• মাৎস্যন্যায়ে পুড়ছে বৌদ্ধবিহারঃ জেগে উঠুক বাংলার উত্তরাধিকার!
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশে, চট্টগ্রামের রামু উপজেলায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী মুসলমানদের একটি শক্তিশালী অংশ সংখ্যালঘু বাঙালী বৌদ্ধদের বসতিতে আগুন দিয়েছেন। তাঁরা আগুন দিয়েছেন সমাবেশ ও মিছিল সহযোগে, ইসলামের জিগিরে মত্ত হয়ে, গতকাল মধ্য-রাতে। আগুনের লেলিহান শিখা পুড়িয়ে দিয়েছে ৩০টি বাড়ী। আপন মাতৃভূমিতে  দূর্বল, অসহায়, শক্তিহীন, রাষ্ট্রের ও আইনের আশ্রয়হীন সংখ্যালঘুরা পালিয়ে গিয়েছেন প্রাণ-ভয়ে।

    তবু ক্ষান্ত হননি ‘আল্লাহ মহান’ দাবিতে উচ্চকিত হৃদয়হীন ‘ঈমানদারগণ’। তাঁরা স্বারোপিত ‘মহান দায়িত্ব’ পালনের জন্য ছুটে গেলেন বৌদ্ধবিহারে। আগুনের শিখা হয়তো তাঁদের সাথেই বাহিত হয়েছিলো। মহা উল্লাসে তাঁরা অগ্নিসংযোগ করলেন ১২টি বৌদ্ধবিহারে। শেষ-রাত অবধি সেখানে আগুন জ্বলেছে। এতে আড়াইশো বছরের একটি বিহারও ছিলো।

    এক ধর্মের জয়গান গাইতে অন্য ধর্মকে ছাড়খার করা নতুন কিছু নয়। এমনকি, যেখানে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মের প্রায় নামগন্ধও নেই, সেখানে শিয়া পোড়ায় সুন্নির মসজিদ, আর সুন্নি পোড়ায় শিয়ার। উভয়ই উভয়কে খুন করে বর্বর উন্মত্ততায়। তবুও মুখে উচ্চারিত হয় একই ধ্বনিঃ ‘আল্লাহু আকবার!’ একদল আরেক দলের শিশু-বৃদ্ধ-নর-নারীকে হত্যা করে প্রচণ্ড ঘৃণা-নির্মমতা-নৃশংসতায়। উভয়ের অভিন্ন ‘আল্লাহ’ তৎক্ষণাৎ রক্ষা করেন না ‘তাঁর’ ঘর বলে বিবেচিত মসজিদগুলোকে কিংবা মসজিদে বিশ্বাসে আশ্রিত মানুষগুলোকে।

    বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নিতান্ত দুর্বল। পালিয়ে যাওয়া আর আপন-আপন ঈশ্বরের কিংবা দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করা ছাড়া কোনো শক্তিই নেই তাঁদের। শক্তি নেই তাঁদের দেবতা ও ঈশ্বরেরও। যখন আক্রান্ত হন, তখন ভক্তকে রক্ষা করা তো দূরে থাক, নিজেকেও রক্ষা করতে পারেন না ঈশ্বর ও দেবতাগণ।

    সবলের হাতে দুর্বলের নির্যাতিত হবার ইতিহাস বাংলায় নতুন নয়। এ-মাটির ইতিহাসে একটি কুখ্যাত সময় ছিলো সাড়ে বারোশো বছরেরও আগে। বড়ো মাছ যেমন ছোটো মাছগুলোকে ভক্ষণ করে একান্ত শক্তির বলে, আজকের মতোই, বাংলার মাটিতে ৭৫০ সালের আগে একটি সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিলো, যাকে বলা হতো মাৎস্যন্যায়।

    এক পর্যায়ে ক্লান্ত বাঙালী আজকের মতোই ‘বিকল্প’র সন্ধানে মাৎস্যান্যায় ত্যাগ করে এশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত করলো একজন শাসককে। ইতিহাসে তাঁর নাম ‘গোপাল’। শুরু হয় পাল-রাজত্ব। সে-সময় থেকে টানা প্রায় চারশো বছর এক অভূতপূর্ব সভ্যতার সৃষ্টি করেছিলো বাঙালীরা। বহির্বিশ্বের ঐতিহাসিকগণ বলেন, এ-সময়টি হচ্ছে ইতিহাসে বাঙালী জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ও গৌরবোজ্জ্বলতম যুগ।

    আজকের আত্ম-বিস্মৃত বাঙালী এ-ইতিহাস জানতে চায় না যে, আসাম-সীমান্ত থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত পাল-নেতৃত্বে বাঙালীরা প্রতিষ্ঠা করেছিলো এক শক্তিশালী ঊন্নত সাম্রাজ্য। পূর্ব থেকে পশ্চিমে ও দক্ষিণ থেকে উত্তরে সমগ্র ভারতবর্ষের প্রায় সবটুকু শাসন করেছিলো বাঙালীরা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপদেশ - জাভা, সুমাত্রা, মালয়, ইত্যাদি - ছিলো বাংলার উপনিবেশ।

    বার্মা, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভূটান, সিকিম, তিব্বত থেকে শুরু করে দূর প্রাচ্য পর্যন্ত বাঙালী জ্ঞানের আলো হাতে ছড়িয়ে পড়েছিলো  দিগ্বিজয়ীর মতো। প্রতিষ্ঠা করেছিলো বিশালায়তনের সব বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে দর্শন ও মনোবিজ্ঞান থেকে শুরু করে বিভিন্ন শাস্ত্রের পাঠ, গবেষণা ও চর্চা করা হতো। দেশ-বিদেশের অগণিত শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করতেন। ‘আলো-হাতে আঁধারের যাত্রী’দের মধ্যে অনন্য ছিলেন ঢাকার বিক্রমপুরের জন্মিত মহাজ্ঞানী অতিশ দীপঙ্কর। এমনই আরেকজন ছিলেন এই চট্টগ্রামেরই, যাঁর নাম তিলোপা। তখন বাংলা ছিলো পৃথিবী আলো করা এক জনগোষ্ঠীর দেশ। এটি সত্যি। অতিকথন নয়।

    বলার অপেক্ষা রাখে না, বাংলার সেই স্বর্ণযুগের স্রষ্টা এই পালেরা ছিলেন ব্রাহ্মণ্য-বর্ণবাদের কৃপায় ইতিহাসে শূদ্র-বংশোদ্ভূত বলে পরিচিত খাঁটি বাঙালী এবং ধর্মে বৌদ্ধ। পালেরা বৌদ্ধ বলেই পরবর্তীতে বহিরাগত হিন্দুবাদী শক্তি বৌদ্ধ-যুগের মহিমাকে মুছে দিতে চেয়েছে। লাখে-লাখে বৌদ্ধকে খুন করেছে। বৌদ্ধ ধর্মের জন্ম দেশেই বৌদ্ধদের করা হয়েছে সংখ্যা লঘু, সেই হিন্দু শাসনামলেই।

    একই ভাবে বাইরে থেকে আসা ইসলামবাদী শাসকগণ এসে কবর দিতে চেয়েছেন বৌদ্ধ-যুগ ও হিন্দু-যুগকে। ভিন্ন ধর্মের প্রান্তিক মানুষদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করেছেন লাখে-লাখে সাম্য ও সম্মানের প্রতিশ্রুতিতে। কিন্তু বাস্তবে সাম্য ও সম্মান মিলেনি তাঁদের, নতুন প্রকরণ 'আশরাফ-আতরাফ' বিভাজনে। সব শেষে খ্রিষ্টবাদী ইংরেজগণ চাপা দিয়েছেন পূর্ববর্তী বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলিম-সহ সব যুগকে। তাঁরাও চেষ্টা করেছেন দরিদ্র মানুষদেরকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত করতে। এটিই ইতিহাস যে, এক শাসক নিজেকে মহিমান্বিত করার জন্য পূর্ববর্তী-কালের গৌরবকে লঘু ও অকিঞ্চিৎকর করে দেখাতে চান। এই প্রক্রিয়া আজও চলছে।

    শাসকগণ তা করবেন, করুন। কিন্তু একটি জনজাতিকে তা করলে চলবে না। এটি খুব দুঃখের যে, আজকের বাঙালী জনজাতির বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব নিতান্তই লঘু। তাঁরা বৌদ্ধ-বাংলার প্রসারিত দৃষ্টি অর্জন তো দূরের কথা, মুসলিম আমলের সুবেহ বাংলা, কিংবা অন্ততঃ খ্রিস্টীয় শাসক আমলের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অধিকার-বোধও ধারণ করেন না। মুসলিম-বিদ্বেষী হিন্দু-পুনরুজ্জীবনবাদী জাতীয়তাবাদ, আর তার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু-বিদ্বেষী মুসলিম জাতীয়তাবাদ বাঙালীর বোধ ও ভূমিকা এতোই ক্ষুদ্র ও সঙ্কীর্ণ করেছে যে, তাঁরা বাংলার জল-স্থল-অন্তরীক্ষের আখণ্ড সত্ত্বাকে রক্ষা করতে পারেনি। আজ দ্বিখণ্ডিত বাংলা ভুগছে সর্বক্ষেত্রে।

    হাস্যকর ভাবে বাঙালী বুদ্ধিজীবীগণ প্রায়শঃ ‘শ্বাস্বত বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাস’ বলে পাতিহাঁসের মতো দল বেঁধে প্যাঁক-প্যাঁক আওয়াজ তুলে বক্তৃতা দেন। কিন্তু বোধের দারিদ্র্যের কারণে তাঁরা ১৯৭১, কিংবা ১৯৫২, কিংবা ১৯৪৭ সালের গণ্ডি পেরুতে পারেন না জাত হারাবার ভয়ে।

    বাংলায় বৌদ্ধদের ভূমিকা কী, তা যদি আজকের বাঙালীরা বুঝতেন, তাহলে তাঁদের একাংশ আরবের গৌরব বাঁচাতে বাংলার বৌদ্ধবিহারে আক্রমণ করতেন না। মিশরীয়রা আজ প্রধানতঃ মুসলিম, কিন্তু তাই বলে, সিংহ-মূর্তি-খচিত পিরামিডকে তাঁরা ইসলামের নামে ধ্বংস করে দেননি। তাঁরা বরং পৃথিবীর সভ্যতার নিদর্শন পিরামিডকে সগর্বে ধারণ করে প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকার দাবি করে থাকেন।

    ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক, আরব বংশোদ্ভূত আবু আল-কাসিম মুহাম্মদ ইবন্‌ আবদ্‌ আল্লাহ্‌ ইবন্‌ আবদ্‌ আল-মুত্তালিব ইবন্‌ হাশিমের চরিত্র হনন করে একজন মিসরীয় আরব কপ্টিক-খ্রিস্টান একটি নিম্ন মানের ছায়াছবি তৈরী করেছেন বলে মিসরীয় আরব মুসলমানগণ তো তাঁদের দেশের সংখ্যালঘু কপ্টিকদের উপর আক্রমণ করেননি। তাঁরা কপ্টিকদের হাজার বছরের পুরনো মন্দিরে আগুন দেননি কিংবা যিশু খ্রিস্টের মূর্তি পোড়াননি।

    কী অপরাধ করেছিলেন বৌদ্ধ উত্তম কুমার বড়ুয়া? কেউ একজন ইন্টারনেটে তাঁর ফেইসবুকে একটি ছবি সেঁটে দিয়েছিলো তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জানা গেলো, সে ছবিটি ইসলামের ধর্মের প্রতি অবমাননা কর। এটিও শোনা কথা।

    ধরা যাক, ঘটনাটা সত্যি, যদিও উত্তম কুমার বড়ুয়ার জবানবন্দি আমাদের কাছে নেই। কিন্ত কোনো বিচারেই তাতে উত্তম কুমার বড়ুয়ার পরিবার ও সম্প্রদায়কে আক্রমণ করার, তাঁদের বাড়ী-ঘর পোড়াবার এবং 'পবিত্র'-জ্ঞাত ধর্মালয় ভষ্মীভূত করার অধিকার পেতে পারেন না ইসলাম ও ইসলাম-প্রবর্তকের 'সম্মান' রক্ষাকারীগণ। এটি সম্পূর্ণ অন্যায়। অসভ্যতা। এটি কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায় না।

    এ-রকম ঘটনা ঘটেই চলেছে বাংলাদেশে যুগে-যুগে। মিরাটে হিন্দুত্ববাদীরা মসজিদে কাপুরুষোচিত হামলা চালালে, বাংলাদেশের ইসলামবাদীগণ হিন্দুদের বাড়ীতে-মন্দিরে আক্রমণ করে বসেন।

    বাংলাদেশের শাসক দল আওয়ামী লীগ সংখ্যালঘুদের ভূয়া সংরক্ষক। আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীত্বের অবস্থান থেকে নিজ ধর্মের পক্ষে অপ্রয়োজনীয় বিপণন করে প্রায়শঃ বক্তৃতা-বিবৃতি দেন।

    পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-নেত্রী খালেদা জিয়া ইসলামবাদীদের প্রধান আশ্রয়দাত্রী হিসেবে থেকে-থেকে ‘ইসলাম রক্ষা’র হুঙ্কার ছাড়েন।

    তারও আগে, অবৈধ-ক্ষমতাগ্রাসী জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্মে পরিণত করে অন্যান্য ধর্মের মানুষকে বস্তুতঃ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করেছেন।

    সেনা-হাতে হত্যায়িত পূর্ববর্তী রহমান প্রেসিডেন্টদ্বয়ের মধ্যে প্রথম জন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইসলামিক ফাউণ্ডেশন এবং ধর্ম-নিরপেক্ষ বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন ইসলামিক সম্মেলন সংগঠনে (ওআইসি)। দ্বিতীয়জন এসে সংবিধানের মুখে ধর্ম-বাক্য জুড়ে দিয়ে রাষ্ট্রে ও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার শুরু করেছিলেন।

    প্রথম প্রেসিডেন্ট-রহমান রাষ্ট্রের ‘ধর্ম-নিরপেক্ষতা মানে ধর্ম-হীনতা নয়’ বাঁশি বাজিয়ে ধর্মীয় জিগির তোলার প্রতিযোগিতার ‘মাল্টি থিয়োক্র্যাসী’র আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। তাতে স্বাভাবিকভাবেই, গলায় ‘জোর যাঁর, মুল্লুক তাঁর’ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জীবন নাজুক হয়ে উঠেছিলো সংখ্যাগুরু ধর্মবাদীদের চিৎকারে।

    রোগের জীবাণুতে শরীর সংক্রমিত হলে যেমন খানিকটা সময় পরে এর লক্ষণগুলো বেরিয়ে এসে জীবনকে সঙ্কটগ্রস্ত করে তোলে, অনেকটা তেমনিভাবে, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই ধর্মীয়তার রোগে নতুন রাষ্ট্রটি সংক্রমিত হয়েছিলো প্রসব-কালে-অনুপস্থিত পিতা প্রথম রহমানের হাতে।

    আজ যাঁরা রোগের লক্ষণ ও প্রকোপ দেখে ‘হায়-হায়’ করেন, তাঁদের বুঝতে হবে রোগের কারণ কী। জানতে হবে রোগের ‘কেইস হিস্টরী’ কী। সে-ভাবে বুঝাটাই হবে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝা। আর রোগকে বৈজ্ঞানিকভাবে না-বুঝা পর্যন্ত এর সঠিক চিকিৎসা সম্ভব নয়। তা যতো বড়ো ইষ্টদেবতার নাম ধরে জয়ধ্বনি দেয়া হোক না কেনো।

    বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকগণ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে করুণ। তাঁদের বোধ-বুদ্ধি প্রধানতঃ আবেগ-সর্বস্ব ‘চেতনায়’ আচ্ছন্ন। এতো আবেগ দিয়ে তাঁরা বলেন, লিখেন, বুঝেন ও বুঝান যে, এঁদের ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মী-শিষ্যদের মধ্যে নির্মোহ, বস্তুনিষ্ঠ, বৈজ্ঞানিক-বোধ তথা ‘ক্রিটিক্যাল’ দৃষ্টি ও চিন্তা গড়ে ওঠে না।

    ডানপন্থী থেকে শুরু করে বামপন্থী পর্যন্ত প্রায় সব গুরুরাই অন্ধ ভক্ত লালন-পালন করেন। এঁদের না আছে বিশ্বজ্ঞান, না আছে বিশ্ববোধ। নিজের জাতি, নিজের দেশ, নিজের ধর্ম, নিজের আদর্শ, নিজের দল, নিজের নেতা, নিজের গুণেই মুগ্ধ তাঁরা।

    এঁরা অন্য জাতি সম্পর্কে কোন খোঁজ রাখেন না। এঁদের মধ্যে যাঁরা জনগণের অর্থে ‘উচ্চ শিক্ষা লাভ’ করতে ইউরোপ-আমেরিকাতে যান, তাঁরা ইউরোপ-আমেরিকা সম্বন্ধে গবেষণা করেন না। গবেষণা করেন নিজ-দেশ নিয়ে। পৃথিবীতে কোনো উন্নত জাতির গবেষক কিংবা প্রকৃত জ্ঞানানুসন্ধানী বিদেশে গিয়ে স্বদেশের উপর বিদ্যালাভ করেন? সম্ভবতঃ এঁরা হতে চান বিদেশী প্রভূর ভাষা ও পদ্ধতি রপ্ত-করা স্থানীয় সেবক।

    পৃথিবীর পরিমণ্ডলে বাস্তবে নিজেদের মূল্য কতোটুকু, সেটি বুঝার ক্ষমতাই নেই তাঁদের। এঁরা যা পারেন, তা হচ্ছে অন্ধ আবেগের ‘ভাং’ খাইয়ে চারপাশে ভক্ত তৈরী করে রাখা এবং কোনো সমালোচনা আসা মাত্রই সমালোচকের প্রতি, নাস্তিক, রাজাকার, সংশোধনবাদী, ব্যক্তিবাদী, ইহুদী, ইত্যাদি সুবিধামতো গালি বর্ষণ, সম্ভব হলে আক্রমণ ও নির্যাতনের নির্দেশ দেয়া।

    এঁরা হয়তো জানেনও না, এঁদের চিন্তা বন্ধ্যা, ভাষা পঙ্গু ও কর্মকাণ্ড সৃষ্টিহীন। সোজা কথায়, এঁরা প্রতিক্রিয়াশীল। এঁদেরকে বাতিল করে এগিয়ে আসতে হবে তরুণদের।

    তরুণদের ভরসা করতে হবে নিজেদের উপর। এর জন্য প্রয়োজন নিজেদের প্রস্তুত করা। প্রথমেই হচ্ছে মানসিক প্রস্তুতি। অসম ও বিভিক্ত এ-সমাজে, যেখানে এক মুষ্ঠিমেয় শ্রেণী প্রায় সমগ্র জনগোষ্ঠীর দুঃখ ও দুর্দশার কারণ, সেখানে ঠিক করতে হবে আপনি কার পক্ষে যাবেন। স্থির করতে হবে কার সাথে ‘আইডেন্টিফাইড’ বা একাত্ম হবেন এবং ‘সাবমিটেড’ বা আনুগত্যশীল হবেন।

    আমি বলি, দুঃখী মানুষের সাথে ‘আডেন্টিফাইড’ হোন এবং মনুষ্যত্বের প্রতি ‘সাবমিট’ করুন। কোনো ধর্ম নয়, কোনো আদর্শ নয়, কোনো দেশ নয়, কোন সরকার নয়, কোনো দল নয়, কোনো নেতা নয়, কোনো দার্শনিক নয়, কোনো ব্যবসায়ী নয়, ভাই নয়, বাবা নয়, মা নয়, শিক্ষক নয়, প্রেমিক নয়, প্রেমিকা নয়, সন্তান নয়, সন্ততি নয়, ঈশ্বর নয়, দেবতা নয়, নাস্তিক নয়, আস্তিক নয়, বস্তু নয়, ভাব নয় - কোনো কিচ্ছুর প্রতি নয় - শুধু মনুষ্যত্বর প্রতি সাবমিট করুন।

    ‘স্বাধীন বাংলা’য় কোটি-কোটি বাঙালী-অবাঙালী মানবেতর জীবন-যাপনে বাধ্য হচ্ছেন। ওঁদেরকে মনুষ্য জীবন দিতে আত্মনিয়োগ করুন। ওঁদেরকে মানুষের মতো বাঁচতে দিন। ওঁরা আপনার রক্ত। আপনার পরিচয়ের সূত্র। ওঁদেরকে নোংরা প্রাণীর মতো আবর্জনার মধ্যে বাস করতে দিয়ে, উচ্ছিষ্ট খেতে দেখে, মর্যাদাহীনভাবে বাঁচতে দেখে, বিনা চিকিৎসায় মরতে দেখে, আপনি কতোদূর এগুবেন? পৃথিবীতে আপনার কী সম্মান?

    আপনার শিক্ষা, দীক্ষা, ধর্ম, দেশপ্রেম, ইতিহাস, চেতনা, নাগরিকতা, সব কিছু অর্থহীন। কারণ, আপনার মানুষের পশুর মতো জীবন-যাপন করছেন। যিনি পশুর মতো জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁর জন্য কোনো ধর্ম নেই, কোনো স্বাধীনতা নেই, দেশপ্রেম নেই, সংবিধান নেই, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নেই। এগুলো শুধু কথার কথা।

    আপনি এর সবকিছুকে চ্যালেইঞ্জ করুন। প্রশ্ন করুন। উল্টে-পাল্টে, মাটিতে ফেলে, হাতের তালুতে ঘষে, কামড়ে, মুচড়ে, দুমড়ে, পায়ে দলে, চক্ষু মেলে, দেখার চেষ্টা করুন। এভাবে চ্যালেইঞ্জের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে নতুন জ্ঞান, নতুন বিজ্ঞান। আর তাতেই দেখতে পাবেন নতুন আলোয় নতুন পথ। পূর্ব-নির্ধারিত কোনো আদর্শবাদ কিংবা শেখানো বুলি খোঁজার দরকার নেই। দরকার শুধু ভালোবাসার এবং মানুষকে মর্যাদাপূর্ণ জীবনে অভিষিক্ত করার দুর্বার আকাঙ্খার। মনে রাখতে হবে, পৃথিবীর সমস্ত আদর্শ, সমস্ত বিজ্ঞান, সমস্ত শুভ আবিষ্কার হয়েছে মানুষকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। তাই পুরনো ভালোবাসা ও পুরনো আদর্শবাদকে কবর দিয়ে নতুন ভালোবাসায় উজ্জীবিত হতে হবে।

    বাংলার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের স্রষ্টা বৌদ্ধ-বাঙালীদের উত্তরাধিকারী শুধু কি বৌদ্ধরাই? আর কেউ নয়? আপনি নন? বাংলার সব মানুষই কি শেখ মুজিবুর রহমানের মতো  আরব-বংশোদ্ভূত?  নিশ্চয় না। আপনিই তাঁদের উত্তরাধিকারী। একটি সুমহৎ সভ্যতার উত্তরাধিকারী আপনি। কারণ, আপনি বাঙালী।

    ধর্মের নামে কিছু কুৎসিত লোক আপনারই লোকদের উপর আক্রমণ করেছে, নির্যাতন করেছে, অসভ্যতা করেছে। রাষ্ট্র ও সরকার নির্যাতিতদের রক্ষা করতে পারেনি।

    কিন্তু আপনি পারবেন। আপনি ‘শুধু মানুষ’ হোন এবং মানুষের পক্ষে দাঁড়ান। ইতিহাস আপনার কাছে এটি চায়। কোনো কৈফিয়ত দেবেন না। ইতিহাস কৈফিয়ত শুনতে চায়। সোজা হয়ে মাথা উঁচু করে দাড়ান। সাড়া দিন। মানবতার ডাকে আপনি সাড়া না দিলে কে দেবে?

    নিজের বুকে বৃদ্ধাঙ্গুল স্পর্শ করে জোরে চিৎকার করে বলুন ‘আমি’। আরও কোটি কন্ঠ প্রতিধ্বনি করে উঠবে ‘আমি’'। আর এভাবেই তৈরী হবে নতুন মুক্তিবাহিনী।

    রোববার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

এমন একটা উদ্দীপনাময় লেখা চোখে পড়ে না। মনুষত্যের ডাকা এভাবেই সাড়া দেয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন