• মুক্তিযুদ্ধ কবে এই দুই দলের দখল থেকে মুক্তি পাবে?
    যায়নুদ্দিন সানী

    তর্ক-বিতর্কের বাজার হঠাৎ করেই বেশ গরম হয়ে উঠেছে। বাজারটা বেশ কিছুদিন থেকেই নেতিয়ে ছিল। সব দিকেই আওয়ামী নেতাদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিলো। জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে গিনেস বুকে রেকর্ড-প্রচেষ্টা, তাতে ইসলামী ব্যাংকের তিন কোটি টাকা অনুদান, তারপর সে-অনুদানের চেক ফেরত — কোনো ঘটনাতেই বিএনপি নামক দলটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। বিএনপির খবর বলতে ছিলো কিছু গ্রেফতার আর উপজেলা নির্বাচন। প্রথম দুই দফা নির্বাচনে উপজেলাগুলোতে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও ৪র্থ দফায় ধরাশায়ী হলো বিএনপি। তাঁর চেয়েও বড় কথা, শত চেষ্টা করেও ‘ভোট কারচুপি’ অভিযোগটাকে ঠিক ‘লাইম লাইটে’ আনতে পারেনি তারা। দলটির নেতারা প্রায় সকলেই এখন চৌদ্দ শিকের ভয়ে অস্থির। কর্মীরা আছেন ক্রসফায়ারের ভয়ে। সব মিলিয়ে খেলা চলছে একতরফা। আওয়ামী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়বার সামর্থ্য কিংবা ইচ্ছা কোনটাই এখন বিএনপির নেই। এদিকে আওয়ামীদের এই একতরফা মাঠ দখল তাঁদেরকে আরও কোণঠাসা করে দিচ্ছিলো। ফলে কিছু একটা তাঁদের দরকার ছিলো আবার আলোচনায় ফিরে আসবার জন্য।

    সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলো কাজ দিচ্ছিলো না। কারণ দেশ তখন ‘জাতীয় সঙ্গীত’ বিতর্ক নিয়ে মহাব্যস্ত। একদিকে ‘ইসলামী ব্যাংক’ অন্যদিকে নুর সাহেবের নিজের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া। একদিকে ৯০ কোটি টাকা অন্যদিকে বিভিন্ন স্কুলের দৈন্য দশা। প্রায় দিনই বিভিন্নভাবে আলোচনায় চলে আসছিলো ‘জাতীয় সঙ্গীত’ রেকর্ড। আর আলোচনায় সত্যিকারের কোন দিক-নির্দেশনা না থাকলেও বিএনপির প্রসঙ্গ সেখানে কোনভাবেই স্থান পাচ্ছিলো না। কারো-কারো মতে এই বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে ইচ্ছে করেই - ‘৫ই জানুয়ারী’ কে পেছনে ফেলে নতুন কোনো বিষয়কে সামনে আনবার জন্য। কারো-কারো মতে এর উদ্দেশ্য ছিলো, সমুদ্রের গ্যাস-ব্লক বণ্টন বিষয়টিকে আলোচনায় না এনে দেশবাসীকে অন্য বিষয়ে ব্যস্ত রাখবার জন্য।

    এমনই বিভিন্ন ‘কৌশল’ থিয়োরিতে দেশ যখন ব্যস্ত তখন লণ্ডন থেকে বিশেষ বক্তব্যটি এলো। ছোটো-খাটো কোন নেতা বললে হয়তো অনেকে হেসে উড়িয়ে দিতো। ‘তেলের ড্রাম’ ফর্মুলার ক্ষেত্রে যেমনটা আগে একবার হয়েছিল। সবাই একচোট হেসেও ছিল। এবার কী হবে বুঝা যাচ্ছে না। প্রথমে অনেকে ভেবেছিলো হয়তো মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। তবে এখন মনে হচ্ছে ‘মুখ ফসকে’ নয় বরং রীতিমতো চিন্তা ভাবনা করেই মুখ খোলা হয়েছে।

    কারণ প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীও সুর মেলালেন। ফলে তখন দেশীয় আণ্ডা-বাচ্চা নেতৃত্বেরও সুরে সুর মিলিয়ে ফেলা ছাড়া আর করণীয় কিছু ছিলো না। যেহেতু এখন আর পিছু হটার কোন উপায় নেই, তাই বলা যায় এ-ব্যাপারে আগামী বেশ কিছুদিন মাঠ গরম থাকবে। আওয়ামী নেতারা তাঁদের বিভিন্ন ‘ফিতা কাটার’ অনুষ্ঠানে রসিয়ে রসিয়ে এই বক্তব্যের সূত্র টানবেন। ‘টক শো’র পক্ষেও এই মজার টপিক হাতছাড়া করার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ। পাড়ায়- মহল্লায়, নাপিতের দোকানে আর চায়ের আড্ডায় তো আলোচনা হবেই। আমরা কলামিস্টরাও নেমে পড়বো। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ইতিহাসবিদরা এই তর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবেন। আওয়ামী আর জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদরা বোধহয় কোমর বেঁধে ফেলেছেন।

    বুদ্ধিজীবী, টকশোজীবী থেকে শুরু করে ছাত্র, যুব এবং মূল সংগঠনের পাতি থেকে বড় সব নেতারাই এখন অপেক্ষা করে আছেন। যে যখন যেখানে ডাক পাবেন, হামলে পড়বেন। তর্কে তর্কে টিভির পর্দা গরম করে ফেলবেন। ‘জাতির জনক...’ আর ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি...’ বলে শুরু করবেন। এরপরে চালাবেন এক পশলা গুণগান। মৃতদের গুণগান শেষ হতে না হতেই শুরু করে দেবেন জীবিতদের স্তুতি। এরপরে মনোযোগী হবেন অনাগতদের গুণকীর্তনে। এরপরে কিছুটা দম নিয়ে শুরু করবেন তর্ক। তা চলুক। এতে আমার খুব একটা আপত্তি নেই। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ‘খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স’ কিংবা ‘কী করণীয়’ নিয়ে যেমন সঙ্গীত শিল্পীর কাছ থেকে বিশেষজ্ঞ মতামত শুনতে শিখেছি তেমনি ’৭১ এর ঘটনাবলির ওপর বিশেষজ্ঞ মতামত হজম করাও শিখে যাবো। সবচেয়ে মজার ব্যাপার যেটা ঘটবে বলে মনে হচ্ছে, তা হলো সে-সময়ের ঘটনাবলি সম্পর্কে তথ্য দেয়ার লোকের কোন অভাব হবে না। ‘অনন্ত জলিল এবং বর্ষার মাঝে এখন কেনো ঝগড়া হচ্ছে’ জাতীয় অপ্রয়োজনীয় রিপোর্ট দেখার মত আরও কিছু ভয়ংকর অভিজ্ঞতা অচিরেই পেতে যাচ্ছি বলেই অনুমান হচ্ছে।

    তা না হয় পেলাম। আমাদের যেহেতু সময়ের খুব একটা অভাব নেই, তাই আগামী কিছুদিন এ-নিয়ে যে আমরা মেতেও থাকবো, এ-ব্যাপারেও আমার খুব একটা সন্দেহ নেই। তবে, আমার চিন্তা অন্যখানে। লণ্ডন প্রবাসী নেতাটি কাজটা কেনো করলেন? বক্তব্যটির পরে যে বিতর্ক শুরু হবে তা নিশ্চ্যই তিনি নিজেও জানতেন! আওয়ামী বাহিনী এমন একটি বক্তব্য নিয়ে যে ঠাট্টা মশকরা শুরু করবে এটিও তাঁর অজানা না। আর ‘তথ্যটি’ কি তিনি প্রমাণ করতে পারবেন?  তারপরও কেনো কাজটি করলেন? ‘ঘোষক’ কিংবা ‘ঘোষণাপত্র পাঠক' দিয়ে তো বেশ চলছিলো। বরং সেই ঘটনার কিছু ছোটো-খাটো ডালপালা ছড়ানো যেত। ‘সেই সময়ে আওয়ামী নেতারা সব ভারতে পালিয়েছিল-- তাই একজন মেজরকে রাজনীতিবিদের দ্বায়িত্ব নিতে হয়েছিল।’ তাই বলে একেবারে রাষ্ট্রপতি?

    আসলে ‘বাকশাল’ আর ’৭৫ পরবর্তী আওয়ামী নেতাদের ভোল পাল্টানো দিয়ে বিএনপি বেশ কিছুদিন চালিয়েছিল। একঘেয়েমির কারণেই হোক আর তার্কিকের অভাবের কারণেই হোক বিষয়গুলো আর আকর্ষণীয় হচ্ছিলো না। এদিকে ‘৫ই জানুয়ারী নির্বাচন’ নিয়ে বিএনপির অভিযোগোগুলো খুব একটা লাইমলাইটে আসছিলো না। বাংলাদেশের মিডিয়ার বেশিরভাগই আওয়ামীদের দখলে। বিদেশী প্রভুদের ভেতর আমেরিকা এখন একটু বিপদে আছে - কারণ, রাশিয়া মাথা চাঁড়া দিচ্ছে। ফলে, সেদিক দিয়েও সুবিধা করতে পারছে না। তাই নতুন কোনো ভুমিকম্প না ঘটালে বিএনপির পক্ষে আবার আলোচনার মধ্যমণি হওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এই বিতর্কের মাধ্যমে আলোচনায় ফিরে আসবার বুদ্ধিটা জনৈক সম্পাদকের দেয়া, না লণ্ডন-প্রবাসী নেতার নিজস্ব উদ্ভাবন, তা এখনও ভালো বোঝা যাচ্ছে না। তবে, বিএনপি এই তত্ত্ব এগিয়ে নিয়ে যেতে যে বেশ বদ্ধ পরিকর, তা বেশ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। ফলে আগামী দিনের ‘টক শো’ গুলোতে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়ে টানাটানি বেশ জোরেসোরেই শুরু হবে।

    একটা প্রশ্ন কেনো যেনো মনে জাগছেঃ ‘জাতীয় পতাকা’, ‘জাতীয় সঙ্গীত’, ‘মুক্তিযুদ্ধ’ - কবে যে দুই দলের দখল থেকে মুক্তি পাবে? কবে আমরা বলতে পারবো এগুলো আমাদের সবার অহংকার?

    শনিবার, ২৯ মার্চ ২০১৪
    রংপুর
    বাংলাদেশ
    sani2000bd@yahoo.com

     

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন