• সংবিধান-বিতর্কের উচ্চ-কোলাহলে অশ্রুত সংখ্যালঘুর দীর্ঘশ্বাস
    সত্যব্রত দাস স্বপন

    সংবিধান, সংবিধান, সংবিধান! সারাদেশ জুড়ে চলছে তোলপাড়। কী থাকবে আর কী থাকবে না, কোর্ট কী বললেন, নেতা নেত্রীরা কী বললেন। তাই নিয়ে মহাব্যস্ত সবাই।

    নিজের আসন পাকাপোক্ত করার অস্ত্র এ-সংবিধান। আলোচনা, গোল-টেবিল বৈঠক, সভা-সমাবেশ, বর্জন, হরতাল সবই চলছে।

    একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাকে যদি কেউ দয়া করে জিজ্ঞেস করে, আমি কী মনে করি। আমি কিন্তু কোনো কিছু না ভেবেই বলে দিতে পারি, আমার কিছু যায় আসে না - আগের কিংবা পরের, সংশোধিত অথবা অসংশোধিত।

    না, আমার কিছু যায় আসে না। এ-জিনিষ যাদের কাজে লাগে, তারাই এ-নিয়ে ব্যস্ত হবেন। যারা আমাকে চিনেন-জানেন, তারা বলবেন,  ‘এই ব্যাটা বলে কী? এতো বড়ো একটা বিষয়, যা নিয়ে সারা দেশের বড়ো-বড়ো সব মানুষের ঘুম-খাওয়া হারাম, আর সে বলে কিনা কিছু যায় আসে না’। কেউ-কেউ অতি উৎসাহে বলেও ফেলতে পারেন, ‘ও পঁচেছে’। অনেকেই ভাববেন, ‘নিশ্চয়ই এর ভ্রম হয়েছে’। তার হয়তো আমাকে এর উপকারিতা-অপকারিতা বিষয়ে ভাষণ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করবেন।

    যার যা ভাবার ভাবতেই পারেন। তবে আমি সবাইকেই বলবোঃ আসুন আমার সীটে বসুন। আমার জায়গা থেকে বুঝবার চেষ্টা করুন। ঠিকই বুঝবেন।

    কেনো এ-সংবিধান? কী হয় এ-সংবিধান দিয়ে? এ-সংবিধান কি পারে একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক থেকে উন্নীত করতে প্রথম শ্রেণীতে?

    সবাই আমাকে ঝাপটে ধরবেন একথা শুনেই। বলবেন, ‘বলে কি’?  আমি বলবোঃ ইয়েস স্যার, ওদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলেই মনে করা হয়। সংবিধানে মনে করা হয়! যাকে বলা যায় সর্ষের মধ্যে ভূত। এই সে-সংবিধান যা আরম্ভ করতে হয় ‘বিসমিল্লাহ’ বলে, আর যেখানে বলা আছে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম।

    এহেন ‘পবিত্র সংবিধান’ সংখ্যালঘু সম্প্রাদায়ের মানুষ (যারা মুসলমান নন) পাঠ করবেন কীভাবে? কেউ একজন হয়তো বলে উঠবেন, 'ঢং দেখে আর বাঁচি না’। সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের মতো লোক বলতে পারেন, ‘আরে তুমি কোথাকার হে বাপু?'  তিনি বলতেই পারেন, কারণ তিনি মন্ত্রী- এমপি হবেন।

    কিন্তু আমি? বাংলাদেশের অজপাড়াগায়ে বড় হয়ে উঠা সাধারণ হিন্দু কৃষক পরিবারের একজন? যে সৎসঙ্গগুণে বুঝতে পেরেছিলো 'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই', যে সেকুলার হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলো, কমিউনিস্টদের সাথে পথ হাঁটতে-হাঁটতে বুঝতে পেরেছিলো মানুষের (নিজেরও) মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তার বেলায়?

    এ-সংবিধান-সংবিধান খেলা সেই আমাকেও মনে করিয়ে দিচ্ছে, কোনও এক নাটকের সেই পাখীটির 'তুই রাজাকার, তুই রাজাকার' উচ্চারণের মতো 'তুই হিন্দু, তুই সংখ্যালঘু'।

    আমি ধর্ম মানি কি না, পালন করি কি না, সেটা এখানে বিষয় নয়। আমার পারিবারিক পরিচয়ের কারণে আমিও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজন। আমার কাছ থেকে উঠতেই পারে এ-প্রশ্নঃ এ-সংবিধান সংখ্যালঘুকে কী দিতে পেরেছে ১৯৭২ সাল থেকে আজ ২০১১ সাল অবধি?

    নিজদেশে পরবাসী এই সংখ্যালঘুরা। সরকার আসছে, সরকার যাচ্ছে, আর যে যার মতো করে সংবিধান ঠিক করে নিচ্ছে। যার যে অনুচ্ছেদ দরকার তা পাঠ করে শুনাচ্ছে অন্যদেরকে। আর, যখনি অসুবিধায় পড়ছে, তখনই চালাচ্ছে কাঁচি, হচ্ছে সংশোধনী।

    একথা বলার লোকের অভাব হবে না, যারা বলবেন ‘সংবিধান ছাড়া দেশ চলে চলতে পারে না, দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হয়ে যাবে’। কিন্তু বাস্তবে সংবিধান ছাড়াও দেশ চলে এবং চলছে। এই পার্লামেন্ট-পার্লামেন্ট খেলার হোতারাও কিন্তু সংবিধান ছাড়াই চলে।
     
    এ-সংবিধান কী দিয়েছে দেশের মানুষকে?  নিশ্চিত করতে পেরেছে কি তার কোন মৌলিক অধিকার?

    পারেনি। যে-সংবিধান মানুষকে মানুষ থেকে হিন্দু-মুসলমান, সংখ্যালঘু-সঙ্খ্যাগুরু বানায়, রাষ্ট্রের ধর্ম আর তার ধর্ম এক নয় বলে মাথা নীচু করে হাঁটতে বাধ্য করে, পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবার কারণে নির্যাতিত কিংবা ধর্ষিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে না, সে সংবিধান আমি চাই না।

    সংবিধান হবে সকল নাগরিকের রক্ষাকবচ। সংবিধান হবে সকল নাগরিকের জন্য। সে-সংবিধান সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে। নিশ্চিত করবে তার মৌলিক অধিকার। আর যদি না হয়, তাহলে আপনারা যা ইচ্ছে করুন। সংশোধন করুন, নতুন করে লিখুন আপনাদের ইচ্ছা মতো।

    সংখ্যাধিক্যের জোরে উচ্চ-কোলাহলে তৈরী হোক আপনাদের সংবিধান, আর অশ্রুত থাক আমাদের মতো সংখ্যলঘুর দীর্ঘশ্বাস।

    ১১ জুন ২০১১
    লন্ডন, ইংল্যান্ড

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

দাদা আপনার কথা আর লেখা দুটোতেই বেশ অনন্দ পাই। সাপ্লাই আরো বাড়বে বলে আশা রাখি।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন