• রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ঃ জাগো বাহে, কোণ্‌ঠে সবায়!
    মাসুদ রানা

    আধুনিক বাঙালী জাতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস গড়েছেন এর বিদ্যার্থীরা। অখণ্ড বাংলায় ঊনিশ শতকের রেনেসাঁ বা নবজাগরণ থেকে শুরু করে বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালীর প্রায় সমস্ত ইতিহাস বিদ্যার্থীদের তৈরি। বাঙালী বিদ্যার্থীদের মতো এমন ইতিহাস-স্রষ্টা বিদ্যার্থীর পৃথিবীতে খুব কমই দেখা যায়।

    বাঙালীর ইতিহাসে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের জন্ম দিয়েছেন বিদ্যার্থীরা। বাঙালী জাতি-রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন তাঁরা। স্বাধীনতার পতাকা নির্মাণ করেছেন এই বিদ্যার্থীরা। বাঙালীর স্বাধীনতার ইশতেহার তথা ঘোষণা পাঠ এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাঁরা।

    পৃথিবীতে গত শতাব্দীর ষাটের দশক তারুণ্যের জাগরণে ইতিহাসে অন্যন্য হয়ে আছে। কিন্তু তার অন্ততঃ এক দশক আগেই জেগে উঠেছিলো পূর্ব দিগন্তে বাংলার বিদ্যার্থীকূল। ১৯৬৮ সালে প্যারিসে ফরাসী বিদ্যার্থীগণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে-আন্দোলনের সংঘটিত করেছিলো, সারা ইউরোপে, আমেরিকায়, এশিয়া ও আফ্রিকায় সে-আন্দোলনের ভাব-তরঙ্গ প্রচণ্ড অভিঘাত তৈরি করে। প্যারিসে সূচিত ছাত্র-আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ লাভ করে ফ্রান্সের একনায়ক জেনারেল চার্লস দ্যগলকে পতনের প্রান্তদেশে নিয়ে গিয়েছিলো, তার পতন ঘটেনি তাৎক্ষণিকভাবে।

    কিন্ত এক বছর পর ১৯৬৯ সালে বাঙালী ছাত্রসমাজ পাকিস্তানের তথাকথিত লৌহমানব ফীল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়ে আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের স্টেইজ রিহার্সেল সংঘটিত করেছিলো। কারণ, তার আগে ১৯৫২ ও ১৯৬২ সালে মাতৃভাষা ও শিক্ষার আন্দোলনের রাজপথে রক্তাক্ত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে তারা তৈরি হয়েই ছিলো।

    ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যূত্থানের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিলো ২০শে ফেব্রুয়ারীতে রাজপথের মিছিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায়। কিন্তু সেই মিছিল গণ-অভ্যূত্থাণের দিকে ধাবিত হয় ১৮ই ফেব্রুয়ারীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ শামসুজ্জোহার সচেতন শহীদি আত্মদানের মধ্য দিয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ছাত্রসমাজের সাথে একাত্ম শিক্ষক ডঃ শামসুজ্জোহার শহীদ হওয়ার পাঁচ সপ্তাহ'র মাথায় ২৫শে মার্চে সংঘটিত গণ-অভ্যূত্থান আইয়ুব খানের পতন ঘটায়।

    বাংলাদেশ আবার স্বৈরশাসনে নিপতিত। আবার শিক্ষার অধিকারের ওপর আক্রমণ এসেছে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র-পক্ষ থেকে। আবারও গণতান্ত্রিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত। কিন্তু আবার জেগে উঠেছে ছাত্র সমাজ। ৪৫ বছর পর আবার জেগে উঠেছে অসম সাহসিকতায় উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

    সংগ্রামী বিদ্যার্থীদের প্রতি ভালোবাসায় সিক্ত প্যারিস রৌডে হয়তো নেমে এসেছে আবার কোনো শামসুজ্জোহা। এবার তাঁর নাম হতে পারে বখতিয়ার আহমেদ কিংবা সুস্মিতা চক্রবর্তী। হতে পারেন তিনি সৌভিক রেজা কিংবা মোহাম্মদ নাসের, অথবা নজরুল ইসলাম।

    তিনিই বা তাঁরাই হয়তো ছাত্রের পিঠে ছররা গুলির শতো ক্ষত লক্ষ্য করে পুলিসী ও বাকশালী বুলেটের বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়াবেন। তিনি বা তাঁরাই হয়তো উত্তরবঙ্গের মুক্তিপাগল কিংবদন্তীর নুরুলদীনের কণ্ঠে হাঁকবেনঃ

    “জাগো বাহে, কোণ্‌ঠে সবায়!”

    সোমবার ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৪
    জুবিলী ষ্ট্রীট
    স্টেপনী, লণ্ডন
    ইংল্যাণ্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন