• শিক্ষার বাণিজ্যিকরণঃ অকস্মাৎ অর্থোদ্ধার!
    মাসুদ রানা

    কখনও একা ও কখনও বহুজন মিলে, কখনও ব্যক্তি ও কখনও সংগঠন থেকে প্রচুর লেখা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ কিংবা বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে। কিন্তু কোথায়ও সংজ্ঞা নেই শিক্ষার বাণিজ্যিকরণের, যদিও উষ্মা আছে প্রচুর।

    এই যখন পরিস্থিতি, তখন আমার আজকের লেখার শুরু হোক একটু নাটকীয়ভাবে। আমি বলতে চাইছি, নাটকের সংলাপাকারে লিখিত হোক আজকের লেখা। তাতে একঘেয়েমি কাটবে।

    প্রসঙ্গঃ শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ। প্রেক্ষাপটঃ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা বাণিজ্যিকরণের বিরুদ্ধে বিদ্যার্থীদের সংগ্রাম, আর সে-সংগ্রামে সরকারী দলের পুলিস ও প্রাইভেট বাহিনীর গুলিবর্ষণ।

    বাংলাদেশের কোনো এক শহরে কথা বলছেন দুই বাঙালী, যাঁদের মধ্যে এক হলেন নামকরা ও উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিতজন এবং অন্যজন হলে্ন ইংল্যাণ্ডে শ্রমিকের কাজ-করা ও স্বদেশ-ফেরা এক অতি সাধারণ। স্থানঃ পণ্ডিতের লিভিংরুম - বাংলাদেশে যাকে বলা হয় ড্রয়িংরুম।

    -    স্যার, আমি কঠিন বাংলা বুঝি না। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলার খবর পড়ে খুব কষ্ট পেয়েছি।
    -    ঠিকই বলেছেন, এটি খুবই দুঃখের এবং লজ্জার। এইতো বাংলাদেশ! আপনারা ভালো আছেন। আচ্ছা, বলুন তো এই মাইগ্রেশন করতে চাইলে, কতো ইনভেষ্টমেণ্ট...।

    -    স্যার, আমাকে কি কাইণ্ডলি বলবেন, শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ বলতে কী বোঝায়?
    -    এটি বুঝলেন না? মানে হচ্ছে, কমার্শিয়ালাইজশন। অর্থাৎ শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য করা।

    -    বাণিজ্য মানে কী?
    -    হা, হা, হা...। বাণিজ্য মানেও বুঝেন না? বাণিজ্য মানে হচ্ছে ব্যবসা।

    -    আর ব্যবসা মানে?
    -    বলে কী! ব্যবসা মানে হচ্ছে বিজিনেস। মানে, অর্থের বিনিময়ে পণ্য হস্তান্তর।

    -    পণ্য মানে কী?
    -    মহা মুশকিল হলো তো! পণ্য হচ্ছে কোমোডিটি - অর্থাৎ, অর্থের বিনিময়ে লভ্য বস্তু বা সেবা।

    -    বস্তু বুঝেছি। কিন্তু সেবা কী?
    -    সেবা মানে সার্ভিস। মানে, মানে...বলা যায়, একের চাহিদা পূরণার্থে অন্যের শ্রম।

    -    আচ্ছা, শিক্ষদের বেলায় ‘বেতন’ মানে টাকা নেওয়া, কিন্তু ছাত্রদের বেলায় ‘বেতন’ মানে টাকা দেওয়া কেনো? একই শব্দের দুই অর্থ কেনো?
    -    ধুত্তুরি! এক প্যাঁচালের মধ্যে আরেক প্যাঁচাল আনবেন না তো। মূল কথায় থাকুন।

    -    ঠিক আছে। সেটিই বলুন।
    -    বললাম তো।

    -    বলছি কি, ছাত্র-বেতন আর শিক্ষক-বেতন তো সবসময়ই আছে। এটিই তো অর্থের বিনিময় সেবা? ঠিক কি-না? তাহলে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য নতুন কী?
    -    শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ হয় তখন, যখন ছাত্র-বেতন অনেক গুণ বেড়ে যায়।

    -    আচ্ছা। কতোগুণ বাড়লে সেটি বাণিজ্য হয়? অর্থাৎ, পরিমাণে কতোটুকু পরিবর্তন হলে গুণের দিক থেকে পরিবর্তন ঘটে শিক্ষা পরিণত হয় বাণিজ্যে, স্যার?
    -    জানি না, যান! যত্তোসব! এ-জন্যেই আপনাদের মতো অশিক্ষিত মানুষের সাথে কথা বলি না।

    -    রাগছেন কেনো স্যার? আপনি তো শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মানুষ। বুঝিনি বলেই তো আপনাকে প্রশ্ন করলাম।
    -    বুদ্ধিজীবী হলেই কি সব ফালতু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে?

    -    আচ্ছা, ফালতু মানে কী?
    -    আরে, ভাই, আপনি কি পাগল নাকি? ফালতু বুঝেন না? ফালতু মানে আপনি। আপনার মতো যাদের খেয়ে-দেয়ে কোনো কাজ নেই, কেবল ত্যানা প্যাঁচায়।

    -    দারুন তো! আচ্ছা, এই ‘ত্যানা প্যাঁচানো’ কথাটা কীভাবে এলো? ‘ত্যানা প্যাঁচানো’র অর্থটা কী?
    -    উফ! আপনার মতো এমন নাছোড়বান্দা তো কখনও দেখিনি!

    -    দেখুন স্যার, আপনি আমাকে ‘ফালতু’ বলেছেন কিছু, বলিনি। কিন্তু ‘বান্দা’ বলবেন না। বান্দা নই কারো। আমি মুক্ত স্বাধীন মানুষ, স্বাধীন চিন্তা করি। তাই সব কিছুকেই প্রশ্ন করি। উত্তর জানা না থাকলে বলবেন জানি না। কিন্তু রেগে-মেগে গালি দেবেন না!

    -    কী বললে? আমি জানি না? বেরুও, বেরুও এক্ষুণি। আই স্যে গেট আউট ফ্রম হেয়ার।

    -    যাচ্ছি স্যার। তার আগে বলি, কথাটা ‘গেট আউট ফ্রম’ নয়, হবে ‘গেট আউট অফ’।  আর ‘হেয়ার’ নয়, হবে ‘হিয়ার’।
    -    কী বললি? ছোটো লোক কোথাকার! আমাকে এসেছিস ইংরজি শেখাতে! আমাকে চিনিস? জানিস আমি কে?

    -    না। আপনি কে? এখন আপনাকে চিনতে পারছি না। আমাকে প্রথম ‘আপনি’, তারপর ‘তুমি’, আর এখন ‘তুই’ বলছেন। আমি সত্যি আপনাকে চিনতে পারছি না। কিন্তু আপনি কি নিজে চিনতে পেরেছেন আপনি কে, স্যার?
    -    আলবৎ চিনি। কিন্তু তোর মতো অশিক্ষিতের কাছে আমার মতো উচ্চশিক্ষতের পরিচয় দিতে হবে না। লণ্ডনে থাকিস তো কী হয়েছে? তোর মতো লোককে আমি আমার বাড়ীর চাকর হিসেবেও যোগ্য মনে করি না। কী মূল্য আছে তোর? কতো টাকা বেতন পাস তুই? ইংল্যাণ্ডে থাকলে আমার বেতন কতো হতো জানিস?

    -    পেয়েছি! পেয়েছি! শিক্ষার বাণিজ্যিকরণের অর্থ পেয়েছি!
    -    মানে? কী বলছেন আপনি?

    -    হা, হা, হা...। ‘আপনি’ নয়, ‘তুই’-ই জারি রাখুন স্যার। এতেই আপনাকে বেশি মানায়। আর, শিক্ষার বাণিজ্যিকরণ মানে হচ্ছে, মানুষকে মূল্যবান পণ্যে পরিণত করার কারবার। ধন্যবাদ, ধন্যবাদ স্যার!
    -    আউট! আউট!! জাস্ট আউট, ইউ হারামজাদা আনএডুকটেড এ্যাণ্ড ইগনোরেন্ট!

    -    থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, ফর ইউর কমপ্লিমেণ্টস! নেভার টু সী ইউ এ্যাগেইন! বাই!

    মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৪
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন