• শুধু ক্ষমা প্রার্থনা নয়, পাঠ্যপুস্তকেও উল্লেখ চাই
    মাসুদ রানা

    ২৩শে মার্চ ১৯৪০ পাকিস্তান সৃষ্টির প্রস্তাবনা দিবস, আর ২৬শে মার্চ ১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিবস। দু'টিই বাঙালীর কাজ। প্রথমটি আবুল কাশেম ফজলুল হকের এবং দ্বিতীয়টি শেখ মুজিবুর রহমানের বলে দাবী করা হয়। দু'জনেই বঙ্গসন্তান। পাকিস্তানে লাহোর প্রস্তাবের ব্যাপারে কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই, কারণ এটি লিখিত। বাংলাদেশে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক আছে, কারণ এটি কথিত (কিছু মানুষ দাবী করেন যে, রেডিওতে ঘোষণা করেছেন মেজর জিয়াউর রহমান, তবে তিনিও ঘোষণাটা করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের নামেই)।

    এবারের পাকিস্তান দিবসে প্রখ্যাত পাকিস্তানী সংবাদিক হামিদ মীর পাকিস্তানের জিও সুপার টিভি চ্যানেলের একটি টকশোতে নিমন্ত্রণ করে এনেছিলেন পাকিস্তানী রাজনীতিক ইমরান খানকে, যিনি বরং পৃথিবীতে সমধিক পরিচিত প্রাক্তন ক্রিকেট তারকা হিসেবে।

    ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে পাকিস্তানের ম্যাচ শুরু হবার কিছুক্ষণ আগে হামিদ মীর জিজ্ঞেস করলেন ইমরান খানকে মাঠে উপস্থিত বাংলাদেশী দর্শকদের সম্ভাব্য সমর্থন সম্পর্কে। খান আত্মবিশ্বাসের সাথে জানালেন বাংলাদেশীরা পাকিস্তানকে সমর্থন করবে।

    দিনটি ২৩শে মার্চ - অর্থাৎ পাকিস্তান দিবস - স্মরণ করিয়ে দিয়ে মীর জিজ্ঞেস করলেন খানকে, ‘আপনি কি মনে করেন না যে এখন সময় এসেছে ১৯৭১ সালে সামরিক অপারেশনের জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে পাকিস্তানী সরকারে ক্ষমা চাওয়ার?’

    ইমরান খান তাৎক্ষণিকভাবে হামিদ মীরের সাথে সহমত প্রকাশ করলেন এবং জানালেন, এক সময় তিনিও মনে করতেন ১৯৭১ সালের সামরিক অপারেশন ‘গুড থিং’ ছিলো। কিন্তু ১৯৭১ সালে ইংল্যাণ্ডে এলেন, তখন তার বাঙালী বন্ধুদের কাছে আর্মী অপারেশনের বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে পারেন।

    পাকিস্তানে সে-সময় কোনো নিরপেক্ষ সাংবাদ মাধ্যম ছিলো না বলে প্রকৃত তথ্য পাওয়া সম্ভব ছিলো না বলে জানালেন খান। সেনাবাহিনীকে ‘সবসময় ঘৃণা ছড়াবার’ দায়ে অভিযুক্ত করে ইমরান খান বলেন, কৃতকর্মের জন্য পাকিস্তানকে বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। উল্লেখ্য, পাকিস্তানী এই ক্রিকেটার-টার্নড্‌-পলিটিশিয়ানের প্রকৃত নাম ইমরান খান নিয়াজি, যিনি ১৯৭১ বাংলাদেশে আত্মসমর্পনকারী পাকিস্তানী বাহিনীর প্রধান জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজির সম-গোত্রের পাখতুন বা পাঠান।

    গত সপ্তায় খোদ হামিদ মীরের সাক্ষাতকার নিয়েছে বাংলাদেশের বৈশাখী টিভি। মীর জানালেন, বাংলাদেশের কাছে অনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হতে যাচ্ছে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে। শুনে প্রীত হলাম। কিন্তু ইমরান খানের মতো ইংল্যাণ্ডে এসে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানী ‘আর্মী অপারেশন’ সম্পর্কে জানার সুযোগ নেই যে-সমস্ত আম-পাকিস্তানীর, তাঁদের বোধে পরিবর্তন আসবে কী করে? একদিনের একটি ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়ে যে-সংবাদ তৈরী হবে মিডিয়াতে, তা বুদ্বুদের মতো হারিয়ে যাবে কয়েক দিনের তর্ক-বিতর্কের তরঙ্গ তুলে। তাতেই কি বোধের পরিবর্তন আসবে পাকিস্তানীদের?

    আমি প্রস্তাব করছি, বিষয়টি অবশ্যই পাকিস্তানের স্কুল পর্যায়ের ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং সেখানে অন্ততঃ ৫টি বিষয়ের উল্লেখ থাকতে হবেঃ

    (১) বাংলা ভাষার অবদমন ও ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারীর ঘটনা-সহ পূর্ব-বাংলার প্রতি পাকিস্তান রাষ্টের বৈষম্য ও নিপীড়ন।
    (২) ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সমগ্র পাকিস্তানের মধ্যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিজয় কিন্তু তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তের অস্বীকৃতি।
    (৩) ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা ও অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের বিবরণ।
    (৪) বাঙালীদের স্বাধীনতা ঘোষণা, মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা এবং বিজয়।
    (৫) পাকিস্তানের ক্ষমা প্রার্থনা।
     
    আমি আমার প্রস্তাবের সমর্থনে চীন-জাপানের উদাহরণ দিতে চাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীন-জাপান কূটনৈতিক সম্পর্কের শর্ত হিসেবে জাপানের স্কুল পর্যায়ে ইতিহাসের পাঠ্যবইগুলোতে চীনের উপর তাদের বর্বর আচরণের কথা অনুতাপের সুরে লিখতে ও পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এটি মনিটর করা হচ্ছে। বইগুলোর নতুন সংস্করণে সুরের একটু পরিবর্তন হলেই চীন চিৎকার করে পৃথিবী মাতিয়ে তোলে এবং জাপান আবার ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়। এ-ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে।

    পাকিস্তানের প্রতি শেখ মুজিবুর রহমান যে মুসলিম-ভ্রাতৃত্বমূলক নীতি গ্রহণ করে ক্ষমা চাওয়ার অপেক্ষা না করে ১৯৭৪ সালে লাহোরে চলে গেলেন ইসলামী সম্মেলনে যোগ দিতে, এটি তাঁর বড়ো ভুল ছিলো। এ-ভুলের কারণেই পাকিস্তান এখনও পর্যন্ত ক্ষমা চায়নি। বরং পাকিস্তানের ডিফেন্সের ওয়েবসাইটে দাবী করে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য বাংলাদেশকে মাফ চাইতে হবে। তাঁরা বলছেন, পাকিস্তানীরা গণহত্যা করেনি। করেছে বাঙালী রাজাকারেরা। আর সেজন্যই রাজাকারদের বিচার করা হচ্ছে। ওরা উলটো বিচার চাইছে মুক্তিযোদ্ধাদের, যাঁরা বেসামরিক অবাঙালী পাকিস্তানীদের হত্যা করেছে।

    যাঁরা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাইছেন, তাঁদের প্রতি আমার সর্বতো সমর্থন জ্ঞাপন করে প্রস্তাব করতে চাইঃ যুদ্ধাপরাধের যারা মূল নায়ক - অর্থাৎ পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধী - তাদের বিচার দাবী করে পৃথিবীচ-ব্যাপী আন্দোলন শুরু করুন। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ১৯৭১ এর ব্যাপারে চুক্তি করতে পারে। চুক্তি মানা-না-মানা সরকারের ব্যাপার, কিন্তু জনগণতো সে-চুক্তি মানাতে বাধ্য নয়। বাংলাদেশের জনগণের কথা না হয় বাদই দিলাম। ব্রিটিশ বাঙালীকে সে-চুক্তি মানতে হবে কেনো?

    পৃথিবীতে কি এমন কোনো চুক্তি আছে, যা পৃথিবীর কোনো ইহুদীকে নাৎসী জার্মানীর বিরুদ্ধে কথা বলা থেকে এবং নাৎসী যুদ্ধাপরাধীর বিচার সংঘটিত করা থেকে বিরত রাখতে পারে? কী এবং কারা আমাদের আটকাচ্ছে?

    বাংলাদেশে চলুক কোলাবোরেইটার রাজাকারের বিচার। আর আফ্রিকা-এশিয়া-ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়াতে উত্থিত হোক পার্পেট্রেইটার পাক-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী। ভয় কি! আমরা আছি পৃথিবীর সর্বত্র বিপুল সংখ্যায়। শুধু ভুলবেন না উর্ধ্বে তুলে ধরতে অখণ্ড বাংলা-ভাষা, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী-সংস্কৃতি, অনমনীয় বাঙালী-আত্মমর্যাদা, গৌরবোজ্জ্বল বাঙালী-ইতিহাস, বিশ্বে বাঙালীর দ্বিতীয় বৃহত্তম সংখ্যাগুরুত্ব এবং সে-হিসেবে পালনীয় ভূমিকা।

    মাসুদ রানা
    এসেক্স, ইংল্যান্ড
    রোববার, ২৪ এপ্রিল ২০১১

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন