• মিসরে গণ-অভ্যূত্থানঃ এক কদম আগে ও দু’কদম পিছে
    মাসুদ রানা

    মুর্সির কুর্সি-কাড়া
    মিসরের সেনাবাহিনী প্রেসিডেণ্ট মোহাম্মদ মুর্সির কুর্সি কেড়ে নেবার অব্যবহিত পর-পরই, আমি কিছু লিখিনি লক্ষ্য করে, একাধিকজন জানতে চেয়েছেন এ-বিষয়ে আমার মূল্যায়ণ ও বিশ্লেষণ কী। তাঁরা জানতে চেয়েছেন, আমি কী মনে করি ঘটনাটিকেঃ গণ-অভ্যূত্থান না সামরিক অভ্যূত্থান? কেনো এমনটি হতে পেরেছে? সর্বোপরি কী হওয়া উচিত? ইত্যাদি।

    আমার চলমান মিসর-সিরিজের গত সপ্তাহের পর্বে দেখিয়েছি, দেশটিতে জনগণের অভ্যূত্থানকে সামরিক বাহিনী ছিনতাই করে বস্তুতঃ সামরিক অভ্যূত্থানই সংঘটিত করেছে। সূত্র নির্দেশ করে এটিও দেখিয়েছি যে, মার্কিন অধ্যাপক ওযান ভ্যারোল ১৯৬০ সালের তুরষ্কে, ১৯৭৪ সালের পর্তুগালে ও ২০১১ সালের মিসরে সংঘটিত গণ-অভ্যূত্থান-রূপান্তরিত-সামরিক-অভ্যূত্থান পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে এর নাম দিয়েছেন ‘ডেমোক্র্যাটিক ক্যুদেতা’ বা গণতান্ত্রিক সামরিক অভ্যূত্থান; কারণ, তিনি মনে করেন, এহেন ক্যুদেতার মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি রচনা করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে থাকে।

    অধ্যাপক ভ্যারোলের পর্যবেক্ষণের সাধারণীকরণ-জাত তত্ত্বায়ণের ভ্যালিডিটি বা বৈধতা আমি চ্যালেইঞ্জ করেছি প্রয়াত পূর্ব-পাকিস্তানে ১৯৬৯ সালে সংঘটিত গণ-অভ্যূত্থান ও তার পরবর্তী ঘটনার উল্লেখ করে। ইতিহাস নির্দেশ করে আমি দেখিয়েছি যে, ১৯৬৯ সালের বাঙালীর গণ-অভ্যূত্থানের সামরিক অধিগ্রহণ গণতন্ত্রে পরিণতি লাভ-তো করেইনি, বরং বাঙালী জাতির উপর গণহত্যা চাপিয়ে দিয়েছিলো ১৯৭১ সালে। সুতরাং অধ্যাপক ভ্যারোলের ডেমোক্র্যাটিক ক্যুদেতা একটি ভ্রান্ত তত্ত্ব।

    পরিশেষে আমি সতর্কতা উচ্চারণ করে বলেছি যে, এ্যাকাডেমিক লেভেলে প্রশংসিত অধ্যাপক ভ্যারোলের পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভ্রান্ত তত্ত্ব যদি বিশ্বরাজনীতির স্ট্যাট্রেজিক লেভেলে অনুমোদন লাভ করে, তাহলে অদূর ও সুদূর ভবিষ্যতে অনেক দেশেই সামরিক-অভ্যূত্থানের প্রবণতা উৎসাহিত হবে। বলাই বাহুল্য, সে-দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশও একটি। সে-বিবেচনায় ডেমোক্র্যাটিক ক্যুদেতা শুধু ভ্রান্ত তত্ত্ব নয়, বিপজনকও বটে।

    পরিবর্তনের পাঁচশর্ত
    গণ-অভ্যূত্থানের কাঙ্খিত সাফল্য বিষয়ে আমার নিজস্ব একটি তাত্ত্বিক অবস্থান আছে, যা বংলাদেশে ১৯৮০'র দশকে স্বৈরতন্ত্র-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতার সারসঙ্কলন করে পরবর্তীতে পাঁচশর্ত রূপে আমি লণ্ডনের রাজনৈতিক আলোচনা-চক্রে বিকশিত করেছিলাম। অদ্য এ-পাঁচশর্তের পুনরুল্লেখ আমি প্রাসঙ্গিক মনে করছি।

    অভিজ্ঞতা-আশ্রিত আগ্রহের কারণেই, মিসরের গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যূত্থান আমি লক্ষ্য করছি গত আড়াই বছর ধরে। তার ভিত্তিতে গত বছর ৩রা জুন লণ্ডনের সাপ্তাহিক পত্রিকায় ও ইউকেবেঙ্গলিতে ‘বাংলাদেশ ও মিসরঃ গণ-অভ্যূত্থানের ঐতিহাসিক শিক্ষা’ শিরোনামে আমি একটি মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেছিলাম। সেখানে আমার সমাপ্তি বাক্য ছিলোঃ

    “১৯৯০ সালে বাংলাদেশ একটি দারুন সুযোগ হারিয়েছে। পৃথিবীর নাগরিক হিসেবে আমার আশা, মিসরীয় গণ-অভ্যূত্থান যেনো ব্যর্থ না হয়।”

    আশার পেছনে যে-আশঙ্কা ছিলো, তার প্রত্যক্ষ উল্লেখ হয়তো প্রয়োজনীয় ছিলো না। তবে, পরিবর্তনের পাঁচশর্ত উল্লেখ করে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছিলামঃ

    “গণ-অভ্যূত্থান গড়ে ওঠার কালে যদি (১) জনগণের বিভিন্ন অংশের নিজস্ব দাবির ‘চার্টার’ গড়ে না ওঠে, (২) ঐ চার্টারকে ভিত্তি করে যদি সম্ভাব্য প্রতিটি স্থানে আলোচনা-আয়তন ও আন্দোলনের কর্ম-পরিষদ গড়ে না ওঠে, (৩) এই কর্ম-পরিষদগুলো যদি পরস্পরের সাথে সমন্বয় ও সংযোগ রক্ষা করে আন্দোলনকে একটি সাধারণ রাজনৈতিক লক্ষ্যে এগিয়ে না নিয়ে যেতে পারে, (৪) সংযোজিত ও সমন্বিত কর্ম-পরিষদগুলো যদি একটি আপোসহীন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে না আসে এবং (৫) এই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের যদি প্রচলিত ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের দর্শন ও কর্মসূচি না থাকে, তাহলে গণ-অভ্যূত্থান কিংবা গণ-অভ্যূত্থান-মূলক বিপ্লব ব্যর্থ হতে বাধ্য।”

    বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার সারসঙ্কলিত উপলব্ধির ভিত্তিতে আমি মিসরীয়দের করণীয় সম্পর্কে সে-লেখাতেই লিখেছিলামঃ

    “মিসরীয় বিপ্লবীদের করণীয় হবে শহরে-শহরে, গ্রামে-গ্রামে, সেক্টরে-সেক্টরে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা, সেখানে নিজস্ব স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়সমূহ নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক অব্যাহত রাখা, এবং শক্তিশালী কর্ম-পরিষদের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা উৎসাহিত করে আন্দোলনের সম্পৃক্তি ও শক্তি বৃদ্ধি করা। ১৯১৭ সালে বিপ্লবের প্রাক্কালে রাশিয়াতে যেভাবে জনগণের পঞ্চায়েত বা ‘সোভিয়েত’ গড়ে উঠেছিলো, যে-কোনো গণ-অভ্যূত্থানে জনগণের পক্ষের শক্তির উচিত হবে সেই ধরনের সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা। আর, দেশব্যাপী গড়ে ওঠা হাজার-হাজার সংগ্রাম পরিষদের সমন্বিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তন পেকে উঠবে, নিশ্চিত করতে হবে সেই পরিবর্তন যেনো এক-দফায় পর্যবসিত না হয়ে সংগ্রাম পরিষদের দাবীর প্রতি জবাদিহিমূলক হয়। এক মাত্র এ-রকম পরিস্থিতিতে গণ-অভ্যূত্থান জনগণের পক্ষে ফল নিয়ে আসে, অন্যথায় নয়।”

    পরিবর্তনে ব্যর্থতা
    মিসরের তাহরির আন্দোলন এখনও প্রচুর সম্ভাবনাময় হলেও, কখনও সেটি উপরে বর্ণিত গণ-অভ্যূত্থানের পাঁচশর্ত প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আশির দশকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মতোই মিসরের তাহরির আন্দোলন স্বৈরশাসকের অপসারণের একদাবির মধ্যে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলো। তাই একনায়ক হোসনে মুবারকের পতনের পর বিপ্লব সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে বলে মনে করা হয়েছিলো। কিন্তু সেটি ভুল। আমি মনে করি, উপরে লিখিত পাঁচশর্তের পঞ্চশিলা প্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া বিপ্লব সুদূর পরাহত।

    হোসনে মুবারকের পরিবার ও একান্ত পরিধি-নির্ভর দীর্ঘ-প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মধ্যে স্বাভাবিকভাবে খানিকটা শূন্যতা তৈরী হয়েছিলো তাঁর পতনের ফলে। কিন্তু সে-শূন্যতাকে পূরণ করার মতো পাঁচশর্তের প্রস্তুতি ছিলো না তাহরির আন্দোলনের। আবার, যেহেতু ক্ষমতার স্থলে স্থায়ী শূন্যতা সম্ভব নয়, তাই সে-শূন্যতা পূরণ করতে মুখোমুখি হয়ে এগিয়ে আসে মিসরের সর্বোচ্চ সংগঠিত দু’টি শক্তি – প্রথমতঃ সামরিক বাহিনী ও দ্বিতীয়তঃ মুসলিম ব্রাদারহূড। আর, চারপাশে গণ-অভ্যূত্থানের উত্তপ্ত তারল্যে ভাসতে থাকে স্বল্প সংগঠিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রী, উদার গণতন্ত্রী ও বামপন্থী শক্তিসমূহ।

    আমাদের বুঝতে হবে যে, সমাজদেহে সৃষ্ট অভ্যূত্থান যখন রূপতঃ ভূমিকম্পের মতো সমূদয় কাঠামোর মধ্যে সবল ঝাঁকুনি তৈরী করে, তখন প্রতিটি কাঠামোর শীর্ষারোহীদের মধ্যে পতনভীতি সঞ্চারিত হয়। সাধারণ এ-পতনভীতি স্বভাবতঃই শীর্ষাবস্থানকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার একটি সাধারণ বোধের জন্ম দেয়। বলাবাহুল্য, কাঠামোর ভীত্তিমূলে যাঁরা ঝাঁকুনি দেয়, তাঁদের মধ্যে সেই পতনভীতি বিরাজ করে না, কারণ তাদের অবস্থান সর্বনিম্নের হবার কারণে, পতনের কোনো ভয় থাকে না, বরং সম্ভাব্য পতন অবলোকন করার আনন্দে তারা উল্লসিত থাকে।

    ২০১১ সালের গণ-অভ্যূত্থান যখন মিসরের দীর্ঘ-প্রতিষ্ঠিত সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপতঃ ভূকম্পন সৃষ্টি করেছিলো, তখন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সুসংগঠিত সামরিক বাহিনী ও তাদের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম ব্রাদারহূডের মধ্যে টিকে থাকার একটি সাধারণ ঐক্যবোধ তৈরী হয়। কারণ, মিসরের সামাজিক অর্থনৈতিক শ্রেণী বিন্যাসে সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব ও মুসলিম ব্রাদারহূডের নেতৃত্ব উভয়ই শীর্ষারোহী। তাই, ভিত্তিমূলের জনসাধারণের গণ-অভ্যূত্থানে সৃষ্ট কম্পনে তাঁদের উভয়ের মধ্যেই অভিন্ন পতনভীতি ও আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার চেতনা তৈরী হতে বাধ্য।

    আড়াই বছর আগে আমরা লক্ষ্য করেছি, তাহরির আন্দোনের গোটা পর্যায়-কালে সেনাবাহিনীর সাথে মুসলিম ব্রাদারহূডের কোনো সংঘর্ষ বাঁধেনি। কারণ, তাহরির আন্দোলন মুসলিম ব্রাদারহূড তৈরী করেনি। এ-রকম আন্দোলন তৈরী করার কোনো অবস্থান ও কারণ ছিলো না তাদের। কেনো ছিলো না, তা উপরে ব্যাখ্যাত। বস্তুতঃ তাহরির স্কোয়ার মুসলিম ব্রাদারহূডের ছিলো না বলেই, দৃশ্যতঃ আজ সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে তাদেরকে ভিন্ন চত্বরে অবস্থান নিতে হয়েছে। 

    প্রশ্ন হতে পারেঃ তাহরির স্কোয়ার তাহলে কার ছিলো? স্পষ্টতঃ তাহরির স্কোয়ার কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছিলো না। এটি ছিলো স্বপ্রমাণিত ব্যর্থ রাজনৈতিক দলের পরিধির বাইরে অপেক্ষাকৃত তরুণ বয়সের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত ও সর্বহারা শ্রেণীর মানুষের দীর্ঘ বঞ্চনার বিরুদ্ধে হঠাৎ উত্থিত অমান্যতা ও প্রত্যাখানের আন্দোলন। বস্তুনিষ্ঠভাবে, এদের আন্দোলন শুধু হোসনে মুবারকেরই বিরুদ্ধেই ছিলো না, ছিলো গোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কিন্তু এ-অবস্থানটির মধ্যে প্রকৃত আত্মসচেতনতা ও উপযুক্ত কর্মসূচি-ভিত্তিক দিক নির্দেশনা ছিলো না। হয়তো দিক নির্দেশনা দেবার মতো দার্শনিক বোধ ও সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান তখনও এবং এখনও গড়ে ওঠেনি। 

    গণ-অভ্যূত্থানীদের মধ্যে যাঁরা মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত ছিলেন, তাঁরা জেনে বা না জেনে অধ্যাপক জিন শার্পের অহিংস অমান্যতার তত্ত্ব অনুসরণ করে আন্দোলন করেছেন মাত্র। শার্পীয় অহিংস আন্দোলন টেকটিক বা রণকৌশলের দিক দিয়ে সমৃদ্ধ হলে, স্ট্র্যাটিজি বা রণনীতির দিক দিয়ে দরিদ্র। কারণ, রণনীতির বিষয়টি আসে ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র ও জীবন-জগৎ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দার্শনিক উপলব্ধি থেকে।

    এক কদম আগে
    মিসরের ২০১১ সালের গণ-অভ্যূত্থানে পাঁচশর্ত পূরিত না হওয়া সত্ত্বেও গণতন্ত্রের পথে এক কদম অগ্রগমণ ছিলো। কারণ, ১৯৫২ মিসরের রাজা ফারুকের রাজতন্ত্রকে হটিয়ে দিয়ে রিপাবলিক বা জনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার করলেও বাস্তবে দেশটিতে যে-সামরিকতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তার পরম্পরায় শেষ পর্যন্ত সেনাশাসক হোসনে মুবারক মিসর শাসনে যে-পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন, ২০১১ সালে তাঁর পতনের মধ্য দিয়ে তা ভেস্তে যায়। জনগণের জন্য এটি একটি অর্জন বটে।

    কিন্তু এ-পরিবর্তন পাঁচশর্তের পঞ্চশিলায় ভিত্তিষ্ঠিত না হয়ে এক ব্যক্তির পতনের দাবিতে বিকশিত হওয়ার কারণে মুসলিম ব্রাদারহূডের মতো আদর্শগতভাবে গণতন্ত্র বিরোধী শক্তির প্রতিভূ হিসেবে মোহাম্মদ মুর্সি অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে রূপতঃ ‘ফারও’ হয়ে আর্বিভূত হলেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও বিধিবিধান প্রতিষ্ঠিত ও নিশ্চিত না করে শুধুমাত্র নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা মুসলিম ব্রাদারহূডের মুর্সি বাস্তবে পূর্বর্তী এক ব্যক্তির স্বৈরশাসনের বদলে মুসলিম ব্রাদারহূডের স্বৈরশাসনের প্রতিষ্ঠা করলেন অচিরেই।

    মিসরের গণ-অভ্যুত্থানের একটি শক্তিশালী ও সম্ভবতঃ অনন্য দিক হচ্ছে যে, এটি গত আড়াই বছর যাবত নির্বাপিত হয়নি। ফলে গণ-অভ্যূত্থানের অনির্পাবিত চেতনার আলোতে আন্দোলনকারীরা রুখে দাঁড়ালেন মুসলিম ব্রাদারহূড তথা মুর্সির বিরুদ্ধে।

    দু’কদম পিছে
    কিন্তু আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, মিসরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণ-অভ্যূত্থানের চেতনার আপেক্ষিক পশ্চাৎপদতার কারণে আন্দোলনকারীগণ তাৎক্ষণিক স্বৈরতন্ত্রকে হটাতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করে বসলেন পূর্ববর্তী স্বৈরতন্ত্রের ‘পাওয়ার হাউস’ সামরিক বাহিনীর কাছে। অবশ্য, এর পেছনে কিছু ঐতিহাসিক কারণ সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের মোহ হিসেবে কাজ করে থাকবে।

    মিসরের ইতিহাসে রাজতন্ত্রের পতন, আমূল ভূমি সংস্কার, ইঙ্গ-ফরাসী সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সুয়েজ খালের জাতীয়করণ, পাশ্চাত্য সমর্থনপুষ্ট ইসরায়লের বিরুদ্ধে দু'টি যুদ্ধ, বৃহত্তর আরব জাতীয়তাবাদের জন্ম দেওয়া ইত্যাদিতে গামাল আব্দেল নাসেরের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকার কারণে জনগণের মধ্যে এখনও সেনাবাহিনী সম্পর্কে এক ধরনের স্মৃতিকাতরতা কাজ করে। আর, সেকারণেই গণ-অভ্যূত্থানের শক্তি মুসলিম ব্রাদারহূডের সর্বাত্মকবাদী শাসন থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বিনা প্রতিবাদে সামরিক বাহিনীর হাতে সংবিধানের তথা গণতন্ত্রের স্থগিতকরণ মেনে নিলো।

    বস্তুনিষ্ঠ বিচারে, এটি নিঃসন্দেহে মিসরের গণতন্ত্র ও গণ-অভ্যূত্থানের জন্যে দু’কদম পশ্চাদাপসরণ। কারণ, ২০১১ সালে পতিত প্রেসিডেণ্ট হোসনে মুবারের পশ্চাতে থাকা দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত সামরিক কর্তৃত্ব পিছে হটে গণতন্ত্রের জন্য জায়গা ছেড়ে দিলেও বর্তমানে তার পুরনো ছেড়ে দেওয়া জায়গা পুনর্দখল করে নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে। ফলে, মিসরের রাজনীতির সমীকরণে রাষ্ট্রক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে মুসলিম ব্রাদারহূড এবং মুসলিম বাদারহূডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের পক্ষে সেনাবাহিনী ও সেনাবাহিনীর পক্ষে আন্দোলনকারীগণ।

    অর্থাৎ, প্রকৃত আন্দোলনকারী শক্তি নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান অন্ততঃ এই মুহূর্তের জন্য হলে হারিয়ে কিছুদিনের জন্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেলো। আপাততঃ রাজনীতি নির্ধারিত হবে সামরিক বাহিনী ও মুসলিম ব্রাদারহূডের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভিত্তিতে, যা শ্রেণীগতভাবে মৌলিক নয় বলেই জনগণের জন্যে ইতিবাচক কিছুই নিয়ে আসবে না।

    পরিবর্তনের পাঁচশর্ত তত্ত্ব থেকে আমরা শিক্ষাই পাই যে, সমাজ পরিবর্তনের দর্শনের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও উপযুক্ত নেতৃত্বদায়ী সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও তার নির্ণায়ক ভূমিকা গ্রহণ ছাড়া গণ-অভ্যূত্থান তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না। (চলবে)

    রোববার, ২৮ জুলাই ২০১৩
    স্কারবরো, টোরণ্টো
    অণ্টারিও, ক্যানাডা
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন