• মানুষে-মানুষে সংঘাতের থিসিস
    মাসুদ রানা

    মানুষে-মানুষে সংঘাতের মৌলিক রূপ হচ্ছে কাড়াকাড়ি, যাকে অনুসরণ করে আসে ধমকাধমকি, ধাওয়াধাওয়ি, মারামারি এবং শেষ পর্যন্ত খুনোখুনি। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, শিশুদের মধ্যেও কাড়াকাড়ি থেকে মারামারি লাগে। এই সংঘাতের মূলে আছে ‘স্কার্স’।

    স্কার্স হতে পারে শিশুর খেলনা থেকে শুরু করে সামরিক ড্রৌন পর্যন্ত যে-কোনো দ্রব্য বা সুবিধা, যা মানুষ সচেতন বা অসচেতনভাবে হলেও তার মৌলিক প্রেষণা তৃপ্ত করে বলে মনে করে। আমি আমার থিওরি অফ ফাণ্ডামেণ্টাল মৌটিভেশন বা মৌলিক প্রেষণা তত্ত্বের আলোকেই বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করি। কারণ, মানুষের অন্তহীন জীবন থেকে শুরু করে শ্রমহীন সুখের যে মৌলিক প্রেষণা রয়েছে, তার সবগুলোর প্রত্যক্ষিত তৃপ্তকই  বস্তুতঃ স্কার্স।

    স্কার্স নিয়ে শুধু মানুষের মধ্য নয়, সমগ্র প্রাণীজগতের মধ্যে অন্তর্প্রজাতিক ও আন্তর্প্রজাতিক সংঘাত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রাণীজগৎ যেহেতু একটি ফূডচেইন বা খাদ্যশৃঙ্খলায় বাঁধা, অর্থাৎ এক প্রজাতির প্রাণী অন্য প্রজাতির প্রাণীর খাদ্য, তাই আন্তর্প্রজাতিক সংঘাতটা প্রধানতঃ ভক্ষণের বিপরীতে রক্ষণের সংঘাতরূপে প্রকৃতিতে প্রতিভাত হয়। যেমন বাঘের সাথে হরিণের সংঘাত।

    আবার, একই প্রজাতিকে যখন একাধিক ভিন্ন প্রজাতি খাদ্য রূপে গ্রহণ করে, তখন খাদক প্রজাতিসমূহের মধ্যে খাদ্য প্রজাতিকে নিয়ে কাড়াকাড়ি থেকে মারামারি লাগতে পারে। একইভাবে একই প্রজাতির দুই খাদকের মধ্যে কাড়াকাড়ি থেকে মারামারি লাগতে পারে।

    তবে পৃথিবী সমস্ত প্রাণীর মধ্যে মনুষ্য প্রজাতি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি অন্তর্প্রজাতিক সংঘাতে ব্যস্ত। সেই হিসেবে মানুষ সর্বাধিক আত্মঘাতী প্রজাতি। এর সোজা কারণ হচ্ছে, মানুষের অনুভূত প্রয়োজন অন্য প্রাণীর চেয়ে অনেক-অনেক বেশি। অন্য প্রাণীর অনুভূত প্রয়োজন যেখানে প্রধানতঃ বস্তুনিষ্ঠ অর্থাৎ দেহের প্রয়োজনের সমান, মানুষের অনুভূত প্রয়োজন সেখানে দেহের প্রয়োজনের বাইরেও ঐতিহাসিকভাবে ক্রমশঃ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

    মানুষ যেদিন শিকার ও সংগ্রহের জীবন ছেড়ে নিজে উৎপাদন করতে শুরু করেছে, সেদিন থেকে এই প্রজাতি নিজের ক্ষমতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে প্রয়োজনের প্রত্যাশা চিরদিনের জন্য ক্রমবৃদ্ধিতে স্থাপন করেছে। সুতরাং মানুষে মানুষে সংঘাতের মূল কারণ হচ্ছে মানুষের প্রয়োজনের অসীমতা বনাম উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা।

    যদিও মানুষের উৎপাদনের মধ্যে রয়েছে (১) প্রাইমারি উৎপাদন, যা প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত ও উৎপাদিত, (২) সেকেণ্ডারি উৎপাদন, যা প্রাকৃতিক বস্তুর জটিল রূপান্তর ঘটিয়ে তৈরি এবং (৩) টার্শারি উৎপাদন, যা মূলতঃ সেবামূলক বুদ্ধিবৃত্তিক উৎপাদন, তা সত্ত্বেও তা মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম নয়। এটি একটি আপেক্ষিক ও স্থায়ী সীমাবদ্ধতা।   

    এই সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ অপ্রতুল সররাহের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে একদিকে সহযোগিতা ও অন্যদিকে প্রতিযোগিতার যুগপৎ প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত হয়। আর, এই সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার ফ্রেইম অফ রেফারেন্স হিসেবে নিজকে ব্যবহার করে আপন-সদৃশদের নিয়ে ‘ইনগ্রুপ’ ও আপন-বিসদৃশদের দিয়ে ‘আউটগ্রুপ’ প্রকরণ তৈরি করে।

    প্রকৃতিতে অস্তিত্বমান সবকিছুর মধ্যে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব হচ্ছে, একদিকে যেখানে সবকিছুই অভিন্ন, আবার অন্যদিকে প্রতিটিই অনন্য। যেমন, সকল বস্তুই একদিকে অভিন্ন মৌলিক কণা নিয়ে গঠিত, বার অন্যদিকে এদের কণার সংখ্যাগত ও অবস্থানগত ভিন্নতার কারণে প্রতিটি বস্তুই অন্য যেকোনো বস্তুর চেয়ে ভিন্ন।

    এই অভিন্নতা ও ভিন্নতার রূপ নির্ভর করে আমাদের বিচারের স্তর ও পরিস্থিতির ওপর। ভিনগ্রহ থেকে পৃথিবীকে দেখলে সকল মানুষকে অভিন্ন মনে হবে - পৃথিবীর মানুষ বলে। আবার এক পরিবারের দুই সন্তানের মধ্যে তুলনা করলে দুজনকেই সম্পূর্ণ আলাদা মনে হবে। এটি একটি কন্টিনিউয়াম যার এক প্রান্তে আছে ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব এবং অন্য প্রান্তে আছে মনুষ্য ও মনুষ্যত্ব। মাঝখানে আছে বর্ণ, জাতি, গোত্র, শ্রেণী, ইত্যাদি নানা প্রকরণ।

    মানুষের সাথে মানুষের সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা সমগ্র কণ্টিনিউয়ামের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্তই হয়ে থাকে। এখন, স্কার্স নিয়ে কাড়াকাড়ি, ধমকাধমকি, ধাওয়াধাওয়ি, মারামারি ও খুনোখুনি কোন্‌ পরিচয়ে হবে, তা নির্ভর করে স্কার্সটির গুরুত্ব ও অধিকারীত্বের সম্পর্কে মনুষ্য প্রকরণের কোন পর্যায়ের কী প্রত্যক্ষণ, তার ওপর।

    ধরা যাক, সিলেটে ব্রিটিশ ফিনলে কোম্পানীর মালিকানাধীন একটি চা বাগানের ঝর্ণায় মাছ পাওয়া যায় এবং মাছ যেহেতু একটি স্কার্স, তাই মাছ ধরা নিয়ে পাশ্ববর্তী পূর্বপাড়া ও পশ্চিমপাড়ার মানুষের মধ্যে সংঘাত সম্ভব। কিন্তু এ-ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাঙালী জাতির সাথে ইংরেজ জাতির সংঘাতের সংঘাতের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

    এবার ধরা যাক, হঠাৎ জানা গেলো এই নদীতে পাথরের সাথে প্রচুর পরিমাণে হীরের টুকরো পাওয়া যাচ্ছে। হীরে একটি মূল্যবান রত্ন ও স্কার্স। এবার ভাবুন, এই নদীর হীরে নিয়ে সংঘাতটা কি আর দুই গ্রামের মধ্যে সীমিত থাকবে? নিরাপদে ভাবা যায়, এটি প্রয়োজনে একটি বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্র পর্যন্ত তৈরি করে ফেলতে পারে। তো, মাছ নিয়ে যেখানে পূর্বপাড়া বনাম পশ্চিমপাড়া পরিচয়ে সংঘাত হবে, হীরে নিয়ে কিন্তু বাঙালী বনাম ব্রিটিশ জাতি পরিচয়ে যুদ্ধ হতে পারে।

    আমরা চাই বা না চাই, পছন্দ করি বা না করি, পৃথিবী জাতিময় ও জাতি-বিভক্ত। বিশ্বাঙ্গনের স্কার্স নিয়ে এই পর্যন্ত পৃথিবীতে মনুষ্য প্রকরণের মধ্যে জাতিগত প্রতিযোগিতাই হয়েছে। আর এই প্রতিযোগিতায় এক জাতি অন্য জাতিকে ‘ওভারপাওয়ার’ করতে চেয়েছে।

    ওভারপাওয়ার করার একটি চর্চিত মাধ্যম হচ্ছে ঐ জাতির মানুষের সংখ্যাহ্রাস ঘটানো। সাধারণতঃ সংখ্যাহ্রাসের শান্তিকালীন পদ্ধতি হচ্ছে জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধকালীন পদ্ধতি হচ্ছে গণহত্যা। এই গণহত্যা হতে পারে অস্ত্র প্রয়োগ করে অথবা খাদ্য প্রত্যাহার করে।

    বাঙালী জাতির স্কার্স ছিনিয়ে নিতে ব্রিটিশ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী ১৭৫৭ সালে যুদ্ধ করে বাংলা দখল করেছিলো এবং ১৭৭০ সালে ৩ কোটি বাঙালীর মধ্যে ১ কোটি বাঙালী মেরে ফেলেছিলো দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ১৯৪৩ সালে ভারতের ব্রিটিশ সরকার আবার সেই দুর্ভিক্ষকে কাজে লাগিয়ে ৫০ লক্ষ এবং কোনো-কোনো হিসেব মতে ৭৫ লক্ষ বাঙালী নিধন করেছিলো।

    এই শতকেও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মধ্যপ্রাচ্যের স্কার্স খনিজ তেল নিয়ন্ত্রণ ও আহরণের জন্য ইরাকে, লিবিয়াতে, সিরিয়াতে নানা কায়দায় গণহত্যা চালিয়েছে। এখনও পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত আছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। শুধু তাই নয়, স্কার্স নিয়ে ইউরোপে চলছে জাতিগত সংঘাত, যা বৃহত্তর যুদ্ধ বা বিশ্বযুদ্ধের দিকেও যেতে পারে।

    এই যখন ইতিহাস ও বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি, তখন পৃথিবীর জাতিময়তা ও জাতিবিভক্তি এবং জাতিগত গণহত্যা ও অবদমনের প্রবণতাকে উপেক্ষা করে জাতিগত আত্মপরিচয়ে বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা যাঁরা অস্বীকার করেন, তাঁরা বস্তুতঃ ইতিহাসের শিক্ষাকে অস্বীকার করছেন। বিপরীতে, আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন ইতিহাস গড়তে চাইছি।

    শনিবার ২১ জুন ২০১৪
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন