• শেখ হাসিনার সাফল্যের ষ্ট্র্যাটেজিঃ একটি সরল হাইপোথেসিস
    মাসুদ রানা

    আমি শেখ হাসিনার রাজনীতির সমর্থক নই, কিন্তু তিনি যে তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষায় ষ্ট্র্যাটেজিকভাবে সফল, তা স্বীকার করতে আমার কোনো সঙ্কোচ নেই। আমি নিরাসক্ত বিচারে মনে করি, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সবেচেয়ে ব্যর্থ, আর শেখ হাসিনা হচ্ছেন সবচেয়ে সফল রাজনীতিক। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়ঃ

    যাঁরা একসময় শেখ মুজিবুর রহমানের গাত্রচর্ম দিয়ে পাদুকা তৈরির বাসনা প্রকাশ করতেন, তাঁরা আজ রূপতঃ নিজের গাত্রচর্ম দ্বারা সযতনে শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার পাদুকা প্রস্তুত পূর্বক পদতলে উপবিষ্ট হয়ে আপন রসনা যোগে লেহন মাধ্যমে প্রতিনিয়ত "পালিশ" বন্দনা করে চলছেন। শেখ মুজিবুর রহমান যাঁদেরকে বাগে আনতে পারেননি রক্ষীবাহিনী বা লালবাহিনী দিয়ে, শেখ হাসিনা তাঁদেরকে বশীভূত ও অনুগত করেছেন যেনো অবলীলাক্রমে!

    মানুষ চেনার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা পিতা শেখ মুজিবুর রহমানেরও চেয়ে অধিক পারঙ্গম। অবশ্য তার বস্তুনিষ্ঠ ও ঐতিহাসিক কারণও আছে। শেখ হাসিনা জীবনে যে সহায়-সমর্থনহীন কঠিন সময় পার করেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে তা করতে হয়নি। বিপদে শেখ মুজিবুরের ছিলো কোটি-কোটি ভক্ত, শেখ হাসিনা ছিলেন নিঃসঙ্গ। তাই, শেখ হাসিনা মানুষ চিনেন তাঁর পিতার চেয়েও ভালো করে। ১৫ আগষ্ট ও ওয়ান ইলাভেন থেকে শেখ হাসিনা নিশ্চয় কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়ে থাকবেন।

    প্রথমতঃ পনেরোই অগাষ্টে আওয়ামী লীগ তথা বাকশালের দলীয় প্রধানকে খুন করিয়ে খন্দকার মুশতাক আহমেদ সরকার গঠন করলে, দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই সেই সরকারে যোগ দেন এবং দ্বিতীয়তঃ ওয়ান ইলাভেনের পর শেখ হাসিনাকে বন্দিনী করা হলে নিজদল আওয়ামী লীগের নেতারা সংস্কারের নামে তাকে 'মাইনাস' করতে উদ্যোগী হন।

    জীবনের এই দুই সঙ্কটময় মুহূর্তে শেখ হাসিনা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা লাভ করেছেন। তাই, শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর চাটুকারদের বিশ্বাস করলেও, শেখ হাসিনা সম্ভবতঃ তা করেন না। তবে, তিনি নিশ্চয় তাদেরকে ব্যবহার করতে জানেন। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয়, শেখ হাসিনার উপলব্ধি ও বিশ্বাস হচ্ছেঃ

    (১) শেখ মুজিবুর রহমানের বংশ ধ্বংস করার পেছেন মূল চাবি ছিলো জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতে। তাই, জিয়ার বংশ ধ্বংস করতে প্রয়োজনে শয়তানের সাথেও তাঁর ষ্ট্র্যাটেজিক ও টেকটিক্যাল মৈত্রী ন্যায়সঙ্গত।

    (২) সুদিনে মস্তকে তুলে বন্দনা করলেও, সঙ্কটকালে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান নয় আওয়ামী লীগ - যেটি তাঁর পিতাই একটি "চাটার দল" মনে করতেন এবং সেটি ভেঙ্গে দিয়ে বাকশাল তৈরি করেছিলেন।

    (৩) এদেশে ক্ষমতায় থাকাকালে নেতৃত্বের প্রতি নিবেদিত হয়ে লক্ষ-লক্ষ লোক নিজেদের জীবন-দানের ওয়াদা করলেও, ক্ষমতাচ্যুত হওয়া মাত্রই অবস্থা বুঝে সেই নেতৃত্বের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে তারা দ্বিধা করে না।

    (৪) খারাপ হোক, ভালো হোক, মুক্তিযোদ্ধা হোক আর রাজাকারই হোক, বৃহত্তর শেখ পরিবার ও আত্মীয়-কুটুম্বের বাইরে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নির্ভর করার মতো কোনো বন্ধু নেই।

    (৫) ভারতকে ডিঙ্গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান যেমন টিকতে পারেননি, শেখ হাসিনারও তেমনি টিকে থাকার কোনো 'চান্স' নেই।

    সুতরাং, পিতার চেয়েও অধিক বুদ্ধিসম্পন্না শেখ হাসিনার নীতি হচ্ছেঃ ভারতকে খুশী রেখে ও ত্রাণকর্তা মেনে, পরিবারের লোকজনদের ওপর নির্ভর করে, আওয়ামীলীগের লোকজনদেরকে সম্পদ আহরণ ও ক্ষমতাভোগের অগ্রাধিকার দিয়ে হাতের মুঠোয় রেখে এবং ডান-বাম নির্বিশেষ অনুগত অ-আওয়ামী শক্তিকে খানিকটা হিস্যা দিয়ে যতোদিন পারা যায় রাজত্ব করা।

    শেখ হাসিনা হয়তো মনে করেন, দেশপ্রেমের কোনো মূল্য বাঙালী জাতি দিতে জানে না। তিনি হয়তো আরও মনে করেন যে, এই জাতি একটি বিশ্বাসঘাতক জাতি। তাই তিনি হয়তো বিশ্বাস থেকেই বলেন, তাঁর চেয়ে বড়ো দেশপ্রেমিক আর কেউ নেই।

    শেখ হাসিনা যে উপরের মতো করে ভাবেনই, তা আমি বলছি না। উপরের কথাগুলো আমার ধারণা মাত্র, যাকে আমি বলছি "হাইপোথেসিস"। অনুসন্ধানীরা এই হাইপোথেসিসের সাথে শেখ হাসিনার নানা সময়ের কথা ও কর্মকে উপাত্ত বিবেচনা করে পর্যপবেক্ষণের মাধ্যমে মিলিয়ে দেখতে পারেন। পর্যবেক্ষণ একটি বৈধ ইম্পিরিক্যাল সায়িণ্টিফিক রিসার্চ মেথড বা অভিজ্ঞতাবাদী বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতি, যেখানে অনুসন্ধানের যাত্রা শুরু করতে হয় হাইপোথেসিস ফর্মুলেইট করে।

    শুক্রবার ২২ অগাষ্ট ২০১৪
    ধানমণ্ডি, ঢাকা, বাংলাদেশ
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন