• শিক্ষার সমস্যা প্রসঙ্গেঃ বিশ্বাস বনাম গবেষণা
    Bangladesh_EduDemo_RakhalRaha.jpg
    মাসুদ রানা

    ১.
    গত সোমবারে লণ্ডন সিটি হলে - অর্থাৎ, লণ্ডন মেয়েরের কার্যালয়ে - 'স্কুল-টু-স্কুল নেটওয়্যার্ক এ্যাপ্রৌচ' নামে একটি ওয়ার্কশপ ছিলো। আমাকে যেতে হয়েছিলো আমার স্কুলের প্রতিনিধি হিসেবে।

    আমার বলা উচিত, আমাদের সেণ্ট পৌলস ওয়ে ট্রাষ্ট স্কুল সর্বশেষ HR Ofsted ইনস্পেকশনে সর্বক্ষেত্র 'Outstanding' পেয়ে বর্তমানে টাওয়ার হ্যামলেটসে সবচেয়ে আর্কষণীয় স্কুলে পরিণত হয়েছে। বিষয়টি এ-বছর ব্যাপক মিডিয়া কাভারেইজ পেয়েছে।

    এটি স্বীকৃত ঘটনা যে, লণ্ডন মহানগরীর স্কুলগুলোর শিক্ষার গড় মান ও ফলাফল সারা দেশের মধ্যে সেরা। এর পেছেনে কারণ হচ্ছে লণ্ডনের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারগুলোর সহযোগিতা, স্কুল লীডারশিপের সিরিয়াস উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা, প্যারেণ্টদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সর্বোপরি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উচ্চ প্রেষণা ও কঠোর পরিশ্রম।

    আমার উল্লেখ করা উচিত যে, গবেষণার ফল বলে, যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই উচ্চ প্রেষণা ও কঠোর পরিশ্রম লক্ষ্য করা গিয়েছে, তাঁদের পরিসংখ্যানিক তাৎপর্যপূর্ণ অংশ এসেছে মাইনোরিটি এথনিক গ্রুপ্স বা সংখ্যালঘু জনজাতিগুলো থেকে (এ-বিষয়ে বাঙালীর অবদান নিয়ে পরে লিখবো)।

    গত সোমবারে সিটি হলের ওয়ার্কশপের লীড হেডটিচারের উপস্থাপিত অনেক কিছুর মধ্যে একটি বিষয় আমার কাছে অভিনব ও আকর্ষণীয় মনে হলো। তিনি জানানলেন,  প্রতি টার্মে তাঁর স্কুলে কতিপয় আগ্রহী শিক্ষক একত্রে পেডাগোজিক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বিভিন্ন থিওরেটিক্যাল রচনা পড়ে নিজেদের মধ্যে কনসেপ্ট ও আইডিয়া বিকশিত করেন।

    আমার কাছে তাঁদের এই চর্চাটা দারুন পছন্দ হলো। আমি তার সাথে এ্যাকশন রিসার্চের কনসেপ্ট যুক্ত করে প্রস্তাব করলাম, ঐ থিওরিগুলোর কার্যকারিতা কমন সেন্স থেকে বৈজ্ঞানিক উপলব্ধির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন ইম্পেরিক্যালে টেষ্ট এ্যাণ্ড এভিডেন্স।

    আমি প্রস্তাব করলাম, শিক্ষদেরকে রিসার্চ মেথডোলজিতে সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্লাসরুমে এ্যাকশন রিসার্চ এমপ্লয় করা দরকার। আমি জানলাম, এ্যাকশন রিসার্চ এ্যামেরিকাতে ব্যবহৃত হচ্ছে অনেক কাল ধরে। ইংল্যাণ্ড পরীক্ষামূলকভাবে ৭টি এ্যাকাডেমিতে ৩টি থিমের ওপর হয়েছে বর্তমান ২০১৩-২০১৪ শিক্ষাবর্ষে, যার ফলাফল ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। আমার প্রস্তাবে সবাই সম্মতি জানালেন।

    আমিও আমার স্কুলে এ্যাকশন রিসার্চের ওপর দু সপ্তাহে আগে একটি প্রেজেণ্টেশন দিয়েছি। এখন ভাবছি ঐ ওয়ার্কশপ থেকে পাওয়া কালেকটিভ থিওরেটিক্যাল রীডিং কীভাবে ইণ্ট্রোডিউস করা যায়। আমি জানি, এতে ডজন ডজন শিক্ষক আসবেন না। যদি পাঁচজনও আসেন, তাও হবে একটি শুভ সূচনা।

    ২.
    এই যখন ভাবছিলাম, তখন ফেইসবুকে লক্ষ্য করলাম বাংলাদেশের 'শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড' জাতীয় মেটাফর ব্যবহার করে অনেকেই হায়-হায় করছেন বাংলাদেশে শিক্ষা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে অভিযোগ এনে।

    দেখা যাচ্ছে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাচ্ছে পরীক্ষার আগে। পরীক্ষার হলে শিক্ষকগণ পরীক্ষার্থীদের উত্তর বলে দিচ্ছেন। প্রথমিক পাবলিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে সারা দেশের উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা অফিসারদেরকে রাজধানী ঢাকায় ডেকে নিয়ে বলা হয়েছে ১০০% পাস চাই। এ-বিষয়ে আমার এক ফেইসবুক-বন্ধু তাঁর ফার্ষ্টহ্যাণ্ড অভিজ্ঞতা বললেন। তিনি বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু নিজের চাকরি রক্ষার জন্যে তাঁকে সরকারী নির্দেশ মান্য করতে হয়েছে।

    লক্ষ্য করলাম রাখাল রাহা নামে এক অভিভাবক তাঁর মতো আরও অভিভাবকে আজ ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদমিনারে সমাবেশিত হয়ে শিক্ষা ধ্বংস করার প্রক্রিয়া রুখে দাঁড়াবার অনুরোধ করেছেন। আমি সত্যিই তাঁর উদ্যোগে চমৎকৃত। আমি তাঁর ফেইসবুকের ষ্টেইটাসে লক্ষ্য করলাম, তিনি সমস্যাটাকে প্রাকরণিকভাবে বুঝতে ও বুঝাতে চেষ্টা করেছেন।

    বিষয়টি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের নিয়ন্ত্রিত ছাত্রসংগঠনগুলো কী ভাবছে তা জানতে চেষ্টা করলাম। দলগুলোর ওয়েবসাইটে গেলাম। না, সেখানে কিছুই পেলাম না। একাধিক শিক্ষককে জিজ্ঞেস করলাম, বিষয়টির ওপর তাঁদের ভাবনা জানাতে। তাঁরা ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে আগ্রহ দেখালেন না। বললেন, 'জাতিকে মেধাশূন্য করার ষড়যন্ত্র এটি'।

    ৩.
    এ-সমস্ত ব্ল্যঙ্কেট উত্তর আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে এগুলো বিরক্তিরও বটে। কারণ, এতে কোনো জ্ঞান থাকে না। কার্য-কারণ সম্পর্কের বিশ্লেষণ থাকে না। বিভিন্ন ভ্যারিএ্যবল বা ফ্যাটরের জটিল-সহ সম্পর্ক আলোকপ্রাপ্ত হয় না। ফলে, অভিযোগ, পালটা অভিযোগ এবং গালাগালি হয় প্রচুর। কিন্তু যা হয় না, তা হচ্ছে জ্ঞান প্রাপ্তি।

    আমাদের রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা তাঁদের প্রথাগত জ্ঞানের মাধ্যমে দুনিয়ার তাবৎ বিষয় ব্যাখ্যা করতে চান। বলা বাহুল্য, তাঁদের এই জ্ঞানের নাম হচ্ছে 'আদর্শ', যা শব্দান্তরে বিশ্বাস। এই আদর্শ বা বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তারা নিত্যনতুন বিষয়াদি বুঝতে ও বুঝাতে চান। আমি জানি না, তাতে তাঁরাই কী বুঝেন আর জনগণকেই কী বুঝান?

    আমি অবাক হলাম, শিক্ষা বিষয়ে এতো বড়ো একটি ইস্যুতে কীভাবে ছাত্র সংগঠনগুলো এবং এদের নিয়ন্ত্রণকারী রাজনৈতিক দলগুলো প্রায় নীরব থাকতে পারে! বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর ক্রমহ্রাসমান ভূমিকা নিয়ে আমি ভাবছি।

    সন্দেহ নেই, কোথায় কিছু একটা সমস্যা কোথায় নিশ্চয় হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেঃ সেটি কী?  উত্তর দিতে পারে একমাত্র সুপরিকল্পিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

    রোববার ৩০ নভেম্বর ২০১৪
    লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন