিন্ন বলে শিবদাস ঘোষের চিন্তার সাথে বারবার সংঘাত হয়েছে প্রথাগত চিন্তার। জাসদের প্রথম ভাঙ্গন, বাসদের প্রথম ভাঙ্গন ও দ্বিতীয় ভাঙ্গনের মূলে আছে বিভিন্ন মাত্রায় শিবদাস ঘোষের চিন্তার সাথে প্রচলিত চিন্তার সংঘাত। বাসদের এবারের ভাঙ্গন সম্পূর্ণরূপে শিবদাস ঘোষের চিন্তার স্বীকৃতি নিয়ে।

    ২০১৩ বাসদ ভেঙ্গেছে প্রধানতঃ একটি প্রশ্নে। আর সেটি হচ্ছে শিবদাস ঘোষ বাসদের রাজনীতির অথোরিটি কি না। এই প্রশ্নটি দেখা দিয়েছিলো অথোরিটি প্রয়োজন কি না তা ফয়সাল করার জন্যে নয়, বরং অথোরিটি খালেকুজ্জামান হবেন না কি শিবদাস ঘোষ হবেন, তা নির্ধারণ করা নিয়ে। পরবর্তীতে এই প্রশ্নটি একটি দ্বিতীয় প্রশ্নের জন্ম দেয়। আর তা হচ্ছেঃ বাসদ শিবদাস ঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে কি না।

    খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন অংশ প্রথম প্রশ্নে খানিকটা যৌক্তিক থাকলেও দ্বিতীয় প্রশ্নে ইতিহাস বিকৃত করে শিবদাস ঘোষের চিন্তার নির্ণায়ক ভূমিকা অস্বীকার করেছেন। বিপরীতে, মবিনুল হায়দার চৌধুরী অযৌক্তিভাবে শিবদাস ঘোষকে আন্তর্জাতিক কমিউনিষ্ট আন্দোলনের একজন অথোরিটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। খালেকুজ্জামান ও মবিনুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যে দ্বন্দ্ব অমীমাংসেয় হয়ে ওঠে এবং বাসদ দ্বিখণ্ডিত হয়।

    গত দেড় বছরে খালেকুজ্জামানের বাসদ দলীয় চিন্তা ও চর্চা থেকে যে-গতিতে শিবদাস ঘোষের লিগ্যাসি মুছে ফেলে, মবিনুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাসদ সে-গতিতে শিবদাস ঘোষের অথোরিটিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। মবিনুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাসদের সদ্য সমাপ্ত কনভেনশের লক্ষ্য-বিবৃতিতে স্পষ্ট করে 'মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ও শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার ভিত্তিতে' বিপ্লবী দল গড়ে তোলার 'প্রত্যয়' ঘোষণা করা হয়।

    তাই, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের কথা বলা খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন 'বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল' থেকে মার্ক্সাবাদ-লেনিনবাদ ও শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার কথা বলা মুবিনুল হায়দার চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন 'বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল'কে আদর্শগভাবে পার্থক্যপূর্ণ বুঝাতে বন্ধনীর মধ্যে 'মার্ক্সবাদী' শব্দের পরিবর্তে 'ঘোষবাদী' বলাই যৌক্তিক ছিলো।

    মাও সেতুংয়ের চিন্তাধারার অনুসারী হয়ে নেপালের পার্টি নাম যদি হতে পারে 'Unified Communist Party of Nepal (Maoist)', তাহলে বাংলাদেশে শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার দলের নাম 'Socialist Party of Bangladesh (Ghoshist)' বা 'বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (ঘোষবাদী)' হতে পারবে না কেনো?

    এই প্রশ্নের জবাব দিতে একাধিক হাইপোথেসিস প্রস্তাব করা সম্ভব। কিন্তু আমার মনে হয়, উত্তরের জন্যে প্রশ্নটি ছেড়ে দেওয়া উচিত শিবদাস ঘোষকে অথোরিটি মনে করা মবিনুল হায়দার চৌধুরী ও তাঁর নেতৃত্বাধীন দলটির কাছে।

    রোববার ২৩ নভেম্বর ২০১৪
    লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

সামান‍্য িবষয় নিয়ে যদি খণ্ডবিখণ্ড হয় তাহলে তাহলে ঐক‍্য আসবে কোত্থেকে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন