• শাহবাগ-আন্দোলনঃ সূচনা
    মাসুদ রানা


    বিস্ময়ের নয়

    মিসরীয় রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কোয়ারের গণ-অভ্যূত্থানের প্রেরণা পেয়ে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে বিশ্বের দেশে-দেশে, গণদাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘নন-ভায়োলেন্ট ডিফায়েন্স’ বা অহিংস অমান্যতার নব-আন্দোলনের যে ধারা তৈরী হয়েছে, তার বহতায় একদিন বাংলাদেশেও গড়ে উঠবে একটি আন্দোলন-চত্বর, এ-পূর্বোক্তি এসেছিলো দেড় বছর আগে ‘গণ-অভ্যূত্থানঃ রাজনৈতিক সুনামি’ শিরোনামের কলামেঃ

    "গণ-অভ্যূত্থানের মাতৃভূমি বাংলাদেশেও তাহরির স্কোয়ার গড়ে উঠবে। কারণ, বাংলাদেশে দীর্ঘ কাল ধরে একটি অচলায়তন গড়ে উঠেছে। ওখানে রহমানিজম বা রহমানবাদের অচলায়তন তৈরী হয়েছে। জনগণ এর সেবাদাসে পরিণত হয়েছে। বুদ্ধিজীবী-শিল্পী-সাহিত্যিক সবাই সেবাসঙ্গীত গাইছেন। সমবেত সেবাসঙ্গীতের উচ্চ-নিনাদে দেশের মনুষ্য-জীবন-বঞ্চিত কোটি-কোটি মানুষের হতাশা ও ক্ষুব্ধতা মিশ্রিত নিঃশ্বাসের সুনামি-ধ্বনি এখনও কানে আসছে না। কিন্তু ফুঁসছে তারা।" [ইউকেবেঙ্গলি.কম, ৫ জুন ২০১১]

    তাই, শাহবাগের উত্থানে বিস্ময়ের কিছু নেই। প্রাকৃতিক বাংলার পূর্বখণ্ডে বাংলাদেশ নামের ‘প্রজাতন্ত্রে’ উত্থিত দু’টি রাজকীয় রহমান-পরিবার তাদের নিজ-নিজ বলয়ভুক্ত জাতীয়তাবাদী, ধর্মবাদী, বামবাদী, সামরিকবাদী ও সুশীল তথা উদারবাদীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনে, একটি আমলাতান্ত্রিক-স্বৈরতান্ত্রিক রাজনীতি, দস্যুবৃত্তিক-পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও সামন্ত-কূপমণ্ডুক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে, সম্ভাব্য ১৬ কোটি নাগরিককে প্রকৃত আত্মপরিচয়হীন, আত্মমূল্যহীন, আত্মসম্মানহীন, আত্মমর্যাদাহীন, বিশ্ববোধহীন, স্বপ্নহীন ও গন্তব্যহীন প্রজায় পরিণত করেছে।

    সঠিক চেতনা-শূন্য ও সঠিক নেতৃত্ব-শূন্য এ-প্রজাকূল বার-বার দিকভ্রান্ত হয়ে একবার এদিক, আরেকবার ওদিক ছুটোছুটি করছেন, কিন্তু সামনে কোনো পথই দেখতে পাচ্ছেন না। তাই, অচলায়তের যে-কোনো পরিবর্তন-সম্ভাবনা দেখলেই হিতাহিত জ্ঞান-শূন্য হয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে ধাবিত হন তাঁরা। এর মধ্যে না থাকে বোধ, না থাকে বিবেচনা, না থাকে বিচার। থাকে শুধু অন্ধ আবেগের আদিম প্রকাশ।

    আর তাই দেখে, মূর্খ উচ্ছাসের শিক্ষিত সম্প্রদায় ও বুদ্ধিজীবী বাহিনী তাঁদের প্রত্যক্ষিত ভবিষ্যত-সুযোগ হাতছাড়া হবার আশঙ্কায় দৌড়-প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে মিশে যায় গড্ডালিকা প্রবাহে। জনগণ কখনও আর আলোকিত হন না। যে-তিমিরে ছিলেন, পড়ে থাকেন সে-তিমিরেই।

    এ-মুহূর্তে শাহবাগে ঠিক তাই হচ্ছে। এটি যে হবে, তা অকল্পনীয় ছিলো না। তাই, উল্লিখিত একই মন্তব্য প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিলোঃ

    "ইতিহাসের কারণে গণ-অভ্যূত্থানের পথেই বিমুক্ত নতুন শক্তি প্রকাশিত হতে চাইবে। কিন্তু তাকে ধারণ করার মতো এবং যৌক্তিক পরিণতিতে পৌঁছে দেবার মতো দর্শন ও সংগঠন প্রস্তুত না থাকলে, একটা নিশ্চিত রাজনৈতিক সুনামি বাংলাদেশকে আলিঙ্গন করবে। আর যদি তাই হয়, তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র কী হবে তা আমরা কেউ বলতে পারি না।"

    শাহবাগ-সমাবেশ
    অচলায়তনের বিরুদ্ধে অমান্যতা প্রকাশের জন্য মানুষের কাছে একটি জনপ্রিয় উপলক্ষ্যের প্রয়োজন ছিলো। ১৯৭১ সালের মানবতা-বিরোধী অপরাধের দায়ে, অবাক ৪২ বছর অতিবাহিত হবার পর, আন্তর্জাতিক অপরাধের স্থানীয় আদালতে বিচারিত কাদের মোল্লাকে শুনানো যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় যেনো সেই উপলক্ষ্যের যোগান দিয়েছে।

    পুনঃপুন গণ-অভ্যূত্থানের গর্ভধারিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পশ্চাৎভূমি ধরে, আন্দোলনের ঐতিহ্যবাহী শাহবাগের চৌপথের সঙ্গমস্থলে গত কয়েক দিনে লক্ষ-লক্ষ লোকের সমাবেশ ঘটেছে ‘অহিংস অমান্যতার’ নন্দিত স্পর্ধা প্রদর্শন করে, যা ‘আদালতের রায় মানি না’ স্লৌগানে উচ্চকিত। তাঁরা ফাঁসিতে ঝুলানো মৃত্যু চাচ্ছেন কাদের মোল্লার।

    একাত্তরের যুদ্ধ-করা সাড়ে-সাত কোটির জাতির দ্বিগুণিত বর্তমান প্রজন্মের বর্ধিষ্ণু বঞ্চনা, অপ্রাপ্তি, অসম্মান ও অমর্যাদার বিরুদ্ধে সুপ্ত-দ্রোহ-আগ্নেয়গিরি এ-পর্যন্ত আত্মপ্রকাশের কোনো জীবনদায়ী জ্বালামুখ পায়নি বলে প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি অমান্যতা দেখাতে ছুটে এসেছে শাহবাগ চত্বরে। বস্তুতঃ কাদের মোল্লা শাহবাগ বিক্ষোভের যতোটুকু না লক্ষ্য, তার চেয়ে অধিক উপলক্ষ্য।

    কে এই কাদের মোল্লা?
    বঙ্গজ কাদের মোল্লা স্বজাতির স্বাধীনতা অর্জন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধবাদী এবং একাত্তরে বাঙালী জাতির উপর হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠন চালানো হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাদের একজন।

    ইসলামবাদী এ-দলটি আরব বংশোদ্ভূত ধর্ম-প্রবর্তক মুহাম্মদ ইবন্‌ আব্দুল্লাহর পরিচালিত ধর্ম-যুদ্ধের স্মৃতি-নির্দেশক ‘রাজাকার’, ‘আল-বদর’, ‘আল-শামস’ নাম দিয়ে সংগঠন তৈরী করে বাঙালী জাতির বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করেছিলো। আর, তাদের নিজস্ব ধর্মীয় নৈতিকতায় ‘গনিমতের মাল হালাল’ ফতোয়া দিয়ে ধর্ষণ-লুন্ঠনের ন্যায্যতা দাবি করেছিলো।

    এহেন ধার্মিক ও অপরাধপ্রবণ দলের নেতা কাদের মোল্লা স্বয়ং হত্যা ও ধর্ষণ-সহ নানা অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টিতেই তিনি দোষী প্রমাণিত হয়েছেন এবং রায় পেয়েছেন যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের।

    ১৯৭১ সালে মানবতা-বিরোধী অপরাধের নৃশংসতার জন্য ‘বুচার অফ মিরপুর’ অর্থাৎ মিরপুরের কসাই প্রতীকনামে কুখ্যাত (যদিও এই নামকরণের মাধ্যমে কসাইয়ের পেশাকে অপমান করা হচ্ছে) কাদের মোল্লার জন্য আদালতের এ-রায় গুরুপাপে লঘুদণ্ড হিসেবে প্রত্যক্ষিত হচ্ছে। তাই, শাহবাগ সমাবেশ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করছে।

    শাহবাগ-আন্দোলনের তত্ত্ব-কৌশল
    শাহবাগ চত্বরে গণ-অংশগ্রহণ স্বতঃস্ফূর্ত হলেও, এর আয়োজন দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফল। পরবর্তী অনুচ্ছেদগুলোতে এ-প্রসঙ্গের উপর আলোকপাত করা হচ্ছে।

    শাহবাগ আন্দোলনে যে-পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে, তা ইতোমধ্যে বিশ্বে পরিচিত ও পরীক্ষিত পদ্ধতি, যা নতুন অহিংস-গান্ধীবাদী মার্কিন পণ্ডিত ডঃ জিন শার্পের সূত্রায়িত ‘ননভায়োলেন্ট এ্যাকশন’ তত্ত্বের আলোকে বিকশিত। এ-বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য পড়া প্রয়োজন জিন শার্পের বই ‘Waging Nonviolent Struggle: 20th Century Practice and 21st Century Potential’ From Dictatorship to Democracy

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৯ সালে সৌশ্যাল সায়ীন্সেসে বিএ, ১৯৫১ সালে সৌশিওলজিতে এমএ এবং ব্রিটেইনের অক্সফৌর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল থিওরীর উপর ১৯৬৮ সালে পিএইচডি করা জিন শার্প মূলতঃ গান্ধীর অহিংসাবাদের রাজনৈতিক কার্যকারিতার উপর বিস্তর গবেষণা করে, এর সৃষ্টিশীল ও প্রায়োগিক দিকসমূহকে সূত্রাবদ্ধ করে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি নতুন জ্ঞানকাণ্ড গড়ে তুলেছেন।

    জিন শার্পের তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে, সমাজের শাসক শ্রেণীর ক্ষমতার উৎস হলো শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্য ও মান্যতা। তাঁর মতে, জনগণ যদি অনানুগত্য ও অমান্যতা দেখাতে শুরু করে, তাহলে শাসকের ক্ষমতা কমতে থাকে। কোনো সহিংস পথে না গিয়েও শুধুমাত্র অনানুগত্য ও অমান্যতার মধ্য দিয়ে শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়। এ-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে শার্প বেশ কিছু কৌশল বিকশিত করেছেন, যা অন্যত্র আলোচ্য।

    জিন শার্প ১৯৮৩ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অহিংস পদ্ধতির উপর শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালনা করে আসছেন। তাই, জিন শার্পকে অহিংসাবাদের ম্যাকিয়াভেলি (ষোড়শ শতকের ইতালীয় রাষ্ট্র-দার্শনিক) ও অহিংস যুদ্ধের ক্লাউসেভিৎ (ঊনিশ শতকের জার্মান সমরতত্ত্ববিদ) বলা হয়ে থাকে।

    জিন শার্পের শিক্ষা ও পদ্ধতিকে অবলম্বন করে পৃথিবীর দেশে-দেশে বিভিন্ন নামের সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায়। এ-রকম একটি সংগঠন হচ্ছে ইয়ুথ ফর পীস এ্যাণ্ড ডেমোক্র্যাসি, বিভিন্ন দেশে যার সমরূপ সে-দেশের নামটিকে যুক্ত করে পরিচিত ও পরিচালিত হয়ে থাকে।

    স্বদেশে ক্রিয়াশীল হলেও সংগঠনের নেতা ও কর্মীদের বিভিন্ন ননভায়োলেন্ট কৌশল ও কর্মপদ্ধতি শেখানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ কন্ট্যাক্ট বা যোগাযোগ করিয়ে দেয়া হয়। স্থানীয় সংগঠকগণও তাঁদের বিভিন্ন কর্মতৎপরতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক প্রচার চালিয়ে থাকেন।

    শাহবাগ-আন্দোলনের সংগঠনিক ভিত্তি
    ইয়ুথ ফর পীস এ্যাণ্ড ডেমোক্র্যাসির বাংলাদেশের সমরূপ হচ্ছে ‘ইয়ুথ ফর পীস এ্যাণ্ড ডেমোক্র্যাসি বাংলাদেশ’। সংগঠনটির ফেইসবুক পেইজে প্রকাশিত তথ্যানুসারে এর অফিসের ঠিকানা হচ্ছেঃ House # 263, Road # 01, Baitul Aman Housing Society, 1207 Dhaka। কিন্তু লক্ষ্যণীয়  বিষয় হচ্ছে, শাহবাগ আন্দোলন শুরু হবার পর থেকে সেখানে কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি তাদের ওয়েবসাইটটিও (www.ypd-bd.org) বর্তমানে বন্ধ হয়ে রয়েছে, যদিও এদের ফেইসবুক উপস্থিতি এখনও সক্রিয়, যার ঠিকানা হচ্ছে www.facebook.com/ypd.bd

    ননভায়োলেট এ্যাকশনের অংশ হিসেবে নগরী চত্বরে লোক সমাবেশিত করার জন্য যে-যোগাযোগ-মাধ্যম ব্যবহার করা হয়, তা হচ্ছে ডিজিট্যাল কমিউনিকেশন সিস্টেম, যার মধ্যে আছে ফেইসবুক, ওয়েব লগ বা ব্লগ, ট্যুইটার, মৌবাইল ফৌন, মৌবাইল টেক্সট ম্যাসেজ ইত্যাদি।

    ফেইসবুকের বাইরে ওয়াইপিডিবিডি বা ইয়ুথ ফর পীস এ্যাণ্ড ডেমোক্র্যাসি বাংলাদেশ-এর তৎপরতার প্রধান প্রচার মাধ্যম হলো ‘প্রজন্মব্লগ’, যার ঠিকানা হচ্ছে (www.projonmoblog.com)। এ-ব্লগেই ওয়াইপিডিবিডি’র প্রৌফাইল দেয়া আছে। ব্লগের এ্যডমিন বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০১২ সালের ২৪ মে তারিখে একটি পৌস্টিংয়ের মাধ্যমে ওয়াইপিডিবিডি’র উদ্দেশ্য বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে (http://projonmoblog.com/admin/58.html) বলা হয়েছেঃ

    "YPD aims to trained (প্রেজেন্ট টেন্সে ট্রেইন পড়ুন) youth in political activism techniques and may provide interested youth with valuable skills, contacts, and opportunities to allow them to improve life in their communities and country through active engagement in the democratic process. YPD will focus their work on projects that inform young voters about the electoral and political process, and the principles of liberal democracy. YPD aims to weave together varying aspects of youth civic programs into a cohesive program that complements other youth movements in Bangladesh."

    অর্থাৎ, "ওয়াইপিডির উদ্দেশ্য হচ্ছে তরুণদেরকে রাজনৈতিক কর্মবাদের কৌশলে প্রশিক্ষিত করা এবং উৎসাহী তরুণদেরকে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা, যোগাযোগ যুগিয়ে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে জড়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে, তাঁদের দেশে ও সমাজে জীবন উন্নয়নের সুযোগের ব্যবস্থা করে দেয়া। নির্বাচনী ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং উদারনৈতিক গণতন্ত্রের নীতিমালা সম্পর্কে তরুণ ভৌটারদেরকে অবহিত করার মতো কাজ ও প্রকল্পের উপর ওয়াইপিডি আলোকপাত করবে। ওয়াইপিডির লক্ষ্য হচ্ছে সুশীল যুব কর্মসূচিসমূহের বিভিন্ন দিককে একত্রে বয়ন করে বাংলাদেশের অন্যান্য যুব আন্দোলনের পরিপূরক একটি সমন্বিত কর্মসূচিতে বিকশিত করা।"

    আগেই বলেছি, শাহবাগে জনগণের অংশগ্রহণ স্বতঃস্ফূর্ত হলেও এর পেছেনে আছে সুনিপুণ পরিকল্পনা। প্রজন্মব্লগে গত বছরের ২৫ মে তারিখে এমএইচ রনি নামের একজন ব্লগার ‘রাজনীতিতে বড়ো পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে’ শীর্ষক একটি পৌস্টে লিখেছেনঃ

    "বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঘটতে যাচ্ছে একটা অনেক বড় পরিবর্তন। যে পরিবর্তনের পূর্বাভাস মিডিয়া বা আমাদের বুদ্ধিজীবিগণ ওইভাবে দিচ্ছেন না। এই পরিবর্তনটি আসছে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের মধ্য দিয়ে।" [http://projonmoblog.com/mh-rony/74.html]

    উপরের লেখা থেকে বুঝা যাচ্ছে, শাহবাগ-আন্দোলনকে যতো স্বতঃস্ফূর্ত বলে মনে করা হয়, বাস্তবে মোটেও তা নয়। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, রসদ, অর্থিক সহযোগিতা এবং প্রশিক্ষণ সহযোগে একটি সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এটি তৈরী করেছে।

    শাহবাগ-আন্দোলনের সংগঠক
    যদি প্রশ্ন করা হয়ঃ শাহবাগ সমাবেশের ডাক দিয়েছেন কে? এর উত্তরে সবাই বলবেনঃ তরুণ চিকিৎসক ইমরান এইচ সরকার।

    যদি আরও প্রশ্ন করা হয়ঃ কে এই ইমরান এইচ সরকার? তাহলে এর উত্তরে জানা যায় যে, ইমরান এইচ সরকার হচ্ছেন ইয়ুথ ফর পীস এ্যাণ্ড ডেমোক্র্যসি বাংলাদেশের প্রেসিডেণ্ট এবং  প্রজন্মব্লগের মালিক।

    তো কীভাবে তিনি এ-রকম একটি সাংঘাতিক কাজ করে ফেললেন? এর উত্তর পাওয়া যায়, তাঁর প্রজন্মব্লগের ‘এ্যাডমিন;-এর পক্ষ থেকে পৌস্ট করা ‘প্রোগ্রাম অফ ওয়াইপিডি’ সম্পর্কে দেয়া তথ্য থেকে। সেখানে লেখা হয়েছেঃ 

    "YPD identifies outstanding youth with the potential to lead and provide those young leaders with additional training and resources to pursue positions of influence."

    অর্থাৎ, "ওয়াইপিডি নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা সম্পন্ন তরুণদের চিহ্নিত করে এবং ঐ-সমস্ত তরুণ নেতাকে প্রভাবশালী অবস্থানে যাবার জন্য বাড়তি প্রশিক্ষণ ও রসদ যোগান দেয়া হয়।"

    বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তরুণ চিকিৎসক ইমরাইন এইচ সরকার হচ্ছেন সেই ক্ষমতা সম্পন্ন তরুণ, যিনি শাহবাগ সমাবেশ সৃষ্টি করে প্রমাণ করেছেন, ওয়াইপিডি সঠিক ব্যক্তিটিকেই চিনে বের করেছে।

    ইমরান সরকারকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। তাই ওয়াইপিডি’র কর্মসূচিতে লেখা আছেঃ

    "The trainings that will be conducted under financial supports from various donors will increase citizen participation in democratic institutions and empower citizens with the tools to demand greater government responsiveness to their needs."

    অর্থাৎ, "বিভিন্ন দাতার কাছ থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সহযোগিতার অধীনে প্রদত্ত প্রশিক্ষণাদি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানাগুলোতে নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করবে এবং তাঁদের প্রয়োজনের প্রতি সরকারের বৃহত্তর সাড়া আদায় করার দাবি করার কলা-কৌশল দিয়ে ক্ষমতায়িত করা হবে।"

    ইরমান সরকার বেশ দক্ষতার সাথেই এ-পর্যন্ত কর্ম সম্পাদন করেছেন এবং বহু সংগ্রামের স্মৃতিবাহী শাহবাগ চত্বরের ঐতিহাসিক নামটির তাঁর নিজের সংগঠন প্রজন্মব্লগ-এর সাথে মিলিয়ে ‘প্রজন্ম চত্বর’ নামকরণের ব্যবস্থা তৈরির মধ্য দিয়ে প্রমাণ করলেন যে, আত্মপ্রতিষ্ঠার পথে তিনি অনেক দূর যেতে পারবেন। (অসমাপ্ত)।

    [লেখার দৈর্ঘ্য ও পাঠকের ধৈর্য্যের সীমা বিবেচনা করে এ-লেখার প্রথম কিস্তি এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী কিস্তিতে শাহবাগ-আন্দোলনের জাতীয় রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, এই আন্দোলনের আদর্শিকতা ও যৌক্তিকতা এবং এই আন্দোলনের সম্ভাব্য পরিণতির উপর আলোকপাত করা হবে।]

    রোববার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন