• শিরোচ্ছেদ-বিরোধী আন্দোলনের বিভ্রান্তির স্বরূপ
    আরিফ রহমান

    ৮ বাঙালীর শিরোচ্ছের বিরুদ্ধে প্রেস-ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ করছেন বুদ্ধিজীবি সৈয়দ আবুল মকসুদনরহত্যার দায়ে সম্প্রতি সৌদি আরবে প্রবাসী ৮ জন বাংলাদেশী কর্মীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে সে-দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তলোয়ারের আঘাতে ঘাড় থেকে মস্তক-ছিন্ন করে। ইন্টারনেটের কল্যাণে ঘটনাটির স্থিরচিত্র ও চলচ্চিত্র ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীময়। নিজেদেরকে 'আড্ডাপ্রিয়' বলে পরিচয় দেয়া বাঙালী-সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। চঞ্চলতা শুরু হয়েছেও বৈকি! ইলেক্ট্রনিক প্রচার-মাধ্যমের সুবাদে সে-চাঞ্চল্যের ছোঁয়া বাংলাদেশ থেকে পাঁচ হাজার মাইল দূরে বসেও টের পাচ্ছি। টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট, ব্লগ-সহ প্রায় সবখানেই হৈচৈ চলছে এ-নিয়ে।

    অনেকে বলছেন, 'ঠিকই আছে, খুনের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য।' আবার কেউ বলছেন 'এটা আদিম বর্বরতা'। কেউ বা বলছেন, 'অমানবিকতা'। যাঁরা ‘আলাপ-প্রলাপে নয়, এ্যাকশনে বিশ্বাসী', তাঁরা ইতোমধ্যে প্রতিবাদ-কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। কিছু-কিছু কর্মসূচি পালিতও হয়ে গেছে। আশা করা যায়, সামনে আরও হবে। যাঁদেরকে 'বুদ্ধিজীবী' বলা হয়, তাঁরাও পিছিয়ে নেই। তাঁরা শুরু করেছেন পত্রিকায় বিবৃতি-প্রদান, টেলিভিশনের টকশোতে দর্শকদের জ্ঞান-দান ইত্যাদি আরও নানা কর্মকাণ্ড। তাতেও সন্তুষ্ট না হতে পেরে কোনো-কোনো বুদ্ধিজীবী প্রতিবাদ জানাতে পথেই নেমে পড়েছেন। আলাপ-মিছিল-বিবৃতি-প্রতিবাদ এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। এক মহা-কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে যেনো সারা বাংলাদেশ জুড়ে!

    বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা তথা মার্কিন ডলারের ‘রিজার্ভ’ অর্জনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকের কাজ করতে যাওয়া নিজ-দেশে সুবিধা-বঞ্চিত দরিদ্র মানুষরা। কিন্তু তাঁদের প্রতি কারো শ্রদ্ধা দূরে থাক, কোনরকমের সহমর্মিতার প্রকাশও কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। যে-দেশে এখনও রিকশা-অলাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধোন করাটাই রীতি, রেগে গেলে তাকে দু'’ঘা কিল-ঘুষি বসিয়ে দেয়াটা এখনো প্রায় অধিকারের পর্যায়ে পড়ে, কিংবা গৃহের কর্মে নিযুক্ত শ্রমিককে পেটানো বা গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেয়াটা খুবই মামুলি ঘটনা, সে-দেশে কারও প্রবাসী শ্রমিকেদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে না, এটাই হয়তো স্বাভাবিক। তাহলে খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড-প্রাপ্ত হতভাগ্য ঐ ৮ শ্রমিকের জন্য বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-সমাজে এমন অস্থিরতা জাগলো কেনো? এমন তো নয় যে, এ-ই প্রথম প্রবাসী কোন শ্রমিক প্রাণ হারালেন? সরকারী হিসেবে শুধুমাত্র ২০০৮ সালেই ২ হাজারের বেশি প্রবাসী-শ্রমিকের লাশ এসেছে বাংলাদেশে। তাঁরা কে কীভাবে মারা গেছেন, তার কোনো ঠিক পরিসংখ্যান পাওয়াও দুঃসাধ্য।

    এ-ঘটনার প্রকৃতি বুঝার জন্য তাই গত কয়েকদিনের প্রাসঙ্গিক সংবাদ, বিশ্লেষণ, আলোচনা, বিতর্ক ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ-যোগ্য। এ-পর্যবেক্ষণে মোটা দাগে দু’টো পক্ষ চিহ্নিত করা গেছে। এক পক্ষ এ-মৃত্যুদণ্ডকে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক কাজ বলে মনে করছেন, আরেক পক্ষ মনে করছেন উচিত কাজটিই করেছে সৌদি আরবের সরকার।

    দ্বিতীয় দলের বক্তব্য দিয়ে শুরু করা যাক। তাঁদের মতে সৌদি আরবে প্রচলিত আইনে অর্থাৎ 'আল্লাহর' আইনেই এ-বিচার হয়েছে, সুতরাং এটিই নায্য। বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের প্রেস-ব্রিফিং এর বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে তাদের অনেকে বলছেন যে, আল্লাহর আইন পরিবর্তনের সাধ্য কারও নেই। মৃত্যদণ্ড-প্রাপ্তদের অপরাধ যে আসলে অত্যন্ত গর্হিত ছিলো, ছিলো ক্ষমার অযোগ্য, সেটা প্রমাণের চেষ্টাই তাঁরা করছেন। তবে তাঁরা একটি ষড়যন্ত্র-তত্ত্বও প্রচার করছেনঃ যাঁরা এ-ঘটনার প্রতিবাদ করছেন, তাঁরা প্রতিবেশী দেশ ভারতের স্বার্থে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রম-বাজার ধ্বংস করার চেষ্টা করছেন। স্পস্টতঃ ইসলাম-ধর্মের ফ্রেইমওয়ার্কের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে এঁদের বক্তব্যগুলো যৌক্তিক-বিতর্কের রূপ নিচ্ছে না। ফলে, তা সৌদি আরবের সিদ্ধান্তকে নায্যতা দেয়ার চেষ্টা ছাড়া ঘটনাটির আর কোন মাত্র বা তলের সন্ধান দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

    অন্যপক্ষ দৃশ্যতঃ অত্যন্ত উত্তেজিত। কড়া ভাষায় তাঁরা সৌদি আরবের সমালোচনা করছেন। লক্ষ্য করা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই বিশেষতঃ ইন্টারনেটে 'সৌদি অসভ্যতার' প্রতিবাদ করতে গিয়ে, অনেকেই ভাষা-ব্যবহার সংক্রান্ত প্রচলিত 'সভ্য-সীমা' অতিক্রম করেছেন। ঢাকাস্থ সৌদি দূতাবাসের সামনে ১২ অক্টোবর বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হবে এমন পূর্ব-ঘোষণা থাকলেও নির্ধারিত দিন বিক্ষোভকারীরা (সম্ভবতঃ পুলিসের বাধার কারণে) সেখানে পৌঁছুতে না পেরে কাছাকাছি অবস্থান-কর্মসূচি পালন করেছেন। ঢাকার প্রেস-ক্লাবের সামনে অবস্থান-কর্মসূচি পালন করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন প্রবীণ কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ। ১৫ তারিখে জাতীয় যাদুঘরের সামনে প্রতীকী শিরোচ্ছেদ-দৃশ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছে 'ম্যাজিক মুভমেন্ট' নামক নবজাতক একটি সংগঠন। জানা গেছে, সংগঠনটির পেছনে রয়েছেন কয়েকজন সাংবাদিক। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগের ওয়েব-সাইট ফেইসবুকে একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে এ-সংক্রান্ত প্রতিবাদে।

    অবস্থান-কর্মসূচি পালন-কালে, বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত মকসুদ সাহেবের গলায় ঝুলানো ছিল, 'বর্বর শিরোচ্ছেদ প্রথার বিলুপ্তি চাই' শীর্ষক স্বীয় নামাঙ্কিত একটি পৌস্টার (প্রথম আলো ১২/১০/১১)। তাঁর পিছনে ঝুলছিলো কালো একটি ব্যানার, যাতে বলা হয়েছে, 'সৌদি আরবে শিরোচ্ছেদ হওয়া আমাদের আট হতভাগ্য সন্তানের জন্য আসুন আমরা ১৬ কোটি মানুষ এক ফোটা করে চোখের পানি ফেলি'। চোখের পানি ১ ফোঁটা ফেলা যায় না, ফেলতে হলে একসাথে অন্তত ২ ফোঁটা ফেলতে হয় - তাড়াহুড়োয় ব্যানার তৈরী করাতে গিয়ে হয়তো মকসুদ সাহেব তা ভুলে গিয়ে থাকবেন। সে কথা যাক, প্রশ্ন হচ্ছে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সকল মানুষকে কাঁদিয়ে তিনি আসলে কী অর্জন বা বর্জন করতে চাইলেন? তাঁর প্রতিবাদের লক্ষ্যবস্তু পরিষ্কার হলো না একেবারেই। বরং একটা ধোঁয়াশা তৈরি হলো, যাতে ঢাকা পড়ে গেল এ-আট তরুণ প্রাণের অকাল বিনাশের জন্য কে দায়ী, সে প্রশ্নটির ফয়সালা হওয়ার সুযোগ।

    কেবল প্রবীণ বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদে নয়, তরুণদের প্রতিবাদেও পরিষ্কার কোনো বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই কিছু একটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন বটে কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে মুখ ফুটে বলছেন না কী সেটা। ফলে প্রতিকার-কল্পে তাঁদের দাবীই বা কী তাও বুঝা কঠিন। কেন্দ্রীয় কোন সংস্থা এ-প্রতিবাদের নেতৃত্ব না দেয়ার কারণে বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলি থেকে উদ্ধার করতে হচ্ছে আন্দোলকদের বক্তব্য। সংক্ষেপে তার সারকথা হচ্ছেঃ অস্বচ্ছ বিচার-প্রক্রিয়ার কারণে 'আসামীরা' যথাযথ আইনী সহায়তা পাননি এবং আধুনিক-যুগে 'বর্বর' শিরোচ্ছেদে মৃত্যুদণ্ডের প্রথা গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও আরও অনেক কথা তারা বলছেন তবে সেগুলো প্রায় সবই মূলত এ-দু'টোরই ভিন্ন ভিন্ন বয়ান।

    কথা দু'টোর মধ্যে ভাবগত বৈপরীত্য রয়েছে। প্রথমটি থেকে ধারণা হয় যে, বিচার-প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছ হতো, আসামী যদি উপযুক্ত আইনী সহায়তা পেতেন তাহলে বিচার শেষে বিচারক মৃত্যুদণ্ডের রায় দিলেও তাতে কারও আপত্তি থাকতো না। অথচ দ্বিতীয়টি বলছে, শিরোচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য নয় - যদিও ঐতিহাসিক্ভাবে আলোচ্য দেশটিতে সে-ভাবেই তা করা হয়। এ-থেকে ধরে নেয়া যায় যে, মৃত্যুদণ্ডে আন্দোলনকগণের আপত্তি নেই, তাঁদের আপত্তি প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ শিরোচ্ছেদে। অন্য কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করে যেমনঃ ফাঁসি, বিষ-প্রয়োগ বা বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসিয়ে দণ্ড কার্যকর করলে তা গ্রহণযোগ্য হতো।

    ভদ্রলোকদের উত্তেজনার হেতু এবার পরিষ্কার হলো। শিরোচ্ছেদ নিয়ে হৈচৈয়ের কারণ মনুষ্য-প্রাণ রক্ষার মানবতাও নয়, ন্যায়-বিচার সংক্রান্ত দার্শনিক কোনো উপলব্ধিও নয়। কারণটা হচ্ছে স্রেফ অনভ্যস্ত চোখে মাথা কাটার দৃশ্য সহ্য করতে কষ্ট হওয়া। তাই তাঁরা মৃত্যুদণ্ডের বিলোপ চান না, চান শিরোচ্ছেদ প্রথা বিলোপ করা হোক। তাই তাঁরা এ-ঘটনার দায়-দায়ীত্ব কার উপরে বর্তাবে তার হদিশ দেন না, জনতাকে শোক করতে পরামর্শ দেন। তাই যখন সারে-সারে কফিনে (শিরোচ্ছেদ-ভিন্ন অন্য কোনোভাবে প্রাণ হারানো, যা তাঁদেরকে দেখতে হয় না, যেমন নিয়োগকর্তার নির্যাতনে মৃত) প্রবাসী-শ্রমিকদের লাশ আসে, তখন তাদের মধ্যে কোনো চাঞ্চল্য দেখা যায় না। তখন তাঁরা গলায় পৌস্টার ঝুলিয়ে অবস্থান-র্কমসূচি করেন না। এ-পুরো প্রতিবাদ আন্দোলনে যুক্তি-রহিত থকথকে আবেগ ও সে-আবেগপ্রসূত কোমল অনুভূতি যেনো শিরোচ্ছেদের মতো কোনো দৃশ্য অবলোকনে আহত না হয়, সে-আকাঙ্খার মতো স্বার্থপরতাই চোখে পড়ছে।

    আবেগ একটু সংবরণ করলেই আমরা দেখতে পাবো, কেবল সৌদি আরবেই নয়, খোদ বাংলাদেশেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় নরহত্যার মতো অপরাধের জন্য। পদ্ধতিটা ভিন্ন মাত্র - আমৃত্যু ফাঁসীর দঁড়িতে ঝুলিয়ে তা কার্যকর করা হয় সেখানে। আরও লক্ষ্যণীয়, দৃশ্যতঃ যাঁরা বিশ্বজুড়ে মানবতার শিক্ষা-প্রদানে ব্রত, সেই যুক্তরাষ্ট্রও মৃত্যুদণ্ড দেয়! তারা বরং সৌদি আরবের চেয়ে এগিয়েই আছে। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র মোট ১১০ ব্যাক্তিকে এ-সাজা দিয়েছে আর সৌদি আরব দিয়েছে ৩৪ জনকে। একটু পিছিয়ে থেকে বাংলাদেশ দিয়েছে ৩২ জনকে (সূত্রঃ এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল)। সৌদি আরবে ৮ বাঙালীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, তা তো সেখানকার প্রচলিত আইন – যা প্রবাসী কর্মীদের জন্যও প্রযোজ্য- তার আওতাতেই। বাংলাদেশের সরকার তাতে অসন্তুষ্ট হয়নি। বাংলাদেশ জানিয়েছে, এতে দু'দেশের মধ্যে 'বন্ধুত্বপূর্ণ' সম্পর্ক নষ্ট হবে না। অর্থাৎ, এ-ঘটনাটিতে দু-দেশেরই আইন ও কূটনৈতিক সমোঝোতা বর্তমান।

    আমরা দেখলাম, প্রচলিত আইন মৃত্যুর বদলে মৃত্যুর বৈধতা দিয়েছে। তাই কার্যকর ও টেকসই পরিবর্তন আনতে হলে যুক্তিশীল মানুষকে চাইতে হবে এ-আইনেরই রদ। এখন যাঁরা সে-আইনের পরিবর্তন না চেয়ে কেবল তা কার্যকরা করার পন্থা বদলাতে সুপারিশ করছেন তাঁরা আসলে আইনের হাতে প্রতিশোধ নেবার ক্ষমতা থাকাকে অনুমোদন করছেন। কিন্তু চোখের বদলে চোখ নিলে পৃথিবীর সকলেই অন্ধ হয়ে যাবে যে! বিচার-ব্যবস্থা যে-ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে প্রতিশোধের কোন স্থান নেই; আছে অপরাধীর সংশোধন ও অপরাধে নিরুৎসাহ। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরা করার পর যদি দেখা যায় আসলে ভুল ব্যাক্তিকে সাজা দেয়া হয়ে গেছে তখন কী উপায়? ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি প্রাণ হারানো হতভাগ্য সে-মানুষটিকে? না, হবে না। তাই মৃত্যুদণ্ড কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।

    আজ সময় এসেছে সকল ধরণের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করার দাবী তুলবার। আইনের মাধ্যমে তো বটেই, ক্রসফায়ারের গল্প সাজিয়ে আমাদের শখের রাষ্ট্রটি বিনা-বিচারেও খুন করে চলেছে তার নাগরিকগণকে এবং নিজের বানানো আইনকেই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। আমাদের বুদ্ধিজীবিরা তাতেও বিশেষ চিন্তিত নন। সুতরাং তাঁরা মৃত্যুদণ্ডের বিলোপ চাইবেন এ-দূরাশা করি না। চাইতে হবে আমাদেরকেই। জোর গলায় আওয়াজ তুলুন, 'মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হোক'। তবেই হয়তো আইনের হাতে 'বৈধভাবে' অকালে প্রাণ-হারানো থেকে রক্ষা পাবে আরো অনেকে।

    আরিফ রহমান
    ১৬ অক্টোবর ২০১১
    লণ্ডন, যুক্তরাজ্য

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

সৈয়দ আবুল মকসুদ সাহেব কিছুদিন পর পরই বিভিন্ন আন্দোলনের ডাক দেন। গত ঈদের দিন উনি এই ধরনের একটি আন্দোলন করেছিলেন শহীদ মিনারে,তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর প্রতিবাদ জানিয়ে , যা অবশ্যই প্রস ংশনীয় কাজ। কিন্তু প্রায় প্রতি দিনই তো সড়ক দুরঘটনায় কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে । যদি অকাল মৃত্যু( সে যেই হোক না কেন , মন্ত্রীর ছেলে বা মিডিয়ার কেউ অথবা গ্রামের কোন কৃষক) বন্ধ করাই এই আন্দোলনের মূল ভিত্তি হয় , তাহলে আন্দোলনটা সমবেগে অথবা এর চে বেশী বেগবান হওয়ার কথা ছিল । যাই হোক ,হয়তো উনি যথেষ্ট সময় পান নি অথবা ওনার আন্দোলনই ছিল শুধুমাত্র তারকা বন্ধুদের জন্য। সাম্প্রতিক আন্দোলন টাও আবেগী আর উদ্দেশ্যহীন বলেই মনে হচ্ছে। রাজনীতিবিদদের মত বড় বড় করে নিজের নাম( যেমন দেখি বিভিন্ন পোষ্টারে , ব্যানারে )লেখাটাও ভাল লাগেনি ।

ধন্যবাদ লেখাটার জন্য।

অনেক ধন্যবাদ, স্বপনদা' - পড়ার ও প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য।

আরাম কেদারায় বসে কিছু চাওয়াটাও কিন্তু ছোট কাজ না মোটেও। বরং যে-কোন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঠিকতা নিশ্চিত হয়েই পথে নামা উচিত - নতুবা তাতে কোনো ফল আসে না। সে-পর্যায় পর্যন্ত ব্যাপারটা বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরেই থাকা উচিত। ভেবে দেখুন তো, রুশো তথাকথিত আরাম-কেদারায় বসে বসে যা চেয়েছেন, তা কেমন করে ফরাসী সমাজে অ-ভাবিত বিপ্লব আসন্ন করেছিলো!

শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে নিশ্চয়ই স্যালুট করবেন, তবে যাঁদের কথা বলছেন যে, কথায় বড়ো না হয়ে কাজে বড়ো হচ্ছেন, তাঁরা কি আসলেই কাজে বড় হয়েছেন? সত্যিই বলছি, আমি তাঁদের কাজগুলো খুঁজে পাচ্ছি না। বরং দেখতে পাচ্ছি ভুল-বক্তব্যের পৌস্টারের নিচে বড়ো হরফে নিজেদের নাম জারি করছেন। সে-পৌস্টার যে কেবল নিজেদের গলায় ঝুলাচ্ছেন তা নয়, নিজেদের নামাঙ্কিত সে প্রচারপত্র অন্যদের গলায়ও টাঙ্গিয়ে দিয়েছেন! বড়ো তাঁরা হচ্ছেন বটে - তবে কাজে নয় কথায়।

সমস্যাটিকেই তাঁরা সম্ভবত বুঝতে পারছেন না কিংবা এড়িয়ে যাচ্ছেন। সবাই মিলে বিলাপ করলে কেমন করে ভবিষ্যতে এ-ধরণের শিরোচ্ছের মতো অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঠেকানো যাবে, সেটি আমার বোধগম্য নয়। তাহলে এ-সব কর্মসূচীর মানে কী? কার কাছে তাঁরা কী মেসেজ পাঠাতে চাইছেন? বাংলাদেশের সরকার না-কি সৌদি আরবের সরকারের কাছে?

মৃত্যুদণ্ড বাতিলের দাবীর ধারে-কাছে দিয়েও তাঁরা যাচ্ছেন না, কারণ ওটি আপাতত তাঁদের এজেন্ডাতেই নেই। আপনি যদি আশা করে থাকেন যে, মৃত্যদণ্ড বাতিলের আন্দোলনে ইনাদের এইসব কর্মসূচী কোনভাবে কন্ট্রিবিউট করবে তাহলে মোটামুটিভাবে নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনি আশাহত হবেন। তবে হ্যাঁ, আবার যখন কোন ঘটনার মুখোমুখি হয়ে মৃত্যুদণ্ডের দাবী সামনে চলে আসবে, তখন হয়তো দেখা যাবে 'বর্বর মৃত্যুদণ্ড বিলোপ চাই' শীর্ষক পৌস্টার হাতে অনেকেই হাজির হয়েছেন।

বুদ্ধিজীবিরা হচ্ছেন সমাজের অগ্রসরতম অংশ, তাদের কাছে থাকে আলো। সে-আলো ব্যসহার করে তাঁরা সমাজের দ্বন্দ্বগুলোকে সঠিকভাবে অনুধাবন করবেন ও কার্যকর পরিবর্তনের লক্ষ্যে সমাজের বাকী অংশকে পথ-নির্দেশ দিবেন। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের বুদ্ধিজীবিরা তার ব্যাতিক্রম। ফলে যারা সমাজের বাকী অংশ অর্থাৎ যাঁরা তাঁদেরকে অনুসরন করেন তার সঠিক পথের দিশা পাচ্ছেন না। রাষ্ট্রের বয়স ৪০ বছর চলে যাওয়ার পরও আমরা দরিদ্র রয়ে গেছি, কারণ সম্পদে নয় আমরা বুদ্ধিতে দরিদ্র, স্বভাবতই আবেগে চ্যাম্পিয়ন।

অনেক শুভেচ্ছা।

পুনশ্চঃ আপনার লেখাগুলো বেশ উপভোগ করছিলাম, থেমে গেলেন কেন? শীঘ্রই আবার লিখার অনুরোধ রইলো।

আরিফ,
আপনার লেখাটা পড়লাম। অবশ্যই আপনার সাথে জোর গলায় আওয়াজ তুলতে চাই (আমার ঘরে আরাম কেদারায় বসে বসে) ''মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হোক'। এর বাইরে কিছু করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে যারা এর বিরুদ্ধে কিছু একটা করছেন অবশ্যই তাঁদেরকে স্যালুট করতে চাই। তাঁরা অন্তত কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হচ্ছেন। এঁদের ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন কাজগুলোর কারনেই একসময় মৃত্যুদণ্ড বিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী হবে বলে আমি মনে করি। আশা করি আপনিও একমত হবেন।
সৈয়দ আবু মকসুদ এর পিছনের পোস্টারের বক্তব্য সম্পর্কে আপনি যা' বললেন তার সাথে একমত হতে পারলাম না। এটা মনে হয় ভুল নয়, এটি একটি প্রতিকী বক্তব্য- যেমন 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা'। আমরা কি গান রচয়িতাকে প্রশ্ন করতে পারি, এক সাগর রক্ত দেখেছ কি হে লেখক?
ভালো থাকবেন।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন