• মিসরে গণ-অভ্যূত্থানঃ বিপ্লব থেকে প্রতিবিপ্লব
    মাসুদ রানা

    মুসলিম ব্রাদারহূডের বিরুদ্ধে বিকাশমান গণ-অভ্যূত্থান ছিনতাই করে মিসরের সেনাবাহিনী গত ৩রা জুলাই যে প্রকৃতই একটি সামরিক অভ্যূত্থান সংঘটিত করেছে, সে-বিষয়ে এক্ষণে সম্ভবতঃ সন্দেহের আর অবকাশ নেই। ২০১১ সালের তাহরির স্কোয়ারের গণ-অভ্যূত্থানকে যদি বিপ্লব বলা যায়, তাহলে ২০১৩ সালের সেই একই তাহরির স্কোয়ারের গণ-অভ্যূত্থান রূপান্তরিত সামরিক-অভ্যূত্থানকে বলতে হবে প্রতিবিপ্লব।

    প্রতিবিপ্লবের বিবিধ বৈশিষ্ট্যের একটি হচ্ছে পুরনো রেজিমের পুনঃপ্রতিষ্ঠা কিংবা অনুরূপ কিছুর প্রচেষ্টা। প্রাক্তন ও পতিত স্বৈরশাসক হোসনি মুবারকের এ-সপ্তাহে কারাগার থেকে আইনতঃ মুক্তিলাভ সে-প্রতিবিপ্লবেরই ইঙ্গিতবহ। মুবারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ও বিচার প্রক্রিয়াগুলোই হয়েছে তাঁকে পার করিয়ে দেওয়ার মতো। কিন্তু এটি কীভাবে সম্ভব হলো? এর নির্দিষ্ট কারণ প্রায়োগিক অনুসন্ধানের বিষয় হলেও এর সাধারণ কারণ-সমূহের তাত্ত্বিক উপলব্ধি গড়ে তোলা তেমন কঠিন কিছু নয়।

    প্রকৃত প্রস্তাবে মিসরের প্রতিবিপ্লবটি শুরু হয়েছিলো নীরবে ২০১১ সালের প্রথম বিপ্লবের জন্ম থেকেই। সে-প্রতিবিপ্লরের সম্মুখ ভাগে ছিলো মুসলিম ব্রাদারহূড, আর এর দূর-নিয়ন্ত্রক ছিলো মিসরীয় সমাজের প্রবল ও প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী-সমূহের শীর্ষ সংরক্ষক-সংগঠন সেনাবাহিনী। এ-দু’শক্তি মিলেই তাহরির স্কোয়ারের প্রথম গণ-অভ্যূত্থান বা গণতন্ত্রিক বিপ্লবকে থামিয়ে দিয়েছিলো।

    একই সামাজিক শ্রেণীভূক্ত হবার পরও উৎস-বিকাশগত, পরিচয়-প্রকরণগত ও সংস্কৃতি-ঐতিহ্যগত বিবেচনায় সেনাবাহিনী ও মুসলিম ব্রাদারহূডের মধ্যে পার্থক্য থাকার কারণে প্রতিবিপ্লবে দরদস্তুরিত ক্ষমতার ভাগাভাগিতে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিলো বিপ্লবোত্তর নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহূডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুর্সির ক্ষমতায় আসীন হবার পর-পরই।

    প্রেসিডেণ্ট মুর্সির জন্য চ্যালেইঞ্জ ছিলো দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত সেনাবাহিনীর কব্জা থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রটিকে নিজেদের হাতে নিয়ে এসে তাদের বিশ্বাসিত ও প্রচারিত ইসলাম ধর্মের পথে পরিচালিত করা। তাঁর সামনে মডেল বা নমুনা হিসবে ছিলো তুরষ্ক - অর্থাৎ, গণতন্ত্রের বিধিবিধান কাজে লাগিয়ে ও সেনাবাহিনীতে পরিবর্তন ঘটিয়ে তাদেরকে রাজনৈতিক ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে রাখা।

    আর, সেনাবাহিনীর জন্য চালেইঞ্জ ছিলো গণতন্ত্রের নামে মুসলিম ব্রাদারহূড যাতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ছিনিয়ে নিতে না পারে, তার সুরক্ষা করা। এ-দ্বন্দ্বে মুসলিম ব্রাদারহূড আপাততঃ পরাজিত হয়েছে। কারণ, তূল্য-বিচারে সংগঠন হিসেবে মুসলিম ব্রাদারহূড মিসরীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে সর্বোতোভাবে দূর্বল।

    অধিকন্তু, যার বলে মুসলিম ব্রাদারহূড সেনাবাহিনীর সাথে দরদস্তুর করার যোগ্যতা ও ক্ষমতা অর্জন করেছিলো, রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার পর তারা তা হারিয়ে ফেলেছিলো। আর সেনাবাহিনী সেটি কুড়িয়ে পেয়ে মুসলিম ব্রাদারহূডের চেয়ে বহুগুণ শক্তিশালী হয়ে গিয়েছিলো। সেটি কী?

    সেটি হচ্ছে আপন জীবন পরিবর্তনের জন্য রাস্তায় উচ্চকিত ও লড়াকু মিসরীয় জনগণ, যাঁরা প্রধানতঃ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমাবেশিত হয়েছিলো তাহরির স্কোয়ারে। এ-জনতাকেই ২০১১ সালের প্রথম গণ-অভ্যূত্থানে কুড়িয়ে পেয়েছিলো মুসলিম ব্রাদারহূড এবং এ-জনতাকেই ২০১৩ সালে কুড়িয়ে পেয়েছে সেনাবাহিনী।

    পক্ষের না হওয়া সত্ত্বেও এ-দু’শক্তির হাতে জনগণের এ-সহজলভ্যতার কারণ কী? কারণ হচ্ছেঃ জনগণের মাঝে কোনো সুসংবদ্ধ দার্শনিক বোধের অভাব; সুবিন্যস্ত সংগঠন ও সুবিস্তৃত সংজালিকার অভাব; সুবিকশিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত নেতার অভাব; সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সুগ্রথিত কর্মসূচির অভাব। তবে, যা তখনও বর্তমান ছিলো এবং এখনও আছে, তা হচ্ছে জনগণের মধ্যে পুঁজিবাদী শোষণ ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের কারণে প্রবল জীবন-যন্ত্রণা এবং এ-যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসার সবল আকাঙ্খা।

    যন্ত্রণাক্লিষ্ট অথচ আশায় উজ্জীবিত এ-মানুষগুলো হচ্ছেন প্রধানতঃ মিসরের শ্রমিক শ্রেণীর, যার পুরোভাগে রয়েছেন বয়ন-বস্ত্র-পোষাক শিল্পের শ্রমিকগণ। বাংলাদেশের মতোই বয়ন-বস্ত্র-পোষাক শিল্প হচ্ছে মিসরের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং বাংলাদেশের মতোই এ-শিল্পের শ্রমিকেরা হচ্ছেন মিসরের শ্রমজীবী মানুষের অগ্রগামী লড়াকু বাহিনী।

    বাংলাদেশে যেমন সোনালী আঁশ পাটকে ভিত্তি করে পঞ্চাশের দশকে  গড়ে উঠেছিলো আদমজী জুট মিলস, তেমনিভাবে বিশ্ববিখ্যাত ইজিপ্‌শিয়ান কটন, যা নীল নদের অববাহিকায় উৎপাদিত তূলো থেকে ঊনবিংশ শতকে উদ্ভাবিত হয়, তাকে কেন্দ্র করেই বিশ শতকের বিশের দশকে গড়ে উঠেছিলো মিসর স্পিনিং এ্যাণ্ড ওয়েইভিং কোম্পানী। এতে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিলো আদমজীর শ্রমিক সংখ্যার প্রায় সমান - সিকি লক্ষাধিক।

    আদমজী জুট মিলস যেভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৯৫১ প্রতিষ্ঠিত হয়ে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র-মালিকানাধীন হয় এবং পরবর্তীতে বিশ্বব্যাঙ্কের পরামর্শে তথা নির্দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়, তেমনিভাবে ১৯৫২ সালে মিসরে রাজতন্ত্রের অবসানের পর  ১৯৬০ সালে মিসর স্পিনিং এ্যাণ্ড ওয়েইভিং কোম্পানীও রাষ্ট্রীয়-মালিকানাধীন হয় এবং পরবর্তীতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের নির্দেশে স্ট্র্যাকচারাল এ্যাডজাস্টমেন্টের নামে এর উৎপাদিকা শক্তির ক্ষতি করা হয়।

    বস্তুতঃ মিসর স্পিনিং এ্যাণ্ড ওয়েইভিং কোম্পানীর শ্রমিকরাই ২০০৬ সাল থেকে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় প্রথমে মিসরের শিল্প-শ্রমিকদের মধ্যে এবং পরিবর্তীতে সমাজের অন্যান্য শ্রেণী ও অংশের মধ্যে আন্দোলনের জোয়ার তোলেন। সে-বছরের ডিসেম্বরে গার্মেন্ট শ্রমিকদের মধ্য থেকে ৩,০০০ নারী ধর্মঘটে নেমে ‘আমরা নারীরা হেথায়, তোমরা পুরুষেরা কোথায়?’ স্লৌগান দিয়ে ফ্যাক্টরী ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলে এক অভূতপূর্ব শ্রমিক জাগরণ শুরু হয়।

    মিসর সম্পর্কে অনুসন্ধানীরা জানেন যে, ২০১১ সালের গণ-অভ্যূত্থানের স্বৈরশাসক হোসনে মুবারকের পতনের পেছনে যে-শক্তি কাজ করেছে, তা হচ্ছে মিসরের শ্রমিক শ্রেণী ও তাঁদের সাথে একাত্ম নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণ-তরুণীগণ। তবে দুঃখজনকভাবে লক্ষ্যণীয় যে, বঙ্গদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই মিসরে তাহরির চত্বরের মুবারক-বিরোধী গণ-অভ্যূত্থানকে মুসলিম ব্রাদারহূডের কাজ বলে স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে মনোবৃত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু, বাস্তবে তাঁরা যে কতো ভ্রান্ত ছিলেন, তা স্বপ্রমাণিত হয়েছে ২০১৩ সালের একই তাহরির স্কোয়ার থেকে মুর্সি-বিরোধী আন্দোলন দেখে তাঁদের তাৎক্ষণিক পক্ষাবলম্বনের মধ্য দিয়ে।

    বস্তুতঃ মুসলিম ব্রাদারহূড যেভাবে চাতুরীর সাথে তাদের সংগঠিত সমাবেশ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে তাহরির স্কোয়ারের গণ-অভ্যূত্থানকে নিজেদের বলে দেখাতে চেয়েছে, উপরে উল্লেখিত বুদ্ধিজীবীগণও সেভাবে দেখেছেন। আর, রাষ্ট্রযন্ত্র আকড়ে ধরা ও পতনোন্মুখ সামরিক কর্তৃত্বের কাছে মুসলিম ব্রাদারহূড এ-প্রদর্শনীর ভিত্তিতেই নিজেদেরকে প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে নেয়। অভূতপূর্ব গণ-অভ্যূত্থানে ভীত সামরিক কর্তৃত্বও 'অচেনা শত্রুর চেয়ে চেনা শত্রু শ্রেয়' বিবেচনায় মুসলিম ব্রাদারহূডের সাথে হাত মিলিয়ে চলমান বিপ্লবী অভ্যূত্থানকে থামিয়ে দেয়।

    আমরা মুসলিম ব্রাদারহূডের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাবো যে, এরা অতীতে সহিংস বিপ্লবের পথে ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ হেঁটে মিসরের সামরিক রাষ্ট্রের হাতে মার খেয়ে-খেয়ে হতাশ হয়ে সে-পথ ত্যাগ করে ‘শান্তি’র পথে এসেছে। যাহোক, আদি পথ ত্যাগ করলেও, এরা এদের লক্ষ্য ত্যাগ করেনি।

    তাই, মুসলিম ব্রাদারহূড মিসরের সমাজের মধ্যে অর্থে-বিত্তে, ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে কল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে জনগণকে বৈষয়িক সুবিধাদানের মধ্য দিয়ে ভৌটারে পরিণত করে গণতান্ত্রিক ফ্রেইমওয়ার্কের মধ্যে ক্ষমতায় যেতে যায়। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি, ক্ষমতায় যাবার পর তারা পার্লামেণ্টকে ব্যবহার করে আইন তৈরীর মাধ্যমে ইসলামী বিধি-বিধান আরোপ করতে চায়।

    মুসলিম ব্রাদারহূড যেহেতু দর্শনে ও বিশ্বাসে মৌলবাদী, তাই তাদের বিশ্বাসিত ইসলামী বিধি-বিধান বাস্তবায়নের পথে কোনো কনসেশন দিতে বা আপোষ করতে প্রস্তুত নয়। বিভিন্ন বিশ্বাসের নাগরিকদের সাধারণ সংস্থা হিসেবে রাষ্ট্রের সেক্যুলার হওয়াই যে সবচেয়ে ন্যায্য, সেটি তারা মানতে চায় না। তারা সমর্থন চায় সবার, ভৌট চায় সবার, কিন্তু ভৌট পেয়ে ক্ষমতায় গিয়ে বাস্তবায়িত করতে চায় একটি মাত্র বিশ্বাস। আর এখানেই গণতন্ত্রের সাথে রাজনৈতিক ইসলামবাদীদের অমীমাংসেয় দ্বন্দ্ব সারা পৃথিবী জুড়ে।

    যুক্তির বিচারে, বহু ধর্ম-বিশ্বাসের সমাজে গণতান্ত্রিক পথে রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে একটি ধর্ম-বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠা অনৈতিক, কারণ এটি সংজ্ঞানুসারে গণতন্ত্র সংহারক। এ-অনৈতিকতা ঘুচাবার একমাত্র পথ হচ্ছে মৌলবাদ ত্যাগ করা অথবা উদ্দেশ্য জানান দিয়ে বিপ্লবের পথে যাওয়া।

    প্রসঙ্গতঃ আমাদের একটি মৌলিক বিষয় বুঝতে হবেঃ নির্বাচনের বিজয় আমাদেরকে বিপ্লবে লভ্য সর্বাত্মক পরিবর্তনের অধিকার দেয় না। নির্বাচন হচ্ছে আপোষ-আলোচনার ভিত্তিতে নিয়ম ঠিক করে অস্থায়ী হার-জিত তথা পালাবদলের সম্ভাব্যতা মেনে নেওয়া একটি খেলা। বিপরীতে, বিপ্লব হচ্ছে চিরস্থায়ী হার-জিত নির্ধারণের একটি যুদ্ধ। যুদ্ধের নৈতিকতা খেলায় চলে না। যুদ্ধের বিজয়ী বিজিতের পরমার্শ নেয় না। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী শক্তিকে পরাজিতের সাথে আপোষে চলতে হয়। গণতন্ত্র মানবো কিন্তু আপোষ করবো না, ভাগ দেবো না, তা হয় না।

    মুসলিম ব্রাদারহূডের সমস্যা হচ্ছে, ওরা নির্বাচনের পথে বিপ্লবে লভ্য ফল আনতে চেয়েছে। অর্থাৎ, বিপ্লবী না হয়ে এবং বিপ্লব না করেই বিপ্লবের ফল ফলাতে চেয়েছে মুসলিম ব্রাদারহূড। একদিকে গণতন্ত্রে অন্তর্নিহিত অংশীদারিত্বের নীতি স্বীকার করে ক্ষমতায় গিয়ে, বাস্তবে বিপ্লবের মতো সর্বাত্মক-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকার চর্চা করতে চেয়েছে ওরা।

    আমার ধারণা, মুসলিম ব্রাদারহূডের এ-মনোভঙ্গি ও আচরণের পেছেনে কাজ রয়েছে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। শুধু মুসলিম ব্রাদারহূড নয়, বাংলাদেশ-সহ পৃথিবীর দেশে-দেশে মুসলিম ব্রাদারহূডের সম-আদর্শের প্রায় সবগুলো দলই ভূগছে এ-দ্বন্দ্বে। আর, এটি হচ্ছে জবরদস্তিমূলক রণনীতির (coercive strategy) সাথে সম্মতিবাদী রণকৌশলের (consensual tactic) দ্বন্দ্ব।

    মুসলিম ব্রাদারহূড এ-নৈতিক দ্বন্দ্বে ভোগার কারণেই একের পর এক ভুল করেছে। ওরা মর্মে গণতান্ত্রিক নয় বলে গণতন্ত্রের ধারণ ও সংরক্ষণ করা ওদের পক্ষে কঠিন। প্রেসিডেণ্ট হিসেবে শেষ বক্তৃতায় মোহাম্মদ মুর্সিও ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন, যদিও কী ভুল করেছেন, তার উল্লেখ করেননি।

    স্পষ্টতঃ সেনাবাহিনী অনেক দূর পর্যন্ত অনুল্লিখিত ভুল-সহ মুর্সিকে ‘সহ্য’ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে মুর্সির আরোপিত তাৎপর্য্যপূর্ণ পরিবর্তনও মেনে নিয়েছিলো সেনাবাহিনী। এমনকি, মুর্সিকে প্রাচীন মিসরের ফারাও বা সম্রাটের মতো পরম ক্ষমতার মালিকও হতে দিয়েছে ওরা। কিন্তু যখন দেখা গেলো মুর্সির দল মুসলিম ব্রাদারহূড নির্বাচনে জিতে বিপ্লবে বিজয়ীর মতো আচরণ করছে এবং কোনো ধরণের ভাগ না দিয়ে সর্বস্ব নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, তখনই মুর্সি তথা মুসলিম ব্রাদারহূডের বিরুদ্ধে খেলার নিয়ম ভাঙ্গার অভিযোগ তুলেছে সেনাবাহিনী। ৩রা জুলাই'র মধ্যে আপোষে আসতে প্রকাশ্য সীমা বেঁধে দিয়েছিলো সেনাবাহিনী।

    সেনাবাহিনী এহেন স্পর্ধিত আচরণ করতে পেরেছিলো এ-জন্যেই যে, তাহরির আন্দোলনের অন্যান্য শক্তিগুলো গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী প্রেসিডেণ্ট মুর্সি ও মুসলিম ব্রাদারহূডের সর্বগ্রাসী আচরণে বিক্ষুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো। তাই, ইসলামবাদী আল-নূর পার্টি থেকে শুরু করে ধর্মনিরপেক্ষ ন্যাশনাল স্যালভেশন ফ্রণ্ট পর্যন্ত (যার মধ্যে বামপন্থীরাও আছেন) সকলেই সেনাবাহিনীর আল্টিমেটামে বেশ খুশি হয়েছিলো। আর, এখানেও সম্ভবতঃ শ্রেণী-সহজাত প্রবৃত্তি কাজ করে থাকবে।

    মিসরের তাহরির স্কোয়ারের অহিংস অমান্যতার আন্দোলন যদি মিসরের প্রান্তিক শ্রেণীসমূহের স্বার্থে উপযুক্ত নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত হতো, তাহলে সেখানকার সে-নেতৃত্ব সেনাবাহিনীর আল্টিমেটামের বিরুদ্ধে আন্দোলনের দ্বিতীয় ফ্রণ্ট ঘোষণা করতো। সেনাবাহিনীকে পাল্টা আল্টিমেটাম দিয়ে হুঁশিয়ারি দিতো। কিন্তু ইসলামিস্ট থেকে কমিউনিস্টরা পর্যন্ত সেনাবাহিনীর মুর্সি-বিরোধী আল্টিমেটামে আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন।

    রূপতঃ মূর্সিকে কিন্তু সামরিক বাহিনী লাল কার্ড দেখিয়েই রাজনীতির খেলার মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। বিশ্ব-শক্তি খেলার নিয়ম জানে। তাই, প্রায় সবাই মিসরের রাজনীতির খেলার ফলাফল নীরবে মেনে নিয়েছে।

    যে জনগণ প্রাণ যেতে পারে জেনেও অহিংস-অমান্যতার আন্দোলনের যোগ দেন, তাঁদের কাছে কিন্তু এটি খেলা নয়। এটি তাঁদের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। ধুঁকে-ধুঁকে তিলে-তিলে মৃত্যুর চেয়ে উন্নততর জীবনের জন্যে ঝুঁকি নিয়ে বিজয়ী হওয়ার সংগ্রাম এটি।

    কিন্তু হায়, যদি না সঠিক নেতৃত্বে সঠিক পথে এ-সংগ্রাম পরিচালিত হয়, লক্ষ প্রাণের বিনিময়েও প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে না। দুঃখের ব্যাপার হলো মিসরের গণ-আন্দোলনের নেতৃত্ব রাজনৈতিক চিন্তায় এখনও পশ্চাৎপদ। আর পশ্চাৎপদ বলেই গণ-অভ্যূত্থানের ফলকে সেনাবাহিনীর হাতে ছিনতাই হতে দেখেও তাঁরা স্বস্তিতে থাকতে পারেন।

    আমি আমার লেখার পূর্ববর্তী একটি পর্বে উল্লেখ করেছিলাম, মিসরে সেনাবাহিনীর প্রতি জনগণের একটি মোহ আছে এবং এর কিছু ঐতিহাসিক কারণও আছে। পঞ্চাশের দশকে সেনাপতি-রূপান্তরিত-রাষ্ট্রপতি গামাল আব্দেল নাসের কতিপয় ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মৃতি হয়ে মিসরীয় জনগণের মনোজগতে সেনাবাহিনীর প্রতি একটি শ্রদ্ধার ভাব এখনও ক্রিয়াশীল রেখেছে।

    নাসেরের ঐতিহাসিক ভূমিকার মধ্যে রয়েছে, ১৯৫২ সালে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ, জনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা ও ভূমিসংস্কার, ১৯৫৬ সালে ইঙ্গ-ফরাসী শক্তির হাত থেকে অর্থকরী সুয়েজ খালের জাতীয়করণ, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ ও ১৯৬৭ সালের দু-দু’টি যুদ্ধ। এ-বিষয়গুলো মিসরীয়দের মধ্যে কাজ করে থাকে অনেকটা বাংলাদেশের শাসক দল আওয়ামী লীগের প্রতি বাংলাদেশীদের মধ্যে ক্রিয়াশীল ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ মতো।

    তবে আমাদের বুঝতে হবে, যে-সেনাবাহিনী রাজা ফারুকের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে, রিপাবলিক বা সাধারণতন্ত্রের নামে, বাস্তবে সেনাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে গত ছয় দশক ধরে কর্তৃত্ব ও সুবিধা ভোগ করে আসছে, একটি সুসংগঠিত ও সশস্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে সে-সেনাবাহিনী তাঁদের সে-কর্তৃত্ব ও সুবিধাদি স্বল্প-সংগঠিত নিরস্ত্র শক্তির কাছে ছেড়ে দিয়ে ‘জনগণের সেবক’ হয়ে থাকবে, এ-রকম প্রস্তাবনা একটি ইউটোপিয়া বা কল্পনা না হয়ে পারেই না।

    সোমবার, ২৬ অগাষ্ট ২০১৩
    নিউবারীর পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন