• সম্রাট থেকে মন্ত্রী শাহজাহানঃ বাঙালী এখনও প্রজা
    মাসুদ রানা

    আজকের বাংলাদেশ এক সময় মুঘল সাম্রাজ্য হিন্দুস্তানের অংশ ছিলো। চতুর্থ মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে বাংলার রাজধানী ঢাকার নামকরণ করা হয়েছিলো জাহাঙ্গীরনগর। সেই জাহাঙ্গীরের পুত্র ছিলেন শাহজাদা খুর্‌রম। সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর শাহজাদা খুররম হিন্দুস্তানের বাদ্‌শাহ হয়ে নিজেকে সারা পৃথিবীর রাজা মনে করেছিলেন। ফার্সিতে নিজের নাম রেখেছিলেন ‘শাহজাহান’ - অর্থাৎ জাহান বা পৃথিবীর বাদ্‌শাহ।

    তিনি তাঁর বিগত পত্নী আঞ্জুমান বানুর স্মৃতিতে ‘বেহেশ্‌ত’ কল্পনায় গড়িয়েছিলেন অনুপম সমাধি-সৌধ তাজমহল। কথিত আছে, যে-স্থাপত্যশিল্পীরা তাজমহল গড়েছিলেন, তাঁদের সবার হাতের কব্জি কেটে নিয়েছিলেন সম্রাট শাহজাহান, যাতে তাঁরা অনুরূপ দ্বিতীয় সৌধ গড়তে না পারেন।

    সেই সম্রাট শাহজাহান নিজ-পুত্র সম্রাট আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দী হয়ে আগ্রার দূর্গের এক নিভৃত প্রকোষ্ঠ থেকে যমুনার জলে প্রতিবিম্বিত তাজমহলের ছবি দেখে-দেখে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব পিতা শাহ্‌জাহানকে মৃত্যুর পর তাজমহলে আঞ্জুমান বানু ওরফে মমতাজ মহলের কবরের পাশে সমাহিত করেন।

    বর্তমানে সেই সমাধিস্থলে দাঁড়িয়ে এক খেদমতগার পর্যটকদের কাছে অর্থ ভিক্ষা করেন। ১৯৮৫ সালের গ্রীষ্মে এক বাঙালী পর্যটক তাঁকে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপ কিউ ভিক্‌ মাঙ্গতা হ্যায়?’ উত্তরে খেদমতগার বললেন, ‘বাদশাহ্‌ শাহজাহাঁকে লিয়ে’।

    শাহজাহানেরা যখন সম্রাট ছিলেন, তখন জনগণ ছিলেন প্রজা। শাহজাহানদের সামনে যেতে হলে প্রজা সাধারণকে মাটিতে লম্বা হয়ে শুয়ে 'সিজদাহ্' করতে হতো। তা নাহলে, তাঁদের কঠিন শাস্তি পেতে হতো। কখনও-কখনও ওঁদের জীবনও যেতো। সেই শাস্তির অংশ হিসেবে সম্ভবতঃ চোখও উপড়ে ফেলা হতো। সে-সময় তাঁরা বা তাঁদের উজির-নাজিরেরা হয়তো বলতেনঃ ‘হারামযাদো, বাদশাহ্‌সে ক্যায়েসে বাত্‌ কার্‌না হ্যায় তু জানতা নেহি? তেরি আঁখ উখার-লেঙ্গে।’

    মুঘল বংশোদ্ভূত হতে পারেন আবার নাও হতে পারেন, খানসেনাদের আত্মীয় হতে পারেন আবার নাও হতে পারে, কিন্তু নিশ্চিত সম্রাট শাহজাহানের নামধারী এক খান, আওয়ামী মন্ত্রীত্বের বলে বলীয়ান হয়ে সম্প্রতি প্রতিপক্ষ বিএনপির এক প্রাক্তন মন্ত্রীকে বলেছেন, ‘হারামজাদা তুমি জানো না একজন মন্ত্রীর সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়? তোমাকে আজ জুতাপেটা করবো।’ তিনি বলেছেন, ‘তোমার চোখ তুলে ফেলবো।’

    ঘটনাটি ঘটেছে প্রকাশ্যে, গত সোমবারে বাংলাদেশের তথাকথিত একটি টিভি-টকশো ‘আওয়ার ডেমোক্র্যাসি’তে। গোটা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে এই ‘শো’। সাধারণ জনগণ ভয়ে শিউরে উঠেছেন এই ভেবেঃ বর্তমান মন্ত্রী যদি প্রাক্তন মন্ত্রীকে জুতোপেটা করতে ও চোখ উপড়ে ফেলতে সক্ষম হন, তাহলে আমাদের মতো আমজনতার কী হবে?

    কথানুষ্ঠান ‘আওয়ার ডেমোক্র্যাসি’ অর্থাৎ ‘আমাদের গণতন্ত্র’ দেখিয়ে দিলো ক্ষমতাসীনদের আস্ফালন কতো। সে-দিক থেকে অনুষ্ঠানটি সার্থক, যদিও সঞ্চালক রোবায়েত ফেরদৌস অহেতুক জনগণকে প্রকৃত চিত্র দেখা থেকে বঞ্চিত করতে চেয়ে বারবার প্রচার ‘স্টপ’ করার নির্দেশ দিচ্ছিলেন। মানুষকে সাজানো চিত্র দেখাতে চেয়েছিলেন ফেরদৌস। কিন্তু ‘ডেমোক্র্যাসি’র বরপুত্রগণ স্বরূপে স্বৈরাচারে আবির্ভূত হয়েছেন।

    হুমকিপ্রাপ্ত প্রাক্তন মন্ত্রীটি পেশায় আইনজীবী - ব্যারিস্টার। তিনি নিশ্চয়ই ইংল্যাণ্ডে লেখাপড়া করেই তবে ব্যারিস্টার হয়েছিলেন। পশ্চিমী অর্থে সুশীল ও সুসভ্য প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ পেয়েই তিনি ব্যারিস্টার হয়ে থাকবেন। কিন্তু হায়, তিনি হয়তো ভুলে গিয়ে থাকবেন যে, ইংল্যাণ্ডের সুশীল সমাজেতো বটেই, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই ভব্যতা মানা হয় যে, একজন যখন কথা বলেন, তখন তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এমনকি সে-কথা যদি কোনো অভিযোগাত্মকও হয়।

    ভব্যতা-বিস্মৃত কিংবা ভব্যতা-বর্জিত ব্যারিস্টার ও প্রাক্তন বিএনপি-মন্ত্রী বর্তমান আওয়ামী মন্ত্রীকে তাঁর কথা শেষ করতে দিচ্ছিলেন না। ফলে, বর্তমান মন্ত্রী বলতে বাধ্য হলেন ‘আপনি চুপ করুন। আমার কথা বলা শেষ হবার পর আপনি বলবেন’।

    তাও থামলেন না প্রাক্তন মন্ত্রী। হয়তো ভাবলেনঃ ‘তুমি মন্ত্রী হয়েছো বটে, কিন্তু তোমার আগে আমিও ছিলাম যে!’ দুর্বল ব্যক্তিত্বের অনুষ্ঠান-সঞ্চালক বিএনপির প্রাক্তন মন্ত্রীকে নিরস্ত করতে পারেননি। প্রাক্তন মন্ত্রী বলেই চললেন, আর তাতেই ক্ষেপে উঠলেন বর্তমান মন্ত্রী।

    মানুষ রাগতে পারে। ক্ষেপতে পারে। কিন্তু এর প্রকাশটা কেমন হবে, তা নির্ভর করে তাঁর সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের উপর। আওয়ামী মন্ত্রী তাঁর রুচি-সংস্কৃতি-মূল্যবোধের প্রয়োগ ঘটিয়ে সভ্যতা-ভব্যতা-শালীনতার সমস্ত বন্ধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এলেন আদিম রূপে এবং অবলীলায় ঘোষণা করলেন জুতোপেটা ও চোখ তুলে ফেলার সংকল্প। তাঁর এই আচারণ বহুকাল বাঙালী জাতিকে লজ্জিত করে রাখবে।

    নিরপেক্ষ বিচারে, প্রাক্তন মন্ত্রী ও বর্তমান মন্ত্রী মধ্যে মূল্যবোধের পার্থক্য সামান্যই। দুজনেই অসহিষ্ণু ও স্বৈরতান্ত্রিক। দু’জনের মধ্যে পার্থক্য কেবল ক্ষমতায় থাকা আর না-থাকার এবং এর অনিবার্য প্রকাশের। বর্তমান মন্ত্রীর ‘জুতোপেটা’ ও ‘চোখ তুলে ফেলার’  ক্ষমতা আছে বলেই তার প্রকাশ পেয়েছে; আর প্রাক্তন মন্ত্রীর সেই ক্ষমতা নেই বলে হয়তো তিনি তার প্রকাশ ঘটাতে পারেননি। সাধারণভাবে বলা যায়, এ-হচ্ছে বাঙালীর রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

    বাঙালীর রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি-মানুষ মূল্যহীন। বাংলাদেশে গণতন্ত্রিক অধিকারের একবার গণ-অভ্যূত্থান হয়েছে ১৯৬৯ সালে, তারপর আবার ১৯৯০ সালে। প্রথম গণ-অভ্যূত্থানের রেশ ধরে হয়েছিলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এর মাঝে হয়েছে অনেক আন্দোলন ও সংগ্রাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমাজে ব্যক্তি-মানুষের মুক্তি ঘটেনি।

    যখনই ব্যক্তি-মানুষ নিষ্পেষিত হয়েছে, তখনই সে এর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে যে-আদর্শবাদের শরাণাপন্ন হয়েছে, সেই আদর্শবাদ কখনও ধর্মের নামে, কখনও জাতির নামে, কখনও শ্রেণীর নামে তাঁর স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নটিকে গৌণ করে দিয়েছে। আদর্শবাদ ব্যক্তি-মানুষকে সমষ্টির কাছে সমর্পণ করতে নির্দেশ দিয়েছে। কেবলই ত্যাগের কথা, আত্মোৎসর্গের কথা ও আত্মসমর্পণের কথা বলেছে সমষ্টির সমীপে। কিন্তু সেই সমষ্টি সবসময়ই শাসিত হয়ে এসেছে আদর্শের প্রতিভূরূপে উত্থিত ব্যক্তির দ্বারা। সুতরাং ব্যক্তি সমর্পিত সমষ্টিতে, আর সমষ্টি শাসিত আদর্শের প্রতিভূতে।

    যতো আদর্শবাদী রাজনীতির কথাই বলা হোক না কেনো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি-মানুষ তুচ্ছ। আদর্শের প্রতিভূ ও তার প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধাচারণ করা মাত্রই যে-কোনো ব্যক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। এতে ডান-বাম-ঊর্ধ্ব-অধঃর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ, সবারই রয়েছে স্ব-স্ব আদর্শ এবং সবার কাছেই সেই আদর্শই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং এ-বিষয়ে কোনো আপোস নেই।

    বাংলাদেশের রাজনীতিতে যতোক্ষণ ব্যক্তি-মানুষের ফ্রীডম (স্বাধীনতা), ডিগনিটি (মর্যাদা) ও রাইট্‌স (অধিকার) নিশ্চিত করে নাগরিকের ধারণা না তৈরী হবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত দেশের মানুষ নৈর্ব্যক্তিক প্রকরণ হয়ে আদর্শ ও আদর্শের প্রতিভূ এবং তস্য প্রতিনিধিদের কাছে তুচ্ছ বিবেচিত হবেন।

    তাই, বাঙালীর উচিত হবে ব্যক্তি-মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকারের উপর আলোকপাত করা রাজনীতির জন্ম দেয়া। বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে একটি রিপাবলিক অর্থাৎ জনতন্ত্র হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করতে হবে।

    বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রটি একটি প্রজাতন্ত্র, যেখানে দেশের মানুষ প্রজা। ইতিহাসে ‘প্রজা’ হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক প্রকরণ, যার অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজন বিপরীত প্রকরণ ‘রাজা’র।

    রাজার অস্তিত্ব ছাড়া প্রজা হয় না। আরও সহজভাবে বলতে গেলে, সামন্ততন্ত্র বা সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক সম্পর্ক বা সংস্কৃতি ছাড়া ‘প্রজা’র অস্তিত্ব সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে প্রজা এলো তবে কোত্থেকে? এ-প্রশ্নের মীমাংসা প্রয়োজন।

    রোববার, ২৮ অক্টোবর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন