• 'সাম্প্রদায়িকতা'র ডিকনষ্ট্রাকশনঃ ঐতিহাসিক স্বরূপ ও বিভ্রান্তি
    মাসুদ রানা

    পূর্বসূত্র
    আমাদের সামষ্টিক পরিচয়ের (collective identity) যতো সামষ্টিক বিশেষ্য (collective noun) আছে, তার প্রতিটির 'ইক'-অন্ত বিশেষণকে (adjective) আমারা আমাদের ব্যক্তিত্বের গুণ হিসেবে মনে করি, একমাত্র সম্প্রদায় ছাড়া। মানবিক, আন্তর্জাতিক, স্বজাতিক, সামাজিক, পারিবারিক হওয়া গুণের, কিন্তু সাম্প্রদায়িক হওয়া দোষের।

    তাই, সেই বিশেষণ থেকে তৈরি 'তা'-অন্ত বিমূর্ত বিশেষ্যের (abstract noun) সবগুলোই ইতিবাচক নীতি বা আদর্শ, একমাত্র 'সম্প্রদায়িক' বিশেষণ থেকে গঠিত 'সাম্প্রদায়িকতা' বিশেষ্যটি ছাড়া। মানবিকতা, আন্তর্জাতিকতা, জাতিকতা বা জাতীয়তা, সামাজিকতা, পারিবারিকতা, এগুলো হচ্ছে সুনীতি বা সু-আদর্শ কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা কুনীতি বা কু-আদর্শ।

    অর্থাৎ, আমাদের যতো অস্তিত্ব আছে, তাদের প্রতিটি আদৃত, শুধু সম্প্রদায় ছাড়া। তো, প্রশ্ন ছিলো সম্প্রদায়ের সমস্যা কী? আজকের লেখায় তার উত্তর খোঁজার শুরু করবো এবং এর সাথে প্রাসঙ্গিক বিষয়াদি জড়িত করে তা করবো।

    প্রাসঙ্গিক ধারণা
    ‘সাম্প্রদায়িক' শব্দটি বাংলার রাজনৈতিক ‘ডিসকৌর্সে' বা ভাষ্যে সরাসরি ইংরেজি ‘কম্যুনাল' শব্দ থেকে এসেছে, যা শতাধিক বছর আগে খোদ ইংল্যাণ্ডের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ব্রিটিশ ঔনিবেশিক কালে ভারতে প্রবর্তিত হয়েছিলো।

    কিন্তু এর ব্যবহারগত পার্থক্য বুঝতে গেলে ইউরোপীয় ও ভারতীয় প্রাসঙ্গিক রাজনৈতির প্রেক্ষাপটটি বুঝতে হবে। সেই সাথে কিছু মৌলিক বিষয়ে আমাদের ধারণা ঝালিয়ে নিতে হবে। এই সূত্রে দেশ-রাষ্ট্র-জাতি-সম্প্রদায় এই চারটি বিষয় নীচে সংজ্ঞায়িত করা হলোঃ

    (১) দেশ বলতে আমরা পৃথিবীর এমন একেকটি অংশের স্থল-জল-অন্তরীক্ষের সমষ্টি বুঝি, যা প্রধানতঃ একেকটি নির্দিষ্ট জাতির মানুষের ঐতিহাসিক আবাস হিসেবে স্বীকৃত, যদিও অল্প সংখ্যায় অন্যান্য জাতির মানুষও সেখানে থাকতে পারেন।

    (২) রাষ্ট্র হচ্ছে নির্দিষ্ট সীমানার স্থল-জল-অন্তরীক্ষ অধিকারী এমন একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান, যা তার অন্তর্গত বিবিধ প্রতিষ্ঠান দ্বারা ঐ সীমানাভূক্ত সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষা, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিধি তৈরির এবং বলপ্রয়োগে তা কার্যকর করার স্বীকৃত ক্ষমতা রাখে।

    (৩) জাতি হচ্ছে যে-কোনো ঐতিহাসিক যুগে একটি নির্দিষ্ট ভূভাগে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত ও ঐতিহাসিকভাবে রপ্ত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অভিন্ন বিবেচিত জনসমষ্টি, যারা অভিন্ন আত্মপরিচয়ে সমস্বার্থ-বোধে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মোন্নয়নের তৎপর।

    (৪) সম্প্রদায় হচ্ছে একটি জাতির অন্তর্গত ক্ষুদ্রতর জনসমষ্টি যারা অভিন্ন আঞ্চলিক অবস্থান বা ঐতিহ্যের ভিত্তিতে সম্পর্কিত ও অভিন্ন বিবেচিত এবং সমস্বার্থে পরস্পরের সহায় ও সহযোগী।

    রাষ্ট্র বনাম সম্প্রদায়
    পৃথিবীতে যুগযুগ ধরে রাষ্ট্র সম্পর্কিত যে-সমস্ত চিন্তা বিকশিত হয়েছে, তাদের মধ্যে যেমন রাষ্ট্রের পক্ষে রাষ্ট্রচিন্তা আছে, তেমনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধ নৈরাষ্ট্রিক চিন্তাও আছে। আদিতে রাষ্ট্র ছিলো না। রাষ্ট্রের আগে সম্প্রদায় ছিলো, সমাজ ছিলো। রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে অনেক অনেক পরে, সমাজে সম্প্রদায়সমূহকে একত্রিত পেয়ে বা করে।

    একদল রাষ্ট্রবাদী বলেন, রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে মঙ্গলার্থে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সাধারণ ইচ্ছার ফল হিসেবে সামাজিক চুক্তি রূপে। আর, নৈরাষ্ট্রবাদীরা বলেন, রাষ্ট্র সৃষ্ট হয়েছে সমাজের বৃহত্তর দুর্বল অংশের ওপর ক্ষুদ্রতর প্রবল অংশ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে।

    সঙ্গত কারণেই, রাষ্ট্রবাদীরা যেখানে সমাজের সর্বত্রগামী শক্তিশালী কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র চান, নৈরাষ্ট্রবাদীরা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও সমাজের স্বাভাবিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে শেষপর্যন্ত রাষ্ট্রের বিলোপ চান।

    পাশ্চাত্যের নৈরাষ্ট্রবাদীরা তো বটেই, এমনকি লিবারেলরাও রাষ্ট্রের সমান্তরাল মৌলিক সামাজিক সত্তা হিসেবে কমিউনিটি বা সম্প্রদায়ের ওপর জোর দিয়ে থাকেন। তাঁরা কম্যুনালিজম বা সাম্প্রদায়িতাকে উৎসাহিত করেন। কম্যুনাল বা সাম্প্রদায়িক মানেই যৌথতা নির্ভর। প্রবল কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের কাছে নাগরিক যখন একা ও অসহায়, তখন সম্প্রদায়ই তার ভরসার জায়গা। এটি সব সমাজেই ইতিহাসের পর্যায়ে পর্যায়ে প্রমাণিত।

    ইউরোপীয় অর্থ
    সাম্প্রদায়িকতা বা কম্যুনালিজম একটি দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত ইউরোপীয় ধারণা, যার অর্থ হচ্ছে কমিউনিটি বা সম্প্রদায়ের মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা। ইংরেজি ভাষায় ‘কম্যুনাল' শব্দের উৎপত্তি কাল ‘অক্সফৌর্ড ডিকশনারী'তে দেখানো হয়েছে ঊনিশ শতক।

    কম্যুনালিজমের মূলে আছে চতুর্থ শতকে প্রতিষ্ঠিত ক্রিশ্চিয়ান চার্চসমূহের চর্চিত যৌথতা এবং ষোড়শ শতকে তৎকালীন ক্যাথলিক ধর্মের বিরুদ্ধে জার্মানী-সহ পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংঘটিত ‘রিফর্মেশন’ বা সংস্কার আন্দোলনে চর্চিত সাম্প্রদায়িক মালিকানা ভিত্তিক যৌথজীবন ব্যবস্থা।

    ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত প্যারিসে সাম্প্রদায়িক মালিকানা ও কর্তৃত্বের বাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়ে ‘কমিউন’ প্রতিষ্ঠিত হয়, অক্সফৌর্ড ডিকশনারি তাকেই ‘কম্যুনাল’ শব্দের উৎপত্তি হিসেবে নির্দেশ করেঃ

    “Early 19th century (in the sense 'relating to a commune, especially the Paris Commune'): from French” [১৯ শতকের গোড়া (এই অর্থে 'কমিউন সম্পর্কিত, বিশেষতঃ প্যারিস কমিউন'): ফ্রেঞ্চ]

    অক্সফৌর্ড ডিকশনারীতে ‘কম্যুনাল' শব্দের যে তিনটি অর্থ আছে তাদের প্রথমটি হচ্ছে ‘shared by all members of a community; for common use' অর্থাৎ, ‘কমিউনিটির সকল সদস্যের অংশীদারিত্বে, সাধারণ ব্যবহারের জন্য'।

    পাশ্চাত্যের ‘কম্যুনাল' একটি ইতিবাচক ধারণা। এখানে ‘কম্যুনাল চাইল্ড রীয়ারিং' (শিশুপালন), ‘কম্যুনাল এডুকেশন' (শিক্ষা), ‘কম্যুনাল হাউজিং (আবাসান)' ‘কম্যুনাল লিভিং' (বসবাস), ‘কম্যুনাল কুকিং (রান্না)' ‘কম্যুনাল ঈটিং' (ভোজন) ‘কম্যুনাল স্লীপিং' (নিদ্রা), ‘কম্যুনাল পার্কিং' (গাড়ী রাখা), ‘কম্যুনাল সেইফটি' (নিরাপত্তা), ইত্যাদি ‘প্র্যাক্টিস' বা চর্চাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়।

    যাঁরা কম্যুনালিজমকে সেক্যুলারিজমের বিপরীত অর্থে ব্যবহার করেন, সেই তাঁদের জন্যে জানাই, প্যারিস কমিউনের গৃহীত কর্মসূচির প্রথমটিই ছিলো সেক্যুলারঃ রাষ্ট্র ও চার্চের পৃথকীকরণ এবং তৃতীয়টি ছিলো অবিবাহিত তথা ধর্মমতে ‘অবৈধ’ নরনারী-যুগলের পেনশনের অধিকার প্রতিষ্ঠা।

    ইউরোপে এই সব কম্যুনাল ও সাম্প্রদায়িক চিন্তা ছিলো চার্চের আশির্বাদপুষ্ট স্বৈরতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে নিবিড় সম্পর্কে সম্পর্কিত কর্মজীবী মানুষের প্রতিরোধ ও বিকল্প সমাজ ও সরকার গঠনের ভিত্তি। ঊনিশ শতকে বাস্তব রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় যেমন প্যারিস কমিউন গড়ে উঠেছিলো, তেমনি তাত্ত্বিক বিনির্মাণেও আমরা কমিউনিজমের সাক্ষাত পাই।

    মার্ক্সবাদী কমিউনিষ্টরা চূড়ান্ত বিচারে নৈরাষ্ট্রবাদী ও সম্প্রদায়বাদী। কারণ, কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের বিকশিত তত্ত্ব ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ অনুসারে কমিউনিজম হচ্ছে সমাজতন্ত্রের পরবর্তী ধাপ, যে ব্যবস্থায় কোনো শ্রেণী ও রাষ্ট্র দু’টিই বিলুপ্ত হবে এবং ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় মালিকানা বিলুপ্ত হয়ে সাম্প্রদায়িক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে।

    রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে সাম্প্রদায়িকতা
    সাম্প্রদায়িকতা বা কম্যুনালিজম যুগে যুগে স্বেচ্ছাচারী কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে স্থানীয় সম্প্রদায়বদ্ধ মানুষকে যৌথ সংগ্রামের প্রেরণা যুগায়। গত শতকে কমিউনিজমের পরিচয় দিয়ে বাস্তবে কম্যুনালিজমের চর্চা ও চেতনা থেকে বিচ্যুত অতি-কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক সোভিয়েত রাষ্ট্র ধ্বসে পড়ার পর আমরা খোদ ‘কম্যুনালিজম’ নামের রাজনৈতিক দর্শনের আবির্ভাব লক্ষ্য করছি। এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।

    সাম্প্রদায়িকতা বা কম্যুনালিজম একটি মহৎ রাজনৈতিক আদর্শ রূপে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ছে। মুর‍্যে বূকচিন (১৯২১ -২০০৬) এই দর্শনের জনক। তিনি ছিলেন একজন লিবার্টেরিয়ান সমাজতন্ত্রী (যাঁরা উৎপাদনের ওপর কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও কর্তৃত্ব এবং উৎপাদনের মুজরি প্রথা প্রত্যাখান করে বিকেন্দ্রিত সরকার ও উৎপাদনের ওপর শ্রমিকদের পূর্ণ ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাস করেন)।

    মুর‍্যে বূকচিনের রাজনৈতিক দর্শন এই কম্যুনালিজমের প্রস্তাবনা হচ্ছে, অর্থনৈতিক বাজার ও মুদ্রার বিলোপ এবং ভূমি ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ-সমূহকে ক্রমবর্ধিষ্ণু হারে সম্প্রদায়ের তত্ত্ববধানে -  সুনির্দিষ্টভাবে, কনফেডারেশনভূক্ত স্বতন্ত্র কাউন্সিলগুলোতে নাগরিক ও তাঁদের প্রতিনিধিদের উন্মুক্ত এ্যাসেম্বলির তত্ত্বাবধানে - আনতে হবে।

    রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মসূচি হিসেবে কম্যুনালিজম ক্রমশঃ জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। কুর্দিস্তানের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে নিয়োজিত মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দল পিকেকে (PKK) কয়েক বছর আগে আনুষ্ঠানিকভাবে কম্যুনালিজমকে তাদের রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছে। অবশ্য, তাঁরা এর নতুন নাম দিয়েছেন ‘ডেমোক্যাট্রিক কনফেডারেলিজম’।

    পিকেকের নেতা আব্দুল্লাহ ওজালান ১৯৯৯ সালে বন্দী হয়ে কারাগারে তাঁর রাজনৈতিক পাঠকালে মুর‍্যে বূকচিনের লেখা পড়ে কম্যুনালিজমের সাথে পরিচিত হন। ওজালান নিজেকে বূকচিনের 'ছাত্র' হিসেবে বিবেচনা করেন। আব্দুল্লাহ ওজালান ২০০৪ সালে তুরষ্কের কারাগারে থেকেই কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানান মুর‍্যে বূকচিনের সাথে সাক্ষাতের। দুর্ভাগ্যবশতঃ বৃদ্ধ বূকচিন তখন ভ্রমণের উপযুক্ত ছিলেন না বলে ওজালানের সাথে সাক্ষাতের পরিবর্তে তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়ে পত্র লিখেন। ২০০৬ সালে বূকচিনের মৃত্যুর পর পিকেকের নেতা আব্দুল্লাহ ওজালান তাঁকে বিংশ শতাব্দীর মহত্তম সমাজবিজ্ঞানীদের একজন বলে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন।

    বাঙালী কমিউনিষ্টদের বিভ্রান্তি
    দুঃখের বিষয় যে, বাঙালী কমিউনিষ্টগণ ‘কমিউনিজম’ শব্দের ভুল বঙ্গানুবাদ করেছেন ‘সাম্যবাদ’ বলে। এটি ভুল। কমিউনিজম মানে সাম্যবাদ নয়। সাম্য এখানে প্রসঙ্গ নয়।

    সাম্যবাদ আদর্শ হিসেবে এসেছে কমিউনিজমের আগে, আঠারো শতকে ফরাসী বুর্জোয়াদের দ্বিতীয় মন্ত্র হিসেবে। স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব (liberté, égalité, fraternité) ছিলো বুর্জোয়াদের আদর্শ। আর, এই আদর্শের ভিত্তিতে ফ্রান্সে বিপ্লব হয়েছিলো কমিউনিজমের তাত্ত্বিক কার্ল মার্ক্সের জন্মেরও কয়েক দশক আগে ১৭৮৯-১৭৯৯ সালে।

    কমিউনিজমের মূল বিষয় হচ্ছে সম্প্রাদয়িক মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা, যেখান মানুষের দেওয়া ও পাওয়া সমান নাও হতে পারে। ইউরোপের যে-কোনো কমিউনিষ্টই জানেনঃ

    "Communism is a theory or system of social organization in which all property is owned by the community and each person contributes and receives according to their ability and need (কমিউনিজম হচ্ছে একটি তত্ত্ব ও সামাজিক সংগঠনের ব্যবস্থা, যেখানে সমস্ত সম্পত্তির মালিকানা সম্প্রদায়ের এবং প্রতিটি ব্যক্তি নিজের ক্ষমতা অনুসারে অবদান রাখেন এবং প্রয়োজন অনুসারে গ্রহণ করেন)"

    যদি সোসাইটি (society) মানে সমাজ হয় এবং সৌশ্যালিজম (socialism) মানে সমাজতন্ত্র হয়, তাহলে কমিউন (commune) অর্থ সম্প্রদায় মেনে কমিউনিজম (communism) মানে সম্প্রদায়তন্ত্র হওয়ারই কথা। এখানে সাম্যবাদ এলো কোথা থেকে? যতো ভালো উদ্দেশ্যেই করা হয়ে থাকুক না কেনো, অনুবাদটা ভুল।

    বাঙালী কমিউনিষ্টগণ নামে কমিনিউনিষ্ট হলেও এঁরা কমিউনিজমের মর্মবাণী বুঝতে যে ব্যর্থ, তা তাঁরা ইতিহাসে বারবার প্রমাণ করেছেন। ধর্মের ভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনের প্রস্তাব তাঁরা সমর্থন করেছিলেন লেনিনীয় ‘জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার’ নীতির ভুল উপলব্ধিতে; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত মৈত্রীর কারণে তাঁরা ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের সহযোগিতা করেছেন জাতীয়তাবাদী নেতা সুভাষ বসুর বিরুদ্ধে।

    স্বাধীন বাংলাদেশে এই কমিউনিষ্টগণ ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের একনায়কতান্ত্রিক বাকশাল ব্যবস্থাকে সমর্থন করে নিজেদের দল পর্যন্ত বিলুপ্ত করে বাকশালে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তিতে তাঁরা পরবর্তী একনায়ক জিয়াউর রহমানের খালকাটা বিপ্লবের সাথী হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে এই কমিউনিষ্টরা জগনগণের আন্দোলন ছেড়ে তৃতীয় একনায়ক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অবৈধ পার্লামেণ্টারি নির্বাচনে যোগ দিয়ে তাঁকে বৈধতা দিয়েছিলেন।

    এই মুহূর্তে এঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতো বাস্তবে বাকশালী চেতনা ধারণ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ফ্যসিবাদী দুঃশাসনকে বাগড়া না দিয়ে নির্বাচনী খেলায় মেতে উঠেছেন।

    কমিউনিষ্ট নেতার নির্বোধ তত্ত্ব
    বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম গত ৩০ মার্চ তিনি দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত 'সাম্প্রদায়িক বিপদ ও গণতন্ত্র' শীর্ষক এক উপসম্পাদকীতে এই মর্মে তত্ত্বায়ন করেছেন যে, সাম্প্রদায়িকতা রেখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। তিনি লিখেছেনঃ

    "এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না যে সাম্প্রদায়িকতা বহাল রেখে কখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না।"

    আমি আমার পূর্বের প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী তাঁর ভ্রান্ত তত্ত্ব চ্যালেইঞ্জ করতে চাই। কারণ, বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক তত্ত্ব নির্বোধ এবং বিপজ্জনক। বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রেসিডেণ্ট পদে থেকে তিনি যদি এমন ভুল তত্ত্ব প্রচার করেন, তা হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে বিভ্রান্ত ও বিপথে পরিচালিত করবে।

    আমি জানি, রাশিয়াতে ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত সৌশ্যালিষ্ট রাষ্ট্র সম্পর্কে তিনি শিক্ষিত ও দীক্ষিত। কিন্তু আমি নিশ্চিত নই, তিনি ১৯১৭ সালে নেদারল্যাণ্ডসে প্রতিষ্ঠিত কোনসোসিয়েশন্যালিষ্ট রাষ্ট্র এবং ১৯৪৩ সালে লেবাননে প্রতিষ্ঠিত কনফেশন্যালিষ্ট রাষ্ট্র সম্পর্কে জানেন কি না।

    নেদারল্যাণ্ডসে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এবং লেবাননে এখনও পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা বহাল রেখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে, বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যে বলেছেন “এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না যে সাম্প্রদায়িকতা বহাল রেখে কখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না”, তাতে আমি তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সম্পর্কে সাংঘাতিক সন্দেহ পোষণ করছি।

    নেদারল্যাণ্ডের ১৮৫৭ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত জনগণ ৪টি অ-ভৌগোলিক সম্প্রদায় বা পিলারে বিভক্ত ছিলো - ক্যাথলিক ক্রিশ্চিয়ান, ক্যালভিনিষ্ট ক্রিশ্চিয়ান, সৌশ্যালিষ্ট ও জেনারেল বা সেক্যুলার। ১৯১৭ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত কোনসোসিয়েশনালিষ্ট ব্যবস্থায় তাঁরা তাঁদের সংখ্যানুপাতে তাঁরা নিজ-নিজ সম্প্রদায় থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত করে সাম্প্রদায়িক সমঝোতার গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতেন। এখন সেই সম্প্রদায়গুলো তাঁদের স্বস্ব পার্টিকে ভৌট দিয়ে পার্লামেণ্ট নিজেদের মতামতের প্রতিফলন ঘটায়।

    লেবাননে কনফেশন্যালিষ্ট ব্যবস্থায় আরব জাতীয় আত্মপরিচিতির অধীনে মুসলমান শিয়া ও সুন্নী এবং ক্রশ্চিয়ান ম্যারোনাইট সম্প্রদায় তাঁদের সাম্প্রদায়িক পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। ১৯৪৩ সাল থেকে এক অলিখিত চুক্তির বলে আজও লেবানের প্রেসিডেণ্ট ক্রিশ্চিয়ান, প্রধান মন্ত্রী সুন্নি মুসলিম ও পার্লামেণ্টের স্পীকার শিয়া মুসলিম হয়ে থাকেন। সর্বশেষ ১৯৯০ সালের তায়ফ চুক্তির ভিত্তিতে পার্লামেণ্ট ৭টি ক্রিশ্চিয়ান সম্প্রদায় ৪টি মুসলিম সম্প্রদায়ের নির্দিষ্ট সংখ্যাক এমপি নির্বাচিত করে পার্লামেণ্ট মোট ৬৪ খ্রিশ্চিয়ান ও ৬৪ মুসলিম আসন পূরণ করে থাকে।

    শুধু তাই নয়, খোদ বাংলায় ১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের ভিন্ন ভিন্ন সাম্প্রদায়িক অবস্থান মেনে নিয়ে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের বৃহত্তম দল স্বরাজ পার্টির নেতা চিত্ত রঞ্জন দাশ বাংলার মুসলিম নেতাদের সাথে বিখ্যাত 'বেঙ্গল প্যাক্ট' স্বাক্ষর করে প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করেছিলেন।

    ঐতিহাসিকগণ বলেন, বাংলার জন্যে এটি দুর্ভাগ্য যে, বাঙালী জাতির এমন একজন মহান নেতা এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক দেড় বছরের ১৯২৫ সালের ১৬ জুন ৫৪ বছর বয়সে মৃত্যুলীন হন। কিন্তু তিনি বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সম্প্রদায়ের পশ্চাৎপদ অবস্থান উপলব্ধি করে তাঁদের জন্যে প্রশাসনে ও চাকুরি ক্ষেত্রে যে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করেছিলেন, তাই ছিলো বাংলার গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রকৃত গ্যারাণ্টি, পরবর্তীতে ভুল নেতৃত্বের ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিলুপ্ত হয় এবং বাঙালী জাতি ভারতীয় উপমহাদেশে পিছিয়ে পড়ে ১৯৪৭ সালে বাংলার বিভক্তির মধ্য দিয়ে।

    ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আমি বলবো, সাম্প্রদায়িকতা সম্পর্কে মুজাহিদুল ইসলামের ধারণা ভ্রান্ত এবং তাঁর এই  তত্ত্বায়ন সম্পূর্ণ ভ্রান্ত যে, 'সাম্প্রদায়িকতা বহাল রেখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না'। আমি আশা করবো তিনি তাঁর ভুল সংশোধন করবেন।

    ভারতীয় অর্থের রূপরেখা
    এই রচনাটি দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে বলে আমি সাম্প্রদায়িকতার ভারতীয় অর্থ সম্পর্কে বিস্তারিত বলছি না। তবে একটি রূপরেখা দিতে চাই, যা আমি পরবর্তী পর্বে বিস্তারিত করবো। আমি সেখানে ব্যাখ্যা করে দেখাবো যে, ঔপনিবেশিক ভারতের হিন্দু-কর্তৃত্বাধীন কংগ্রেস দল সেক্যুলারিজমের কথা বলে বাস্তবে হিন্দু-পুনরুজ্জীবনবাদ চর্চার ফলে ভারতের স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোতে যে ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটে, তার দায়ভার থেকে নিজেদের আড়াল করার জন্যেই তাঁরা ‘কম্যুনালিজম’ বা ‘সাম্প্রদায়িকতা’র ধারণা সামনে নিয়ে আসে।

    প্রকৃত প্রস্তাবে, ব্রিটিশ পুঁজিবাদের সেবা করে গড়ে ওঠা ভারতীয় পুঁজিবাদের পরবর্তী বিকাশের স্বার্থে এর প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেস দলটি মুঘল ও ব্রিটিশ উত্তারাধিকার ধারণ করে একটি সুপ্রা-ন্যাশন বা মহাজাতি গঠনের উদ্দেশ্যে হিন্দুত্বকে গ্রন্থনসূত্র রূপে বিবেচনা করে এর কর্তৃত্বাধীনে বহুধর্মীয় সহশীলতাকে ‘সেক্যুলারিজম’ বলে চালানোর প্রয়োজনে ‘কম্যুনালিজম’কে এণ্টিথিসস হিসেবে আনতে হয়েছিলো।

    বাংলায় এখন যে ‘সাম্প্রদায়িকতা’র কথা বলা হচ্ছে, তাহচ্ছে সেই কংগ্রেসীয় কম্যুনালিজমের ধারাবাহিকতা, যার ফলে ‘সেক্যুলারিজম’ তার সম্পূর্ণ অর্থ হারিয়ে ফেলে ‘ওয়াট ইট ইজ’-এর বদলে ‘ওয়াট ইট ইজ নট' রূপে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ নাম ধারণ করেছে। অর্থের এই নেতিবাচকতা ডেষ্ট্রাক্টিভ বা ধ্বংসাত্মক হলেও কনষ্ট্রাক্টিভ বা সৃষ্টশীল হতে পারে না বলেই আমার ধারণা।

    বাঙালীর বঙ্গানুবাদের বিভ্রাট
    আমি রাজনীতিতে সেক্যুলারিজমের সমর্থক। কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতাকে সেক্যুলারিজম বলা মূর্খতা মনে করি। এমনকি, ধর্মনিরপেক্ষতাও সেক্যুলারিজম নয়। বাঙালী মেকি সেক্যুলারিষ্টগণ একসময় সেক্যুলারিজমকে ধর্মনিরিপেক্ষতা বলে প্রচার করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে তা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারবে ভেবে 'সেক্যুলারিজম'কে 'অসাম্প্রদায়িকতা'য় রিডিউস করে বিষয়টির মূল বোধটি নিঃশেষিত করে দিয়েছেন।

    আমি বস্তুতঃ এই লেখার মাধ্যমে বাঙালীর ভাষাবোধের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে সঠিক জায়গায় আনার চেষ্টা করছি। আমি বলতে চাই, ধর্মীয় বিদ্বেষ বা ধর্মীয় সংঘাতের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে কিংবা লড়তে গিয়ে 'সাম্প্রদায়িকতা'কে কালিমালিপ্ত করা ভুল। সাম্প্রদায়িকতা সম্প্রদায়ের মতোই স্বাভাবিক এবং মানবিকতার মতোই মহৎ।

    আমি চাইবো, সাম্প্রদায়িক ও সাম্প্রদায়িকতা শব্দের সঠিক উপলব্ধি ঘটুক বাঙালী জাতির মধ্যে। কারণ, পৃথিবীতে কম্যুনালিজম বা সাম্প্রদায়িকতা একটি প্রগতিশীল আন্দোলন হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করবে।

    গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কনসেপ্ট ও কনষ্ট্রাক্টের ক্ষেত্রে ইংরেজি বাংলায় রূপান্তরে বাঙালীর আরেকটি ক্ষমাহীন ভ্রান্তি হচ্ছে 'রিপাবলিক'কে ‘প্রজাতন্ত্র’ বলা। এটি একটি মৌলিক ভ্রান্তি। কারণ, রাজা ছাড়া প্রজা হয় না, অথচ বাংলাদেশে আইনতঃ কোনো রাজপরিবার নেই। এ-বিষয়ে আমি আগেও একাধিক লেখায় লিখেছি। অচিরেই আমি এবিষয়ে একটি স্বতন্ত্র রচনা হাজির করবো।

    লেনিনবাদ না লালনবাদ?
    শেষ করার আগে আমি পাঠকদের বাংলার লালনের কমিউন সম্পর্কে ভাবতে বলবো। তাঁর কমিউন ভিত্তিক যৌথজীবন চর্চা বা কম্যুনালিজম ছিলো একটি নৈরাষ্ট্রবাদী ও আপেক্ষিক অর্থে সেক্যুলার দেশজ সামাজিক আন্দোলন, যার রাজনৈতিক তাৎপর্যও প্রণিধানযোগ্য।

    আমার মনে হচ্ছে, আমাদের দেশে লেনিনবাদের বদলে যদি লালনবাদের রাজনৈতিক চর্চা হতো, তাহলে আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা বহুদূর এগিয়ে গিয়ে অতীতের সেই পাল যুগের মতোই আজ বিশ্বকেও আলোকিত করতে পারতো।

    শনিবার ৪ এপ্রিল ২০১৫
    লণ্ডন, ইংল্যাণ্ড

     

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

দারুন লিখেছেন

I think the Bangladeshi minorities are deprived of their rights of getting public jobs. They were not considered in Pakistan period. They were not considered in Mujib tenure. Zia and Ershad, both were against minorities. Khaleda Zia's time was so pathetic. Now a days if we have the Top most judge is Hindu, so many Majority Muslims are against it. Every example they give is comparing with the neighbouring country India. But India had minority prime minister from Sikh community and President from Muslim community at the same time. Bangladeshi people can never be as generous as Indians. Silent communalism is going in Bangladesh. This the Bangladeshi Minorities bad luck being Minority in Muslim majority country.

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন