• রক্তাক্ত মতিঝিলঃ ঢাকার জালিয়ানওয়ালা বাগ
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মতিঝিলে, ধর্মবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ডাকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা, ধর্মানুগত গ্রামীণ সাধারণের সমাবেশের উপর, ৫ই মে রোববার মধ্যরাত পেরিয়ে, ৬ই মে সোমবার ভোর পৌনে ৩টার দিকে, সমগ্র অঞ্চলের আলো ‘ব্ল্যাক আউট’ করে, রাষ্ট্রের তিন বাহিনী - পুলিস, বিজিবি ও র‍্যাব - তিন দিক থেকে সাঁড়াশি রচনা করে, গুলি বর্ষণের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে, যেভাবে তা ‘পরিষ্কার’ করে দিলো, তা যে-কোনো বিবেচনায় একটি ‘ম্যাসাকার’ বা নির্বিচার হত্যাকাণ্ড। এর সঙ্গে তুলনা চলে একমাত্র ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পরাধীন ভারতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের সামরিক বাহিনীর পরিচালিত পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডের সাথে।

    বৈশাখী রাতের অন্ধকারে কালবৈশাখীর মতো বর্ষিত বুলেটে মতিঝিলে কতো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, তার সঠিক হিসেব হয়তো কখনও জানা যাবে না। ইতিহাস বলে, জালিয়ানওয়ালা বাগে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ লোকের সমাবেশে, ব্রিগেইডিয়ার জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে মাত্র ৫০ গোর্খা সেনা ১০ মিনিট গুলি বর্ষণ করে হত্যা করেছিলো আন্দাজিত ১,৫০০ মানুষ। আর, গতরাত ঢাকার মতিঝিলে, কয়েক লক্ষ মানুষের সমাবেশের উপর তিন বাহিনীর সমন্বিত ১০,০০০ সদস্যের কতোজন কতো মিনিট গুলিবর্ষণ করে কতো মানুষ হত্যা করে থাকতে পারেন, সে-হিসেবের গাণিতিক নকশা আমার জানা নেই।

    পৃথিবীর কোনো ঘটনাই, এমনকি পৃথিবীর সৃষ্টি পর্যন্ত, বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। ইতিহাসের আলোকে আমি নিশ্চিত বলতে পারি, ৫-৬ মে’র ঘটনা নিয়ে বহুকাল বিতর্ক চলবে এবং সে-বিতর্ক আবর্তিত হবে মানুষের রাজনৈতিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বারা। বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক নিরাসক্ত সত্য হিসেবে সমগ্র জাতি হয়তো কোনো দিনই মতিঝিলকাণ্ড বুঝতে সক্ষম হবে না। কারণ, বাঙালী জাতি আজ রাজনৈতিকভাবে সাংঘাতিক বিভক্ত। আর, এ-বিভক্তির কারণেই পরস্পর বিরোধী অভিঘাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে মতিঝিলকাণ্ডের। এতে কেউ-কেউ ভয়ে ভীত ও শোকে বিহ্বল, আবার কেউ-কেউ আনন্দে উল্লসিত ও গর্বে স্ফীত।

    অথচ, মাত্র ১১ দিন আগে, ২৪ শে এপ্রিলে, সাভারের অবৈধ স্থাপত্য রানা-প্লাজা ধ্বসে যখন অজ্ঞাত সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হলো এবং এক-এক করে তাঁদের মৃতদেহ উদ্ধারিত হতে থাকলো, তখন আমরা কাউকে হাসতে দেখিনি। তখন আমরা সবাইকে দেখেছি মৌলিক মনুষ্যত্বের বোধে শোকাহত হতে। অথচ আজ কী বৈপরীত্য!

    ধারণা করা অযৌক্তিক নয় যে, আজ যদি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় না থেকে বিএনপি-জামায়েতের নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় থাকতো, আর ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রীয় ধর্ম বাতিল করে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ করতো এবং এমনইভাবে সে-সমাবেশে সশস্ত্র বাহিনী আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করতো, তাহলে গোটা চিত্রটিই পাল্টে যেতো। আমরা দেখতাম ইসলামবাদীরা হাসছেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা কাঁদছেন।

    একই জাতির মধ্যে কিছু মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্য কিছু মানুষের মধ্যে প্রদর্শিত এই ঐক্য ও বৈপরীত্যের পেছনে নিশ্চয় থেকে থাকবে মৌলিক মনুষ্যত্বের বাইরে অন্য কোনো কিছু। আমি মনে করি, এর উত্তর খুঁজতে হবে মানুষের কোগনিশন-মৌটিভেশন-এ্যাফকেশন-এ্যাকশনের - অর্থাৎ, বোধ-প্রেষণা-আবেগ-আচরণের - মনোবৈজ্ঞানিক সূত্র অনুসন্ধান করে। এই সূত্রের প্রথমেই আছে মানুষের বোধের স্তরে তার আত্মপরিচয়ের মৌলিক প্রশ্নটি। কারণ, মানুষের আচরণ নির্ভর করে তার পরিচয় ও প্রেষণার উপর - অর্থাৎ, আপনি কে ও আপনি কী চান, তার উপর নির্ভর করবে একটি প্রদত্ত স্থানে ও সময়ে কী ধরনের আচরণ করবেন।

    আমরা যখন নিজেকে শুধুই মানুষ মনে করি এবং বেঁচে থাকার প্রেষণায় কর্মস্থানে ও গণস্থানে নিরাপত্তা প্রত্যাশা করি, তখন আমরা সবাই মিলে সাভারকাণ্ডে হাহাকার করি, সাহায্যের জন্যে এগিয়ে যাই। দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগেও আমরা একই আচরণ করি। কারণ, তখন আমরা মনুষ্য প্রকরণে এক সত্ত্বা হিসেবে প্রকৃতির প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করি। কিন্তু এই আমরাই যখন নিজেদেরকে বিভক্ত মনে করি, তা মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই হোক কিংবা ধর্ম নিয়েই হোক, তখন আমাদের মধ্যে কেউ মতিঝিলকাণ্ডে হাসেন, আর কেউ কাঁদেন। কারণ, তখন আমরা আমাদের বিশ্বাস কিংবা ইতিহাসের প্রত্যক্ষণের সাথে জড়িত করে বিভক্তিমূলক আত্মপরিচয় গড়ে তুলি।

    সুনির্দিষ্টভাবে, এই বিভক্তির পেছনে আছে একটি ঐতিহাসিক থিসিস, একটি ঐতিহাসিক এ্যান্টিথিসিস এবং ফলস্বরূপ একটি ঐতিহাসিক সিন্‌থেসিস। থিসিসটা ছিলো ১৯০৬ সাল থেকে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে, মুসলিম আত্মপরিচয় ভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, যার ফলে বাংলা ভাগ হয়ে এর পূর্বাংশ ও বর্তমান পাকিস্তানকে নিয়ে ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হয়েছিলো নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের। এই থিসিসটিই মূর্তরূপে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ’র টু-নেশন্স থিওরী বা দ্বিজাতি তত্ত্ব হিসেবে উদয় হয়ে বাংলাকে ভাগ করলো।

    আর এ্যান্টিথিসিসটা ছিলো, ১৯৪৮ সালে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ্‌র বক্তব্যে প্রতিফলিত বাংলার বিপরীতে উর্দুভাষার প্রাধান্যের বিরুদ্ধে, তথা পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালীর স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ভিত্তিক বাঙালী জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম।

    উপরের থিসিস ও এ্যান্টিথিসিসের সংঘর্ষে ১৯৭১ সালে সিন্‌থেসিস হিসেবে অভ্যূদয় ঘটলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের, যা ১৯৪৭ সালের বাঙালীর ধর্মভিত্তিক আত্মপরিচয়কে প্রত্যাখান করলো বটে, কিন্তু কোনো ক্রমেই ১৯৪৭ পূর্বকালীন অখণ্ড বাঙালী আত্মপরিচয়ে আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারলো না কিংবা সমগ্র বাংলার সমস্ত মাটি ও মানুষের উপর দাবিও উচ্চারণ করতে পারলো না।

    এ-পরিস্থিতিতে পূর্ববাংলার বাঙালীর সংবেদনে পশ্চিম বাংলার বাঙালী মানুষ, বাংলা কথা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা সঙ্গীত, জল-স্থল-অন্তরীক্ষ প্রতিফলিত হবে না, এটি অসম্ভব। আর যদি প্রতিফলিত হয়ই, তাহলে সেই সংবেদনের ভিত্তিতে কী বোধ তৈরী হবে, তার সাথে আত্মবোধের তুলনায় কী সিদ্ধান্ত আসবে এবং এর প্রেষণাগত, আবেগত ও আচরণগত প্রকাশ কী হবে? মানুষ মাত্রই তার পর্যবেক্ষণযোগ্য পরিবেশকে এবং সেই পরিবেশের সাথে নিজের সম্পর্ক কী তা নিরূপণ না করে পারে না। এটি তার কোগনিটিভ কম্পালশন অর্থাৎ, বোধিক বাধ্যতা। সে-জন্যই কথা ফোটার পর শিশুরা অক্লান্তভাবে জিজ্ঞেস করতে থাকে ‘মা, এটি কী?’ ‘ওটা কী?’ ‘এ কে?’ ‘ও কে?’ ইত্যাদি।

    আমরা দেখলাম, যথেষ্ট অস্পষ্টতার মধ্যে বাংলাদেশের জাতিগত পরিচয়ে বাঙালী জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে ১৯৭২ সালে সংবিধানের অন্তর্ভূক্ত করা হলো রাষ্ট্রের চার স্তম্ভের দু’টি হিসেবে ঘোষণা করে। আবার অন্যদিক এর ‘জাতির পিতা’ শেখ মুজিবুর রহমান আন্তর্জাতিক ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা সদস্য করে ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ঐ সংস্থার দ্বিতীয় সম্মেলনে যোগ দিয়ে বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশটিকে আবার মুসলিম আইডণ্টিটির দিকে নিয়ে গেলেন।

    এখানেই সঙ্কটের শুরু এবং এই সঙ্কটের জনক হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। একটি জাতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসলামিক পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং জাতীয় পরিসরে এর মানুষের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় অক্ষুণ্ণ থাকবে, এটি হতে পারে না। এটি একটি সঙ্কটের জন্ম দিতে বাধ্য। আর, এ-সঙ্কট কাটাতেই শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়’। এই যে, কোনো কিছুকে ‘কী তা নয়’ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা, তা দিয়ে আর যা-ই হোক, একটি জাতির ইতবাচক বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করা যায় না। আর ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য ছাড়া জাতি আত্মপরিচয় লাভ করতে পারে না।

    বাঙালী জাতি এখনও পর্যন্ত সেই আত্মপরিচয়ের সঙ্কটেই ভুগছে। আর সেখান থেকেই রাজনৈতিক সঙ্কটের জন্ম হচ্ছে। পাঠক লক্ষ্য করুন, বাংলাদেশে প্রতিটি ক্ষেত্রে, রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে, শিক্ষায়, শিল্পে, সাহিত্য, অর্থনীতিতে, পরিষেবায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, সচিবালয়ে, পুলিসে, মিলিট্যারিতে, গ্রামে, গঞ্জে, সর্বত্র মোটা দাগে দু’টি ভাগ। লক্ষ্য করুন, এই ভাগগুলো কীভাবে ১৯৪৭ সাল ও ১৯৭১ সালের সাথে সমান্তরাল!

    আজ বাংলাদেশ নিশ্চিত একটি ক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছে। তার আত্মপরিচয়ের সঙ্কট পরিপক্ক হয়ে সংঘাতের রূপ নিয়েছে। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে আদর্শ ও বিশ্বাসাশ্রিত আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মাঝে অধিকতর মৌলিক যে আত্মপরিচিতি - মনুষ্য পরিচিতি তা যেনো হারিয়ে যেতে বসেছে।

    আমি আমার মনুষ্য আত্মপরিচয়ের জায়গা থেকে লিখছি, আমি আমার বোধ-প্রেষণা-আবেগ-আচরণ দিয়ে সর্বতোভাবে ধর্মবাদী হেফাজতে ইসলামের দর্শন, কর্মসূচি ও আন্দোলনের তীব্র বিরোধিতা করার পরও, শুধু বিশ্বাস ভিন্ন হবার কারণে, তাঁদের উপর রাষ্ট্রীয় ম্যাসাকারে আমি নীরব থাকতে পারি না। আমি আমার লেখার মাধ্যমে এর প্রতিবাদ করছি।

    আমি আহবান করছি সমস্ত মুক্তমনা, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষকেঃ হেফাজতে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করুন, কিন্তু তারপরও এদের উপর  রাষ্ট্রের এই বর্বর হামলার প্রতিবাদ করুন।

    সোমবার, ৬ মে ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

@Saikat Acharjee

মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের জমায়েতকে বল-প্রয়োগে স্থানচ্যূত করার সময় ঘটে থাকা সম্ভাব্য প্রাণহানির মধ্যে যাঁরা গণহত্যার উপাদান খুঁজে পাচ্ছেন তাঁদেরকে আপনি 'ধান্দাবাজ' ও 'ভণ্ড' বলে গাল দিয়েছেন। কেনো তাঁরা ধান্দাবাজ (এ-কথাটির অর্থ সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই) এবং ভণ্ড তা ব্যাখ্যা করেননি। আপনার আর্গুমেণ্টও স্পস্ট নয়। যেটুকু ধরা যাচ্ছে, তা হলো, মতিঝিলে গণহত্যার ব্যাপারটি আপনি অস্বীকার করছেন।

চলুন পরীক্ষা করে দেখি আপনার বক্তব্যের 'ভ্যালিডিটি'।

বাংলাদেশে শব্দ ব্যবহারে সতর্কতার অভাবে প্রায়ই শব্দের অর্থের বিচ্যুতি ঘটে। গণহত্যা তেমনি একটি শব্দ, যাকে জেনোসাইড ও ম্যাসাকারের প্রতিশব্দ হিসেবে প্রায়শই ব্যবহার করা হয়। আসলে জেনোসাইডের অর্থ হিসেবে গণহত্যা শব্দের ব্যবহার পুরোপুরি সঠিক নয়, জাতিগত নিধন বরং কাছাকাছি। আপনি ম্যাসাকার-গণহত্যা-জেনোসাইড শব্দমালায় তালগোল পাকিয়ে জড়িয়ে না গিয়েই আপনার মন্তব্য করেছেন - এটি ধরে নিয়েই এগুচ্ছি।

গণহত্যা বা ম্যাসাকার বলতে আসলে কী বুঝায়? অক্সফৌর্ড ডিকশনারির সংজ্ঞা হচ্ছেঃ 'an indiscriminate and brutal slaughter of many people'. অর্থাৎ 'বাছবিচার ছাড়াই নির্মমভাবে বহু লোক খুন হওয়ার ঘটনা' হচ্ছে গণহত্যা। এ-সংজ্ঞার ভ্যারিয়েশন রয়েছে কিছু তবে মূল কথা মোটামুটি একই। তাহলে, গণহত্যার মূল শর্ত দাঁড়াচ্ছে দু'টোঃ (১) হত্যাগুলো নির্বিচারে হওয়া এবং (২) বহু মানুষের প্রাণ যাওয়া। সাধারণতঃ দেখা যায় কর্তৃপক্ষ (যেমন সরকারী বাহিনী) বা শক্তির বিচারে গরিষ্ঠরাই (সুপেরিয়র অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে) গণহত্যা সঙ্ঘটিত করে থাকে।

লক্ষ্য করুন, আপনার মন্তব্যে কিছু স্বীকারোক্তি রয়েছেঃ
(১) মতিঝিলে হেফাজতের লক্ষাধিক মানুষ ছিলো,
(২) র‍্যাব-বিজিবি-পুলিসের আক্রমণে, আপনার ভাষায় 'এনফোর্সমেণ্ট এ্যাকশনে', মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে, রক্তপাত ঘটেছে।

মানুষ যে মারা গিয়েছে তা তো আপনিও বলছেন। আর এ-লক্ষ লোকের মধ্য থেকে যে বাছ-বিচার করে সুনির্দিষ্ট কয়েকজনকে (দোষে হোক বা বিনা দোষে) হত্যা করা হয়নি এটি তো অবভিয়াস। মানে, এ-হত্যাকাণ্ডের ধরণটি 'indiscriminate' বা নির্বিচার। কীভাবে, কে কাকে মারলো এটা পরিষ্কার হলো, অর্থাৎ সশস্ত্র স্টেইট এজেন্সির অস্ত্রের নির্বিচার আঘাতে প্রাণ হারালো লক্ষাধিক হেফাজতে ইসলামের লোকের মধ্য থেকে কিছু মানুষ। পূরণ হলো প্রথম শর্ত।

দ্বিতীয় শর্ত, বহু মানুষের মৃত্যুঃ
বহু বলতে যে কতো বুঝায় তা নির্ধারণে আসলে নির্দিষ্ট কোন মাপকাঠি নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে 'ম্যাসাকার' বা গণহত্যা বলে স্বীকৃত অনেক ঘটনা আছে যাতে প্রাণহানির সংখ্যা ৫-১০-এর বেশি নয়; আবার কোন-কোন ঘটনায় এ-সংখ্যা লাখেরও বেশি। ১৭৬৮ সালে লণ্ডনের সেইণ্ট জর্জেস ফীল্ডসে্‌র ম্যাসাকারে ৭ জন মারা গিয়েছিলো, ১৯৭০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেণ্ট স্টেইট ম্যাসাকারে ৪ জন, উত্তর আয়ারল্যাণ্ডের ব্লাডি সানডে বা বগসাইড ম্যাসাকারর কথা তো অনেকেরই জানা, যাতে ব্রিটিশ সেনাদের গুলিতে ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছিলো।

তবে মতিঝিলে খুন হওয়া মানুষের সংখ্যাটা যে কতো তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি এখনও - হতে পারে কয়েক ডজন আবার হতে পারে কয়েকশো বা তারও বেশি। আপাততঃ সেটা নিশ্চিত করে জানার উপায় নেই। তাই এ-প্রসঙ্গে আমি তিনটি বিষয়ে কথা তুলবোঃ (ক) যে-সব ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে দিন শেষ হয়ে রাতের এ্যাকশন এলো, তার গুরুত্ব, (খ) রাতের ঘটনায় এ-পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য, ফুটেজ, ফটো ইত্যাদি এবং (গ) হেফাজতের দাবি ও সরকারের বক্তব্য এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার বিবৃতি।

বিরাট সংখ্যায় জমায়েত হওয়া এ মানুষগুলো দিনভর পুলিসের টীয়ার শেল, রবার কৌটেড বুলেট, সাউণ্ড গ্রেনেইড, লাঠির আঘাত সত্বেও রাজপথ ছাড়েনি; তাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছে, পাল্টা আঘাত করেছে, অগ্নি-সংযোগ করেছে, ভাঙচুর করেছে। এমনকি আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী ক্যাডারদের হামলায়ও এরা ভয় পেয়ে ঢাকা ছেড়ে যায়নি। বরং সন্ধ্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে অবস্থানে অটল থাকার।

এ-রকম স্ট্রংলি মৌটিভেইটেড লক্ষাধিক মানুষকে ঠিক কোন জাদুতে ১০ মিনিটের মধ্যে একটি শহর থেকে বিতাড়িত করা সম্ভব? স্বাভাবিক বিচার-বোধ সম্পন্ন মানুষ বলবে, ভীষণ ভয় দেখিয়ে - সত্যিকারের গণ-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে।

ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পুলিস প্রথমেই নিভিয়ে দিয়েছে স্ট্রীটল্যাম্প-সহ সকল আলো। মাঝরাতের পরে, যখন ওদের বেশীরভাগই ঘুমোচ্ছিলো, তখন অন্ধকারের মধ্যে পুলিসের সাথে এসেছে আরও ভয়ংকর র‍্যাব (যা 'কিলিং স্কোয়াড' নামে কুখ্যাত)। এবং বাড়তি 'এনফৌর্সমেণ্ট' ফৌর্স হিসেবে এসেছে ভয়াল-দর্শন সাঁজোয়া-যানে করে প্যারা-মিলিট্যারি - বিজিবি। অকুস্থল থেকে সরিয়ে দিয়েছে সাংবাদিকদেরকে।

এম্বেডেড জার্নালিস্টদের (যাঁরা পুলিসের পাশে-পাশে হেঁটে প্রধানতঃ বুট থেকে কোমর পর্যন্ত ভিডিও ধারণ করেছেন) দেখানো সীমিত ভিডিওতেও শোনা গিয়েছে অনবরত গুলির শব্দ, যা করোবোরেট করছে ব্যাপক হারে মানুষের গুলিবিদ্ধ হওয়ার অনুমানকে। ওগুলো সব ফাঁকা গুলি হওয়ার কারণ নেই, কারণ দিনেই পুলিস নিশ্চিত হয়েছে, ফাঁকা গুলি কেনো, দু'চারটা লাশের বিনিময়েও ওরা পিছু হটবে না। সুতরাং, এটি ধরে নেয়াটা কষ্ট-কল্পনা হবে না যে, 'হেফাজতে ইসলামকে যেকোনো মূল্যে হটাতেই হবে' এমন পরিস্থিতির মধ্যে প্রথম ধাক্কাতেই আমাদের বীর পুলিস-র‍্যাব-বিজিবি সদস্যরা কিছু মানুষ বধ করে থাকবেন।

এ-ভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় কেমন করে স্টেইট-এজেণ্টরা বাতি নিভিয়ে সাংবাদিক সরিয়ে দিয়ে রিলিজিয়াস ফার্ভারে উদ্দীপ্ত ও ডিটারমাইণ্ড লক্ষাধিক মাদ্রাসা-ছাত্রকে শহরছাড়া করেছে।

প্রকৃত সংখ্যা কতো তা জানার পথ সরকারই বন্ধ করে রেখেছ। সরকার স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। ঘটনা লাইভ কাভার করতেও দেয়নি সাংবাদিকদেরকে, বন্ধ করে দিয়েছে টিভি চ্যানেল। হেফাজত হাজার-হাজার প্রানহানির কথা বলছে, দৃশ্যতঃ তাদের মিত্র বিএনপিও প্রায় একই কথা বলছে। কিন্তু এদের দাবির উপর আস্থা রাখা কঠিন, কারণ এরা সকলেই নিজেদের জায়গায় বায়াস্‌ড। সরকার যে একটি স্বাধীন কমিটিকে তদন্ত করে সত্য হিসাবটি বের করতে দেবে সে সম্ভবনাও প্রায় নেই। সুতরাং এ-মুহুর্তে আমাদের হাতে থাকা তথ্য-উপাত্ত্ব ও তার ভিত্তিতে ব্যাখ্যার মাধ্যমে একটি হিসেব ধরা ছাড়া উপায় নেই। আর সে হিসেবে সংখ্যাটি অন্ততঃ কয়েক ডজন হওয়ার সম্ভবনাই বেশি।

অর্থাৎ, এ-ঘটনাটিকে যথার্থই একটি indiscriminate and brutal slaughter of many people বলতে অসুবিধা হওয়ার কোন কারণ নেই। তাই আমি সিদ্ধান্ত টানছি, আপনার ম্যাসাকার ডিনায়াল অযৌক্তিক।

আর যুক্তিবিরোধী, গোয়ার্তুমিপূর্ণ ও অসৎ ডিনায়ালের উপর দাঁড়িয়ে আপনি বলছেন, 'যারা এখানে গনহত্যার উপাদান খুঁজে পান তাদের বেশিরভাগই ধান্ধাবাজ, ভন্ড'। গালাগালিতে আপনি অনায়াসে জিৎতে পারবেন, ওটি আমি করবো না। তবে আপনাকে আহবান করছি আপনি আপনার কাউণ্টার আর্গুমেণ্ট দিন, বলুন কেনো এটি গণহত্যা নয়।

শুধু ভুলে যাবেন না, ইতিহাস সাক্ষী, গণহত্যা যারা সঙ্ঘটিত করে বা সমর্থন করে কিংবা এ্যাক্টিভলি কোলাবোরেইট করে, তারা কখনোই তাকে গণহত্যা বলে স্বীকার করে না এবং প্রানহানির সংখ্যা কমিয়ে দেখাতে চায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ন্যাশন্যাল আর্মি ২৫শে মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পূর্ব বাংলায় যতো গণহত্যা করেছে তার একটিও স্বীকার করেনি; স্বীকার করেনি তাদের কোলাবরেইটর প্যারা-মিলিট্যারি ফৌর্স রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসও। তাদের মতে পাকিস্তান-বিরোধী সন্ত্রাসীদের দমন করতে মহান সেনাবাহিনী মিলিট্যারি এ্যাকশন নিয়েছিলো। হামদুর রহমান কমিশনের রিপৌর্টের বরাতে তারা এমনও বলে যে, এখানে ৩০ লাখ না, মোটে ২৬ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

একটা সমাবেশ যখন আর শান্তিপূর্ন থাকে না, যখন সমাবেশে অংশ নেয়া মানুষগুলো প্রচন্ড রকম ভায়োলেন্ট হয়ে পড়ে, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে আগুন দিয়ে একটা নয় দুটো নয়, শতের বেশী দোকান জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়, ব্যবসা প্রতিষ্টানগুলোতে নির্বিচারে ভাংচুর চালাতে থাকে, রাস্তার আলকাতরা তুলে ফেলে পুড়িয়ে দেয়, আইল্যান্ডের গাছগুলোকে পর্যন্ত কেটে ফেলে, ফুটপাতের স্ল্যাব নিয়ে এসে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয় আরো বড় সন্ত্রাসের উন্মত্ত নেশায় ----তখন রাষ্ট্র বসে থাকতে পারে না।

আপনি এতবড় একটা আনরুলি মবকে রাস্তা থেকে সরাবেন, কিন্ত কোন ক্যাজুয়েলিটি হবে না, আপনি এনফোর্সমেণ্ট একশনে যাবেন এবং লক্ষাধিক মানুষের কাছ থেকে রাজপথ রিক্লেইম করবেন, এবং একেবারেই কোন রক্তপাত হতে পারবে না বা কেউ মারা যেতে পারবে না এইটা বাস্তবতা বিবর্জিত একটি ইউটোপীয়ান চিন্তা মাত্র।

যারা এখানে গনহত্যার উপাদান খুঁজে পান তাদের বেশিরভাগই ধান্ধাবাজ, ভন্ড। এদের আমরা চিনি। আর বাকীরা জ্ঞানী। যাদের জ্ঞান কখনো মানুষের উপকারে লাগে নাই।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন