• সিরিয়ার অন্তঃস্থ সঙ্কটের বহিঃস্থ কারণ
    মাসুদ রানা

    সিরিয়ার সঙ্কট যতোটুকু না অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলরূপে দৃষ্ট, প্রকৃত প্রস্তাবে তার চেয়ে অধিক পরিমাণে বহিঃস্থ একাধিক কারণে সৃষ্ট। এ-কারণসমূহের প্রধানতমটি হচ্ছে, শক্তি প্রদায়ক প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহী আন্তর্জাতিক পাইপলাইন স্থাপনা নিয়ে পরস্পর বিরোধী বহিঃশক্তিসমূহের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। আর, সিরিয়া হচ্ছে সে-দ্বন্দ্বের ঘটনা-মঞ্চ।

    যে-কোনো দেশের মতোই সিরিয়াতেও রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের প্রশ্নে পরস্পর বিরোধী শক্তির উপস্থিতি ছিলো এবং আছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মতো সেখানেও বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত প্রকরণে বিভক্তি আছে এবং তাদের মধ্যে স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও ঐক্য-মিলনও আছে।

    আড়াই বছর আগে রূপতঃ আরব-বসন্তের হাওয়া সিরিয়াতেও লেগেছিলো এবং সেখানে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে গণ-আন্দোলনও হয়েছিলো। সে-আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় সিরিয়ার রাষ্ট্রটি অন্যান্য যে-কোনো রাষ্ট্রের মতোই আচরণ করেছে ও কিছু মানুষ হতাহত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত নতুন সংবিধান প্রস্তাবিত ও গণভৌটের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে। কিন্তু তারপরও দ্বন্দ্বের অবসান হয়নি।

    সিরিয়ায় গণ-আন্দোলনের গণতন্ত্রকামী জনগণকে পেছনে ফেলে ইসলামবাদীরা সশস্ত্র বিদ্রোহ করেছে। সিরিয়ার রাষ্ট্র-পক্ষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদেরকে আঞ্চলিক পর্যায়ে কাতার, তুরষ্ক, মিসর, সৌদি আরব, জর্ডান, ইসরায়েল, আল-কায়েদা ইত্যাদি এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে ফ্রান্স, ব্রিটেইন, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ নৈতিক, আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা দিচ্ছে। বিপরীতক্রমে, সিরিয়ার পক্ষে দাঁড়িয়েছে আঞ্চলিক পর্যায়ে ইরান, ইরাক ও লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাশিয়া, চীন, ব্রিকস্‌ জোট ইত্যাদি।

    বিদ্রোহী-পক্ষ বলছে, সিরিয়ার প্রেসিডেণ্ট বাশার আল-আসাদ হচ্ছে এক নৃশংস একনায়ক, তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে। আর, সরকারী পক্ষের দাবি হচ্ছে, বিদ্রোহীরা সাংবিধানিক সরকার ও রাষ্ট্রের  বিরুদ্ধে বিদেশী মদতে সন্ত্রাস করছে, তাঁদেরকে তা বন্ধ করতে হবে। বলাবাহুল্য, স্ব-স্ব পক্ষের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও কমবেশি একইভাবে বিভক্ত হয়ে অবস্থান নিয়েছে।

    সিরিয়ার বিবিধ ধর্মীয় ও জাতিগত বুননের মধ্যে প্রায় এক শতাব্দী আগে ফরাসী উপনিবেশবাদ একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে যে এক ধরণের যান্ত্রিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো, তা-ই গত শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদের হাতে অর্পিত হয় অপরিবর্তিত মৌলিক চরিত্র সহকারে। আর সে-কারণেই, রাষ্ট্রের রূপটি রাজতান্ত্রিক হোক কিংবা জনতান্ত্রিকই হোক, সর্বক্ষেত্রেই তার স্বৈরতান্ত্রিকতা অক্ষুন্ন থাকে।

    বিকাশের ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ হিসেবে রাজতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে আদর্শ হয় ধর্মবাদ এবং জনতন্ত্রের পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ। কারণ, রাজতন্ত্রে রাজ সার্বভৌম হন ঈশ্বরের আশীর্বাদে, আর জনতন্ত্রে শাসক সার্বভৌমত্ব ধারণ করে জাতির প্রতিভূ রূপে। সামন্ত সংস্কৃতির সমাজে রাষ্ট্রীয় কাঠামো রাজতান্ত্রিকই হোক, আর জনতান্ত্রিকই হোক, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতিতে সেখানে পরিবারতন্ত্র কিংবা গোষ্ঠীতন্ত্র দেখা দিতে বাধ্য। তাই, জনতন্ত্র হওয়া সত্ত্বেও, পারিবারিক-সূত্রে শাসনের রীতি শুধু সিরিয়াতে নয়, বরং এশিয়ার ও আফ্রিকার প্রায় সর্বত্র পরিদৃষ্ট।

    পরিবারতন্ত্রের এই রূপ বিশ্বের তথাকথিত বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে গর্বিত ভারত থেকে শুরু করে দুই পরিবারের কলহ-কলঙ্কিত বাংলাদেশও আছে। সুতরাং, হাফিজ আল-আসাদের পর তাঁর পুত্র বাশার আল-আসাদ শাসিত সিরিয়া কোনো সৃষ্টিছাড়া রাষ্ট্র নয়।

    সিরিয়ার জনগণ যদি ধর্ম-নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আসাদের একনায়কী শাসনের অবসান চাইতেন, তাহলে সেটি প্রগতির পক্ষে যেতো। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনে ও ধর্মবাদের ভিত্তিতে সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তন দেশটিকে অধিকতর প্রতিক্রিয়ার দিকে চালিত করতে বাধ্য। বিষয়টির সাধারণ উপলব্ধির জন্য ইরাক ও লিবিয়ার উদাহরণই যথেষ্ট।

    সিরিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলনটিকে ইউরো-মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহিঃস্থ শক্তি কেনো ধর্মবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহের দিকে চালিত হতে সহায়তা করলো? এ-প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে এ-লেখার প্রথম অনুচ্ছেদে উল্লেখিত আন্তর্জাতিক গ্যাস পাইপলাইনের দ্বন্দ্বটি বুঝতে হবে।

    এ-মুহূর্তে ইউরোপে জ্বালানী হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের একচেটে সরবরাহী দেশ হচ্ছে রাশিয়া। গ্যাস সরবরাহে রাশিয়ার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব দৃষ্টে ইউরোপের প্রবল-প্রতিপত্তির দেশগুলো ভীত ও ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছে। এ-ভীতি ও ঈর্ষার পেছনে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কারণ বর্তমান।

    উক্রাইনের যে-পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে রুশ গ্যাস সরবরাহিত হয়, ২০০৮ সালের নববর্ষে দর নিয়ে দ্বন্দ্বে সে-পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ করে দেয় রাশিয়া। তীব্র শীতের মধ্যে গ্যাসের অভাবে দারুণ সঙ্কটে পড়ে প্রায় সমগ্র পূর্ব ও মধ্য ইউরোপ। সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয় ইউরোপের অনেক গ্যাস-নির্ভর কারখানা এবং কমাতে হয় গৃহস্থালীর ব্যবহারও। দু'সপ্তাহেরও অধিককাল পরে সমাধান হয় সে-সঙ্কটের। ২০০৬ সালেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিলো উক্রাইন ও রাশিয়ার মধ্যে। রাশিয়ার গ্যাসের উপর নির্ভরতা কমাতে তাই ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন বিকল্প গ্যাসের সরবরাহ পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে।

    ১৯১৭ সালে রাশিয়া সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে ১৯৯১ সালে সমাজতন্ত্রের বিলুপ্তি পর্যন্ত প্রায় পৌনে-শতো বছর ধরে ইউরোপের প্রবল শক্তিসমূহ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার প্রতি তীব্র বিরুদ্ধতা চর্চা করে অভ্যস্ত  হয়ে উঠেছিলো। সাধারণতঃ জাতিসমূহের মধ্যে একবার দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলে, তাতে যে-মনোভাব গড়ে ওঠে, তা সহজে তিরোহিত হয় না। এ-মনোভাবটি আরও তীব্র হয়েছে দীর্ঘকাল যাবত বিশ্বের দুই পরাশক্তি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শীতল যুদ্ধ চলার কারণে। শীতল যুদ্ধ-কালে একদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে পরস্পর-বিরোধী শিবির গড়ে উঠেছিলো, তা বিশ্বরাজনীতির বর্তমান মেরুকরণে এখনও ক্রিয়াশীল রয়েছে - যদিও মার্কিন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক আদর্শের লড়াইটি আর নেই।

    সমাজতন্ত্র না থাকলেও, সমাজতন্ত্র রাশিয়াকে যে শক্তি, মেধা, মর্যাদা ও গৌরব দিয়েছিলো, তার অবশেষ ও স্মৃতি শ্রেণী-নির্বেশেষে রুশ জনগণের মনে নষ্টালজিয়া হয়ে এখনও এক বিশেষ আত্মপরিচয় দানের মধ্য দিয়ে বিশ্ব পরিমণ্ডলে তার ‘প্রাপ্য’ ভূমিকা পালনে উদ্বুদ্ধ করে। আর, সে-কারণেই রাশিয়া সর্বোতোভাবে পুঁজিবাদে ফিরে গেলেও কোনোভাবেই মার্কিন শিবিরের বন্ধু হতে পারে না, কিংবা মার্কিন শিবির তাকে বন্ধু হিসেবে নেয় না।

    ইউরোপের গ্যাসের বাজারে রাশিয়ার একচেটে অধিকার ও রাশিয়ার উপর ইউরোপের নির্ভরশীলতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে গত এক দশকেরও অধিক কাল যাবত একটি পাইপলাইন প্রকল্প ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতায় বাস্তবায়িত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। পাইপলাইনটির নাম নাবুক্কো ওয়েস্ট পাইপলাইন বা টার্কি-অস্ট্রিয়া গ্যাস পাইপলাইন, যার বর্তমান মালিক ছয়টি দেশের ছয়টি কোম্পানীর সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম। নাবুক্কো নামটিও এসেছে ইতালির ভেনিসে ২০০২ সালে মিলিত হওয়া ঐ কোম্পানীগুলোর কর্তাব্যক্তিদের একসাথে ঊনিশ শতকের বিখ্যাত কম্পৌজার জুসেপে বার্দির বিখ্যাত 'নাবুক্কো' অপেরা উপভোগের স্মৃতি থেকে।

    নাবুক্কো কনসোর্টিয়ামে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানীগুলো হচ্ছে অষ্ট্রিয়ার 'ওএমভি', তুরষ্কের 'বোটাস', হাঙ্গেরির 'এমওএল', বুলগেরিয়ার 'বুলগারগ্যাজ়', রুমানিয়ার 'ট্র্যান্সগ্যাজ়' ও জার্মানীর 'আরডব্লিউই'। নাবুক্কো পাইপলাইনের যাত্রা শুরু হয় প্রথমে অষ্ট্রিয়া ও তুরষ্কের উদ্যোগে ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারীতে। পরবর্তীতে, একই বছরের জুন মাসে যুক্ত হয় উপরের তালিকার জার্মানী ছাড়া বাকি ৪টি এবং সবশেষে ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারীতে যুক্ত হয় জার্মানীও।

    ২০০৯ সালের জুলাইয়ে তুরষ্কের রাজধানী আঙ্কারাতে নাবুক্কো কনসোর্টিয়ামের  দেশগুলোর প্রধানমন্ত্রীগণ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। আর, সেখানে উপস্থিত হয়ে নাবুক্কো পাইপলাইন প্রকল্পকে সমর্থন করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি বিষয়ক ও বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিগণ এবং ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের প্রেসিডেণ্ট ও এনার্জি বিষয়ক কমিশনার।

    নাবুক্কো পাইপলাইন মূলতঃ ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহের বিকল্প প্রকল্প হিসেবে, রাশিয়াকে বাজার থেকে হঠাবার উদ্দেশ্যে তুলনামূলকভাবে স্বল্প মূল্যে গ্যাস সরবরাহ করবে ঘোষণা করে এবং সরবরাহের উৎস হিসেবে ইরাক, আজারবাইজান, তুর্কেমেনিস্তান ও মিসরের গ্যাস ক্ষেত্রে কথা বিবেচনা করা হয়। তবে, এতে ইরানের পক্ষ থেকে গ্যাস সরবরাহের প্রস্তাব এলে, তুরষ্কের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির মুখে তা প্রত্যাখ্যাত হয়।

    এ-পরিস্থিতিতে রাশিয়া উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ইউরোপে তার গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির জন্য নাবুক্কোর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ২০০৭ সালের জুনে 'সাউথ স্ট্রীম' নামে একটি পাইপলাইন প্রকল্পের ঘোষণা দেয়। সাউথ স্ট্রীম পাইপলাইন রাশিয়ার গ্যাসক্ষেত্র থেকে শুরু করে কৃষ্ণসাগরের তলদেশ দিয়ে বুলগেরিয়া হয়ে দক্ষিণে গ্রীস ও ইতালিতে প্রবেশ করবে এবং উত্তরে সার্বিয়া হয়ে হাঙ্গেরি ও স্লৌভেনিয়া হয়ে যাবে অষ্ট্রিয়াতে।

    অর্থাৎ, সমীকরণটি হচ্ছেঃ ইউরো-মার্কিনীদের পক্ষ থেকে ইউরোপের গ্যাস সরবরাহের বাজার থেকে রাশিয়াকে হঠাবার উদ্দেশ্যে নাবুক্কো পাইপলাইন প্রকল্প ঘোষণা করলে, তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে রাশিয়া সাউথ স্ট্রীম পাইপলাইন প্রকল্প নিয়ে আসে এবং দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলে এবং এতে নাবুক্কো প্রকল্প ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। কারণ, নাবুক্কো পাইপলাইন যে আজারবাইজানের ক্যাস্পিয়ান সাগরের শাহ ডেনিজ গ্যাসক্ষেত্রকে হিসেবে রেখে প্রকল্পিত হয়েছিলো, তা কখনও নিশ্চিত হয়নি।

    অনিশ্চিয়তার পেছনে সম্ভাব্য কারণ হতে পারে এই যে, শাহ ডেনিজ
    গ্যাসক্ষেত্রটি ব্রিটিশ কোম্পানী 'বিপি', নরওজিয়ান কোম্পানী 'স্ট্যাটওয়েল',
    আজারবাইজানী কোম্পানী 'সোকার', ফ্রেঞ্চ কোম্পানী 'টৌট্যাল এসএ' ও  তুর্কী
    কোম্পানী টিপিএ্যাও'র সাথে ইরানী কোম্পানী 'নাইওক' ও রুশ কোম্পানী 'লুকওয়েল'-এরও
    মালিকানা ছিলো (সর্বশেষ খবরে জানা যায়, এ-বছরের জুন মাসে শাহ ডেনিজ
    নাবুক্কোর পরিবর্তে সুইস কোম্পানীর ট্র্যান্স-এ্যাড্রিয়াটিক পাইপলাইনের
    সাথে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে)।

    ইউরোপীয় নাবুক্কো বনাম রুশ সাউথ স্ট্রীম গ্যাস পাইপলাইন

    এ-পরিস্থিতিতে নাবুক্কো পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এগিয়ে আসে কাতার। ইরানের সাথে সীমান্ত-শরিকানায় পারস্য উপসাগরে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পার্স ও নর্থ ডৌম থেকে গ্যাস উত্তোলনের পর যে উচ্চমূল্যে তরলিত করে বিদেশে রফতানি করতো, সে-গ্যাসকে নাবুক্কো পাইপলাইনে সরবরাহের উদ্দেশ্যে সেখান থেকে সৌদি আরব, জর্ডান ও সিরিয়া হয়ে তুরষ্ক পর্যন্ত একটি নতুন পাইপলাইনের চিন্তা করে। ২০০৯ সালে কাতার ও তুরষ্কের শীর্ষ নেতৃত্ব এ-ঘোষণা দেন।

    ২০১০ সালে সিরিয়ার কাছে কাতারের প্রস্তাব হাজির করা হলে, প্রকল্পটি সিরিয়ার মিত্রদেশ রাশিয়ার স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে বলে দেশটির প্রেসিডেণ্ট বাশার আল-আসাদ  প্রত্যাখ্যান করেন। বিষয়টি কাতার, তুরষ্ক, জর্ডান ও সৌদি আরব-সহ ইউরো-মার্কিনীদের হতাশ করে।

    কিন্তু এক বছর পর একই পারস্য উপসাগরের সাউথ পার্স ও নর্থ ডৌম গ্যাসক্ষেত্রের ইরানী শরিকানাধীন অংশ থেকে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন হয়ে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহের উদ্দেশ্যে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের জন্য সিরিয়া, ইরাক ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে কাতার, তুরষ্ক, জর্ডান, সৌদি আরব ও তাদের ইউরো-মার্কিন মিত্ররা সাংঘাতিক ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

    সংবাদ-মাধ্যমে ঘোষিত না হলেও, ইরান-ইরাক-সিরিয়া-লেবানন পাইপলাইন যে ইউরোপে তেল সরবরাহ করতে গিয়ে বস্তুতঃ রাশিয়ার নির্মাণাধীন সাউথ স্ট্রীমের সাথে মিলিত হবে এবং এর ফলে যে নাবুক্কো প্রকল্পকে অসম্ভব করে তুলবে, তা বুঝতে সংশ্লিষ্ট কারও আর বাকি থাকলো না। আর, এখান থেকেই সিরিয়ার প্রেসিডেণ্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের জন্য ইউরো-মার্কিন ও তাদের মধ্যপ্রাচ্য-মিত্রদের মধ্যে এক রাজনৈতিক ও সামরিক প্রকল্প গৃহীত হয়।

    তুরষ্ক যে সিরিয়ার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হয়েছে, কাতার যে সিরিয়ার বিদ্রোহের পক্ষে ইতোমধ্যে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করেছে, কিংবা 'ফ্রেণ্ডস অফ সিরিয়া' নামে যে শক্তিসমূহ বিদ্রোহীদের 'সাহায্য' করেছে ও করছে তার সবগুলোই সেই প্রকল্পেরই অংশ। বর্তমানে সিরিয়া-সঙ্কট বলে আমরা পশ্চিমের প্রতিপত্তিশালী গণমাধ্যমে যা দেখশুনপড়ছি, তাকে বুঝতে হবে সে-আলোকেই। সুতরাং, সিরিয়ার সঙ্কট যে সিরিয়ার ভেতরের চেয়েও অনেক বেশি বাইরের কারণে সৃষ্ট, তা উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত।

    সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

পাঠকের প্রতিক্রিয়া

সুন্দর বিশ্লেষণ

অসাধারণ এই লেখাটার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন