• মিসরে গণ-অভ্যূত্থানঃ সামরিক ছিনতাই
    মাসুদ রানা

    মিসরের গুরুত্ব
    বর্তমান-কালে বিশ্ব-শক্তিগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শক্তি-প্রদর্শনের রঙ্গমঞ্চ মধ্যপ্রাচ্য। কারণ সহজবোধ্যঃ আধুনিক সভ্যতা চলন্ত রাখার অপরিহার্য্য জ্বালানী তথা খনিজ তেলের শ্রেষ্ঠ ভাণ্ডার রয়েছে সেখানে।

    মধ্যপ্রাচ্যের সর্বপ্রাচীন সভ্যতা ও সর্ববৃহৎ জনসংখ্যার দেশ মিসর, যা শুধু প্রাচীন যুগেই নয়, মধ্য ও আধুনিক যুগেও তার প্রভাবশালী ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। মিসরের রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কোয়ার বিশ্ববিখ্যাত হয়ে উঠেছে স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে অহিংস অমান্যতার সার্থক নগরচত্বর-আন্দোলনের শ্রেষ্ঠতম প্রতীক হিসেবে।

    একই তাহরির স্কোয়ার থেকে গণ-আন্দোলনে সৃষ্ট গণ-অভ্যূত্থানের মাধ্যমে ২০১১ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারীতে প্রেসিডেণ্ট হোসনি মুবারকের পতন ঘটনার পর, ২০১৩ সালের ৩রা জুলাই প্রেসিডেণ্ট মোহাম্মদ মুর্সিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা - অর্থাৎ, আড়াই বছরের ব্যবধানে পর-পর দু’জন প্রেসিডেণ্টের পতন ঘটানো - ঐতিহাসিক বিবেচনায় অসামান্য বটে।

    আমি আগেও বলেছি যে, মিসরের তাহরির স্কোয়ার শুধু মিসরের জন্যেই নয়, সারা বিশ্বের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ একটি আন্দোলন। কারণ, বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক বিকাশের বর্তমান পর্যায়ে, বিশ্ববাসীর রাজনৈতিক বোধের বর্তমান মাত্রায়, অহিংস অমান্যতার নগরচত্বর-আন্দোলন রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি পদ্ধতি হিসেবে ইতোমধ্যে অন্যান্য দেশে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হলেও, মিসরের ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে তাহরির স্কোয়ার আন্দোলনের প্রভাব ও প্রতিপত্তি অসামান্য হতে বাধ্য।

    স্বাভাবিক বিতর্ক
    এহেন মিসরের গণ-নির্বাচিত প্রেসিডেণ্টকে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা-যে বিশ্বজোড়া বুদ্ধিজীবীদেরকে আলোড়িত করবে, তা স্বাভাবিক। আর, এটিও স্বাভাবিক যে, এ-ঘটনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্কও থাকবে।

    কেউ বলছেন, মুর্সির ক্ষমতাচ্যুতি হচ্ছে একটি মিলিট্যারি ক্যুদেতা বা সামরিক অভ্যূত্থান। আবার কেউ বলছেন এটি গণ-অভ্যূত্থান। কেউ-কেউ একে বিপ্লব পর্যন্ত বলছেন। বস্তুতঃ বিতর্কের পক্ষ ও প্রতিপক্ষ নির্ধারিত হচ্ছে পার্থক্যপূর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিবোধের ও স্বার্থবোধের ভিত্তিতে।

    বিশ্লেষণ ও বিতর্কে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যতোই পার্থক্য থাকুক না কেনো, ঘটনা কিন্তু নির্বিকার অপরিবর্তিত থেকে যাবে আমাদের ইচ্ছা ও চিন্তা-নিরপেক্ষভাবে। বিতর্ক অনন্তকাল চললেও এ-ঘটনার পরিবর্তন হবে না।  বোধে ও ব্যাখ্যায় ঘটনার বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করা কঠিন। হয়তো শতোভাগ অর্জন করা সম্ভব নয়। কিন্তু আবেগ-নিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণ-পদ্ধতি অবলম্বন করলে শতোভাগ বস্তুনিষ্ঠতার দিকে নিকটবর্তী হওয়া সম্ভব।

    বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখতে পারার মতো অবস্থান ও ক্ষমতা থাকলে এটি দেখা সম্ভব যে, মিসরের ঘটনা কোনো অবিমিশ্র গণ-অভ্যূত্থান কিংবা অবিমিশ্র কোনো সামরিক অভ্যূত্থান নয়। বলা যায়, মিসরের ক্ষমতার পটপরিবর্তন বস্তুতঃ এ-দু’টিরই সংমিশ্রণ।

    দৃশ্যতার মাত্রায় পার্থক্য থাকলেও, তাহরির স্কোয়ারের দু’টি গণ-অভ্যূত্থানের পরিণতিতে প্রায় একই ঘটনা ঘটেছেঃ গণ-আন্দোলন যখন গণ-বিপ্লবের সীমান্তবর্তী হয়, তখনই সামরিক বাহিনী এসে ধিকৃত প্রেসিডেণ্টের কাছ থেকে ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় এবং জনগণকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতিতে একটি পথমানচিত্র তুলে ধরে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তৈরী করে অবস্থিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সংরক্ষণ করে।

    গণতন্ত্রের পথে যাবার জন্য এই যে সামরিকতন্ত্রের আরোপ, মার্কিন অধ্যাপক ওযাল ভ্যারোল তার নাম দিয়েছেন ‘ডেমোক্র্যাটিক ক্যুদেতা’। হার্ভার্ড ইণ্টারন্যাশনাল ল জার্নালে প্রকাশিত এক রচনায় অধ্যাপক ভ্যারোল ১৯৬০ সালে তুরষ্কে, ১৯৭৪ সালে পর্তুগালে ও ২০১১ সালে মিসরে সংঘটিত গণ-অভ্যূত্থানের পরিণতিতে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিতার কাহিনী বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করে ডেমোক্র্যাটিক ক্যুদেতার তত্ত্ব নির্মাণ করেছেন।

    তিনি দাবি করেছেন যে, গণ-অভ্যূত্থানের প্রতি সাড়া দিয়ে যে-সামরিক অভ্যূত্থান হয়, তাতে সামরিক বাহিনী সংবিধানে নীতিগত অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, যাকে বলা যায় গণতান্ত্রিক সেনা-অভ্যূত্থান। অধ্যাপক ভ্যারোলের ডেমোক্র্যাটিক ক্যুদেতার তত্ত্ব আমার কাছে রূপতঃ একটি সোনার পাথরবাটি! আমি আমার পরবর্তী কোনো এক লেখায় ভ্যারোলের তত্ত্বের উপর বিস্তারিত আলোকপাত করবো।

    তবে, এখানে সতর্কতা উচ্চারণ করে আমাকে বলতেই হবেঃ এ্যাকাডেমিক জগতে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বীকৃতি পাওয়া ডেমোক্র্যাটিক ক্যুদেতার তত্ত্ব যদি স্ট্র্যাটেজিক জগতেও রাজনৈতিক স্বীকৃতি লাভ করে, তাহলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নয়, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতেও গণতন্ত্র বিপদগ্রস্ত হবে। কারণ, সামরিক অভ্যূত্থানকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে এ-তত্ত্ব পশ্চিমা গণতন্ত্র-সমূহের কাছে রাজনৈতিক যৌক্তিকতা ও আদর্শিক নৈতিকতা সরবরাহ করবে অনায়াসে।

    অধ্যাপক ভ্যারোলের পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা থেকে নিজেকে আপাততঃ বিরত রেখে শুধু তাঁর জেনারালাইজেশনের ভ্যালিডিটি বা সাধারণীকরণের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করবো। ভ্যারোল যদি ১৯৬০ সালের ইউরেশিয়া থেকে ২০১১ সালের আফ্রিকা পর্যন্ত পর্বেক্ষণ করলেন, তাহলে তিনি ১৯৬৯ সালের দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন পরম মিত্র পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্ব প্রদেশ তথা পূর্বপাকিস্তান, তথা পূর্ববাংলা, তথা বাংলাদেশে সংঘটিত অতিতাৎপর্যপূর্ণ গণ-অভ্যূত্থানটি অনুধ্যান করলেন না কেনো? বাংলার গণ-অভ্যূত্থানের ফলে পাকিস্তানের একনায়ক ফীল্ড মার্শাল মুহাম্মদ আইয়ুব খানকে সরিয়ে দিয়ে সেনাবাহিনী জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে দিয়ে নির্বাচন করিয়েছিলো।

    অধ্যাপক ভ্যারোল যদি ১৯৬৯ সালের বাংলার গণ-অভ্যূত্থানটি অনুধ্যান করতেন, তাহলে তিনি দেখতে পেতেন গণ-অভ্যূত্থানকে ছিনতাই করে আরোপিত সামরিক শাসন কীভাবে শেষপর্যন্ত গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়ার পরিবর্ততে দু’বছরের মধ্যে গণহত্যা পর্যন্ত সংঘটিত করতে পারে। বাঙালী জাতির গণ-অভ্যূত্থানের অভিজ্ঞতা অধ্যাপক ভ্যারোলকে হয়তো তাঁর ‘গণতান্ত্রিক সামরিক অভ্যূত্থানের’ ভ্রান্ত তত্ত্বায়ন থেকে বিরত রাখতে পারতো।

    গণ-অভ্যূত্থানের ছিনতাই
    অধ্যাপক ভ্যারোল তাঁর গবেষণায় মিসরের যে-অভ্যূত্থানটিকে গণতান্ত্রিক সামরিক অভ্যূত্থান বলে চিহ্নিত করেছেন, তা ২০১১ সালের। রাজনৈতিক মহলে ২০১১ সালের অভ্যূত্থানকে যদিও সামরিক অভ্যূত্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয় না, তথাপি কৌশলিক বিবেচনায় অধ্যাপক ভ্যারোল একে  ক্যুদেতা বা সামরিক অভ্যূত্থান প্রকরণেই ফেলেছেন। কারণ, গণ-অভ্যূত্থানের ফলে ক্ষমতাটি কোনো অবস্থিত বা নব-প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের হাতে যায়নি, গিয়েছে সামরিক বাহিনীর হাতে।

    কিন্তু আজ ২০১৩ সালের গণ-অভ্যূত্থানের পরম পর্যায়ে যখন সেনাবাহিনী আল্টিমেটাম দিয়ে নির্বাচিত প্রেসিডেণ্টকে শুধু ক্ষমতা থেকেই অপসারিতই করেনি, বরং তাঁকে গ্রেফতার করে গত তিন সপ্তাহ যাবৎ গুম করে রেখেছে, তখন সেটি-যে সামরিক অভ্যূত্থান ছাড়া আর কিছুই নয়, তা অধ্যাপক ভ্যারোল সম্ভবতঃ বিনা তর্কে স্বীকার করবেন।

    আমরা বিচার করছি মিসরীয় সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপের। আমরা মুসলিম ব্রাদারহূডের বিচার করছি না (সেটি করবো পরবর্তী পর্বে)। মুসলিম ব্রাদারহূড কতো গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক, কিংবা কতোটুকু প্রগতিশীল বা প্রতিক্রিয়াশীল, তার উপর নির্ভর করবে না সেনাবাহিনীর ক্ষমতাগ্রহণটি ক্যুদেতা হলো কি-না। এমনকি, কতো লক্ষ লোক কতো দিন ধরে অহিংস অমান্যতার আন্দোলন করেছে কিংবা নগরচত্বর দখল করে রেখেছে, তার উপরও নির্ভর করবে না সেনাবাহিনীর দ্বারা প্রেসিডেণ্টকে ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দী করার ঘটনাটা ক্যুদেতা কি-না।

    ক্যুদেতার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অসাংবিধানিকভাবে সরকারী ক্ষমতা গ্রহণ, যা সাধারণতঃ একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর দ্বারা ক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তি ও তাঁর সমর্থক ও সহযোগীদের হত্যা, আটক কিংবা বিতাড়ণের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়ে থাকে। ক্যুদেতার সাথে বৈধতার প্রশ্নটি মৌলিকভাবে জড়িত।

    আমাদের মনে রাখতে  হবে, তাহরির স্কোয়ারের গণ-অভ্যূত্থানের কাছে যদি প্রেসিডেণ্ট মুর্সি শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে পদত্যাগ করতেন, তাহলে তা অসাংবিধানিক হতো না। কারণ, জনগণের আন্দোলন কিংবা প্রেসিডেণ্টের পদত্যাগ বিধান সংবিধানে স্বীকৃত। তাই, গণ-অভ্যূত্থানে সরকারী ক্ষমতার পতন ক্যুদেতার মতো অবৈধ নয়। কিন্তু যখনই সেনাবাহিনী প্রেসিডেণ্টকে ক্ষমতা থেকে জোরপূর্বক অপসারণ করে, তখন তার উদ্দেশ্য যতো মহৎই হোক না কেনো, কিংবা এর পক্ষে যতো জনসমর্থনই থাকুক না কেনো, তাকে ক্যুদেতাই বলতে হবে।

    মিসরের মুসলিম ব্রাদারহূডীয় প্রেসিডেণ্ট মুর্সির বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রী, উদার গণতন্ত্রী ও বামপন্থী এবং ধর্মবাদী ইসলামী সালাফিস্টদের আন্দোলন গণ-অভ্যূত্থানেই রূপ নিয়েছিলো। গণ-অভ্যূত্থান দীর্ঘজীবী হলে তা মিসরের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা ও শ্রেণীবিন্যাসের ভিত্তিমূলে আঘাত করতো। তাই, অধিষ্ঠিত ব্যবস্থার মধ্যে সর্বোচ্চ-সংগঠিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ-ব্যবস্থা সংরক্ষণের প্রয়োজনেই সংবিধান লঙ্ঘন করে প্রেসিডেণ্ট মুর্সিকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিয়ে ক্যুদেতা সংঘটিত করেছে।

    মিসরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য আমার উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে যে, সেক্যুলার গণতন্ত্রী, উদারগণতন্ত্রী ও বামপন্থীরা তাঁদের কষ্টকর আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট গণ-অভ্যূত্থানকে সামরিক বাহিনীর হাতে ছিনতাই হতে দেখেও পুলকিত বোধ করছে। এটি সম্ভবতঃ হতে পেরেছে গণ-অভ্যূত্থানের নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার অভাবের কারণে কিংবা সেনাবাহিনীর প্রতি নাসেরীয় আমলের মোহ থেকে মুক্তি না পাওয়ার কারণে। তাই বলিঃ গণ-অভ্যূত্থানকারীদেরকে এর জন্যে একদিন হয়তো পস্তাতে হবে। (চলবে)

    রোববার, ২১ জুলাই ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    Masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন