• লেখক-গোয়েন্দা সখ্যঃ ফ্যাসিবাদ কতো দূর?
    মাসুদ রানা

    জনৈক আসিফ মহিউদ্দীন ফেইসবুকে আমাকে গত সপ্তাহান্তে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠালে আমি তাঁকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করি। সেই সূত্রে তাঁর স্টেইটাস-সমূহ আমার প্রতি প্রত্যহ প্রবাহিত।

    আজ প্রভাতে আসিফ মহিউদ্দীনের দু’টি স্টেইটাস আমার মনোযোগ কাড়ে, যার একটিতে ‘রকমারি.কম’ নামের একটি আন্তর্জালিক বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বর্জনের ডাক এবং অন্যটিতে সেই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে তাঁর নিজের গৃহীত কতিপয় পদক্ষেপের বিবরণ।

    রকমারি বর্জন

    আসিফ মহিউদ্দীন জানান, ফারাবী শফিউর নামের কোনো এক ইসলামবাদী হুমকিদাতার কাছে ‘রকমারি’র সত্ত্বাধিকারী নতি স্বীকার করে নিজের ধর্ম-চর্চার উল্লেখ পূর্বক ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন এবং সেই সাথে তাঁর পণ্য-তালিকা থেকে দু’জন লেখকের গ্রন্থ প্রত্যাহার করেছেন। তাই তিনি ‘রকমারি’ বর্জন করার আহবান জানিয়েছেন। 

    আসিফ মহিউদ্দিন সেই সাথে উল্লেখ করেছেন, এই হুমকিদাতা শুধু রকমারিকেই হুমকি দেননি, তিনি ইতিপূর্বে খোদ প্রধানমন্ত্রী-সহ শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুন, পীযুষ বন্দোপাধ্যায়, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, পারভেজ আলম, অভিজিৎ রায় ও তাঁকেও হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন।

    লক্ষ্যণীয়, আসিফ মহিউদ্দীন তাঁর বা তাঁদের প্রাণের হুমকিকে কিন্ত খারাপ কিছু মনে করেননি। বস্তুতঃ তিনি এই হুমকিকে খারাপের চেয়ে ভালো মনে করছেন। তিনি নিজেই বলেছেনঃ

    “আল্লামা শফীর ফেসবুক ভার্শন ফারাবী শফিউরকে পাত্তা দেয়ার কিছু নেই, তার উগ্র ইসলামিক লেখালেখি বরঞ্চ ধর্মের উগ্রতাই সবার সামনে প্রকাশ করে আসছে, তা আমাদের জন্য ভালই।”

    দুর্ভাগ্যবশতঃ রকমারির সত্ত্বাধিকারী হয়তো আসিফ মহিউদ্দীনের মতো সাহসী নন বলে, তাঁর মতো ইসলামীবাদীর হুমকিকে পাত্তা না বরং ভয়ই পেয়েছেন - যেমনটি অতীতে পেয়ে থাকবেন ‘প্রথম আলো’র সম্পাদক মতিউর রহমান।

    প্রথম আলোর মতিউর রহমানও তাঁর প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনা করে ভয় পেয়েছিলেন এবং বায়তুল মোকাররম মসজিদের খতিবের কাছে ধর্মীয় আভরণে নীত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। অবশ্য, আসিফ মহিউদ্দীন তখন ‘প্রথম আলো’ বর্জনের আহবান জানিয়েছিলেন কি-না, তা আমার জানা নেই। স্পষ্টতঃ ‘রকমারি’র প্রতি আসিফ মহিউদ্দীন ক্ষমাহীন। কারণ, রকমারি শুধু যে ভয় পেয়েছে তাই নয়, তারা দু’জন লেখকের পুস্তক প্রত্যাহার করেছে।

    আমি খুশি হতাম, যদি দেখতাম তিনি ফারাবী শফিউরকে “পাত্তা দেয়ার কিছু নেই” মনে না করে লেখক হিসেবে তাঁর যাবতীয় প্রভাব খাটিয়ে রাজনীতিক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, লেখক ও শিল্পীর প্রতি প্রাণনাশের হুমকির ঘটনাকে গাম্ভীর্যের সাথে “পাত্তা” দিয়ে সাধারণ পাঠকদের মধ্যে সরকারী নিস্পৃহতার বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতেন। কারণ, তিনিই অভিযোগ করেছেনঃ

    “...আমাদের নির্বোধ কর্তৃপক্ষ নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়। দেখেও না দেখার ভান করে। কারণ ধর্মীয় অনুভূতি!”

    আমি আসিফ মহিউদ্দীনের হতাশা বুঝতে পারি। আমি ভাবিঃ ‘রকমারি’ যেখানে রাষ্ট্রীয় আইনে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরও আল্লামা মওদূদীর গ্রন্থ বিক্রি করার সাহস পায়, সেখানে জনৈক ফারাবী শফিউরের হুমকিতে জনপ্রিয় দুজন লেখকের বই প্রত্যাহার করে কোনো নৈতিকতায়?

    আমি মনে করি, আসিফ মহিউদ্দীনের ‘রকমারি বর্জন করি’ আন্দোলনের একটি যৌক্তিকতা আছে। তাঁর যৌক্তিকতা আমার কাছে গ্রহণীয় না হলেও, আমি মনে করি এই বর্জন আন্দোলনের ডাক দেওয়ার অধিকার তাঁর আছে।

    কারণ, আমি এটিকে দেখি একজন  লেখকের প্রতি অন্য একজন লেখকের সমর্মিতা হিসেবে। এই সমমর্মিতাকে আমি সাধুবাদ জানাই এবং রকমারির পণ্য তালিকা থেকে লেখদের বই প্রত্যাহারের প্রতিবাদ করি। আমি দাবী করি, বইগুলো নিঃশর্তভাবে ফিরিয়ে আনা হোক।

    পাঠক যদি কোনো লেখকের বই পছন্দ না করেন, তাঁরা কিনবেন না। কিন্তু কেউ পছন্দ করে না বলে লেখকদের বই পণ্য তালিকায় রাখা যাবে না, এটি কোনো সভ্যতার পর্যায়ে পড়ে না।

    আমি মনে করি, কোনো লেখক যদি মানুষের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যুক্তির বদলে অসভ্য শব্দ প্রয়োগে মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেন, তাহলে তিনি পাঠকের দ্বারা পরিত্যক্ত হবেন। কিন্তু কারও অধিকার নেই লেখকের লেখার ওপর শিকল দেওয়ার। আমি পৃথিবীর সমস্ত গ্রন্থ থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবী জানাই। মওদূদী থেকে সালমান রুশদী পর্যন্ত সবার গ্রন্থই শিকলমুক্ত করে দেওয়া হোক।

    লেখক-গোয়েন্দা সখ্য

    কিন্তু আমি সত্যিই উদ্বিগ্ন আসিফ মহিউদ্দীনের লেখক-সত্তার চেয়েও অধিক ক্ষমতাশালী বিশেষ অবস্থান লক্ষ্য করে। আমি রীতিমতো শঙ্কিত যে, তিনি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে যুক্ত এক বুদ্ধিজীবী, যিনি প্রয়োজনে তাঁর প্রভাব খাটিয়ে অভীষ্ঠ লক্ষ্য অর্জনে পারঙ্গম। কারণ, তিনি স্বয়ং লিখেছেনঃ

    “একজন গোয়েন্দা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এই বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন, তারা এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ইন্টারগেশনে এনে তথ্য বের করার ব্যাপারে একমত হয়েছে।”

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন বিদ্যার্থী ও ডাকসুতে নির্বাচিত হওয়ার সুবাদে আমার অনেক সতীর্থ, অগ্রজ ও অনুজ বিদ্যার্থী সরকারে, সেনাবাহিনীতে, পুলিসে ও গোয়েন্দাতে আছেন বলে জানি। কিন্তু আমি তখন থেকে এখনও পর্যন্ত কখনও তাঁদের সাথে বিশেষ যোগাযোগ রেখে চলার কথা ভাবিনি। এমনও হতে পারে যে, বাংলাদেশে থাকি না বলে প্রয়োজন অনুভব করিনি।

    তথাপি ভাবি, বাংলাদেশে থাকলেও কি দার্শনিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে লেখক হিসেবে আমি কি আমার পাঠক তথা জনগণের কাছে আপীল করবো? নাকি গোয়েন্দা পুলিসে সাথে যোগাযোগ করে “ইন্টারগেশনে এনে তথ্য বের করার ব্যাপারে একমত” হবো?

    আমি অনুমান করছি না যে, আসিফ মহিউদ্দীন গোয়েন্দা পুলিসের সহযোগী। কিন্তু ইতিহাসে আমরা দেখি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রে বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, সংবাদিক, শিক্ষক ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে ফ্যাসীবাদী এজেণ্ট গড়ে ওঠে। গোয়েন্দা পুলিস না চাইলেও অনেকে ‘সেলফ এ্যাপয়েণ্টেড’ হন।

    আমরা জানি, নাৎসী জার্মানীতে হিটলারের নাজিবাদের বিকাশ-কালে কীভাবে কী হয়েছিলো। শিল্পী-সাহিত্যিক, শিক্ষক-বিজ্ঞানী-সহ বুদ্ধিবৃত্তির হাজার হাজার কর্মী জার্মানী ত্যাগ করেছিলেন। খোদ আইনস্টাইনের মতো বিজ্ঞানীকেও স্বদেশ ছেড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে হয়েছিলো।

    আসিফ মহিউদ্দীন যদি সুস্থবোধের মানুষ হোন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন, বাধাহীন বুদ্ধি-চর্চার ক্ষেত্রে সবেচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধক হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র যখন কোনো নির্দিষ্ট দর্শনের পক্ষে ভিন্ন দর্শনের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে সক্রিয় হয়, তখন সে-রাষ্ট্র ফ্যাসীবাদী হয়ে ওঠে। আর, রাষ্ট্র যখন ফ্যাসীবাদী হয়ে ওঠে, তখন একটি জাতির দুর্দিন ঘনিয়ে আসে।

    ইসলামী ফ্যাসিবাদীরা রাষ্ট্র দখল করে সেই কাজটি করতে চায়, আসিফ মহিউদ্দীন আজ যে কাজটি করতে দূর প্রবাসে থেকেও চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু এটি করার মধ্য দিয়ে তিনি কিন্তু সেই মুক্ত চিন্তার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছেন, যার জন্য তিনি আপাতঃ লড়ছেন বলে দাবী করছেন।

    আসিফ মহিউদ্দীন যেই হোন, আমি তাঁকে অনুরোধ করবো, দয়া করে তিনি যেনো এ-চর্চা বন্ধ রাখেন। এ-চর্চা আমরা ১৯৭১ সালে দেখেছি। এটি রাজাকার ও আল-বদরের কাজ। কারও হৃদয় দৃশ্যতঃ রাজাকার-বিরোধী হলেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্রিয়া করতে পারে আল-বদরের মতোই। আর, এই চেতনা কী - মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ইসলামী চেতনা, না-কি সাম্যবাদী চেতনা - সেটি বড়ো কথা নয়।

    আমি আসিফ মহিউদ্দীন সম্পর্কে আজ পিনাকী ভট্টাচার্যের কাছে খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম,  আসিফ নিজেও গত বছর ইসলাবাদীদের দাবীর মুখে পুলিসের হাতে গ্রেফতারিত হয়েছিলেন। রাষ্ট্র ইসলামাদীদের হাতে ছিলো না বলে হয়তো তিনি নিগৃহীত হননি। কিন্তু রাষ্ট্র যদি ইসলামবাদীদের হাতে থাকতো তাহলে কী হতো তাঁর?

    আশ্চর্য্য! আসিফ মহিউদ্দীন নিজে নিপীড়িত হওয়ার পরও তিনি একই নিপীড়নের ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন অন্যের জন্য। এটি কি সম্ভব? কীভাবে সম্ভব?

    সিষ্টেম জাষ্টিফিকেশন

    নিজে নিপীড়িত হয়েও নিপীড়নের পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব। সমাজ-মনোবিজ্ঞানে এই মানসিকতার একটি নাম আছে। নিপীড়নের শিকার যখন নিপীড়ক ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ায়, তখন তাঁর এই মনোস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াটাকে বলা হয় সিস্টেম জাষ্টিফিকেশন। সিষ্টেম জাষ্টিফিকেশনের মধ্য দিয়ে নিপীড়িত নিজের অসহায়ত্বের একটি যৌক্তিক কারণ প্রতিষ্ঠা করে আত্মমূল্য সংরক্ষণ করতে চায়।

    এটি হচ্ছে নিপীড়িতের ওপর নিপীড়কের হেজেমোনি বা বোধাধিপত্যের ফল। নিপীড়িতের বোধে যখন নিপীড়ক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, তখন তাকে হেজেমোনি বা বোধাধিপত্য বলে।

    কিন্তু আমরা ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে জানি, নিপীড়ক ব্যবস্থা নিপীড়িত ও নিপীড়ক কারও জন্যেই ভালো নয়। কারণ, কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দীর সাথে ফটকের প্রহরীও অনড় ও শৃঙ্খলিত। শিকল পরার এই হচ্ছে কল।

    তাই, আমি আসিফ মহিউদ্দীনের উল্লেখিত ‘গোয়েন্দা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা’র প্রতিও এই অনুরোধ করবো, দয়া করে আপনারা লেখক-বুদ্ধিজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিকদের আপনাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সাথে জড়িত করবেন না।

    কেউ নিজে থেকে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য, খেতাব, বৃত্তি, ইত্যাদি পাওয়ার অথবা পেয়ে সুরক্ষার আশায় ‘সেলফ-এ্যাপয়েণ্টেড’ বা স্ব-নিয়োজিত হতে চাইলেও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করুন। কারণ, এটি আপনারও দেশ, আপনারও জাতি।

    নিজের জাতির ইণ্টিলিজেনশিয়া বা বুদ্ধিজীবীদের স্বাধীন থাকতে ও স্বাধীন চিন্তা করতে দিন। স্বাধীন বুদ্ধিজীবী ছাড়া কোনো জাতি সুসভ্য ও মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে দাঁড়াতে পারে না।

    পরিশেষে, আমি নাজি-বিরোধী বিখ্যাত জার্মান লেখক ফ্রেডরিখ গুস্টাভ এমিল মার্টিন নিলৌলারের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে বিদায় নেবোঃ

    When the Nazis came for the communists (যখন নাৎসিরা এলো কমিউনিষ্টদের জন্য),
    I remained silent (আমি তখন নীরব থাকলাম);
    I was not a communist (আমি কমিউনিষ্ট ছিলাম না).

    When they locked up the social democrats (যখন তাঁরা সমাজ-গণতন্ত্রীদের বন্দি করলো),
    I remained silent (আমি তখন নীরব থাকলাম);
    I was not a social democrat (আমি সমাজ-গণতন্ত্রী ছিলাম না).

    When they came for the trade unionists (যখন তারা ট্রেইড ইউনিয়বাদীদের জন্য এলো),
    I did not speak out (আমি তখন কোনো কথা বলিনি);
    I was not a trade unionist (আমি ট্রেইড ইউনয়নবাদী ছিলাম না).

    When they came for the Jews (যখন তারা ইহুদিদের জন্য এলো),
    I remained silent (আমি নীরব থাকলাম);
    I wasn't a Jew (আমি ইহুদি ছিলাম না).

    When they came for me (যখন তারা আমার জন্য এলো),
    there was no one left to speak out (সেখানে আর কেউ অবশিষ্ট ছিলো না কথা বলার).

    রোববার, ১৬ই মার্চ ২০১৪
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন