• শাহবাগ-আন্দোলনঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
    মাসুদ রানা

    পূর্ব-সূত্র
    এ-লেখার প্রথম পর্বে দেখানো হয়েছে, একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মানবতা-বিরোধী অপরাধের দায়ে সদ্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডিত কাদের মোল্লার ফাঁসি-চাওয়া শাহবাগ-সমাবেশ হচ্ছে, ডঃ জিন শার্প সূত্রায়িত, অহিংস-অমান্যতার তাহরির স্কোয়ারের মতো, একটি নগরচত্বর-আন্দোলন, যা আন্তর্জাতিক সমর্থনপুষ্ট ‘ইয়ুথ ফর পীস এ্যাণ্ড ডেমোক্র্যাসি বাংলাদেশ’, তথা ‘প্রজন্মব্লগ’, তথা ‘ব্লগার্স এ্যাণ্ড অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক’ নামের সংগঠনের ডাকে সূচিত এবং চার দশকের বন্ধ্যা ও ভ্রষ্ট রাজনীতির প্রতি সংক্ষুদ্ধ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পরিস্ফীত।

    অভিন্ন প্রশ্ন
    শাহবাগ-সমাবেশ অভূতপূর্ব। এর অভিনবত্ব ও বিশালত্ব সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আকর্ষণ তৈরী করলেও, জামায়াত ইসলামী ভিন্ন প্রায় সকল ক্রিয়াশীল দলের মধ্যে সম্ভবতঃ সৃষ্টি করে থাকবে প্রলুব্ধতা ও অনিশ্চয়তা এবং আকর্ষণ ও বিকর্ষণের এক মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

    শাহবাগে সমাবেশিত লক্ষ-লোক লক্ষ্য করে রাজনীতিকদের মধ্যে স্বভাবতঃ জেগে থাকবে ভাষণ-দানের উদগ্র বাসনা ও করতালি কুড়োনোর ভিক্ষাবৃত্তি। সে-বাসনায় ও বৃত্তিতে কতিপয় নেতা ভ্রমর হয়ে উড়ে যাওয়া মাত্রই, শাহবাগে পূর্ব-পরিস্ফূটিত জনতার শতদল মুদ্রিত হয়ে, কাঁটাবনের কাঁটার আঘাতে ফিরিয়ে দিয়েছে বিমুখ করে। আর সেখান থেকেই এসেছে অনিশ্চয়তা, ‘আসলে ওখানে হচ্ছেটা কী?’

    ওখানে হচ্ছেটা কী কিংবা কী হতে যাচ্ছে, এ-প্রশ্ন শুধু রাজনীতিকদের নয়। এ-প্রশ্ন সম্ভবতঃ খোদ শাহবাগ-সমাবেশেরও। এর উত্তর শুধু শাহবাগ-অনুধ্যানেই জানা যাবে না; এর জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে বুঝতে পারা।

    বিশ্ব-প্রেক্ষিত
    সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে পড়ার পর, গত দু’দশক ধরে শক্তির ভারসাম্যে পৃথিবী হয়েছে ‘ইউনিপোলার’ বা এক মেরুর। মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী পুঁজিবাদী শক্তিসমূহ তাদের আন্তঃমহাদেশীয় মিত্রদের সমন্বয়ে একটি ‘হায়ারার্কি’ তৈরির করার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছে ‘নিউ ওয়্যার্ল্ড অর্ডার’ বা নতুন বিশ্বব্যবস্থা।

    এ-ব্যবস্থার অধীনে দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব এসে পড়েছে ভারতের হাতে। ভারতের প্রভাব-বলয়ের মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ইত্যাদি দেশ। প্রকৃতপ্রস্তাবে, পারমাণবিক শক্তিধর ভারতের প্রতিপত্তি বর্তমানে সমগ্র ভারত মহাসাগর জুড়ে - উত্তরে এডেন উপসাগর থেকে দক্ষিণে এন্টার্কটিকা এবং পূর্বে মালক্কা প্রণালী থেকে পশ্চিমে মধ্যএশিয়া পর্যন্ত - বিস্তৃত।

    গত নব্বইয়ের দশক থেকে ভারত তার ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’তে পরিবর্তন এনে ‘লূক ইষ্ট’ নামে নতুন নিরাপত্তা-নীতি গড়ে তুলেছে। ভারত বর্তমানে চীনের মতোই ‘রিজিওন্যাল পাওয়ার উইথ গ্লৌব্যাল পোটেনশিয়্যাল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

    নতুন বিশ্বব্যবস্থার এ-পর্যায়ে, ভারত ও চীনের বিশ্বশক্তিতে রূপান্তরিত হবার সম্ভাব্যতায়, এক মেরুর পৃথিবী এখন বহুমেরুর পৃথিবীতে রূপান্তরিত হবার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্য যুক্ত হয়েছে, পুনরুজ্জীবিত রাশিয়া ও নব বিকশিত ব্রাজিল, যাদেরকে বলা হচ্ছে ‘রিজিওন্যাল পাওয়ার’। আরও রয়েছে, পারমাণবিক ইসরায়েল ও উত্তর-কোরিয়ার, পারমাণবিক-সম্ভবা ইরান, সুদক্ষ ও অভিজ্ঞ জাপান, তুরষ্ক, ইত্যাদি। 

    বিশ্ব-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত নিয়মে আজ যখন সমগ্র বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটে পতিত, তখন তা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বিশ্বব্যবস্থার নতুন বিন্যাসের। কিন্তু নব-বিন্যাস সম্ভবতঃ শান্তিপূর্ণভাবে হবার নয়। দৃশ্যতঃ পৃথিবী ধীরে-ধীরে একটি সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দূরপ্রাচ্য পর্যন্ত চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি।

    আজ থেকে এক বছর আগে, একটি মন্তব্য প্রতিবেদনে দেখিয়েছিলাম যে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তিগুলো কীভাবে তাদের বক্তব্যে বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধের জন্য সম্ভাব্য সহযোগীদের সাথে কী প্রকারের সামরিক চুক্তি করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে তাদের কিরূপ উপস্থিতি ও শক্তি-সমাবেশ ঘটাচ্ছে। সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধে বাংলাদেশের পরিস্থিতি কী হতে পারে, তার ঐতিহাসিক আলোচনায় লিখেছিলামঃ

    ‘‘ভারত-যে আজ বাংলাদেশে ‘ট্র্যানজিট’ শিরোনামে ক্ষিপ্রতার সাথে ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ‘উন্নয়ন’ ঘটাচ্ছে, তাকেও কিন্তু একটি আসন্ন বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখার ভূ-রাজনৈতিক কারণ আছে। চীন সীমান্ত ঘেঁষে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য-সমূহে শক্তিশালী সামরিক অবস্থানের জন্য বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে চলাচল করা ছাড়া আর কোনো সহজ উপায় ভারতের নেই। নাবালকেরা ভারতের ট্র্যানজিটকে শুধু যে বাণিজ্য হিসেবে দেখছে, তাকে সামরিক হিসেবেও দেখতে হবে।’’ [‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও বিমূঢ় বাঙালী’,  ইউকেবেঙ্গলি.কম, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২]

    ইন্দো-মার্কিন-বাংলাদেশ
    আন্তর্জাতিক-সম্পর্ক ও যুদ্ধতত্ত্ব অনুসারে, উপরে উল্লেখিত বিশ্ব-পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কাছে ভারতের কাম্য হতে পারে ৫টি বিষয়ঃ (১) বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের চীন-সীমান্ত পর্যন্ত সামরিক ও রসদ পরিভ্রমণের উপযোগী অবকাঠামো, (২) ভারতীয় শান্তি ও যুদ্ধকালীন অর্থনীতির পরিপূরক স্থানীয় অর্থনীতি, (৩) ভারতের কাছে স্বচ্ছ ও সহযোগী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী (৪) ভারত-বান্ধব সরকার এবং (৫) ভারত-মৈত্রীর সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

    তত্ত্বগতভাবে, উপরের শর্তগুলো যে-দলই পূর্ণ করবে, ভারত বাংলাদেশে সে-দলকেই সমর্থন করবে। এটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি - এমনকি জামায়াত ইসলামী হলেও আপত্তি থাকার কথা নয়। বরং পরস্পরের বিকল্প অথচ একই চরিত্রের দু'টি ‘অপশন’ ভারতের জন্য শ্রেয়তর।

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের গঠন, সংস্কৃতি ও কর্মসূচির কারণেই জনগণের উপর নির্ভরশীল নয় কিংবা ও আস্থাশীলও নয়। এদের নির্ভরতার জায়গা হচ্ছে (১) নেতাদের সামন্ত-সম্মোহনী শক্তি,  (২) কর্মীবাহিনীর পেশীশক্তি, (৩) অর্থায়কদের অর্থায়ন শক্তি, (৪) সামরিক বাহিনীর অনুমোদন, (৫) আমলাতন্ত্রের আনুগত্য, (৬) বিশ্বশক্তির সমর্থন ও (৭) বিকল্পহীন নির্বাচন।

    বাংলাদেশের প্রায় সব দলই টিকে থাকে উপরের প্রথম ৩টি উপাদানের উপর; ক্ষমতায় যাবার যোগ্যতা অর্জন করে পরবর্তী ৩টির উপর নির্ভর করে; আর ক্ষমতায় আসীন হয় শেষেরটি হাতিয়ে নিয়ে।

    বাংলাদেশে ভারতের ‘অপশন’ দু’য়ের অধিকই আছে। ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ও বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া ভারত সফর করে এসেছেন। ধারণা করা যায়, তিনজনেরই সাথে বিস্তারিত দরদস্তুর হয়েছে সেখান।

    বাংলাদেশে একই চরিত্রের পরস্পরের বিকল্প দলগুলো যেমন ভারতের কাছে একগুচ্ছ ‘অপশন’, সে-দলগুলোর কাছেও তেমনি ভারত-মৈত্রী, মার্কিন-মৈত্রী, মধ্যপ্রাচ্য-মৈত্রী, ইত্যাদি ‘অপশন’ রয়েছে। এ-মৈত্রীগুলোর মধ্যে আবার পারস্পরিক সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার এক জটিল রসায়ন রয়েছে। তবে, সাধারণভাবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ-মুহূর্তে  মার্কিন-মৈত্রী ও মধ্যপ্রাচ্য-মৈত্রীর আন্তঃসম্পর্কের চেয়ে ভারত-মৈত্রী ও মার্কিন-মৈত্রীর আন্তঃসম্পর্কটি অধিক প্রতিযোগী ও অল্প সহযোগী।

    ভারত যেভাবে বাংলাদেশকে চায়, মার্কিন-নেতৃত্বধীন পশ্চিমী পুঁজিবাদী জোটও বাংলাদেশকে সেভাবেই পেতে  চায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভিত্তি-করে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহরের অবস্থান চায়, যা ভারতের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। চীনকে ‘কন্টেইন’ করার প্রশ্নে মার্কিন-ভারত সমঝোতা থাকলেও মার্কিন-কেন্দ্রিক একমেরুর বদলে বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা গড়তে চীনের সাথে ভারতের একটি সমস্বার্থতা আছে।

    সম্প্রতি, বঙ্গোপসাগীয় দেশ বার্মাতে বর্ধিষ্ণু মার্কিন প্রতিপত্তিতেও ভারতের অস্বস্তি বাড়ছে। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কাউকে ভাগ দিতে রাজি নয় ভারত। অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দিলেও সামরিক ক্ষেত্র মোটেও নয়। এমনকি পাকিস্তানের আক্রান্ত হওয়াটাও ভারত মেনে নেবে না। কারণ, ভারতীয় রাষ্ট্র-নিরাপত্তা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যে-ইতিহাসের মধ্যে অখণ্ড ভারতবর্ষের ধারণা গভীরে প্রোথিত।

    বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। এটি ভাবলে ভুল হবে যে এ-দলটি - কিংবা অন্য যে-কোনো দল - অন্য দেশের ক্রীড়ানক। বস্তুতঃ কেউই ক্রীড়ানক হতে চায় না। তবে নিজেদের স্বার্থের সবচেয়ে ‘কস্ট-ইফেক্টিভ’ সংরক্ষার জন্য তারা একটি বিনিময়-চুক্তিতে সম্মত হয়, যা ক্রমশঃ ঐতিহ্যে ও বিশ্বাসে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সম্পর্কটি ঠিক সে-রকমেরই।

    আওয়ামী লীগ সরকার যে আজ মার্কিন কর্তৃত্বাধীন বিশ্বব্যাঙ্কের সাথে পদ্মাসেতু নিয়ে নন্দিত স্পর্ধা দেখাচ্ছে, ভারতের সমর্থন না থাকলে তা সম্ভব হতো না। বিশ্বব্যাঙ্কের সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের বিবাদের শুরুতে, আমার মৌখিক ভবিষ্যতবাণী ছিলোঃ পদ্মাসেতুর অর্থায়ন অবশেষে আসবে ভারত থেকে।

    মাঝখানে জাতীয়তাবাদী ‘গিমিক’ তুলে দেশের অর্থেই পদ্মাসেতু করা হবে বলে ঘোষণা দিয়ে বাহবা কুড়োনোর পর, এখন দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকার বলছে, পদ্মাসেতু হবে ভারতীয় ঋণের টাকায়। অতি-সম্প্রতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারী সফরে, তাঁর বেসরকারী সঙ্গী ও আত্মজ, সজীব ওয়াজেদ জয়কে সাথে নিয়ে, রাশিয়াতে গিয়ে, যে-অস্ত্রক্রয় করলেন, সেটিও ভারতের সমর্থনে মার্কিনীদের প্রতি বঙ্গীয় বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন বটে।

    স্বভাবিকভাবেই, মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী শক্তি আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার ‘ডিফায়েন্স’ বা অমান্যতায় অত্যন্ত অখুশী। তাই, তাঁর এ-অমান্যতাকে অভিযোগ আকারে অভিযোগ আকারে আনা হয়েছে দৈনিক ওয়াশিংটন টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত খালেদার জিয়ার ‘লেখা’ ‘কমেন্টারি’ বা মন্তব্য-প্রতিবেদনের মাধ্যমে।

    খালেদা জিয়া তাঁর মন্তব্য-প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে বিরুদ্ধে বিস্তর নালিশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্য-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সরকার ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী। আত্মসম্মান-আত্মমর্যাদাহীন এ-লেখায় খালেদা জিয়া ব্রিটেইন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রীতিমতো আহবান করেছেন বাংলাদেশে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে। একই সাথে, তিনি ইতিহাসকে বিকৃত করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে মিথ্যা কৃতিত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর একটি হিসেবে।

    খালেদা জিয়ার এহেন মার্কিন-তোষণ ও হস্তক্ষেপের আহবান প্রমাণ করে যে, বিএনপির পায়ের নিচে মাটি তেমন শক্ত নয়। সে-জন্যই তিনি ইঙ্গ-মার্কিনীদের কাছে বাংলাদেশকে ‘অফার’ করছেন। কিংবা হতে পারে যে, তাঁকে ক্ষমতার ‘অফার’ দিয়ে ইঙ্গ-মার্কিনীরাই এ-কাজটি করিয়ে নিয়েছে।

    তৃতীয় শক্তি
    এ-কথা নিরাপদে বলা যায় যে, নতুন বিশ্বব্যবস্থার ‘নিও-লিবারেল’ নেতৃত্ব বাংলাদেশে একটি ‘স্ট্যাবল এ্যাণ্ড ফাংশন্যাল ক্যাপিটালিজম’ - অর্থাৎ স্থিতিশীল ও ক্রিয়াশীল পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা - চায়। এবং এ-ব্যবস্থার ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁরা বাংলাদেশের নেতৃত্বে দেখতে চান ‘নিও-লিবারেল ডেমোক্র্যাটস’ বা নয়া উদারগণতান্ত্রিক শক্তির প্রতিষ্ঠা। তাঁরা আশা করেন, বাংলাদেশের এ-নতুন নেতৃত্ব নতুন বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদেরকে ‘গূডফিট’ হিসেবে অভিযোজিত করে বিশ্ব-পুঁজিবাদের 'স্মার্ট পার্টনার' হিসেবে কাজ করবে। তাঁরা প্রচার করেন যে, এটি হচ্ছে একটি ‘উইন-ইউন কণ্ডিশন’ বা দু'পক্ষেরই বিজয়-বিজয় অবস্থা।

    এহেন বিশ্ব-পুঁজিবাদের নিও-লিবারেল নেতৃত্ব দীর্ঘকাল থেকে বাংলাদেশের ‘স্টাবর্ন, ইম্‌ম্যাচ্যুর, ইণ্ডিভিজ্যুয়্যালিস্টিক উইম্যান’, অর্থাৎ একগুঁয়ে, অপরিপক্ক ও ব্যক্তিকেন্দ্রীক দুই নারীর কারণে পুঁজিবাদী বুঝাপড়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে বিশ্বনেতৃত্ব যার-পর-নেই বিরক্ত ও হতাশ। তাঁরা নিশ্চিত এর অবসান চান।

    তথাকথিত ওয়ান ইলাভেনের ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ সফল হয়নি। তাই এবার আরও কার্যকর পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, এবারে সম্ভবতঃ ভারতের আপত্তি থাকতে পারে। কারণ, প্রত্যক্ষিত বিশ্বযুদ্ধকে সামনে রেখে, ভারত সম্ভবতঃ কোনো নতুন এক্সপেরিমেন্ট বা পরীক্ষায় যেতে যাচ্ছে না। অবশ্য, ভেতর থেকে যদি পরিবর্তন পেকে উঠে, তাতে ভারতের আপত্তি থাকবে না, যদি তার পূর্বোল্লিখত পাঁচ-শর্ত পূরণ হয়।

    মোটকথা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতির সমীকরণটিকে দেখতে হবে বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে। বাইরের শক্তিগুলোর জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে পার্টনার নেবার জন্য অপশন আছে, এবং বিপরীতক্রমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বাইরের শক্তিগুলো মধ্য থেকে বেছে নেবার জন্য অপশন রয়েছে, এ-দু'টির মধ্যে যে-একটি বজ্রগুণিত সমীকরণ চিন্তা করা যায়, তার মধ্যেই শাহবাগে-সমাবেশের ‘ডাইনামিক্স’টি বুঝতে হবে।

    আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, শাহবাগ-সমাবেশ নিয়ে রাজনৈতিকগুলোর মধ্যে আছে মিশ্র-প্রতিক্রিয়া। এর কারণ হচ্ছে এর-মধ্যে কারা কীভাবে আছে তা বুঝতে না পারা। শাহবাগ-সমাবেশে যে শুধু জনতাই আছে তা ভাবার কোনো কারণ নেই।

    শাহবাগের আকর্ষণে যদি প্রবাসী তরুণ-তরুণীর ছুটে আসতে পারেন, তাহলে বিদেশী গোয়েন্দারাও আসতে পারেন তাঁদের পেশাগত কারণে। এঁদের মধ্যে থাকতে পারেন  ভারতীয় ‘র’, মার্কিন ‘সিআইএ’, ব্রিটিশ ‘এমআইসিক্স’, এমনকি পাকিস্তানী ‘আইসিআই’-এর গোয়েন্দাগণ। নিশ্চিত এসে থাকবেন দেশীয় সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দাগণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী ও ‘ক্যাডারগণ’।

    এখানে সবাই সবার কাজ করবেন প্রধানতঃ পরস্পর-বিরোধী দু’টি ‘ডাইরেকশনে’। সরকারের পক্ষের ডাইরেকশনটা হবে শান্তিপূর্ণভাবে এ-সমাবেশের ইতি টানা। অন্যদিকে, দ্বিতীয় ডাইরেকশনটা হবে এ-সমাবেশকে জীবন্ত রাখা। দু’দিকেই কাজ হবে কখনও প্রকাশ্যে, আবার কখনও গোপনে এবং কখনও মঞ্চে, কখনও প্রাঙ্গনে। কর্মীরা কখনও করবেন ক্রিয়া, কখনও প্রতিক্রিয়া। থাকবে মিথষ্ক্রিয়া - কখনও সহযোগিতা রূপে, কখনও প্রতিযোগিতা রূপে। তবে সমগ্র প্রক্রিয়াটিতে যাঁরা যতো বেশি সংগঠিত ও শক্তিশালী হবেন, শাহবাগ-আন্দোলনের ফল তাঁদের দিকেই যাবে। কারণ, জনগণ সবসময় বিজয়ীর পক্ষেই জয়ধ্বনি দেন।

    শাহবাগ-সমাবেশ যদি অব্যাহত থাকে, কিংবা থেকে-থেকে প্রত্যাবর্তন করে, তাহলে এর পেছনে, মধ্যে,  কিংবা পাশে-থাকা একটি তৃতীয় শক্তি - সুনির্দিষ্টভাবে একটি ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক’ বা উদার গণতান্ত্রিক শক্তি - আবির্ভূত হয়ে পশ্চিমী শক্তির সমর্থন লাভ করবে।

    এটি খুব সম্ভব যে, শাহবাগ-সমূদ্র-মন্থন থেকে সে-শক্তি নিজেকে ‘অমৃত’ দাবি করে বেরিয়ে আসবে। পৌরাণিক সমূদ্র-মন্থনে যে-বাসুকি নাগকে দড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো, সে-রকম বর্তমানের শাহবাগ-সমূদ্র-মন্থনে সে-নাগ হচ্ছে জামায়াত। মন্থনে ব্যবহৃত বাসুকির মুখ থেকে যে-গরল বা বিষ নিঃসৃত হয়েছিলো, তা ধারণ করার ক্ষমতা কোনো দেবতার ছিলো না বলে গাঁজাখোর মহাদেবকে তা শুষে নিয়ে কন্ঠে ধারণ করে নীলকন্ঠ হয়ে থাকতে হয়েছিলো।

    প্রশ্ন হচ্ছেঃ জামায়াতকে দড়ি পাকানোর প্রতিক্রিয়ায় সে যে-পাল্টা আঘাত হানবে, তার অভিঘাত কে সইবে? কে হবেন সেই নীলকন্ঠ? শেখ হাসিনা?

    আমার ধারণা, শেখ হাসিনা এটি বুঝতে পারছেন। তিনি মুখে যতোই বলুন না কেনো যে, শাহবাগ-স্কোয়ারে যেতে তাঁরও মন চায়, বাস্তবে তা তাঁর মনের কথা না-হবার সম্ভবনাই বেশি। কারণ, সরকার-প্রধান হিসেবে তাঁর রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে লক্ষ-লক্ষ লোকের দাহ্য জনতা মোটেও স্বস্তির বিষয় নয়। যে-কোনো মুহূর্তে, যে-কোনো স্ফূলিঙ্গে দাবানল হয়ে জ্বলে উঠতে পারে। তাই তিনি চাইবেন তাড়াতাড়ি এর ইতি ঘটাতে।

    ষড়যন্ত্র তত্ত্ব-মতে, ইতিপূর্বে জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের যদি এ-মর্মে বুঝাপড়া হয়ে থাকে যে, দলটি বিএনপি-জোট ছেড়ে দিয়ে নিজস্ব নির্বাচন করবে এবং বিনিময়ে সে নিষিদ্ধির হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-নেতারা ফাঁসির দড়ি থেকে বেঁচে যাবেন, তাহলে এখন শাহবাগ-আন্দোলনের দাহ্য মেজাজ দেখে, জামায়াকে বলে বা না-বলে, পূর্বের বুঝাপড়া স্থগিত রেখে, এ-আন্দোলনকে ‘কন্টেইন’ করার বিষয়টিকেই হয়তো শেখ হাসিনা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকবেন।

    ফলে, আইন পরিবর্তন করে, কাদের মোল্লার শাস্তিবৃদ্ধি এবং জামায়াত ইসলামী নিষিদ্ধির সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, শাহবাগ-আন্দোলনের মধ্যে একটি বিজয়ানুভব এনে দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার একটি সুখকর ইতি টানতে চাইছে। কিন্তু তাতেও বিপদ কাটছে না।

    উপরের ‘হাইপোথেসিস’ বা প্রকল্প সত্য হয়ে থাকলে, জামায়াত ইসলামী এক ধরণের ‘বিট্রেইড ফীল’ করে থাকবে। জামায়াতে ইসলামী নিশ্চয় ধর্মের ঢাল দিয়ে আঘাত মোকাবেলার পাশপাশি, নাস্তিক্য-নিধনের দিব্যাস্ত্র ব্যবহার করবে।

    জামায়াতের লোকেরা ইতোমধ্যেই শাহবাগ-আন্দোলনের সংগঠক ব্লগারদের মধ্যে ‘এ্যাকিলিস হীল’ (সর্বাঙ্গ সুরক্ষিত গ্রীক পৌরাণিক বীর এ্যাকিলিসের অরক্ষিত গোঁড়ালি) চিহ্নিত করেছেন। ব্লাগারদের মধ্যে ‘এ্যাকিলিস হীল’ হচ্ছে, কারও কারও পশ্চাৎপদ সংস্কৃতিজাত কুরুচিপূর্ণ ভাষা, যা তাঁরা ইসলাম ধর্মের নবীর প্রতি ব্যবহার করেছেন। জামায়াতের ইসলামীর তীরন্দাজগণ এখন নানা বেশে ব্লগারদের ঐ অরক্ষিত গোঁড়ালি লক্ষ্য করেই তীর ছুঁড়ছেন।

    খুন-হওয়া ব্লগার রাজিব হায়দারের (যাঁর হত্যার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে জামায়াত-শিবিরকে দায়ি করা হয়েছে এবং যাঁকে শাহবাগ-আন্দোলনের শহীদ বলা হচ্ছে) ব্যবহৃত নিম্নমানের ভাষার ভার এখন আন্দোলন-সংগঠকদের উপর এসে পড়ছে। ইতোমধ্যে 'আমার দেশ' পত্রিকায় ব্লগারদের কুৎসিত ভাষার নমুনা ও ছবি ছাপা হয়েছে (জাফর ইমাম সুমন নামের এক বিএনপি-সমর্থকের ছবি ছাপিয়ে তাঁকে ভিন্ন-নামের এক ব্লগার হিসেবে ভুলভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে)। এর ফলে বিশ্বাসীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব তৈরী হচ্ছে শাহবাগ-আন্দোলনের ব্লগারদের প্রতি। আগামী শুক্রবারের মধ্যাহ্নিক মুসলিম-প্রার্থনায় এর কী রকম উপস্থাপনা ও প্রতিক্রিয়া হবে, তার উপর নির্ভর করছে পরবর্তী পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি।

    পরিস্থিতি দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে। আর, যদি তাই হয়, তাহলে একে ‘গৃহযুদ্ধ’ নাম দিয়ে ক্ষমতার পট পরিবর্তন করে ফেলার চেষ্টা চলতে পারে। তখন হয়তো দেখা যাবে, অদ্যাবধি নীরব সুশীলগণ ‘লিবাররেল ডেমোক্র্যাসি’ বা উদার-গণতন্ত্রের পতাকা নিয়ে একটি ঐক্যমতের সরকার গঠন করে মানুষের মধ্য একভাবে জনপ্রিয়তা লাভও করবেন।

    এর বিকল্পও সম্ভব।  তবে, এর রূপরেখা দেবার স্থান ও সময় এটি নয়। পরিশেষে বলি, এ-পর্বের ভাষ্য বিশ্বাস করা পাঠকের জন্য আবশ্যিক নয়। এটি একটি বিশ্লেষণাত্মক পূর্বোক্তি মাত্র। একে সত্যিই ফলতে হতে হবে, এমন কোনো বাধ্যতা নেই।

    বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

পড়ে খুব ভালো লাগলো। আপনার নেক্সট লেখা পড়ার াপেককায় রইলাম।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন