• লেইবার পার্টিতে বিদ্রোহঃ কী করবেন করবিন?
    মাসুদ রানা

    ব্রিটেইনের গণভৌটে ব্রিক্সিটের বিজয় যে-তারল্যের সৃষ্টি করেছে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে, তার সুযোগে লেইবার দলের বামপন্থী নেতা জেরেমি করবিনের বিরুদ্ধের দলটির দক্ষিণপন্থীরা একটি সমন্বিত আক্রমণ শুরু করেছেন। আমার এই লেখা শেষ হতে হতে ঘড়ির কাঁটা সোমবারে গড়াবে এবং এই সোমবারই হবে জেরেমি করবিনের জন্যে এক কঠিন পরীক্ষার দিন।

    সোমবারে লেইবার দলের পার্লামেণ্টারী পার্টির সভায় আলোচিত হওয়ার জন্যে লেইবার এমপি ম্যার্গারেট হজ ও এ্যান কফি অনাস্থা প্রস্তাব এনেছেন জেরিমি করবিনের লীডারশিপ বা নেতৃত্বের ওপর। আর, তার সাথে তাল রেখে ইতোমধ্যে তাঁর নেতৃত্বে কাজ করবেন না বলে ১০জন শ্যাডৌ ক্যাবিনেট মেম্বার পদত্যাগ করেছেন। অবশ্য, পদত্যাগ শুরু হয়েছে জেরেমি করবিন শ্যাডৌ ডিফেন্স সেক্রেট্যারী হিলারী বেনকে বরখাস্ত করার সূত্র ধরে।

    জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে শ্যাডৌ ডিফেন্স সেক্রেট্যারী হিলারী বেন একটি ক্যুর ষড়যন্ত্র করছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর, করবিন ফৌনালাপ করেন বেনের সাথে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই হিলারি বেন হচ্ছেন জেরেমি করবিনের নেতা প্রতিশ্রুতিশীল প্রায়ত বামপন্থী টনি বেনের পুত্র, যিনি পিতার বামপন্থার বিপরীতে হাঁটছেন।

    ফৌনালাপে নেতা জেরেমি করবিনের কাছে হিলারী বেন ক্যু'র ষড়যন্ত্রের কথা অস্বীকার করেন কিন্তু জানান, করবিনের ওপর তার আস্থা নেই এবং তাঁর নেতৃত্বে তিনি কাজ করতে চান না। সঙ্গত কারণেই করবিন বরখাস্ত করেন বেনকে।

    শ্যাডৌ ডিফেন্স সেক্রট্যারী হিলারী বেনের বরখাস্ত হওয়ার খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন করবিনের শ্যাডৌ ক্যাবিনেটের দক্ষিণপন্থী সদস্যরা। ফলে, এ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন (১) হাইডি আলেক্সাণ্ডার, (২) লিলিয়ান গ্রীনঊড, (৩) ভার্ণন কৌকার, (৪) গ্লৌরিয়া ডি পেয়েরো, (৫) সীমা মালহোত্রা, (৬) লর্ড ফ্যালকোনার অফ থোরণ্টন, (৭) কার্ল টার্ণার, (৮) লুসি পাওয়েল, (৯), ইয়নে ম্যুরে ও (১০) কেরি ক্যাকার্থী। পদত্যাগী শ্যাডৌ ক্যাবিনেট সদস্যরা মোটাদাগে বলেছেন যে, তাঁরা মনে করেন, জেরিমি করবিন লেইবার দলের মধ্যে ঐক্য রক্ষার করে আগামী নির্বাচনে বিজয় আনতে পারবেন না। 

     

    কিন্তু ব্রিটেইনের রাজনৈতিক মহল জানে যে, প্রায় এক বছর আগে বামপন্থী জেরেমি করবিন লেইবার পার্টির নেতৃত্বে বিপুল ভৌটে বিজয়ী হয়ে নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর থেকে দলের মধ্যে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের আমল থেকে গড়ে ওঠা ও প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণপন্থীরা কোনোভাবেই তাঁকে দলের নেতা হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। তাঁরা সম্ভাব্য প্রতিটি সুযোগেই তাঁকে দলের নেতৃত্ব থেকে সরাবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু গত দু'দিনে যে-প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে, তা আগের যে-কোনোবারের চেয়ে বেশি চ্যালেইঞ্জ প্রদায়ক।

    জেরেমি করবিন অবশ্য শ্যাডৌ ক্যাবিনেট সদস্যদের পদত্যাগে বেদনা প্রকাশ করার পাশাপাশি জানান, লক্ষ সদস্যদের ভৌটে তিনি যে উদ্দেশ্য নির্বাচিত হয়ছেন, সেখান থেকে তিনি সরে দাঁড়াবেন না। তিনি বলেনঃ, 

    "I was elected by hundreds of thousands of Labour party members and supporters with an overwhelming mandate for a different kind of politics. I regret there have been resignations today from my shadow cabinet. But I am not going to betray the trust of those who voted for me – or the millions of supporters across the country who need Labour to represent them. Those who want to change Labour’s leadership will have to stand in a democratic election, in which I will be a candidate."

    অর্থাৎ, "আমি নির্বাচিত হয়েছি লেইবার পার্টির লক্ষ লক্ষ সদস্য ও সমর্থকের সমর্থনে একটি ভিন্ন প্রকারের রাজনীতির জন্যে। আমি দুঃখিত যে, আমার শ্যাডৌ ক্যাবিনেট থেকে আজ কিছু পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু যাঁরা আমাকে নির্বাচিত করেছেন - অথবা সারাদেশে যে অযুত-অযুত সমর্থক তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্যে লেইবার পার্টির প্রয়োজন - তাঁদের বিশ্বাসের সাথে আমি ঘাতকতা করতে পারবো না। যাঁরা লেইবার দলের নেতৃত্ব পরিবর্তন করতে চান, তাঁদেরকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন মোকাবেলা করতে হবে, যেখানে আমিও একজন প্রার্থী হবো।"

    আমি মনে করি, ব্রিক্সিট যেমন জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের জন্যে চ্যালেইঞ্জ এনেছে, তেমনি নতুন সুযোগও এনে দিয়েছে। কারণ, তিনি যদি সত্যিই ব্রিটেইনের শ্রমজীবী মানুষের সহায়ক অর্থনীতি, স্বাস্থ্যনীতি, শিক্ষানীতি, বাসস্থান-নীতি ও সর্বোপরি বিদেশ নীতির পরিপূরক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চান, তার মাল্টিন্যাশন্যাল কর্পোরেশনের স্বার্থরক্ষাকারী রাষ্ট্রোত্তীর্ণ রাষ্ট্রসঙ্ঘ ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের ভেতরে থেকে সম্ভব ছিলো না।

    যদিও “আমাদের দেশ আমরা ফেরত চাই” দক্ষিণপন্থীরা স্লৌগান তুলে ব্রিক্সিটের পক্ষে প্রধানতঃ ইংলিশ জনগোষ্ঠীর সর্থন পেলেও, বস্তুতঃ তারা আদর্শগত কারণেই কল্যাণমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেয়ে বরং নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার দিকে যাবে। আমার ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতিতে একমাত্র লেইবার পার্টিই পারে ব্রিটিশ জনগণের কাছে প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্রের রূপরেখা তুলে ধরে তাদের সমর্থন নিয়ে আগামী দিনের ব্রিটেইনকে গড়ে তোলা। আর, লেইবার পার্টিকে এই পথে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে জেরেমি করবিনের বিকল্প নেই।

    আমার মনে হয়, জেরেমি করবিন যদি তাঁর মনোবল দৃঢ় রেখে, কোনো হুমকি বা ভীতির কাছে নত না হোন, তিনি একজন ফরমিডিবল নেতা হিসেবে আবির্ভূত হবেন, ঠিক যেমনটির ব্রহত্তর ব্রিটিশ জনগণ আশা করছে। তাই, এই মুহূর্তে দক্ষিণপন্থীদের সাথে কোনো ধরণের আপস করার সুযোগ নেই তাঁর। জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে তাঁর আপসহীন দৃঢ়তাই তাঁকে সফল করতে পারে বর্তমান সঙ্কটে বিজয়ী হতে। আর, জেরেমি করবিন বিজয়ী হলে, আগামী দিনে তিনি ব্রিটেনের জন্য সত্যিই নতুন রাজনীতি উপহার দিতে পারবেন। 

    পরিশেষে, আমি আশা করি, লেইবার দলের সকল সদস্য ও সমর্থক জেরেমি করবিনের পাশে দাঁড়িয়ে সঙ্কটের দিনে তাঁর শক্তি বৃদ্ধি করবেন।

    সোমবার ২৭শে জুন ২০১৬

    লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

     

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন