• সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ নয়ঃ নিজস্ব শক্তি-সম্পদের উপর ভর করাটাই মূখ্য
    মেহেদী হাসান

    ‘সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে’ ধারণাটি ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’র প্রবক্তা এবং নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গীর কেন্দ্রীয় বিষয়। এ-ধারার ব্যাখ্যা হলো, বৈশ্বিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিধি-ব্যবস্থা কার্যকর হলে গ্রহীতা দেশ বিদেশী বিনিয়োগের সুফল পেতে শুরু করবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে।

    আপাতদৃষ্টিতে, বিস্তৃত প্রচারণার চাপে এবং বৈদেশিক পুঁজি সংক্রান্ত মোহগ্রস্থতার কারণে বিষয়টিকে সরলভাবে দেখার প্রবণতা বাংলাদেশের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজে প্রচলিত। এমনকি অর্থনৈতিক নিয়ম-কানুনের ব্যাকরণবিদ নন এমন সাধারণ মানুষটিও এ-সরলীকরণ দ্বারা আচ্ছন্ন। এবং যুক্তিগুলো অনেকটা বিশ্বাসের জায়গা দখল করেছে। বিশ্বাস সংক্রান্ত জটিলতা এড়িয়ে কিছু সাধারণ প্রশ্ন যদি উত্থাপন করা যায় নিম্নলিখিতভাবে।

    বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিধি-ব্যবস্থাগুলো কি বিশ্বের সর্বত্র একই রকম? সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ কি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতার বিকাশ ঘটায়? দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ এর ফলে ত্বরান্বিত হয়? দেশীয় সঞ্চয়ের উৎপাদনশীল ব্যবহার কি এতে নিশ্চিত হয়? সরকারী নিয়মনীতি-শৃঙ্খলার কি কোন উন্নয়ন ঘটে? দেশীয় বাজার ব্যবস্থায় ‘সুশৃঙ্খলা’ কি বজায় থাকে? তথাকথিত সুশাসন নিশ্চিত হয়েছে? নিশ্চিত কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে?

    উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে যে-সব রাষ্ট্রকে আমরা জানি, তারা কি তাদের সর্বত্রে বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে? সরাসরি বৃহৎ বিদেশী বিনিয়োগের ফলাফল সর্বদা কাদের পেটে যায়?

    সর্বোপরি, সম্পদ, পুঁজির উপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ এবং কর্তৃত্ব নেই যে-সকল দেশে, সেখানে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ কী জনগণের জন্য সুফল বয়ে আনতে সক্ষম? মুক্ত বাজার অর্থনীতির যে-তত্ত্ব আমরা দেশী-বিদেশী ক্ষমতাবানদের মুখ থেকে শুনতে পাই, তা কি আসলেই সবার জন্য উন্মুক্ত?

    এসব প্রশ্নকে মোকাবেলা না করে কেবল ‘বিদেশী বিনিয়োগই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা’ বলার অর্থ হলো জনগণের সম্পদ-জীবন-মানকে বহুজাতিক পুঁজির খপ্পরের মধ্যে ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। যে কাজটি আমরা বরাবরই হতে দেখে এসেছি।

    ‘মুক্ত’ বাজার অর্থনীতির কাঠামোয় রাষ্ট্রীয় হস্তপেক্ষ বিষয়ে দু-ধরণের মত দেখা যায়। ‘নিউ লিবারেল’ ধারা মতে, পুঁজির বাধা-বিঘ্নহীন মুক্ত প্রবাহ বিনিয়োগকারী এবং বিনিয়োজিত দেশ উভয়ের জন্যই অর্থনেতিক সুফল বয়ে আনে। পুঁজির বাধা-বিঘ্নহীন মুক্ত প্রবাহ মানে, সরকারী হস্তপেমুক্ত আর্থিক খাত এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রবাহ নিশ্চিত করা। একচেটিয়া পুঁজি কিংবা বৃহৎ ব্যবসায়িক সংস্থার পূর্ণ স্বাধীনতা, কর্তৃত্ব থাকা। এক্ষেত্রে সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো পুঁজি-প্রতিষ্ঠানের সেবায় নিয়োজিত থাকা। তাদের যুক্তি হলো, সরকারি হস্তপে বাজারে ‘বিকৃতি’, ‘বিশৃঙ্খলা’র সৃষ্টি করে। যদি সরকারী নিয়ন্ত্রণ না থাকে তাহলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাজারে সর্বদা একটি স্থিতিশীল অবস্থা বজায় থাকবে; সঞ্চয়ের উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত হবে; উচ্চমাত্রার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে; সরকারী নিয়মনীতি-শৃঙ্খলার উন্নয়ন ঘটবে, সুশাসন কায়েম হবে; ঝুঁকিপূর্ণ মূলধনের বহুমাত্রিকীকরণ ঘটানো সম্ভব হবে, সঞ্চয় বাড়বে, প্রযুক্তির বিকাশ সম্ভব হবে, ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ তৈরী হবে; ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ সবর্ত্রই শান্তি-শান্তি একটি ভাব বজায় থাকবে। অন্য যে-মতটি রয়েছে, সেটি ৩০ দশকের মহামন্দার পরে বিকশিত হয়। সে-মতে, বাজার অর্থনীতি ব্যবস্থার সুফল পেতে হলে কিংবা বাজার ব্যবস্থাকে যদি বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রের হস্তপেক্ষ প্রয়োজন আছে। বাজারকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। বাজারের হাতে সবকিছু ছেড়ে দিলে চলবে না। তাতে দেখা যাবে যে, সর্বত্রই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা বজায় থাকবে।

    ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ আসলেই কি মুক্ত?
    অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ‘মুক্ত’ বলে যে-বাজার ব্যবস্থার কথা আমরা শুনে থাকি, তা কোনো-কালেই মুক্ত ছিলো না। সর্বদাই তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিলো। বলাই বাহুল্য, এ-নিয়ন্ত্রণ সর্বদাই বজায় থেকেছে গুটিকয়েক বহুজাতিক কর্পোরেশনের হাতে। এছাড়া এক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, পৃথিবীর তাবৎ দেশ একই মডেল ধরে চলেনি। যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের মতো আধিপত্যকারী দেশগুলো যে-ধারাতে চলে, বলাই বাহুল্য, বাংলাদেশের অর্থনীতি সে-ধারায় চলেনি কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, চলতে দেওয়া হয়নি। আবার আফ্রিকার মতো দেশগুলো যে-ধারাতে চলে; ‘এক্সিস অব হৌপ’ বা ‘এক্সিস অব গুড’ নামে পরিচিত দেশগুলোর (কিউবা, বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা) পথ সে-ক্ষেত্রে ভিন্ন। (বিশেষ করে যখন থেকে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে এ-দেশগুলো নতুন পথে যাত্রা শুরু করলো।)

    অন্যভাবে বলা যায়, যে-দেশ তার জনগণের সম্পদের উপর মালিকানা, কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পেরেছে, সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে-ধরণের সহযোগী ভূমিকা পালন করেছে, যাদের সে-নিয়ন্ত্রণ নেই তাদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা হয়েছে ঠিক বিপরীত। প্রযু্ক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি খাতের বিস্তৃতি, আমদানি-রপ্তানী ভারসাম্য রক্ষা, পণ্য ও সেবার মান উন্নয়ন কিংবা ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রথমোক্ত দেশ সুফল পেয়েছে কিন্তু দ্বিতীয়োক্ত ক্ষেত্রে, যাদের সে-মেরুদণ্ডটি নেই, সে-সব দেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ মূলতঃ লুণ্ঠণ প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করেছে। মোটকথা, বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশে বিদেশী বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে, তা তথ্য, উপাত্ত, পরিসংখ্যান দিয়ে প্রমাণ করা কঠিন। এছাড়া বিনিয়োগ কোনো-কোনো খাতে নিয়োজিত হচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি বিদেশী বিনিয়োগ প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের নামে আত্মসাতের সাথে জড়িত থাকে; বাংলাদেশ, আফ্রিকার মতো দেশগুলোতে যা হয়ে আসছে; তাহলে প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রবৃদ্ধি অর্জন, দতা বৃদ্ধি বিষয়ক বক্তব্য অতিকথন হিসেবেই পরিগণিত হয়। অর্থাৎ কী শর্তে বিদেশী বিনিয়োগ হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করছে বিনিয়োগকৃত দেশ এর সুফল ভোগ করবে না কুফল ভোগ করবে। ‘উন্নয়ন’ সম্পর্কিত শাসকশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গী এক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য। এ-বিবেচনায় বাংলাদেশের বিদেশী বিনিয়োগের যে-ধরণ ভেনিজুয়েলা কিংবা কিউবা কিংবা বলিভিয়ার মতো ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর ধরণ, ফলাফল যে এক হবে না, এটি বলাই বাহুল্য।

    মার্কিন কিংবা ভারত -  ফলাফল ভিন্ন কিছু নয়
    বাংলাদেশে ফলাফল নেতিবাচক হওয়া সত্ত্বেও বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা কিংবা বিদেশী পুঁজির জন্য ত্রেক্ষ প্রস্তুত করা কিংবা আন্তর্জাতিক পুঁজির আধিপত্য বজায় রাখার তৎপরতা স্বাধীনতাত্তোর সকল সরকারের আমলেই দেখা গেছে। এ-প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় আশির দশকের শেষ এবং নব্বই দশকের শুরু থেকে। পরবর্তী সরকারগুলো সে-পথেই হেঁটেছে। এর ফলাফল যে ইতিবাচক হয়েছে তার কোন প্রমাণ নেই। বরং তার বিপরীতে, জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস সাধন ত্বরান্বিত হয়েছে। দেশীয় উৎপাদন বিনষ্ট হয়েছে। দেশীয় শিল্পের পায়ের তলায় এখন মাটি নেই। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে লুণ্ঠনধর্মী বহুজাতিক পুঁজির বিনিয়োগ ধ্বংসাত্মক ফলাফল বয়ে আনা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বহাল তবিয়তে টিকে আছে। বাণিজ্যযোগ্য নয় এমন অনেক ধরণের খাত বহুজাতিক পুঁজির দখলে। যেমনঃ খনিজ সম্পদ, টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি ও শক্তি, পানি ইত্যাদি। খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে অবস্থাটা দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ। এ-সম্পদ আহরণের জন্য বিনিয়োজিত পুঁজি পরিবেশ-প্রতিবেশগত বিপর্যয় ডেকে এনেছে, স্থানীয় আদিবাসীদের বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করেছে, সামাজিক ও অন্যান্য ক্ষতি বাদ দিলেও বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিসাধন করেছে। এছাড়া, এ-খাতগুলো থেকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিভিন্ন কায়দায় দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে। যার ফল দাঁড়াচ্ছে, বিনিময় ভারসাম্য-জনিত সমস্যা। এসব সমস্যা সেখানেই জটিল আকার ধারণ করেছে যে, সব দেশ একই সাথে রাষ্ট্রীয়/দেশীয় শিল্প-বিনিয়োগ-ভিত্তি ধ্বংস সাধন করেছে অন্যদিকে বিদেশী পুঁজির অনুপ্রবেশের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছে।

    বাংলাদেশে সে-প্রক্রিয়া জারী আছে নানাভাবে। বিভিন্ন সরকারের অভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে। প্রসঙ্গতঃ ভারতের বিনিয়োগ বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। ভারতীয় উদ্যোক্তারা তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো, জ্বালানী, চিকিৎসা এবং শিক্ষাখাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগে বিশেষভাবে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফর করেন গত বছর জানুয়ারী মাসে। সে-সময় ভারতীয় উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ-সহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের জন্য তিনি আমন্ত্রণ জানান। প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ, রেলওয়ে, জ্বালানী ও অবকাঠামো খাত ছাড়াও রপ্তানী প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এসইজেড) ভারতীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আগ্রহী করতে নানা ধরণের সুযোগ-সুবিধার আশ্বাসও প্রদান করেন। কারণ কী? কারণ হলোঃ বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের অন্যতম অনুকূল দেশ। বিদেশী বিনিয়োগের জন্য রয়েছে উদার বিনিয়োগ এবং শিল্পনীতি। তুলনামূলক সস্তা শ্রম, বিনিয়োগের কোন সীমারেখা নেই, কর অবকাশ, শুল্কমুক্ত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ, মুনাফা স্তানান্তরের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার প্রয়োজনে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, দেশীয় শিল্প উদ্যোক্তারা দেশে বিনিয়োগের জন্য সরকারের তরফ থেকে যতখানি প্রতিকূল পরিবেশ কিংবা বৈরীতার সম্মুখীন হয় ঠিক ততটাই কিংবা তার চাইতেও বেশি সুবিধা বা পৃষ্ঠপোষকতা পায় বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ধ্বংসযজ্ঞ সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণ আদায় কিংবা শাস্তিদানের বিপরীতে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

    ভারত যে এ-প্রথম এদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী কিংবা বিনিয়োগ করছে, তা নয়। দীর্ঘসময় ধরেই তা করছে। ঘর থেকে শুরু করে রাস্তায়, সেবা-পরিষেবা খাত থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা, সংস্কৃতি সব জায়গাতেই ভারতীয় পুঁজির উপস্থিতি চোখে পড়ে। বৃহৎ পুঁজি, উন্নত প্রযুক্তি ইত্যাদির কারণে যে-সমস্ত ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিষ্ঠান আধিপত্য করতে পারছে, সে-সমস্ত ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির নিয়মেই। বড়ো পুঁজি ছোটো পুঁজিকে গিলে খেয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র যেখানে এ-অবস্থা পাল্টে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড়ো ভূমিকা পালন করতে পারতো, সেখানে সে-যন্ত্রটির দৃষ্টিভঙ্গীতে ‘উদারতা’র ভাব অন্য রাষ্ট্রের চাইতে বেশি। ফলে, খেসারত কিংবা কুফলের ভাগীদার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। বাংলাদেশের মূলধনী যন্ত্রপাতি কিংবা ভারী শিল্প ভিত্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে কিংবা শিল্প ভিত্তি তৈরী না হলে ভারতীয় যানবাহন কিংবা যন্ত্রপাতি এখানকার বাজার দখল করবে, তা-ই স্বাভাবিক। সরকারী হাসপাতালের পরিবর্তে এ্যাপোলোর শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে। বিদ্যুৎ যেখানে একটি কৌশলগত পণ্য সেখানে বিদ্যুতের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশনের (এনটিপিসি) মতো প্রতিষ্ঠানের। বাংলাদেশের জামদানীর অধিকার-স্বত্ত্ব করতলগত হবে ভারতের। শেয়ার বাজার থেকে কোটি-কোটি টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা দেখা দেবে মাঝে-মধ্যে। অর্থাৎ দেশীয় বাজারের উপর আধিপত্য-নিয়ন্ত্রণ থাকবে ভারতীয় পুঁজির। তাই বলে সবসময় ঘটনাগুলো মসৃণ পথে এগোচ্ছে, তা কিন্তু নয়। এর বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি হয়। প্রতিরোধ তৈরী হয়। যেমনঃ দেশীয় স্টীল মিল ধ্বংস করে ভারতীয় বৃহৎ পুঁজির প্রতিষ্ঠান টাটা’র স্টীল মিল করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে জনমত তৈরী হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ করতে পারেনি।

    টাটা বিনিয়োগ করতে না পারলেও প্রচেষ্টা তারা অব্যাহত রেখেছে। যেমন রয়েছে কনোকো ফিলিপসের মতো বিদেশী তেল কোম্পানীর প্রচেষ্টা। সম্প্রতি সাগরের গ্যাস ব্লক ইজারা নেওয়ার জন্য উৎপাদন অংশিদারীত্ব চুক্তির (পিএসসি) আওতায় শতভাগ রপ্তানির উদ্দেশ্যে তাদের নানা ধরণের কর্মকাণ্ড। মার্কিন দূতাবাস সক্রিয়। সক্রিয় জ্বালানী মন্ত্রণালয়। দেশে বুদ্ধিজীবী নামের বহুজাতিক কোম্পানীর কর্মচারীরাও বেশ তৎপর। সর্বোপরি দেশের গ্যাস ব্লক কনোকো ফিলিপস, টাল্লোর মতো বিদেশী কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য সরকারের দায় বিগত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের প্রচেষ্টাকেও হার মানিয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক নীতি বিশেষ করে জনগণের সম্পদ বহুজাতিক পুঁজির হাতে সমপর্ণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শাসকদের ঐক্য স্বাধীনতার পর থেকে আমরা বরাবরই দেখেছি। বাহ্যিক কিছু অমিল সত্ত্বেও মতাসীন দল এবং ক্ষমতাবহির্ভূত বিরোধী দলের মধ্যে মূলতঃ নীতিগত এ-দিকটিই প্রধান।

    পূঁজি-প্রযুক্তির অভাব?
    অন্যদিকে, যে-যুক্তিবলে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার নানান ধরণের মহড়া চলে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, পুঁজি এবং প্রযুক্তির অভাব। এমনভাবে বিষয়গুলোকে জনগণের সামনে হাজির করানো হয়, যেনো পুঁজি-প্রযুক্তি সমাজ-উৎপাদন বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা। যেনো এগুলো জগতে তৈরী হয় না। কেবলমাত্র সাত সমুদ্র তের নদীর ওপার থেকেই আসতে হয়। সুতরাং সমাধানের রাস্তা একটাই। বিদেশী পুঁজি এবং প্রযুক্তি। এ-ছাড়া, আর কোনো গত্যন্তর নেই! এ ধরণের বক্তব্যের ভিড়ে আসল বক্তব্যগুলো হাজিরই হয় না যে, যে সমস্ত দেশ থেকে পুঁজি কিংবা প্রযুক্তির আহ্বান করা হচ্ছে, সে-সব দেশ এসবে সমৃদ্ধ হয়েই জন্ম নেয়নি। পুঁজি, প্রযুক্তিগত-প্রাতিষ্ঠানিক দতা তৈরী করতে হয়েছে। এভাবে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারা বর্তমান জায়গাটিতে এসে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্র পথ দেখিয়েছে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন উদ্যোগকে। ‘আমাদের নেই’ তাই ‘আমরা পারবো না’ ধরণের হীনমন্যবোধকে ঝেড়ে উদ্যোগ নিতে হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সে প্রচেষ্টাগুলো দেখা যায় না শাসকদের শ্রেণীগত চরিত্র দুর্বলতার কারণে। অথচ, এখানকার শক্তি-সম্পদের উপর ভর করে, সে-জায়গাটি তৈরী করা যেতো। প্রবাসী বাংলাদেশীদের শ্রম-ঘামে অর্জিত অর্থ আছে (প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা), সঞ্চয়-তহবিল আছে, বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়যোগ্য অর্থ আছে (অক্সিডেন্টাল এবং নাইকোর কাছ থেকে মাগুরছড়া এবং টেংরাটিলার গ্যাস বিস্ফোরণের কারণে বর্তমান বাজার মূল্যে আমরা পাই ৩৫-৪০ হাজার কোটি টাকা) এবং আদায়যোগ্য চোরাই কিংবা খেলাপী ঋণের অর্থ (পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) আছে। সুতরাং, পুঁজির অভাবের কারণে বিদেশী পুঁজিকে আকৃষ্ট করার কোনো নির্ভরযোগ্য কারণ নেই। আর, কেবলমাত্র বিদেশী বিনিয়োগের উপর নির্ভর করে কোনো দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, এমন কোনো নজির বিশ্বের কোথাও নেই।

    ল্যাটিন আমেরিকার কোনো-কোনো দেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা লুণ্ঠনধর্মী বিদেশী বিনিয়োগকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। উদার হওয়ার পরিবর্তে নিজস্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তর বিবেচনায় রেখে বৈদেশিক বিনিয়োগকে কোনো-না-কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে এসেছে। অর্থনীতিতে দৃঢ় ভিত্তি তৈরী করতে পেরেছে। অন্যদিকে, সম্পদ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও লুটপাটকারী ক্ষমতাবান শাসকগোষ্ঠীর কারণে বাংলাদেশ সে-শক্তিটি এখন পর্যন্ত অর্জন করতে পারেনি। আন্তর্জাতিক পুঁজি-প্রতিষ্ঠান-রাষ্ট্রের অনুগত কমিশনভোগী শাসকদের কাছ থেকে সে-ধরণের প্রচেষ্টা আশা করা অবশ্য তাই বোকার স্বর্গে বসবাসের শামিল।

    মোদ্দাকথা, এখন সেসব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিপর্যস্ত যেসব দেশের শাসকগোষ্ঠী জনগণের সম্পদ কমিশনের বিনিময়ে বহুজাতিক কর্পোরেশনের হাতে তুলে দিয়েছে; সম্পদের উপর জনগণের মালিকানা-কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ নেই। আর তার বিপরীতে তুলনামুলকভাবে নিরাপদ আছে সেসব দেশ যারা  যুক্তরাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক পুঁজির থাবার নিচে নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত হতে দেয়নি। প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের উন্নয়ন দর্শন এবং নিজেদের মাথা মুক্ত করে জনগণের শক্তি ও সম্পদের উপর ভিত্তি করে নতুন পথ অনুসন্ধান ও নির্মাণ করছে। আমাদের সম্পদ-মান-মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার পথ তাই-ই। এর অন্য কোন বিকল্প নেই।  

    ১২ জুন ২০১১
    mehedihassan1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

বড় লেখায় তথ্য উপাত্ত থাকলে পড়তে ভালো লাগে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন