• মিসরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনঃ যেনো থমকে দাঁড়িয়েছে বিপ্লব
    মাসুদ রানা

    প্রায় দেড় বছর আগে গণ-অভূত্থানের পথ ধরে মিসরের যে-বিপ্লব সূচিত হয়েছে বলে মনে করা হয়েছিলো, তাতে হতাশার ছায়া পড়তে শুরু করেছে। দেশটিতে গত ২৩-২৪ তারিখে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৃশ্যমান কিংবা দেখানো ফল নির্দেশ করে নিঃশ্বাস পড়েছে হতাশার।

    রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কোয়ার থেকে শুরু করে মিসরের সর্বত্র অগণিত বিপ্লবী আঙ্গিনার কর্মীরা একদিকে রক্ষণশীল ইসলামবাদী মুসলিম ব্রাদারহুডের উদ্যত ফণা এবং অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল পতিত স্বৈরতন্ত্রের বিষাক্ত লেজের ঝাপটা দেখে শঙ্কিত।

    প্রাথমিক গণনায় ভৌটের কেন্দ্র-কেন্দ্রে যেখানে বিপ্লবীদের সমর্থিত প্রার্থী হামদীন সাব্বাহিকে এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিলো, শেষ পর্যন্ত তাঁকেই তৃতীয় ঘোষণা করা হলো বেসরাকারী ভাবে। মিসরের আল-আহরাম পত্রিকা দেখাচ্ছে, সাব্বাহির পক্ষে ছাপ দেয়া ব্যালট পেপার পাওয়া যাচ্ছে ঝোপ-ঝাড়ে-জঙ্গলে। সাব্বাহি আজ সংবাদ সম্মেলন ডেকে দেখিয়ে দিয়েছেন, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক ভৌট কারচুপির ঘটনা। তাঁর আইনজীবী বলেছেন আপত্তি তুলবেন আইনী পদ্ধতিতে।

    স্পষ্টতঃ বুধ-বৃহস্পতিবারে অনুষ্ঠিত প্রথম রাউণ্ডের নির্বাচনে কর্মজীবী-শ্রমজীবী ব্যাপক দরিদ্র-সাধারণের মুক্তির আকাঙ্খার প্রতিনিধি হামদীন সাব্বাহিকে পরিকল্পিত-ভাবে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্য চলছে ষড়যন্ত্র। সাব্বাহিকে সরিয়ে দিয়ে একদিকে পূর্ববর্তী স্বৈরতন্ত্রের অবশেষ হিসেবে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী আহমেদ শফিক এবং অন্য দিকে স্বৈরতন্ত্রের সাথে আপোসকামী মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুসরির মধ্যে দ্বিতীয় রাউণ্ডের ভৌট-গ্রহণের দিকে মিসরকে পরিচালিত করছে দেশটির তত্ত্বাবধায়ক মিলিট্যারী কাউন্সিল।

    মিসর তথা মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব-পুঁজিবাদের কাছে অবহেলার নয়। তাই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগী ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, তুরস্ক, ইসরায়েল ও প্রতিক্রিয়াশীল আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে বামপন্হী সাব্বহির চেয়ে মুবারকের অনুগামী মোহাম্মদ শফিক কিংবা তাদের প্রতি অনুগত মুসলিম ব্রাদারহুডের আহমেদ মুসরিই অধিক গ্রহণযোগ্য।

    বিপ্লবী পরিবর্তনের প্রতিনিধি সাব্বাহি তাদের পছন্দের নয়। তাই, ভৌট কারচুপি করে তৃতীয় করে দেয়া হয়েছে বামপন্থী ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এই প্রার্থীকে। দেখানো হয়েছে, মোহাম্মদ মুসরি পেয়েছেন ৫,৫৫৩,৯০৭ (২৫% ভাগ) ভৌট, আহমেদ শফিক পেয়েছেন ৫,২১০,০৭৮ (২৪% ভাগ) এবং হামদীন সাব্বাহি পেয়েছেন ৪,৭৩৯,৯৮৩ (২২% ভাগ)।

    আল-আহরাম পত্রিকার দেয়া উপাত্ত থেকে দেখা যায়, সমগ্র মিসর-ব্যাপী যে-ভৌট হয়েছে, তাতে একাধিক নামের ইসলামবাদীদের পক্ষে মোট ভৌট পড়েছে ৪৩% ভাগ, আর তার বিপরীতে বিবিধ অ-ইসলামবাদীরা পেয়েছেন ৫৭% ভাগ। সুতরাং, মিসর-বিপ্লবে মিসরীয়রা ইসলাবাদীদের পক্ষে রায় দিয়েছে বলে যাঁরা প্রচার করেন, তাঁরা সন্দেহাতীত-ভাবে ভুল।

    বস্তুতঃ মিসর-বিপ্লব ইসলামীদের তৈরী নয়। কেবল দীর্ঘকাল যাবৎ সাংগঠনিকভাবে সুসংগঠিত থাকার কারণে বিপ্লব-পরবর্তী শূন্যতায় স্বৈরশাসনের পতনের ফসল নিজেদের ঘরে বেশি বয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। মিসরের বেশির মানুষ ইসলাবাদীদের পক্ষে মনে করাটা পরিসংখ্যানিকভাবেই ঠিক নয়।

    মিসর-বিপ্লবের কর্মীদের আকাঙ্খা যার মধ্যে দিয়ে প্রধানতঃ উচ্চকিত হয়েছে, তিনি হলেন নাসেরবাদী বামপন্থী হামদীন সাব্বাহি, যিনি প্রার্থী হয়েছিলেন তাঁরই প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আল-কারামার হয়ে। আল-কারামার ইংরেজি অর্থ হচ্ছে ডিগনিটি পার্টি, যার বাংলা নাম হতে পারে ‘মর্যাদা দল’।

    মিসরীয় জাতিকে একটি উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চান মিসরের উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষক-জেলে পরিবারের সন্তান হামদীন সাব্বাহি। সাব্বাহি কৈশোরে নিজেও জেলে হিসেবে কাজ করেছেন। তারপর, দীর্ঘ সংগ্রামের পথে তিনি নিজেকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া-কালে তিনি ছাত্র প্রতিনিধি হয়ে মধ্য-সত্তরের দশকে মার্কিন ও ইসরায়েলী শক্তির অনুগত প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের নীতি বিরুদ্ধে মুখোমুখি তর্ক করেছেন। এ-পর্যন্ত ১৭ বার কারাভোগ করে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছেন পেশায় সাংবাদিক এই হামদীন সাব্বাহি।

    সাব্বাহি তাঁর শিকড় ভুলে যাননি। তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে মিসরের শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের একজন হিসেবে ক্রিয়াশীল রেখেছেন। আর সে-কারণেই তিনি মিসর-বিপ্লবে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করে বিপ্লবীদের মধ্যে অবস্থান করেছেন।

    তিনি যে-মর্যাদা দল বা ডিগনিটি পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেটি প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিসরের জনগণকে একটি আত্মমর্যাদাবান জাতি হিসেবে গড়ে তোলার অদম্য আকাঙ্খা থেকেই করেছেন। আর এই অদম্য আকাঙ্খাই তাঁকে দিয়েছে শক্তি ও বিপ্লবের স্পৃহা।

    গতমাসে আল-আহরামের সাথে এক সাক্ষাতকারে সাব্বাহি বলেছিলেন, ‘মিসরকে আরব জাতির কেন্দ্রে থাকতে হবে। এটিই তার আত্ম-পরিচিতি এবং আত্ম-নিয়তি ... মিসরের পুনরুত্থান একমাত্রে আদর্শের বিষয় নয়। আমাদের থাকতে পুনরুত্থানের দৃষ্টিবোধ।’

    তিনি কীভাবে মিসরীদের এ-মর্যাদার জায়গায় আনবেন? তিনি স্পষ্টতঃ মনে করেন, মিসরের গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সমস্ত মানুষের জন্য মনুষ্য-মর্যাদার জীবন নিশ্চিত করা ছাড়া পৃথিবীতে মিসরীয় জাতি মর্যাদাবান হতে পারবে না। তাই তিনি চিহ্নিত করেছেন, মিসরীদের প্রয়োজন ৮টি বিষয়ঃ ‘আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য, অবৈতনিক শিক্ষা, কাজ, বীমা-সহ নায্য মজুরি এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ।’

    মিসরে গত কয়েক দশক ধরে যে-সামাজিক অসাম্য তৈরী হয়েছে, যার একদিকে প্রায় সীমাহীন সম্পদের মালিক ধনিক শ্রেণী এবং অন্যদিকে নিঃস্ব শ্রমজীবী মানুষ, তাকে অটুট রেখে জাতি হিসেবে মিসরীয়রা মর্যাদাবান হতে পারবে না।

    সাব্বাহি স্পষ্টতঃ ধনিক শ্রেণীর সম্পদের পাহাড়ে ঘা বসিয়ে বলেছেন, দেশে-বিদেশে যে-সকল মিসরীয়দের ৫০ মিলিয়ন মিসরীয় পাউণ্ড বা তার বেশি মূল্যমানের সম্পদ রয়েছে, তাঁদের সকলকে এক বারের জন্য ১০% কর পরিশোধ করতে হবে। তিনি মনে করেন, এভাবে বিশেষ করারোপের ফলে যে-বিশাল অর্থের সংস্থান হবে, তা দিয়ে তিনি সকল মিসরীদের জন্য সামাজিক নায্যতা ও ন্যায় বিচারের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন।

    স্বভাবতঃই মিসরীয় ধনিক শ্রেণী শঙ্কিত হয়ে উঠেছে সাব্বাহির জনপ্রিয়তায় ও প্রার্থিতায়। মিসরীয় ধনিক শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষক মুসলিম ব্রাদারহুড প্রথমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী দেবে না বলেও শেষে এক ধনকুবেরকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছিলো। কিন্তু যোগ্যতার মাপকাঠিতে তাঁর প্রার্থিতা হারাবার কারণে শেষপর্যন্ত মোহাম্মদ মুসরিকে দাঁড় করানো হয়েছে সাব্বাহিকে রোখার জন্য।

    তিন দশকের স্বৈরশাসক ও গণ-অভ্যূত্থানে পতিত হোসনি মুবারকের প্রতি মিসরীয়দের যে-ঘৃণা, তাকে কাজে লাগিয়েই মুসলিম ব্রাদারহূড দেশটির ক্ষমতায় যেতে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্ভাব্য ফ্যাসিস্ট কায়দার শাসনের সম্ভাবনা বুঝতে শুরু করেছেন মানুষ পার্লামেন্টে তাঁদের কীর্তি লক্ষ্য করে।

    এ-পরিস্থিতিতে অনেক মধ্যপন্থী ইসলামবাদীরা পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। কিন্তু ইসলামবাদী রক্ষণশীলতা থেকে বাঁচার চেষ্টায় মিসরীয়রা যাতে বামপন্থীদের দিকে ঝুঁকে না পড়েন, তার জন্য পতিত স্বৈরচারকেই ঐতিহাসিক-ভাবে বিরোধী শক্তি হিসেবে হাজির করা হয়েছে আহমেদ শফিককে প্রার্থী করার মধ্য দিয়ে।

    এখন মিসরে চলছে প্রচণ্ড রাজনৈতিক মেরুকরণ। দুটো তীব্র নেতিবাচক মনো-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এর বৈশিষ্ট্য। একদিকে হচ্ছে ত্রিশ বছরের স্বৈরশাসনের অবশেষ কিংবা পুনরাবৃত্তি রোখা এবং অন্যদিকে মিসরের সেক্যুলার রাজনৈতিক জীবনের উপর হুমকি নিয়ে আসা মুসলিম ব্রাদারহূড থেকে মুক্ত থাকা। কিন্তু যা প্রয়োজনীয়, তা হচ্ছে একটি ইতিবাচক মনো-রাজনৈতিক প্রবণতা, যা আসতে পারে একটি সঠিক আর্থিক-সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে সারা দেশ জুড়ে জনগণের সংগঠিত শক্তির সৃষ্টি ও উত্থান।

    জনগণের তৃতীয় ও বিকল্প ধারা যেটি এই মুহূর্তে সাব্বাহির মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে, তা যাতে কোনো ভাবেই সামনে না আসতে পারে, তার জন্যেই মরিয়া হয়ে উঠেছে রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহ। কিন্তু যে-কোনো বিপ্লবে জনগণের মূল প্রবণতাই যেহেতু চূড়ান্ত নির্ণায়ক, তাই ষড়যন্ত্রের ফলকেই চূড়ান্ত বলে ধরে নেবার কারণ নেই।

    তাহরির স্কোয়ারের মতোই মিসরের নির্বাচনও আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষণীয় হিসেবে ইতিহাস হয়ে থাকবে।
     
    রোববার, ২৭ মে ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন