• শাহবাগ-আন্দোলনঃ আওয়ামী লীগের হিস্যা
    মাসুদ রানা

    যে-দল আছে সরকারে, তার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে না সরকারের তৈরী বিশেষ আদালতে, এমন আইনের শাসন কি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশে?

    এ-প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরী নয়। কারণ, উত্তর দেবার মতো বুদ্ধিমানেরা বুদ্ধির জোরে সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানাতে পারেন।

    বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সঙ্ঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারকল্পে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সম্পর্কে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র সংগঠনগুলোর দাবি হচ্ছে, এটি ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ’। এমন দাবি-করা সংগঠনগুলোর স্বারোপিত যৌথ নাম হলো ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’।

    কিন্তু তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিজোট এ-দাবি মানে না। ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি’ অভিধায় অভিযুক্ত দলগুলোর অভিযোগ হচ্ছে, এ-আদালত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি এবং এর রায়সমূহও আওয়ামী লীগের স্বার্থে পূর্বপরিকল্পিত। এদেরই দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছে, শাহবাগ-আন্দোলনটাও আওয়ামী লীগের কর্মসূচির অংশ।

    দৃশ্যতঃ উপরের অভিযোগ দু’টির রাজনৈতিক আবেদন যাই থাকুক না কেনো, এর একটি সত্য হলে অন্যটি সত্য হতে পারে না। কারণ, এ-দু’টি পরস্পর বিরোধী প্রকল্প।

    আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যদি আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকে, তাহলে সে-আদালতের রায়ের বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগই শাহবাগে অমান্যতা-আন্দোলনের সূচনা করতে পারে না। অধিকন্তু, আওয়ামী লীগ এমন কর্মসূচির আয়োজন করতে পারে না, যেখানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে আক্রমণের মুখে পড়ে পালাতে হয় নেতাদের এবং যেখানে শেখ হাসিনার রাজাকার-আত্মীয়তার পৌস্টার প্রদর্শিত হয় - যেমনটি হয়েছে শাহবাগ-সমাবেশে প্রথম দিকে।

    কাদের মোল্লাকে দেয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় মনঃপুত হয়নি বলেই যদি আওয়ামী লীগ ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন শুরু করে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আওয়ামী লীগের আজ্ঞাবহ ছিলো বলে যে-প্রথম অভিযোগটি রয়েছে, তা ভিত্তি হারিয়ে ফেলে। উপরন্তু, আদালত যদি নিরপেক্ষ ও স্বাধীনই হতো, তাহলে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদালতকে ‘জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে রায়’ দেবার পরামর্শ দিতেন না।

    বস্তুতঃ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা এবং শাহবাগ-আন্দোলনে আওয়ামী লীগের প্রকৌশলতা, এ-দুটির সত্য হবার সম্ভবনাই অতি ক্ষীণ। এ-প্রসঙ্গে কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

    যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ গত নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছে। মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে বিচার শুরু কিংবা সমাপ্ত করে পরবর্তী নির্বাচনেও সুবিধা নেবার পরিকল্পনা থাকা আওয়ামী লীগের জন্য অস্বাভাবিক নয়। কারণ, যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি আওয়ামী লীগের ‘স্ট্র্যাটেজি’ বা রণনীতি নয়, বরং ‘ট্যাক্টিক’ বা রণকৌশল।

    মানবতাবিরোধী অপরাধের তথা যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়টি আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে এসেছে জামায়াতে ইসলামীকে শাস্তি দেবার কিংবা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে নয়। বিষয়টি এসেছে জামায়াতকে আওয়ামী লীগের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করতে।

    জামায়াতে ইসলামীর প্রতি বাকশাল পরিবারের - অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ইত্যাদি - কারও মনে শুরুতেই বিস্বাদ ছিলো না। থাকলে, তারা ১৯৮৬ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে, জামায়াতকে সহযাত্রী হিসেবে মেনে নিয়ে, জেনারেল হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের অধীনে নির্বাচনে যেতো না। শুধু তাই নয়, ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত, জামায়েতের সাথে আওয়ামী লীগের সখ্য ও সহযোগিতাও হতো না।

    প্রসঙ্গতঃ স্মরি, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যকাণ্ডের পর তাঁর সহকর্মী আব্দুল মালেক উকিল লণ্ডনে এসে তাঁকে দুঃশাসক হিসেবে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘ফেরাউনের কবল থেকে আল্লাহ দেশকে রক্ষা করেছেন।’ এই আব্দুল মালেক উকিলই যখন পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন, তখন তাঁকে পূর্বের নেতিবাক্য স্মরণ করিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে কোনো শেষ কথা নেই’।

    আব্দুল মালেক উকিলের প্রথম কথাটি আওয়ামী লীগ বিশ্বাস না করলেও শেষের কথাটি মনেপ্রাণেই বিশ্বাস করে। তাই, জামায়াতে ইসলামী শত্রু , না মিত্র, এ-বিষয়ে আওয়ামী লীগের কোনো শেষ কথা নেই।

    একাধিকবার বন্ধুভাবাপন্ন থাকার পর আওয়ামী লীগের কাছে জামায়াতে ইসলামী তখনই অসহনীয় অপরাধী হয়ে ওঠে, যখন জামায়াতের শক্তি যুক্ত করে গঠিত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট ২০০১ সালে নির্বাচনে বিজয়ী হয়। এটি কোনো তত্ত্ব নয়, এটি সত্য ঘটনা।

    যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটিকে ২০০৮ সালে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি করে, আওয়ামী লীগ নিজের শক্তিবৃদ্ধি ও প্রতিদ্বন্দ্বীর শক্তিহ্রাসের নীতি গ্রহণ করে। অর্থাৎ, এ-কর্মসূচি একদিকে যেমন জামায়তকে যুদ্ধাপরাধে ও বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়দানের অভিযোগে দূর্বল করে, তেমনি ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি’সমূহকে আওয়ামী লীগের ছায়াতলে নিয়ে আসে।

    আওয়ামী লীগের এ-রণনীতির ‘সেকেণ্ড-অর্ডার’ বা দ্বিতীয়ক্রমিক লক্ষ্য হয়ে থাকবে, জামায়াতে ইসলামীকে বিএনপি থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত করা - ধ্বংস করা নয়। কারণ, দল হিসেবে জামায়তকে ধ্বংস করে দিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো লাভ নেই।

    জামায়াত যদি নির্বাচনে তাদের নিজস্ব প্রার্থী না দিতে পারে, তাহলে তাদের ভৌটারদের ভৌটগুলো যাবে বিএনপি’র বাক্সে, যা আওয়ামী লীগের জন্য সুখকর নয়। তাই, জামায়াতকে নির্বাচনে নিজপায়ে দাঁড়ানো প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবেই দেখতে চায় আওয়ামী লীগ। তাতে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ বাড়ে। আর এ-রণনীতির পরিপূরক রণকৌশল হিসেবেই এসেছে 'যুদ্ধাপরাধ' থেকে রূপান্তরিত 'মানবতাবিরোধী' অপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর বিচারের আয়োজন।

    তবে, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের চরম শাস্তির সম্ভাবনা জামায়াতে ইসলামীর ভেতর যতোটুকু অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করেছে, তার চেয়েও বেশি হুমকি তৈরি করেছে তাদের নিষিদ্ধির দাবিটি। পলাতক আবুল কালাম আযাদকে দোষী সাব্যস্ত ও ফাঁসিদণ্ড দিয়ে জামায়াতকে একদিকে মৃত্যুদণ্ডের হুমকি, আর অন্যদিকে, মহাজোটের পক্ষ থেকে পার্লামেন্টে আলোচনা ও বামপন্থীদের পক্ষ থেকে বাইরে হরতালের মাধ্যমে দল-নিষিদ্ধির দাবি সামনে এনে জামায়াতের কাছে কঠিন বার্তা পাঠানো হয়।

    জামায়াতে ইসলামী মৌলবাদী তালিবানদের মতো আণ্ডারগ্রাউণ্ডে ‘অপারেইট’ করার মতো করে তৈরি নয়, বরং সংসদীয় নির্বাচনী রাজনীতির জন্য সংগঠিত। যতোই 'ইসলামী জোশ' দেখাক না কেনো, জামায়াতে ইসলামী দলটি পুঁজিবাদী মুক্তবাজার অর্থনীতির কাঠামোয় ও নেটওয়ার্কের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত।

    এ-দলের নেতা-কর্মীরা অন্যান্য যে-কোনো দলের চেয়ে অধিক সংগঠিত রূপে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত। এ-সুবিধা পরিহার করে এ-দলের পক্ষে আণ্ডারগ্রাউণ্ডে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। গোলাম আযমের ফাঁসি হলেও জামায়াত বাঁচবে, কিন্তু জামায়াতের বিশাল এস্টাব্লিশমেন্ট অবৈধ বা লুপ্ত হয়ে গেলে তা দলটির জন্য হবে মৃত্যু-সম।

    আওয়ামী লীগের হুমকিতে জামায়াতে ইসলামী সম্ভবতঃ ভীত হয়ে এ-রূপ প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলো যে, (১) অভিযুক্ত নেতাদের নামমাত্র দণ্ড দেয়া হবে কিংবা প্রথমে গুরুদণ্ড দিয়ে পরে লঘু করা হবে, (২) জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হবে না, (৩) জামায়াতের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে ও স্বার্থে আঘাত হানা হবে না, যদি দলটি (৪) বিএনপির জোট থেকে সরে আসে, (৫) তত্ত্ববধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন না করে ও (৬) একদলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

    একমাত্র উপরের তত্ত্বের সত্য-সম্ভাব্যতাই, আওয়ামী-জামায়াত পৌনঃপুনিক সখ্যতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, ব্যাখ্যা যোগায়ঃ (১) কেনো সরকার জানুয়ারীতে হঠাৎ করে জামায়াতে ইসলামীকে বিনা বাধায় কর্মসূচি পালন করতে দেবার মতো ‘গণতান্ত্রিক’ হলো; (২) কেনো পুলিস ও পুলিস-প্রতিমন্ত্রী জামায়াতে ইসলামীর নিয়মতান্ত্রিকতার প্রশংসা করলো; (৩) কেনো জামায়াত-শিবির কর্মীরা আন্দোলনের কর্মসূচি পালন-কালে পুলিসকে শুভেচ্ছার প্রতীক হিসেবে রজনীগন্ধা পুষ্প উপহার দিলো; (৪) কেনো শেখ হাসিনা ইসলামী ছাত্র শিবিরের নতুন প্রজন্মের প্রতি সপ্রশংস সহানুভূতি প্রকাশ করে তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানানোর প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করলেন; এবং (৫) কেনো আওয়ামী লীগ জামায়াতের সাথে নির্বাচনী বুঝাপড়া করে থাকতে পারে বলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ-কেউ মন্তব্য করেছিলেন।

    আওয়ামী লীগের ব্যবহৃত রণকৌশল তার রণনীতিকে অত্যন্ত কার্যকারিতার সাথে সমর্থন করেছিলো। কিন্তু এতে বাধ সাধলো শাহবাগ-আন্দোলন। শাহবাগ-আন্দোলনের কর্ণধার ইমরান সরকারের প্রজন্মব্লগে অন্ততঃ ৬ মাস আগে জানানো হয়েছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টিকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ‘অনেক বড়ো পরিবর্তন’ ঘটানো হবে।

    শাহবাগ-আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা শেখ হাসিনাকে করতে হয়েছে আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য নয়, বরং শাহবাগ আন্দোলনটি (১) যেনো আওয়ামী-জামায়াত বুঝাপড়া বিষয়টিকে সামনে না নিয়ে আসে (২) যেনো কোনো অনাকাঙ্খিত শক্তির হাতে সরকার পতনের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, এবং (৩) যেনো আওয়ামী বলয়ের মধ্যে এসে শান্তিপূর্ণভাবে পরিসমাপ্ত হয়।

    রাজাকার-বিরোধিতার পরিমণ্ডলে ‘অপারেশন্যাল’ হলেও শাহবাগ আন্দোলন আওয়ামী লীগের জন্য খুশির বিষয় নয়। ব্যক্তিত্ব-শাসিত আওয়ামী লীগের তৈরী রাজনৈতিক সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে অন্য কোনো বীরব্যক্তিত্ব, তা জাহানারা ইমামই হোন কিংবা ইমরান সরকারই হোন, আওয়ামী লীগের পক্ষে মেনে নেয়া অসম্ভব। কারণ, শেখ হাসিনা বহু আগেই নিজের সম্পর্কে বলে রেখেছেন, ‘আমার চেয়ে বড়ো কোনো দেশপ্রেমিক নেই’।

    তাই, ইমরান সরকারের মুখে উচ্চারিত ‘প্রিয় দেশবাসী’ সম্বোধন আর আন্দোলনের মঞ্চ থেকে একাত্তরের ৭ই মার্চের শেখ মুজিবুর রহমান মতো হুকুম জারি করার ঘটনা আওয়ামী লীগের জন্য বরদাশ্‌ত করা সহজ নয়। কিন্তু ওরা আওয়ামী লীগের গাওয়া গান গাইছে বলে কিছু বলতেও পারছেন না শেখ হাসিনা। নইলে তিনি এতো দিনে ‘ঘুষখোর আর সুদখোর সমান’ বাণীর মতো ‘ধর্মদ্রোহী আর রাষ্ট্রদ্রোহী সমান’ কিংবা ‘নাস্তিক আর রাজাকার সমান’ জাতীয় কিছু একটা বলে দিতেন।

    রূপতঃ শাহবাগ-আন্দোলন হচ্ছে আওয়ামী লীগের স্রোতের উপর দূরনিয়ন্ত্রিত নৌকা। আওয়ামী লীগের জলে ভাসমান, আওয়ামী লীগের স্রোতে ধাবমান এবং আওয়ামী লীগের ‘জয়বাংলা’ পাল দৃশ্যমান হলেও, পালে লাগা বাতাস কিন্তু অদৃশ্য! স্পষ্টতঃ শেখ হাসিনা এ-নৌকার মাঝি নন। তিনি বড়োজোর গুন টেনে চলেছেন।

    বাতাসের গতি বুঝা দায়। ঈশান কোণে মেঘ জমতে শুরু করেছে। এক এক করে বিদেশী কূটনীতিকেরা কথা বলতে শুরু করেছেন। সদ্য, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের চাকুরী খেতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। অর্থাৎ, অনুমান করা যায়, তিনি সঙ্কটেই আছেন।

    অদ্য,‌ তিনি কমিটী গঠন করেছেন ইসলামের নবী-বিরোধী নাস্তিকদের চিহ্নিত করতে। অর্থাৎ, 'নাস্তিক' ব্লগারও ভালো নেই। ঢাকা থেকে শুরু করে লণ্ডন পর্যন্ত সে-ব্লগারেরা কাঁপছে। ব্যঘ্রগুলো মুষিকে পরিণত হয়ে ধর্ম-বিরোধী গালাগালি মুছে ফেলছে স্ব-স্ব ব্লগ-পাতা থেকে।

    ইসলামবাদীদের হুঙ্কারে চট্টগ্রামে হার মেনে নিয়ে খাতিরালাপ করার প্রস্তাব দিয়েছেন শাহবাগ-আন্দোলনের নেতৃত্ব। সরকারের তথ্যমন্ত্রী ও মার্ক্সবাদী হাসানুল হক ইনু ‘আসুন আমরা একসাথে ইসলামের হেফাজত করি’ বলে ঈমানী পয়গাম প্রেরণ করেছেন ধর্মবাদীদের প্রতি।

    এ-পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা নৌকা বাঁচাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেবতার গ্রাস কবিতার সেই মাসীর মতো নাস্তিক ভগ্নিপুত্রদেরকে গঙ্গায় বিসর্জন দিতে দ্বিধা করবেন না। কারণ, তিনি এ-বিসর্জনকে দেখবেন নিজের আস্তিক্য ও অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে একটি ‘কুরবানী’ হিসেবে।

    একাত্তরের ইসলামবাদী যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও ন্যায় বিচার না চেয়ে ‘ফাঁসি চাই’ স্লৌগান উচ্চারণের মাধ্যমে যে-মধ্যযুগীয় জিঘাংসার চাষ করা হলো সারা দেশ জুড়ে, তার ফসল যে কতো বিষাক্ত, তা বুঝতে পারা যাবে সেদিন, যেদিন এ-রাষ্ট্রেরই পৃষ্ঠপোষকতায় নাস্তিকদের বিরুদ্ধে ‘ফাঁসি চাই’ বলে ‘দাবি’ উচ্চারিত হবে। গণউন্মাদনার এই গণজাগরণ মঞ্চের স্থান হয়তো তখন দখল করে নেবে অধিকতর গণউন্মাদনার এক ইসলামীজাগরণ মঞ্চ।

    হাসানুল হক ইনুরা হয়তো সে-দিন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ‘ইসলামের হেফাজত’ করার উদ্দেশ্য সেই ইসলামিক জাগরণের মধ্যেও হিস্যা নিয়ে সেখানে উচ্চারিত ‘ফাঁসি চাই’ দাবিকেও সমর্থন করবেন।

    অতঃপর ক্রমে যখন নাস্তিক্যবাদের সংজ্ঞা বর্ধিত হবে, তখনও হয়তো ‘নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’ মন্ত্রে আওয়ামী লীগ পার হয়ে যাবার চেষ্টা করবে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে ধর্মনিরপেক্ষ মনে-করা ও আওয়ামী লীগের অনুগামী বামপন্থীদের কী হবে?

    মঙ্গলবার ১২ মার্চ ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

thanxs to give more informative article.

পুরো লেখাটাই ভালো লেগেছে শুধুমাত্র নীচের অংশটুকু বাদে।

"একাত্তরের ইসলামবাদী যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও ন্যায় বিচার না চেয়ে ‘ফাঁসি চাই’ স্লৌগান উচ্চারণের মাধ্যমে যে-মধ্যযুগীয় জিঘাংসার চাষ করা হলো সারা দেশ জুড়ে, তার ফসল যে কতো বিষাক্ত, তা বুঝতে পারা যাবে সেদিন, যেদিন এ-রাষ্ট্রেরই পৃষ্ঠপোষকতায় নাস্তিকদের বিরুদ্ধে ‘ফাঁসি চাই’ বলে ‘দাবি’ উচ্চারিত হবে। গণউন্মাদনার এই গণজাগরণ মঞ্চের স্থান হয়তো তখন দখল করে নেবে অধিকতর গণউন্মাদনার এক ইসলামীজাগরণ মঞ্চ।"

যদিও একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে আমি কখনই মৃত্যদন্ডকে সমর্থন করি না, তারপরও বলি, কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি আর ন্যায় বিচারের দাবির মধ্যে কোনো যৌক্তিক পার্থক্য নেই। ১৯৭১ সালে তিনি যে অপরাধ করেছেন তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড হলেই সেটা ন্যায় বিচার হবে বলে মানুষ মনে করছে।

"...ফাঁসি চাই’ স্লৌগান উচ্চারণের মাধ্যমে যে-মধ্যযুগীয় জিঘাংসার চাষ করা হলো সারা দেশ জুড়ে..." এই লাইনটা পড়ে মনে হচ্ছে শান্তিপূর্ণ, মানবিক এক স্বর্গভুমিতে "ফাঁসি চাই" বলে বিশাল বড় অপরাধ করে ফেলেছে আমাদের তরুণেরা। এই দেশে ফাঁসির দাবিতে আন্দোলন নতুন কিছু নয়। তরুণেরা সরাসরি ফাঁসির দাবি না করে যদি ন্যায় বিচারের দাবিও তুলতো তাহলেও "ইসলামীজাগরণ মঞ্চ" (আপনার কল্পিত) থেকে তাঁদের নাস্তিক আখ্যা দিয়ে ফাঁসির দাবিই করা হতো। ১৯৯৪ সালে মৌলবাদীরা যে তসলিমার ফাঁসির দাবীতে আন্দোলন করেছিল সে কথা কি ভুলে গেছেন?

Bangal, please be kind by being specific about which (1) demand and (2) prophecy in my writing you are referring to.

Very good analysis. But I'm looking forward to read more on how this demand will have any impact on the political landscape of Bangladesh. I can see a hint in your writing but no explanation to support your prophecy.

খুব খুব ভালো লাগলো। বেশ মোজা পেলাম। সার আর রসের মিসরন দারুন হয়েছে। লিখে যান।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন