• সাভারকাণ্ডে হরতালঃ ঘোষণা ও প্রত্যাহার (১)
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশ বার-বার দেখে, দরিদ্র শ্রমজীবী শ্রেণীর উপর ধনিক-বণিক-মালিক শ্রেণীর শোষণ-বঞ্চনা-নিপীড়নের তীব্র প্রকাশ ঘটিয়ে, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের গণহারে প্রাণহানি হলে, একমাত্র শ্রমিকেরাই রাস্তায় নেমে তাঁদের সহজাত শত্রু-শ্রেণীর বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই করে। কিন্তু তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক দল নেই বলে, এ-লড়াই সংগঠিত রূপে স্থায়ী হয় না।

    সর্বশেষ, গত ২৪শে এপ্রিল সাভারে অবৈধ-স্থাপত্য রানা-প্লাজা বিধ্বস্তির পরিণতিতে শ্রমজীবী শ্রেণীর বেশুমার প্রাণহানি লক্ষ্য করে, সাভার থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে, প্রধানতঃ পোশাক শ্রমিকেরা স্বতঃস্ফূর্ত ও অসংগঠিত শ্রেণীযুদ্ধের মহড়া দেন। নিঃস্ব ও নিরস্ত্র শ্রমিকদের হাতে প্রাগৈতিহাসিক হাতিয়ার প্রস্তরখণ্ড ছাড়া আর কিছু ছিলো না বলে, মালিক শ্রেণীর স্থাপনাসমূহের দিকে পাথুরে মিসাইল ছুঁড়েই তাঁরা তাঁদের ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

    লক্ষ্যণীয়, এবারের স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক-বিক্ষোভের মধ্যেও রয়েছে একটি সচেতনতা, যা প্রকাশিত হয়েছে পোশাক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে পোশাক-শিল্পপতিদের কেন্দ্রীয় সংস্থা বিজেএমইএ ভবনের উপর হামলার ঘটনায়। অর্থাৎ, শ্রমিকেরা বুঝতে পারছেন যে, তাঁদের শোষণ ও বঞ্চনার বিষয়টি ধনিক-বণিক-মালিক শ্রেণীর একটি সমন্বিত প্রয়াসের অংশ। তাই, এর বিরুদ্ধে শ্রমিকদেরকেও সমন্বিত প্রয়াসে রুখে দাঁড়াতে হবে।

    বিষয়টি অপ্রত্যক্ষিত যায়নি। তাই, ধনিক-বণিক-মালিক শ্রেণীর কর্তৃত্বাধীন সংবাদ-মাধ্যমে ঘটনাটি বেশ ভালোভাবেই প্রকাশিত হয়েছে। আর তাতে, শুধু পোশাক শিল্পের মালিক শ্রেণীই নয়, বাংলাদেশের সমগ্র ধনবান শ্রেণী শঙ্কিত হয়ে ওঠে। তাই, আপাতঃ অসম্ভব মনে হলেও, বাস্তবে সম্ভব হয়ে উঠলো সরকারী ও বিরোধী দলের মধ্যে অভূতপূর্ব সহযোগিতা।

    ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধে খালেদা জিয়া, সরকার-বিরোধী ১৮-দলীয় জোটের নেতা ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটের পূর্ব-ঘোষিত ২রা মে'র হরতাল প্রত্যাহার করে নিয়েছেন অবলীলায়। তবে, বিষয়টি আমাদের কল্পনার একেবারেই কি বাইরে ছিলো? না, মোটেও না। গত ২৭শে এপ্রিল ‘বাংলাদেশের এপ্রিল থিসিস’-এর পঞ্চম টীকায় আমি দেখিয়েছিঃ

    "বাংলাদেশের মৌলিক বিরোধ হচ্ছে ধনবান শ্রেণীর সাথে দরিদ্র শ্রেণীর, যা পৃষ্ঠদেশে দেখা না গেলেও, দিন-দিন তীব্রতর হচ্ছে। আর, তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়া শ্রেণী-বিরোধ এড়াবার জন্য ধনবান শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ বিরোধকে বিশাল ঢাক-ঢোল পিটিয়ে দেখানো হয়। অবশ্য, এ-বিরোধ যদি ধনবান শ্রেণীর সমন্বিত স্বার্থকে বিপদগ্রস্ত করে তোলে, তখন তারা আপোষ কিংবা পরিবর্তনের প্রসঙ্গ নিয়ে আসে।"

    আজকের শ্রমিক-বিক্ষোভ যে শ্রেণীসংগ্রামের একটি রূপ এবং আগামী দিনের বিপ্লবের মহড়া, সেটি বাংলাদেশের ধনবান শ্রেণী যতোটুকু বুঝতে পেরেছে, তার চেয়েও অধিক বুঝতে পেরেছে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাম্রাজ্যবাদ। আর তাই, সাম্রাজ্যবাদের সর্বতো-সমর্থক ক্যাথোলিক ধর্মগুরু পৌপ ফ্রান্সিসের ভাষণে উঠে এসেছে বাংলাদেশের শ্রমিকের কথা।

    বাংলাদেশের ইসলামী ধর্মগুরু সাভারকাণ্ডকে ‘আল্লাহ্‌র গজব’ বলে মধ্যযুগীয় বর্বর বোধ-বুদ্ধি-আবেগ-আচরণের প্রকাশ ঘটালেও, ভ্যাটিকানের খ্রিষ্টীয় ধর্মগুরু আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বলে, বিষয়টিকে তিনি মানুষের উপর মানুষের গজবই মনে করেছেন। তিনি বাংলাদেশের শ্রমিকদের ‘শ্রমদাস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বস্তুতঃ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন দেশটির ধনিক-বণিক-মালিক শ্রেণী ও বিশ্বের পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের প্রতি।

    কারণ, পৌপ নিশ্চয় জানেন যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পার্লামেণ্টে দাঁড়িয়ে উলঙ্গভাবে মালিকের পক্ষে মিথ্যে-ভাষণ দিয়ে বলেছিলেন যে, রানা-প্লাজায় ফাটল দেখা দেবার কারণে ভবনটি খালি করা হয়েছিলো, কিন্তু লোকেরা সেখানে মূল্যবান সামগ্রী আনতে গিয়ে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। পৌপ নিশ্চয় একথাও শুনেছেন যে, শেখ হাসিনার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর বিবিসিকে সাক্ষাতকারে বলেছিলেন যে, বিরোধী দলের লোকেরা হরতালের পক্ষে ফটক ধরে নাড়াচাড়া করার কারণেও রানা-প্লাজা বিধ্বস্ত হয়ে থাকতে পারে।

    বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীর এহেন অপরিপক্কতা ও অর্বাচীনতার পরিণামে যে দেশটিতে ধনিক-বণিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে দরিদ্র শ্রমজীবী শ্রেণীসমূহের একটি মহা-উত্থান অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে, তা হয়তো পশ্চিমা বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো তাদের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকেই বুঝতে পারছে। সে-বুঝাটাই পৌপের ভাষণে প্রকাশিত হয়েছে। তাই, সাথে-সাথে বিশ্বের পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সংগঠন ও সংস্থাগুলো দ্রুত তৎপর হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ‘পক্ষে’।

    এ-পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের ধনবান শ্রেণীর রাষ্ট্রটির ক্ষমতা তাদের যে-গোষ্ঠীটির হাতে ন্যস্ত, তারাও বুঝে গেলোঃ শ্রেণী-ঐক্যের সময় এসেছে; আর যাই হোক, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে বিপদগ্রস্থ করা যাবে না। তাই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রমিকদের প্রতি ‘দরদী’ হয়ে শুধু যে, পোশাক শিল্পে সংস্কারের কথাই বললেন, তা নয়, তিনি অনুরোধ করলেন, তাঁর চির-প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়াকে, ২ তারিখের ডাকা হরতাল প্রত্যাহারের। আর, খালেদা জিয়ারও বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, শেখ হাসিনা তাঁকে সম-শ্রেণীর সমন্বিত স্বার্থ রক্ষার বার্তা পাঠাচ্ছেন। আর, তিনিও তাতে সাড়া দিলেন। হরতাল প্রত্যাহার করে নিলেন খালেদা জিয়া।

    সাড়া দেবার জন্য খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদের পর ধন্যবাদ দিয়ে শেখ হাসিনা মূলতঃ বহির্বিশ্বকে বুঝাতে চাইছেন যে, তিনি নির্বোধ ঝগড়াটে নারী নন - বরং প্রকৃতই একজন রাষ্ট্রনেতা। আরও একই উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা আমন্ত্রণ জানিয়েছেন খালেদা জিয়াকে মুখোমুখি আলোচনায় বসে নিজেদের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির। হাস্যতঃ খালেদা জিয়াকে ‘মাইনাস ওয়ান ফর্মুলা’য় রাজনীতি থেকে উৎখাত করার শপথ নেয়া এবং অতঃপর মন্ত্রিত্ব পাওয়া বৈজ্ঞনিক সমাজতন্ত্রিক নেতা হাসানুল হক ইনু পর্যন্ত নরম সুরে খালেদা জিয়ার প্রতি আলোচনায় বসার আহবান জানাচ্ছেন।

    এগুলো কী? কীসের লক্ষণ? এগুলো হচ্ছে পুঁজিবাদের বিপদ-সম্ভাব্যতা প্রত্যক্ষণে ধনিক-বণিক শ্রেণীর মধ্যে শ্রেণীগত ঐক্য। এগুলো হচ্ছে শ্রমজীবী শ্রেণীর প্রদর্শিত ঘৃণা ও বিক্ষোভ প্রত্যক্ষণে ধনবান শ্রেণীর মধ্যে অনুভূত ভীতি। আন্তঃশ্রেণী ভীতি থেকেই অন্তঃশ্রেণী প্রীতি প্রত্যক্ষিত। তবে, এ-ভয়ে যে শুধুমাত্র ধনিক-বণিক শ্রেণীই ভীত, তা নয়। এ-ভয়ে ভীত মধ্যবিত্ত শ্রেণীও। তাই শ্রমিক শ্রেণীর নামে গড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বামপন্থী দলগুলোও তাদের হরতাল প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

    হরতালের ঘোষণাটা প্রথমে বামেরাই দিয়েছিলেন। গত ২৪শে নভেম্বর, আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিকের প্রাণহানির পর, শুধু মিছিলে সীমিত হওয়া ও দাবিতে বিহিত চাওয়া বামেরা, ডিসেম্বরে ধর্মবাদী জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের বিরুদ্ধে পাল্টা হরতাল ডেকে এবং সরকারের সহযোগিতা ও প্রশংসা পেয়ে যে কালিমালিপ্ত হয়েছিলো, সাভারকাণ্ডকে সম্ভবতঃ সে-কালিমা মোচনের একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে তার সদ্ব্যবহারের মানসে কাণ্ডটিকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে, ২রা মে হরতাল ডেকেছিলেন।

    কিন্তু রাজনীতির খেলায় বামেদের উল্লিখিত ‘সুযোগের সদ্ব্যবহার’টির খোদ সদ্ব্যবহার করলো বিএনপি-জামায়াত। তারাও একই দিনে হরতাল ডেকে সরকারের বিরুদ্ধে একটি স্বয়ংক্রিয় সর্বোচ্চ মেরুকরণ অর্জনের চেষ্টা করলো। ফলে, বামেদের ২রা মে’র হরতালকে যে ডিসেম্বর-হরতালের মতো প্রশংসার চোখে দেখেনি সরকার তথা আওয়ামী লীগ, তা নিরাপদেই বলা যায়।

    আরও ধারণা করা যায় যে, অঘোষিত বাকশাল এ্যালামনাই এসৌসিয়েশন বা বাকশাল প্রাক্তনী সমিতির অভ্যন্তরে সিবিপিকে ডেকে আওয়ামী লীগ অন্ততঃ তাদের ভেতরে এ-ভীতি সাফল্যের সাথে সঞ্চার করতে পেরেছে যে, হেফাজতে ইসলামীর ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির দু’দিন আগে যদি হরতালের ডাকে শ্রমিকেরাও রাস্তায় নেমে পড়ে, তাহলে ‘স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি’র জন্য মহাবিপদ তৈরী হতে পারে।

    ভীত-সন্ত্রস্ত সিপিবি দেরি না করে হরতাল প্রত্যাহার করে নিলো। সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটীর সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স সংবাদ-মাধ্যমকে জানালেন, তাঁদের ডাকা হরতালের দিনে জামায়াতও হরতাল ডাকায়, তাঁরা নীতিগত কারণে হরতাল প্রত্যাহার করবেন।

    অভিনব নীতিবোধ সিপিবির! এটিই যদি নীতি হয়, তাহলে সিবিপির ডাকা শ্রমিক বিপ্লবকে যদি কোনো অনৈতিহাসিক অজ্ঞাত কারণে জামায়াত সমর্থন করে বসে, তাহলে প্রিন্স সাহেবরা কি সেই বিপ্লবের কর্মসূচিও প্রত্যাহার করে নিবেন?

    আমার ধারণা, এর পেছনে কোনো কমিউনিস্ট-নীতি নয়, বরং জামায়াত-ভীতি কিংবা আওয়ামী-প্রীতি কাজ করে থাকবে। কারণ, ১৯৮৬ সালে যখন আওয়ামী লীগের মতো সিবিপিও গণ-আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সামরিক শাসনের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলো, আর সে-একই নির্বাচনে জামায়াতও তাদের অনুগামী হলো, তখন কিন্তু সিপিবি’র নীতিগত কোনো সমস্যা হয়নি। হয়েছিলো কি? কোনো জবাব আছে সিপিবি’র?

    সিপিবি’র কাছে একদা ‘সাম্রাজ্যবাদের মুখপত্র’ প্রত্যক্ষিত দৈনিক ইত্তেফাকে সম্প্রতি কলাম লিখেন দলটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। সর্বশেষ কলামে তিনি হায়-হায় করে জানালনে যে, সিপিবি-বাসদের ডাকা হরতাল নাকি জামায়াতীরা হাইজ্যাক করে নিয়ে গিয়েছে। হায়রে কমিউনিস্ট! হায়রে প্রগতিশীল! এমনই তাঁদের কর্মসূচি, যেটি একটি ধর্মবাদী প্রতিক্রিয়াশীল দল হাইজ্যাক করে নিতে পারে! অর্থাৎ, শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী দল কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচি এমনই শ্রেণী চরিত্রের যে, বুর্জোয়া শ্রেণীর সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল দলটিও একে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে পারে। যা’হোক, তিনিই আবার ক’দিন পর ইণ্টারনেটে তাঁর ফেইসবুক-এর একটি স্টেইটাস লিখে জানালেন যে, আসলে হরতালের কোনো প্রস্তুতি ছিলো না।

    কোন্‌টি সঠিক, কোন্‌টি ভ্রান্ত? কোন্‌টি সত্য, কোন্‌টি মিথ্যা? সিবিপির এ-কাণ্ডকে কী বলা যায়? এটি কি একটি রঙ্গ-তামাশা? নাকি রাজনীতির সিরিয়াস বিজিনেস? বাংলাদেশের শ্রমিকেরা যখন তাঁদের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা বিবর্জিত কর্মক্ষেত্রে শতো-শতো সহকর্মীকে নিমিষে লাশ হতে দেখে নিষ্ঠুর-ঠগ-উৎপীড়ক-জোচ্চোর ও খুনী মালিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামে, তখন কমিউনিস্টরা তাঁদের ঐতিহাসিক দায়িত্ববোধে লড়াকু শ্রমিকদের সাথে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে, এগিয়ে নিয়ে যাবার বদলে বরং সহসা হরতাল ডেকে অতঃপর তা প্রত্যাহার করে নেন! রাজনীতির ভাষায় একে কী বলা হয়? বলা হয়ঃ শ্রমিক শ্রেণীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা!

    সিপিবির এ-বিশ্বাসঘাতকতা দলটির নেতাদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক ত্রুটির বিষয় নয়। এভাবে দেখলে তা ঠিক হবে না। তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে হয়তো খুবই চমৎকার ও সৎ মানুষ। এটি হচ্ছে এঁদের রাজনৈতিক আদর্শ ও তত্ত্বের ত্রুটি। আর, আমার সমালোচনাটাও সে-অর্থে নৈর্ব্যক্তিক।

    বস্তুতঃ যে-কারণে বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা ১৯৭৫ সালে তৎকালীন স্বৈরশাসক শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালে যোগদানের জন্য কমিউনিস্ট পার্টিকে বিলুপ্ত করে দিয়ে, শ্রমিক শ্রেণীকে ধনিক-বণিক বা বুর্জোয়া শ্রেণীর দয়ার উপর নিক্ষেপ করে চরম ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন, সে-কারণটি তাঁদের মধ্যে এখনও বিদ্যমান। আর তা হচ্ছে তাঁদের এ-রাজনৈতিক বিশ্বাস যে, বাংলাদেশের ধনিক-বণিক বা বুর্জোয়া শ্রেণীর মধ্যে এক বা একাধিক অংশ আছে, যারা দেশপ্রেমিক এবং গণতান্ত্রিক। বুর্জোয়াদের এ-প্রগতিশীল অংশকে সাথে নিয়েই ‘সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন’ করতে চায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (দেখুনঃ দশম কংগ্রেসের খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাব, ১১-১৩ অক্টোবর ২০১২)।

    সিপিবি যে-রাজনৈতিক আদর্শ ও বিশ্বাস ধারণ ও চর্চা করে, এর শ্রেণীগত ভিত্তি হচ্ছে মধ্যবিত্ত অবস্থান। পুঁজিবাদী সমাজে ও রাষ্ট্রে মধ্যবিত্ত একই সাথে শোষিত ও শোষক। এঁরা একদিকে ধনিক-বণিক শ্রেণীর মতোই দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণীর শ্রম শোষণ করে পুঁজিবাদী সমাজের সুবিধা ভোগ করেন (যেমন বাড়ীতে কাজের লোক, দোকানের কর্মচারী, গাড়ীর ড্রাইভার, ইত্যাদি), আবার অন্যদিকে নিজেরাও ধনিক-বণিক শ্রেণীর হাতে শোষিত হয়ে এক ধরণের অসুবিধা-বোধে প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন চান।

    নিজেদের পক্ষে পরিবর্তন চাইতে গিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণী দল ভারী করার জন্য দরিদ্র শ্রমজীবী শ্রেণীর দুঃখের বিবরণ তুলে ধরে, তাদেরকে সাথে নিয়ে, শাসক ধনবান শ্রেণীকে আমূল পরিবর্তনের হুমকি দেয়। কিন্তু এ-শ্রেণী তার মধ্যবিত্ত অবস্থান থেকেই জানে যে, বাড়ীর কাজের লোক, দোকানের কর্মচারী, গাড়ীর ড্রাইভার, ইত্যাদি ছাড়া তার চলবে না। তাই, এ-শ্রেণীর লোকেরা তত্ত্ববোধে ও শব্দে শ্রমিক কর্তৃত্বাধীন সমাজের কথা বললেও, বাস্তবে এমন ব্যবস্থা কখনও চান না, যেখানে তাঁরা তাঁদের বর্তমানের সুবিধাটুকুও হারিয়ে ফেলেন। ওঁদের ভীতির জায়গা এটিই।

    মধ্যবিত্ত শ্রেণী অবস্থানের সিপিবির ও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলো কেনো শ্রমিক-বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবার জন্য উপযুক্ত নয়, তার উত্তর পেতে হবে মধ্যবিত্তের শ্রেণীগত সীমবদ্ধতার বিশ্লেষণ থেকে। আর সেখান থেকেই আমরা বুঝতে পারবো, কেনো সাভারকাণ্ডে তারা মধ্যবিত্ত চরিত্রজাত ফায়দা লোটার অধীর মানসিকতা থেকে হরতাল ঘোষণা করে, আবার সে-ঘোষণাকেই একই মধ্যবিত্ত চরিত্রজাত ভীতি থেকে প্রত্যাহার করে নিলো।

    বাম-বিকল্পের আন্দোলনে সিপিবি নেতৃত্ব করছে বলে এবং হরতাল প্রত্যাহারের ঘোষণাটিও প্রথম এ-দলটি দিয়েছে বলে, এ-সিরিজের প্রথম আলোকপাত সিপিবি’র উপরই হলো। এখানে বাসদেকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি স্থানের অভাবে। পরবর্তী পর্বে, অধুনা বিভক্ত বাসদের উভয় খণ্ডের ভূমিকারই বিশ্লেষণ করা হবে।

    শনিবার, ৪ মে ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


পাঠকের প্রতিক্রিয়া

"সব পোপকে একই দাড়িপাল্লায় মাপা" অবশ্যই কোনো বিজ্ঞান সম্মত কথা না। একই দাড়িপাল্লায় মাপা মানে হচ্ছে একই চোখে দেখা। আমি যে কথাটা বলতে চেয়েছি আগের কোনো পোপ সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপোস করেছে বলে যে এই পোপও যে তাই করবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। আর কাথলিক চার্চ সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি তা হচ্ছে যুগে যুগে এর চরিত্র পাল্টেছে। শুরুতে গরীব এবং দুর্বলের পাশেই ছিলো চার্চ। চার্চের মধ্যে অর্থনৈতিক সমতা রাখার জন্য সবাই একটি সাধারণ তহবিলে তাদের সম্পদ রাখতো এবং সেই সাধারণ তহবিল থেকে যার যেমন দরকার সে সেই রকম খরচ করতো। অর্থাৎ, আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগে কাথলিক চার্চে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু একটা সময় চার্চ যখন সম্পদশালী হয়ে ওঠে তখন সে শাসক শ্রেণীর সাথে হাত মিলায় এবং ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। এরপর ক্ষমতার আতিশয্যে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। কিন্তু পরবর্তীতে রেনেসাঁ, কাথলিক যাজক মার্টিন লুথারের প্রতিবাদ, ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলেশনের কারণে কাথলিক চার্চের সেই একক আধিপত্যের পতন হয়। কাজেই এই কাথলিক চার্চের "বিশ্বদৃষ্টি" ভবিষ্যতে আবার পরিবর্তিত হয়ে সত্যিকার অর্থে "গরীবের আশ্রয়স্থল" হবে না এক কথা জোর দিয়ে যেমন বলা যায় না তেমনি "সাম্রাজ্যবাদের সর্বতো-সমর্থক ক্যাথোলিক ধর্মগুরু " এই রকম ঢালাও মন্তব্যও করা যায় না।

Another interesting and thoughtful well clarified writing. Many thanks.

অনন্তকে বলছিঃ

জড় ও জীবের মতো, ঘটনা, বিষয় ও বোধ-বুদ্ধিরও বিকাশ ঘটে নিম্ন থেকে উচ্চে এবং সরল থেকে জটিলে। আপনি চাইলে সব কিছুকেই সরলভাবে বুঝতে পারেন। তাতে আপনার আরাম-বোধ হলেও, সঠিক উপলব্ধি হয়েছে, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

পৌপ বললেন, 'ক্যাথলিক চার্চ হবে গরীবের চার্চ', আর তাতেই তা গরীবের চার্চ হয়ে গেলো? 'তাই সাভাবের ঘটনায় তার সমালোচনা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা' বলে আপনার মনে হলো?

পৃথিবীটা এতো সরল হলে, সম্ভবতঃ আমার লেখার আর কিছুই থাকতো না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যাঁরাই যা বলছেন, তাঁরা তাই মীন করছেন এবং তাই সত্য, এমনটি ভেবে নিতে পারলে তো আমিও আরামে থাকতে পারতাম। কিন্তু অনন্ত, পৃথিবীটা এতো সরল নয়।

সিস্টেমের বাইরে সিস্টেমের প্রতিভূ ব্যক্তিকে শুধুমাত্র তাঁর উচ্চারিত বাক্য ও প্রকাশিত সদিচ্ছা কিংবা ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের দ্বারা বুঝাটাও সঠিক বুঝা নয়। পৌপ যতোটুকু না ব্যক্তি, তার চেয়েও অনেক বেশি তিনি প্রতিষ্ঠান। তিনি যে জন্মসূত্রে পাওয়া তাঁর নামটি পর্যন্ত পাল্টে ফেলে পৌপ ফ্রান্সিস হয়েছেন, তার অর্থ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যক্তির পরিপূর্ণ সমর্পণ। পৌপের ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছা এখানে ক্যাথকলিক বিশ্বদৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠানের দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এ-প্রতিষ্ঠানের, ভিত্তি, কাঠামো ও ভূমিকা ঠিক রেখে তাঁর পক্ষে মৌলিক ভিন্নতা আনা সম্ভব নয়। বিষয়টি সত্যিই জটিল, অনন্ত। আপনার দেখার মতো মোটেও সরল নয়।

আর, এই যে, 'সব পোপকে একই দাড়িপাল্লায় মাপা'র অভিযোগ করলেন, সেটি ঠিক হলো? আমি তো কেবল একজন পৌপের কথা লিখেছি। অন্যের সাথে তাঁরতো কোনো মিল বা অমিল তো নির্দেশ করিনি। তবে, একই দাড়িপাল্লায় মাপা ঠিক নয় যে বললেন, কথাটি কিন্তু বিজ্ঞান সম্মত হলো না। একই প্রকরণের একাধিক ব্যক্তি, বস্তু বা বিষয়কে পরিমাপ করতে গেলে কিন্তু একই স্কেইল ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে আপনি তুলনা করতে পারবে না। যদিও আমি মাপিনি, কিন্তু সব পৌপকে মাপলে আমি অবশ্যই আগে একটি স্কেইল বা দাঁড়িপাল্লা ঠিক করে, নিশ্চয় সেই একই দাঁড়িপাল্লায়ই মাপতাম। কারণ, বৈজ্ঞানিক পরিমাপের এটিই নিয়ম।

আশা করি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অন্তর্গত পরিমাপ্যতার এই মৌলিক বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মিথষ্ক্রিয়ায় বিবৃতির প্রস্তুতিতে বস্তুনিষ্ঠতা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অবলম্বন করবেন। কারণ, একমাত্র বিজ্ঞানই মানব জাতিকে প্রকৃত অর্থে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, যা ধর্মের পক্ষে সম্ভব নয়।

পরিশেষে, আপনার সারল্যের জন্য ও আমার লেখা পড়ে মন্তব্য লেখার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

একটা সময় ছিলো যখন পোপ যা বলতো অনেক রাষ্ট্র তা মানতে বাধ্য থাকতো। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে পোপের সেই অবস্থান আর নেই। পোপের অবস্থান হয়েছে অনেকটা আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতির মত। তার একটা বিশেষ মর্যাদা থাকলেও কোনো ক্ষমতা নেই। আর বর্তমানে যেসব বড় বড় সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো আছে সেগুলির কোনটাই কাথলিক প্রধান নয় বা সেগুলির রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানও কাথলিক না। কাজেই পোপ কি বললো না বললো তাতে তাদের কিছু আসে যায় না।

"আর তাই, সাম্রাজ্যবাদের সর্বতো-সমর্থক ক্যাথোলিক ধর্মগুরু পৌপ ফ্রান্সিসের ভাষণে উঠে এসেছে বাংলাদেশের শ্রমিকের কথা।"

কাথলিক চার্চের ইতিহাস ঘাটলে যেমন দেখা যায় যে বিভিন্ন সময় তারা শাসক শ্রেণীর সাথে এক হয়ে বিভিন্ন অন্যায়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছে আবার এমন ইতিহাসও আছে যখন অধিকার আদায়ের সংগ্রামে গরীবের পাশে থেকেছে চার্চ। বর্তমান পোপ দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই বলেছেন, "কাথলিক চার্চ হবে গরীবের চার্চ", সহকর্মীরদের তিনি বলেছেন,"ফুর্তির দিন শেষ", তাই সাভারের ঘটনায় তার এই সমালোচনা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা। এটাকে এতো জটিল করে দেখার কিছু নাই। আর সব পোপকে একই দাড়িপাল্লায় মাপাটাও মনে হয় ঠিক হবে না।

"সিপিবি যে-রাজনৈতিক আদর্শ ও বিশ্বাস ধারণ ও চর্চা করে, এর শ্রেণীগত ভিত্তি হচ্ছে মধ্যবিত্ত অবস্থান। পুঁজিবাদী সমাজে ও রাষ্ট্রে মধ্যবিত্ত একই সাথে শোষিত ও শোষক। এঁরা একদিকে ধনিক-বণিক শ্রেণীর মতোই দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণীর শ্রম শোষণ করে পুঁজিবাদী সমাজের সুবিধা ভোগ করেন (যেমন বাড়ীতে কাজের লোক, দোকানের কর্মচারী, গাড়ীর ড্রাইভার, ইত্যাদি), আবার অন্যদিকে নিজেরাও ধনিক-বণিক শ্রেণীর হাতে শোষিত হয়ে এক ধরণের অসুবিধা-বোধে প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন চান।"

খুবই বাস্তব ভিত্তিক কথা। আমার পরিচিত এক সিপিবি নেতা তার ড্রাইভারকে চাকুরিচ্যুত করেছেন শুধুমাত্র বিনা অনুমতিতে একদিন ছুটি কাটানোর দায়ে।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন