• রক্তাক্ত মতিঝিলঃ ঢাকার জালিয়ানওয়ালা বাগ
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মতিঝিলে, ধর্মবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ডাকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা, ধর্মানুগত গ্রামীণ সাধারণের সমাবেশের উপর, ৫ই মে রোববার মধ্যরাত পেরিয়ে, ৬ই মে সোমবার ভোর পৌনে ৩টার দিকে, সমগ্র অঞ্চলের আলো ‘ব্ল্যাক আউট’ করে, রাষ্ট্রের তিন বাহিনী - পুলিস, বিজিবি ও র‍্যাব - তিন দিক থেকে সাঁড়াশি রচনা করে, গুলি বর্ষণের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে, যেভাবে তা ‘পরিষ্কার’ করে দিলো, তা যে-কোনো বিবেচনায় একটি ‘ম্যাসাকার’ বা নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। এর সঙ্গে তুলনা চলে একমাত্র ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পরাধীন ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের সামরিক বাহিনীর পরিচালিত পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডের সাথে।

    বৈশাখী রাতের অন্ধকারে কালবৈশাখীর মতো বর্ষিত বুলেটে মতিঝিলে কতো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, তার সঠিক হিসেব হয়তো কখনও জানা যাবে না। ইতিহাস বলে, জালিয়ানওয়ালা বাগে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ লোকের সমাবেশে, ব্রিগেইডিয়ার জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে মাত্র ৫০ গোর্খা সেনা ১০ মিনিট গুলি বর্ষণ করে হত্যা করেছিলো আন্দাজিত ১,৫০০ মানুষ। আর, গতরাত ঢাকার মতিঝিলে, কয়েক লক্ষ মানুষের সমাবেশের উপর তিন বাহিনীর সমন্বিত ১০,০০০ সদস্যের কতোজন কতো মিনিট গুলিবর্ষণ করে কতো মানুষ হত্যা করে থাকতে পারেন, সে-হিসেবের গাণিতিক নকশা আমার জানা নেই।

    পৃথিবীর কোনো ঘটনাই, এমনকি পৃথিবীর সৃষ্টি পর্যন্ত, বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। ইতিহাসের আলোকে আমি নিশ্চিত বলতে পারি, ৫-৬ মে’র ঘটনা নিয়ে বহুকাল বিতর্ক চলবে এবং সে-বিতর্ক আবর্তিত হবে মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বারা। বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক নিরাসক্ত সত্য হিসেবে সমগ্র জাতি হয়তো কোনো দিনই মতিঝিলকাণ্ড বুঝতে সক্ষম হবে না। কারণ, বাঙালী জাতি আজ রাজনৈতিকভাবে সাংঘাতিক বিভক্ত। আর, এ-বিভক্তির কারণেই পরস্পর বিরোধী অভিঘাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে মতিঝিলকাণ্ডের। এতে কেউ-কেউ ভয়ে ভীত ও শোকে বিহ্বল, আবার কেউ-কেউ আনন্দে উল্লসিত ও গর্বে স্ফীত।

    অথচ, মাত্র ১১ দিন আগে, ২৪ শে এপ্রিলে, সাভারের অবৈধ স্থাপত্য রানা-প্লাজা ধ্বসে যখন অজ্ঞাত সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হলো এবং এক-এক করে তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধারিত হতে থাকলো, তখন আমরা কাউকে হাসতে দেখিনি। তখন আমরা সবাইকে দেখেছি মৌলিক মনুষ্যত্বের বোধে শোকাহত হতে। অথচ আজ কী বৈপরীত্য!

    ধারণা করা অযৌক্তিক নয় যে, আজ যদি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় না থেকে বিএনপি-জামায়েতের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় থাকতো, আর ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রীয় ধর্ম বাতিল করে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ করতো এবং এমনইভাবে সে-সমাবেশে সশস্ত্র বাহিনী আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করতো, তাহলে গোটা চিত্রটিই পাল্টে যেতো। আমরা দেখতাম ইসলামবাদীরা হাসছেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কাঁদছেন।

    একই জাতির মধ্যে কিছু মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্য কিছু মানুষের মধ্যে প্রদর্শিত এই ঐক্য ও বৈপরীত্যের পেছনে নিশ্চয় থেকে থাকবে মৌলিক মনুষ্যত্বের বাইরে অন্য কোনো কিছু। আমি মনে করি, এর উত্তর খুঁজতে হবে মানুষের কোগনিশন-মৌটিভেশন-এ্যাফকেশন-এ্যাকশনের - অর্থাৎ, বোধ-প্রেষণা-আবেগ-আচরণের - মনোবৈজ্ঞানিক সূত্র অনুসন্ধান করে। এই সূত্রের প্রথমেই আছে মানুষের বোধের স্তরে তার আত্মপরিচয়ের মৌলিক প্রশ্নটি। কারণ, মানুষের আচরণ নির্ভর করে তার পরিচয় ও প্রেষণার উপর - অর্থাৎ, আপনি কে ও আপনি কী চান, তার উপর নির্ভর করবে একটি প্রদত্ত স্থানে ও সময়ে কী ধরনের আচরণ করবেন।

    আমরা যখন নিজেকে শুধুই মানুষ মনে করি এবং বেঁচে থাকার প্রেষণায় কর্মস্থানে ও গণস্থানে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করি, তখন আমরা সবাই মিলে সাভারকাণ্ডে হাহাকার করি, সাহায্যের জন্যে এগিয়ে যাই। দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগেও আমরা একই আচরণ করি। কারণ, তখন আমরা মনুষ্য প্রকরণে এক সত্ত্বা হিসেবে প্রকৃতির প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি। কিন্তু এই আমরাই যখন নিজেদেরকে বিভক্ত মনে করি, তা মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই হোক কিংবা ধর্ম নিয়েই হোক, তখন আমাদের মধ্যে কেউ মতিঝিলকাণ্ডে হাসেন, আর কেউ কাঁদেন। কারণ, তখন আমরা আমাদের বিশ্বাস কিংবা ইতিহাসের প্রত্যক্ষণের সাথে জড়িত করে বিভক্তিমূলক আত্মপরিচয় গড়ে তুলি।

    সুনির্দিষ্টভাবে, এই বিভক্তির পেছনে আছে একটি ঐতিহাসিক থিসিস, একটি ঐতিহাসিক এ্যান্টিথিসিস এবং ফলস্বরূপ একটি ঐতিহাসিক সিন্‌থেসিস। থিসিসটা ছিলো ১৯০৬ সাল থেকে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে, মুসলিম আত্মপরিচয় ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যার ফলে বাংলা ভাগ হয়ে এর পূর্বাংশ ও বর্তমান পাকিস্তানকে নিয়ে ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হয়েছিলো নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের। এই থিসিসটিই মূর্তরূপে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ’র টু-নেশন্স থিওরী বা দ্বিজাতি তত্ত্ব হিসেবে উদয় হয়ে বাংলাকে ভাগ করলো।

    আর এ্যান্টিথিসিসটা ছিলো, ১৯৪৮ সালে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ্‌র বক্তব্যে প্রতিফলিত বাংলার বিপরীতে উর্দুভাষার প্রাধান্যের বিরুদ্ধে, তথা পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালীর স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম।

    উপরের থিসিস ও এ্যান্টিথিসিসের সংঘর্ষে ১৯৭১ সালে সিন্‌থেসিস হিসেবে অভ্যূদয় ঘটলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, যা ১৯৪৭ সালের বাঙালীর ধর্মভিত্তিক আত্মপরিচয়কে প্রত্যাখান করলো বটে, কিন্তু কোনো ক্রমেই ১৯৪৭ পূর্বকালীন অখণ্ড বাঙালী আত্মপরিচয়ে আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারলো না কিংবা সমগ্র বাংলার সমস্ত মাটি ও মানুষের উপর দাবিও উচ্চারণ করতে পারলো না।

    এ-পরিস্থিতিতে পূর্ববাংলার বাঙালীর সংবেদনে পশ্চিম বাংলার বাঙালী মানুষ, বাংলা কথা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা সঙ্গীত, জল-স্থল-অন্তরীক্ষ প্রতিফলিত হবে না, এটি অসম্ভব। আর যদি প্রতিফলিত হয়ই, তাহলে সেই সংবেদনের ভিত্তিতে কী বোধ তৈরী হবে, তার সাথে আত্মবোধের তুলনায় কী সিদ্ধান্ত আসবে এবং এর প্রেষণাগত, আবেগত ও আচরণগত প্রকাশ কী হবে? মানুষ মাত্রই তার পর্যবেক্ষণযোগ্য পরিবেশকে এবং সেই পরিবেশের সাথে নিজের সম্পর্ক কী তা নিরূপণ না করে পারে না। এটি তার কোগনিটিভ কম্পালশন অর্থাৎ, বোধিক বাধ্যতা। সে-জন্যই কথা ফোটার পর শিশুরা অক্লান্তভাবে জিজ্ঞেস করতে থাকে ‘মা, এটি কী?’ ‘ওটা কী?’ ‘এ কে?’ ‘ও কে?’ ইত্যাদি।

    আমরা দেখলাম, যথেষ্ট অস্পষ্টতার মধ্যে বাংলাদেশের জাতিগত পরিচয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে ১৯৭২ সালে সংবিধানের অন্তর্ভূক্ত করা হলো রাষ্ট্রের চার স্তম্ভের দু’টি হিসেবে ঘোষণা করে। আবার অন্যদিক এর ‘জাতির পিতা’ শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা সদস্য করে ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ঐ সংস্থার দ্বিতীয় সম্মেলনে যোগ দিয়ে বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশটিকে আবার মুসলিম আইডণ্টিটির দিকে নিয়ে গেলেন।

    এখানেই সঙ্কটের শুরু এবং এই সঙ্কটের জনক হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। একটি জাতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং জাতীয় পরিসরে এর মানুষের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় অক্ষুণ্ণ থাকবে, এটি হতে পারে না। এটি একটি সঙ্কটের জন্ম দিতে বাধ্য। আর, এ-সঙ্কট কাটাতেই শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়’। এই যে, কোনো কিছুকে ‘কী তা নয়’ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা, তা দিয়ে আর যা-ই হোক, একটি জাতির ইতবাচক বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা যায় না। আর ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য ছাড়া জাতি আত্মপরিচয় লাভ করতে পারে না।

    বাঙালী জাতি এখনও পর্যন্ত সেই আত্মপরিচয়ের সঙ্কটেই ভুগছে। আর সেখান থেকেই রাজনৈতিক সঙ্কটের জন্ম হচ্ছে। পাঠক লক্ষ্য করুন, বাংলাদেশে প্রতিটি ক্ষেত্রে, রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে, শিক্ষায়, শিল্পে, সাহিত্য, অর্থনীতিতে, পরিষেবায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সচিবালয়ে, পুলিসে, মিলিট্যারিতে, গ্রামে, গঞ্জে, সর্বত্র মোটা দাগে দু’টি ভাগ। লক্ষ্য করুন, এই ভাগগুলো কীভাবে ১৯৪৭ সাল ও ১৯৭১ সালের সাথে সমান্তরাল!

    আজ বাংলাদেশ নিশ্চিত একটি ক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছে। তার আত্মপরিচয়ের সঙ্কট পরিপক্ক হয়ে সংঘাতের রূপ নিয়েছে। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে আদর্শ ও বিশ্বাসাশ্রিত আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মাঝে অধিকতর মৌলিক যে আত্মপরিচিতি - মনুষ্য পরিচিতি তা যেনো হারিয়ে যেতে বসেছে।

    আমি আমার মনুষ্য আত্মপরিচয়ের জায়গা থেকে লিখছি, আমি আমার বোধ-প্রেষণা-আবেগ-আচরণ দিয়ে সর্বতোভাবে ধর্মবাদী হেফাজতে ইসলামের দর্শন, কর্মসূচি ও আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করার পরও, শুধু বিশ্বাস ভিন্ন হবার কারণে, তাঁদের উপর রাষ্ট্রীয় ম্যাসাকারে আমি নীরব থাকতে পারি না। আমি আমার লেখার মাধ্যমে এর প্রতিবাদ করছি।

    আমি আহবান করছি সমস্ত মুক্তমনা, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকেঃ হেফাজতে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করুন, কিন্তু তারপরও এদের উপর  রাষ্ট্রের এই বর্বর হামলার প্রতিবাদ করুন।

    সোমবার, ৬ মে ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন