• মেয়র নির্বাচনের ফলঃ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ডিমিনিশিং রিটার্ন্স
    মাসুদ রানা

    প্রসঙ্গ
    অদ্য বাংলাদেশ সম্পর্কিত লেখার প্রসঙ্গ পাওয়া গেলো। গতকাল অনুষ্ঠিত রাজশাহী-খুলনা-বরিশাল-সিলেট মহানগর চারটির মেয়র নির্বাচনের বিষয় ছাড়া এ-মুহূর্তে উপযুক্ততর প্রসঙ্গ আর কী-ই-বা হতে পারে?

    দেশটির সরকার-সমর্থক গণমাধ্যমগুলো ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পরাজয় সমেত নির্বাচনের ফলাফল যেনো বেশ ক্লেশের সাথে প্রচার করছে। ফেব্রুয়ারীতে শাহবাগ-আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে এ-মাধ্যমগুলো সম্ভবতঃ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ শপথ নিয়ে একটি বিশেষ ধরনের সাংবাদিকতা শুরু করেছিলো। অন্যদিকে, বিপরীত মেরুর কয়েকটি মাধ্যম ‘ঈমানের’ কসম খেয়ে জারি রেখেছিলো আরেক ধরনের সাংবাদিকতা। ঘটনার প্রতিবেদন নয়, ঘটনার নির্মাণই হয়েছিলো উভয় প্রকার সাংবাদিকতার ‘এ্যাসাইনমেন্ট’।

    শাহবাগ-আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমে জামায়াতী-বিএনপি আন্দোলন, পরবর্তীতে সরকারের প্রার্থিত ইসলাম-হেফাজতকারী আন্দোলন ও সবশেষে হেফাজতে ইসলামের উপর সরকারের তিন বাহিনীর যৌথ-অভিযানে রাতের অন্ধকারে ব্ল্যাকআউট করে ম্যাসাকারের পরও সত্যের অপলাপ করেছে বাংলাদেশের দ্বি-মেরুকৃত সংবাদ-মাধ্যমগুলো।

    ফলে, সাধারণ পাঠক বস্তুতঃ তথ্য-বিকৃতি ছাড়া বস্তুনিষ্ঠ কোনো তথ্যই পাচ্ছিলেন না। এমনকি, পক্ষপাত দোষে দুষ্ট, রূপতঃ পক্ষাঘাতগ্রস্ত বুদ্ধিজীবীরাও জনগণকে দিক-নির্দেশ দেওয়া তো দূরের কথা, নিজেরাই দিক নির্ণয় করতে পারছিলেন না।

    শাহবাগে লক্ষ-লোকের সমাবেশ লক্ষ্য করে রাজনীতিক থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত ছুটে এসে লুটে নেবার উন্মত্ত প্রবণতায় বিবিধ হাস্যকর কাণ্ড করেছেন। আজ চার মাস পর পেছনে ফিরে তাঁদের সে-সময়ের লেখা ও মুদ্রিত কথাগুলোর দিকে তাকালে, তাঁদের বুদ্ধির প্রতি করুণাই জন্মানোর কথা বিদগ্ধ পাঠককূলের।

    তবে, আজ সমস্ত জল্পনা-কল্পনার রং-তুলি-ক্যানভাসে জল ঢেলে দিয়ে সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো করে দেখিয়ে দিয়েছে চার নগরীর চার নগরপাল নির্বাচন। সরকারের পরিববহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এ-নির্বাচন সরকারের জন্য একটি ‘সতর্ক সঙ্কেত’।

    অর্থাৎ, বিষয়সমূহ যেভাবে দেখা ও উপলব্ধিত হচ্ছিলো, বস্তুতঃ তা সত্য নয়। তাই, সম্ভবতঃ সে-কারণেই এ-নির্বাচনকে ‘সতর্ক সঙ্কেত’ হিসেবে দেখতে বলেছেন প্রাক্তন ধীমান ছাত্রনেতা ওবায়দুল কাদের।

    বর্ধিত অর্থে দেখলে বুঝতে হবে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ‘স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি’ বিগত দু’-দশকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হলেও নিশ্চিত এক্ষণে এবং সম্ভবতঃ আগামী দিনের জন্য তা অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

    তার মানে কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কোনো আবেদন নেই? এ-প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর পেতে হলে আমাদেরকে প্রথমে একটু রাজনৈতিক ইতিহাস ও একটু অর্থনীতির পাঠ নিতে হবে।

    রাজনৈতিক ইতিহাসের পাঠ

    বাংলাদেশে রাজনৈতিক উৎপাদনে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ একটি শক্তিশালী উপাদান হিসেবে গত শতাব্দীর আশির দশকে জন্ম নিয়ে নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের পক্ষে ফল দিতে শুরু করে।

    ১৯৭১ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে আজকের মতো কোনো বিমূর্ত ধারণা ছিলো না। কারণ, তখন খোদ মুক্তিযুদ্ধ চলছিলো বলে সেখানে ছিলো বাঙালীর ভাষিক ও জনজাতিক আত্মপরিচয়ের চেতনা; ছিলো গণতন্ত্র ও ন্যায্য অধিকারের চেতনা; ছিলো ধর্মনিরপেক্ষতার চেতনা এবং ছিলো একটি উচ্চতর ন্যায়বোধের হালকা উপলব্ধির ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার চেতনা।

    এ-চেতনা মূর্ত হয়ে উঠেছিলো পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পূর্ব-পাকিস্তানের বাঙালীর উপর পশ্চিম-পাকিস্তানী উর্দূভাষী শাসক গোষ্ঠীর আরোপিত ঔপনিবেশিক সম্পর্কের বস্তুনিষ্ঠতার ভিত্তিতে। কিন্তু বাঙালীর সে-চেতনার বাস্তব রূপায়ন পাকিস্তান রাষ্ট্রে সম্ভব ছিলো না। এর বাস্তবায়ন একমাত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়েই সম্ভব ছিলো।

    উপরের উপলব্ধি প্রথম যাঁদের মধ্যে এসেছিলো, তাঁরা ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এগিয়ে থাকা মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্রী। তা সত্ত্বেও মার্ক্সবাদীরা যখন তাঁদের আন্তর্জাতিকতাবাদ প্রসূত দায়িত্ব পালনে এবং জাতীয়তাবাদীদের ‘জাতীয়’ বনাম ‘মুৎসুদ্দি’ চরিত্র নিরূপণে অন্তর্কলহে বিভক্ত, তখন বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ ও আন্তর্জাতিক দায়মুক্ত জাতীয়তাবাদীরা জাতীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে একনিষ্ঠ মনোনিবেশের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বে চলে আসেন।

    জাতীয়তাবাদীরা যুদ্ধ করে দেশটাকেও স্বাধীন করে ফেলেন এবং নবগঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির শাসন ক্ষমতায় জাঁকিয়ে বসেন। বিপরীত দিকে মার্ক্সবাদীরা যুদ্ধের মধ্য আরও বিভক্ত হয়ে পড়লেন।

    মার্ক্সবাদীদের একটি অংশ যুদ্ধে লড়লেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তানী নির্বাচনে জেতা আওয়ামী লীগের হাতে সদ্য স্বাধীন দেশটাকে ছেড়ে দিয়ে মুগ্ধ হৃদয়ে জাতীয়তবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্ব মেনে নিয়ে নিজেদের ‘কমিউনিস্ট’ অস্তিত্ব পর্যন্ত বিলুপ্ত করে দেন। আর, অন্যদিকে একটি অংশ জলজ্যান্ত বাংলাদেশকে অস্বীকার করে দীর্ঘকাল যাবত তাঁদের সংগঠনের নামের আগে ‘পূর্ব-পাকিস্তান’ পরিচয় জারি রাখেন।

    এ-পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদীরা তাঁদের মধ্যবিত্ত শ্রেণী-অবস্থান থেকে উচ্চবিত্ত শ্রেণী অবস্থানে পৌঁছার জন্য রাষ্ট্রকে পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করে এবং স্বজাতির দরিদ্র মেহনতী শ্রেণী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি প্রদত্ত তার পূর্ব-প্রতিশ্রুতি বেমালুম ভুলে যায়।

    শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামিক দেশ হিসেবে পরিচিত করেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারীতে তিনি বহুদলীয় পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র নস্যাৎ করে একদলীয় স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা - বাকশালী শাসন ব্যবস্থা - প্রতিষ্ঠিত করেন।

    এভাবে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত প্রতিশ্রুতির মৃত্যু ঘটে মুক্তিযুদ্ধে অনুপস্থিত থাকা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে। এমনকি ভাসানীর হাতে জন্ম নেওয়া ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগকে শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে হত্যা করে বাকশালের মধ্যে সমাহিত করেন। আর বাকশাল হয় এমন একটি ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দল, যেখানে দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকে পর্যন্ত চিরতরে কবর দিয়ে বাকশাল-প্রধানের হাতে সর্বময় ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চূড়ান্ত মৃত্যু ঠিক তখনই ঘটে।

    নিরাসক্ত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করলে যে-কোনো মানুষই লক্ষ্য করবেন যে, বাকশালে যেহেতু সর্বময় ক্ষমতার মালিকের জন্য কোনো ‘এক্সিট’ এবং অন্যের জন্যে কোনো ‘এন্ট্রি’ রাখা হয়নি, তখন পরিবর্তনের জন্য খোলা থাকে একদিকে জনগণের বিপ্লব আর অন্যদিকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র।

    বিপ্লবের জন্য উপযুক্ত আদর্শ ও সংগঠন লাগে। আজ চার দশক পর স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে, সে-রকমের আদর্শ ও সংগঠন সে-সময়ে ছিলো না। আর, ছিলো না বলেই বিপ্লবও হয়নি। তাই, এক নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে হয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র।

    ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্টে বাকশাল প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে হত্যা করে যে বাকশাল ব্যবস্থার পতন ঘটানো হলো, তার পেছনে কারা? জামায়াত ইসলামী? মুসলিম লীগ? জাসদ? পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি?

    না, এদের কেউ নয়। ষড়যন্ত্র এসেছে ভিতর থেকে। শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ কালের সহকর্মী ও বাকশালের সদস্য খন্দকার মোস্তাক আহমদ (যাত্রা-কালে তাঁরা দুজনেই ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক) ছিলেন সেই ষড়যন্ত্রের মূলে। এমনকি যে জিয়াউর রহমানকে মূল ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়ে থাকে, তিনি নিজেও ছিলেন বাকশালের সদস্য। অর্থাৎ, বাকশালের ভেতরে থেকে এসেছে পরিবর্তন, যা পরিণামে জনগণের পক্ষে তো নয়ই, বরং বিরুদ্ধেই গিয়েছে।

    তখনও পর্যন্ত আমারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাক্ষাত পাই না। এমনকি ১৯৭৫ সালের পর যখন নানা কলা-কৌশলের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন, তখনও আমরা এ-চেতনার সাক্ষাত পাই না। তখনও দেখি আজকের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম ধারক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি জিয়াউর রহমানের সূচিত তথাকথিত খালকাটা বিপ্লবে অংশ গ্রহণ করে, যদিও এ-দলের প্রাক্তন সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান বলছেন জিয়াউর রহমান নাকি মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না।

    ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র উন্মেষ ঘটতে শুরু করে তখন থেকে, যখন মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বঞ্চিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বৃহদাংশটি প্রথমতঃ সত্তর দশকে বিপ্লবের পথে সমাজতন্ত্রে মুক্তির পথ সন্ধান করে ব্যর্থ হয়ে আশির দশকে বিকল্প উপলব্ধি গড়ে তোলে; দ্বিতীয়তঃ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যত নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে; এবং তৃতীয়তঃ আওয়ামী লীগের সাথে না লড়ে বরং তার সহযোগী হিসেবে ক্ষমতার ভাগীদার হবার আকাঙ্খী হয়ে ওঠে।

    অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ তার পঁচাত্তরের বিপর্যের পর আশির দশকে এসে আত্মোপলব্ধি গড়ে তুলে বাকশাল-পর্ব থেকে রেহাই পেতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে এবং সত্তরের একলা ভোগের নীতি ছেড়ে অংশীদারিত্বের বাধ্যতাকে মেনে নেয়।

    উল্লিখিত দু'টি রাজনৈতিক শক্তি বা সামাজিক শ্রেণীর মিলন-সেতুর উপযুক্ত আদর্শ রূপে আবিষ্কৃত হয় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’। সুতরাং ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ হচ্ছে একটি ধারণা, যা ব্যর্থ সমাজতন্ত্রীদের আদর্শবাদী অতীতের সাথে বর্তমানের পুঁজিবাদী ‘বাস্তবতার’ সমন্বয় ঘটিয়ে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের সাথে এবং আওয়ামী লীগকে পূর্বোক্তদের সাথে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব স্বীকার করে তার বাকশালী স্বৈরশাসনের ইতিহাস পাশ কাটিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের ঐতিহাসিক সূত্রে অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার বৈধতা দান করে।

    এটি হচ্ছে একটি সৌশ্যাল রিপ্রেজেণ্টেশন যা সৌশ্যাল রিকনস্ট্রাকশনের চেয়েও অধিক পারঙ্গম ও নিত্য নবায়নযোগ্য (ষাটের দশকে ফরাসী সামাজিক মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক মস্কোভিসি এ-তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা, যা পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে আরও বিকশিত হয়েছে বিশেষতঃ লণ্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক গ্যাস্কেল ও তাঁর সহযোগীর গবেষণার মধ্যে দিয়ে)।

    অর্থনীতির পাঠ
    অর্থনীতিতে 'ল অফ ডিমিনিশিং রিটার্ন্স' বলে একটি কথা আছে। এটি কোনো থিওরী বা তত্ত্ব নয়। পদার্থ বিজ্ঞানে নিউটনের 'ল অফ মোশন' বা গতির সূত্রের মতোই, অর্থনীতিতে এটি একটি সূত্র।

    সূত্র মানেই হচ্ছে এর নিত্যতা আছে। আবার, সূত্রের যেমন নিত্যতা থাকে, তার মধ্যে একটি সর্বজনীনতাও থাকে। বস্তুজগতে, তথা বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞানজগতে, যেহেতু সব কিছু পরস্পর সম্পর্কিত, তাই বিজ্ঞানের একটি শাখায় আবিষ্কৃত সূত্র অন্য শাখাতেও বহুলাংশে প্রযোজ্য।

    তাই, রাজনীতি বিজ্ঞানে পর্যবেক্ষিত রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় বিদ্রোহ হওয়ার ঐতিহাসিক বারংবারতার মধ্যে আমরা নিউটনীয় গতির সূত্রের প্রাসঙ্গিকতা অনায়াসেই ব্যাখ্যা করতে পারি।

    ডিমিনিশিং রিটার্ন্স সূত্রটি শুধু অর্থনীতিতে নয়, এটি এমনকি রাজনীতিতেও ক্রিয়াশীল। কিন্তু কীভাবে ক্রিয়াশীল, তার উদাহরণ দেবার আগে অবশ্যই সংজ্ঞা দেওয়াটা জরুরী।

    ল অফ ডিমিনিশিং রিটার্ন্সের ভাষ্য হচ্ছেঃ উৎপাদনের অন্য উপাদান স্থির রেখে একটি উপাদানের ব্যবহার বাড়াতে থাকলে, এর উৎপাদন-ফল প্রাথমিক পর্যায়ে বৃদ্ধি পেলেও এক পর্যায়ে তা হ্রাস পেতে থাকে।

    এ-সূত্রের বর্ধিত গাণিতিক উপলব্ধি হচ্ছে, উপাদানটির ব্যবহার যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে উৎপাদন-ফলে নিগেটিভ রিটার্ন্স দেখা দেবে। অর্থাৎ, উৎপাদন-বর্ধকটি তখন উৎপাদন-হ্রাসক হিসেবে ক্রিয়া করতে থাকে।

    রাজনৈতিক অর্থনীতি

    পলিটিক্যাল ইকোনমি বা রাজনৈতিক অর্থনীতি শুধু অর্থনীতিতে রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শের প্রয়োগ নয়, একই সাথে রাজনীতিতেও অর্থনীতির নীতি ও সূত্রের প্রয়োগকে বুঝায়।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালের গূডউইল বা সুনামকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখে, যা পৃথিবীর যে-কোনো দেশের যে-কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য ঈর্ষণীয় সম্পদ। কিন্তু তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সচেতন আছে যে, সে-গূডউইলের মধ্যে একটি কলঙ্কের দাগ হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালী শাসন।

    আওয়ামী লীগের বর্তমান নেত্রী শেখ হাসিনার চেয়ে আগের নেতা পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বেশি থাকলেও, সাফল্যের দিকে পিতার চেয়ে কন্যা নিঃসন্দেহে অনেকে অগ্রগামী। বর্তমান ইতিহাসে তাঁদের উভয়কে নিরাসক্তভাবে বিচার করতে সক্ষম না হলেও ভবিষ্যতে কন্যাই পিতার চেয়ে সফল রাজনীতিক হিসেবে বিবেচিত হবেন।

    শেখ হাসিনার রাজনৈতিক আদর্শবাদ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যা বস্তুতঃ বাকশাল আদর্শেরই সৌশ্যাল রিপ্রেজেণ্টেশন। এ-আদর্শবাদ বাকশালের চেয়ে অধিকতর পারঙ্গম। কারণ, এটি সকল ‘প্রগতিশীল’ শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য। এমনকি, তার শত্রুর কাছেও নিন্দনীয় নয়। বিএনপি-জামায়াত নিঃসঙ্কোচে বাকশালকে গাল দিতে পারে, কিন্তু ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’কে গাল দিতে পারবে না।

    ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ রাজনৈতিক উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়ে এ-পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে দু’টি নির্বাচনে বিজয় এনে দিয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র কারণেই প্রথমে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে সংগঠিত গণ-আদালতে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বিচার-আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিলো এবং এর উৎপাদন-ফল হিসেবে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের পর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হতে পেরেছিলো।

    দ্বিতীয় দফায় একই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র ভিত্তিতেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমাণ্ডার্স ফৌরাম। এ-সংগঠনের আন্দোলন ও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দলটিকে সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী করেছে।

    এ-পর্যন্ত আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক উৎপাদনে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ উপাদানটি উৎপাদন-বর্ধক হিসেবেই ব্যবহার করতে পেরেছে। কিন্তু ডিমিনিশিং রিটার্ন্স সূত্রানুসারে অন্য উপাদন ঠিক রেখে সে যদি এটি বর্ধিত হারে ব্যবহার করতেই থাকে, তাতে উৎপাদন-ফল ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকবে। এমনকি, নিগেটিভ রির্টার্ন্স বা নেতি-ফলও বয়ে আনতে পারে।

    গতকাল চার বিভাগীয় মহানগরীর যে মেয়র নির্বচন হলো, তা অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র পক্ষে ব্যাপক সাড়া জাগানো শাহবাগ-আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ-শক্তি হিসেবে প্রচারিত বিএনপি-জামায়াতের সরকার-বিরোধী ও হেফাজতে ইসলামের নাস্তিক-বিরোধী ব্যর্থ অন্দোলনের প্রেক্ষাপটে।

    শুধু তাই নয়, নির্বাচনী প্রচার-কালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবিদার প্রায় সকলেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সমর্থিত প্রার্থীদের এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দল সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ব্যবহার করে।

    ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ অব্যর্থ উপাদান মনে করে যাঁরা উৎপাদনের হিসাব কষেছিলেন, তাঁদের হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদেরই বিজয়ী হবার কথা। হ্যাঁ, সাধারণ হিসেবে তা-ই হবার কথা। ডিমিনিশিং রিটার্ন্স সূত্র ভুলে গিয়ে হিসেব করা হয়েছে বলে সে-হিসেবের সাথে বাস্তব ফলাফলের অমিল ঘটে গেলো। আওয়ামী লীগের চার-চার প্রার্থীই ব্যাপক ভৌটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

    কারা বিজয়ী হয়েছেন, গণ-প্রত্যক্ষণে সেটি বড়ো হয়ে আসছে না। বড়ো হয়ে আসছে আওয়ামী লীগের পরাজয়টাই। সরকার-সমর্থক গণ-মাধ্যমগুলোই জানাচ্ছে, কোথাও-কোথাও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের প্রতি সাধারণ ভৌটারদের কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু তারপরও তাঁরা ভৌট দিয়েছেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে 'বার্তা' দিতে।

    অর্থাৎ, রাষ্ট্র-ক্ষমতা ব্যবহার করে সবকিছুর দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, লুটপাট, নির্যাতনের যে ঐতিহাসিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আওয়ামী লীগের রয়েছে, তা এখনও অপরিবর্তিত বলে প্রতীয়মান হয়েছে ভৌটারদের কাছে। আমরা যদি এ-সমস্ত বৈশিষ্ট্যের প্রত্যক্ষণকে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সমর্থন উৎপাদনে ক্ষেত্রে একটি উপাদান হিসেবে গণ্য করি, তাহলে নিরাপদে বলতে পারিঃ আওয়ামী লীগ যদি এ-উপাদান স্থির রেখে বার-বার শুধু ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ উপাদানটিকেই ব্যবহার করে, তাহলে তা ‘ডিমিনিশিং রিটার্ন্স’ দিতে বাধ্য।

    আওয়ামী লীগের পণ্ডিতেরা নিশ্চয় অর্থনীতিতে ডিমিনিশিং রিটার্ন্স সূত্র জানেন। নিশ্চয় তাঁরা রাজনীতিতেও ডিমিনিশিং রিটার্ন্স সূত্রের প্রযোজ্যতার বিষয়টিও বুঝেন। কিন্তু যদি এমন হয় যে, আওয়ামী লীগ তার বৈশিষ্ট্য-সমূহ শ্রেণীগত সীমাবদ্ধতার কারণেই ত্যাগ করতে অক্ষম, তাহলে সে-ডিমিনিশিং রিটার্ন্স এড়াবার জন্য দলটি কী করতে পারে? তখনও কি আওয়ামী লীগ একইভাবে একই আদলের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ উপাদানটি ব্যবহার করবে?

    আওয়ামী লীগ নির্বাচনের রাজনীতিতে সত্তর বছরের প্রৌঢ়। রাজনৈতিক উৎপাদনে - তথা নির্বাচনে - যদি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ডিমিনিশিং রিটার্ন্স কিংবা নিগেটিভ রিটার্ন্স দেয়, তাহলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বধীন আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ-সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহর ৬২২ সালের ‘মদিনা সনদ’ মাথায় তুলে নিবেন। প্রয়োজনে শারিয়া আইন কার্যকর করবেন।

    কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়ঃ ‘তখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র কী হবে? সৌশ্যাল রিপ্রেজেণ্টশন তত্ত্ব মতেঃ হ্যাঁ, তখনও তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ হিসেবেই ব্যবহার করা সম্ভব হবে। আজ এখানেই থাক। অন্য সুযোগে একদিন সৌশ্যাল রিপ্রেজেণ্টেশন থিওরী ব্যাখ্যা করা যাবে।

    রোববার, ১৬ জুন ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

প্রিয় সঞ্জু, এটি আওয়ামী লীগের প্রচ্ছন্ন অভিযোগ যে, জিয়াউর রহমান ছিলেন ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল ‘ষড়যন্ত্রকারী’। এটি আমার কথা নয়। এটিও আমার কথা নয় যে, জিয়াউর রহমান বাকশালের সদস্য ছিলেন। এটিও আওয়ামী লীগের খোদ শেখ হাসিনার দাবি।

শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ১৭ মে তারিখে আগে জিনিভায় সফর-কালে একটি সভায় দাবি করেছিলেন যে জিয়াউর রহমান আবেদন পত্র পূরণ করে বাকশালের সদস্য হয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার এ-দাবির বিপরীতে বিএনপির ভাইস-চেয়ারপার্সন এম হাফিজউদ্দিন আহমেদ ২০শে মে তারিখে ঢাকার বনানীতে সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে পাল্টা দাবি করে বলেছিলেন যে শেখ হাসিনার দাবি মিথ্যা।

আমার লেখার ভারকেন্দ্র যেহেতু আওয়ামী লীগ রাজনীতির স্ববিরোধিতা, তাই আমি আওয়ামী লীগের ভাষ্য অনুযায়ী জিয়াউর রহমান কী ছিলেন তা নির্দেশ করেছি মাত্র। জিয়াউর রহমান আসলেই বাকশালের সদস্য ছিলনে কি-না, কিংবা কীভাবে বাকশালের সদস্য না হয়ে সেনাবাহিনীর এই উচ্চপদে টিকে ছিলেন, তা নিশ্চয় গবেষণার দাবি রাখে।

Rana Bhai

Salaam. It is interesting to know that

''এমনকি যে জিয়াউর রহমানকে মূল ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়ে থাকে, তিনি নিজেও ছিলেন বাকশালের সদস্য।''

Waiting to know more about it.

Thank you
Shanju

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন