• সিরিয়া-সমঝোতাঃ বিদায়, বিশ্বের একমেরুতা!
    মাসুদ রানা

    বিশ্ব-রাজনীতির সাম্প্রতিক ইতিহাসে গত পঁচিশটি দিন ছিলো অসাধারণ! কারণ, সিরিয়া-সঙ্কট ও এর নিরসন প্রচেষ্টাকে ঘিরে এ-পঁচিশ দিনের ঘটনাসমূহ বিশ্বরাজনীতিতে শক্তির ভারসাম্যে মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, সিরিয়াতে গত ২১শে অগাষ্ট সরকারী রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে মর্মে অভিযোগ এনে, দেশটির ওপর মার্কিন-আক্রমণের হুমকি-দান থেকে আজ ১৪ই সেপ্টেম্বর সুইৎজারল্যাণ্ডের জিনিভাতে সিরিয়া বিষয়ে রুশ-মার্কিন চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে হুমকি-প্রত্যাহার পর্যন্ত যে-ঘটনাবৃত্ত, তা বিশ্ব-রাজনীতির দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত ইউনিপোলারিজম বা একমেরুতাকে পাল্টে দিয়েছে।

    ১৯৯১ সালে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ফলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পৃথিবী একমেরুতার মধ্যে দু’দশকেরও অধিক কাল অতিবাহিত করার পর গত পঁচিশ দিনে এই প্রথমবারের মতো দ্বিমেরুতায় (কিংবা বহুমেরুতায়) প্রবেশ করলো। বিশ্ব-রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হেড-টু-হেড বা সমানে-সমানে এলো সোভিয়েত প্রতিপত্তির স্মৃতি-ধারক রাশিয়ান ফেডারেশন। সিরিয়াকে নিয়ে যুদ্ধংদেহী মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রকে রূপতঃ মুখে লাগাম টেনে ঠায় খাড়া করিয়ে দিলো রাশিয়া।

    এতোদিন যাবৎ ‘উইথ আস্ অর এ্যাগেইনষ্ট আস্’ বলে ইউরোপীয় সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব-রাজনীতিতে দাপিয়ে বেড়িয়ে যে ইরাক-লিবিয়া-আফগানিস্তানের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে, অদ্য সম্ভবতঃ তার অবসান হলো। সেইণ্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন থেকে শুরু করে গত তিনদিন ধরে জিনিভাতে কূটনৈতিক লড়াই শেষে, আজ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সাথে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভ্রভের সমান-সমান অবস্থান থেকে চুক্তি সম্পাদন ও ঘোষণা তা-ই নির্দেশ করেছে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুরনো সাম্রাজ্য-সমূহের সাম্রাজ্য-শক্তি নিঃশেষিত হলে, দু’টি যুক্তরাষ্ট্রীয় দেশ দু'টি বিপরীত মেরু গঠন করে নতুন শক্তি-ভারসাম্য গড়ে তোলে। এদের একটি হচ্ছে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যটি সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন।

    সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান ও পতনের কার্য-কারণের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এক অতিকায় বিষয়, যার উপযুক্ত স্থান এটি নয়। তবে এখানে এটি বলা প্রাসঙ্গিক হবে যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, তার সম্পদ, জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রকৌশল, শক্তি, সাহস ও কৃতিত্বের সিংহভাগ কিন্তু রাশিয়ান ফেডারেশনই লাভ করে। আজও রাশিয়াই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র, যেটি সোভিয়েত-পতনের অব্যবহতিকালে সঙ্কটাপন্ন হলেও দু-দশকের মধ্যে সে-নিজেকে সমস্ত দিক থেকে শক্তিশালী করে নিয়েছে। কারণ, শক্তিশালী হওয়ার মতো রসদ, মেধা, দক্ষতা ও প্রেষণা সে সোভিয়েত-উত্তরাধিকার হিসেবে লাভ করে নতুন আত্মপরিচয়ে বলীয়ান হয়ে ওঠে। গোটা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে দৃশ্যতঃ দু'টি দশক লেগেছে রাশিয়ার। তার এই নব-উত্থানই গত পঁচিশ দিনের সিরিয়া-সঙ্কট সংক্রান্ত ঘটনাবৃত্তে প্রতিভাত হয়েছে।

    সিরিয়া-সঙ্কট বুঝতে হলে আমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বুঝতে হবে। যাঁরা আমার লেখা ‘সিরিয়ার অন্তঃস্থ সঙ্কটের বহিঃস্থ কারণ’ পড়েছেন, তাঁরা নিশ্চয় বুঝবেন যে, সিরিয়ার সঙ্কটের মূলে আছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব। এর একপক্ষে আছে ফ্রান্স, ব্রিটেইন, তুরষ্ক, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান, ব্রাদারহূডের মিসর, ইসরায়েল, ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সুন্নি-জঙ্গী আল-কায়েদা। অন্যপক্ষে আছে রাশিয়া, ইরান, ইরাক, লেবানন, চীন, ব্রিকস্ জোট ও শিয়া-জঙ্গী হিজবুল্লাহ।

    সিরিয়া সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের মূলে আছে পারস্য উপসাগরের গ্যাসক্ষেত্র, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং যা ভৌগলিক সীমানার কারণে কাতার ও ইরানের মালিকানাধীন (ইরানের চেয়ে কাতারের অংশ বেশি)। সিরিয়া-দ্বন্দ্বের প্রথম পক্ষের চাওয়া হচ্ছে কাতারের মালিকাধীন গ্যাসকে কাতার-সৌদি আরব, জর্ডান, সিরিয়া হয়ে তুরষ্কের মধ্য দিয়ে ইউরোপে নিয়ে যাওয়া এবং তুর্কী-ইউরোপ প্রস্তাবিত ও ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত নাবুক্কো ওয়েস্ট পাইপলাইনের সাথে যুক্ত করে বাজারজাত করা। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে ইউরোপে গ্যাসের বাজারে বর্তমানে রাশিয়ার যে-একাধিপত্য রয়েছে, তা খর্ব করা এবং সম্ভব হলে তা নিশ্চিহ্ন করা। বিপরীতক্রমে, দ্বিতীয় পক্ষ চায়, ইরানের মালিকাধীন উপসাগরীয় গ্যাস ইরান-ইরাক-সিরিয়া-লেবানন হয়ে ইউরোপে নেওয়া এবং রাশিয়ার বর্তমান ও নির্মাণাধীন পাইপলাইন সাউথ স্ট্রীমের সাথে যুক্ত করে গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা।

    আমাদের যা বুঝা দরকার, তা হলোঃ সিরিয়ার ভৌগলিক অবস্থান এমনই-যে, সিরিয়াকে এড়িয়ে গিয়ে কাতারের কিংবা ইরানের গ্যাস সহজে তুরষ্কে কিংবা ইউরোপে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ-কারণেই সিরিয়ার এতো ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব। আর, সিরিয়ার ভূ-রাজনৈতিক এ-গুরুত্বের কারণেই সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বিশ্বশক্তি-সমূহের দ্বন্দ্বের সাথে অনিবার্যভাবে জড়িয়ে পড়েছে। আর, দ্বন্দ্বের নিয়মানুসারে দ্বন্দ্বের শীর্ষে মুখোমুখী অবস্থান নিয়ে আবির্ভুত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার একমাত্র প্রকৃত ও সমান প্রতিদ্বন্দ্বী রাশিয়ান ফেডারেশন।

    বস্তুতঃ সিরিয়া-সঙ্কটের সূত্রপাত হয়েছে প্রথমতঃ ২০১০ সালে কাতার ও তুরষ্কের প্রস্তাবে সিরিয়ার রাজি না হওয়ায় এবং দ্বিতীয়তঃ ২০১১ সালে ইরান, ইরাক ও লেবাননের সাথে পাইপলাইন চুক্তি স্বাক্ষর করায়। এই রাজি-গররাজির মধ্যে সিরিয়া যখন রাশিয়ার স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিতে অপরাগতা প্রকাশ করলো, তাতে মার্কিন মেরুর বিশ্ব-শক্তিসমূহ সিরিয়া বিরোধী অবস্থানে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে।

    লক্ষ্য করার মতো ঘটনা হচ্ছে, কাতারের উচ্চাকাঙ্খা ও উত্থান। মার্কিন ও ইউরোপীয় মদতে মধ্যপ্রাচ্যে কাতার অনেকটা ইউরোপে ইংল্যাণ্ডের মতো ক্ষুদ্র দ্বীপদেশ হয়েও অত্যন্ত উচ্চাকাঙ্খী, শক্তিশালী, যুদ্ধংদেহী ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লিবিয়ায় গাদ্দাফিকে ক্ষমতা থেকে হঠিয়ে ও হত্যা করিয়ে কাতারের উচ্চাকাঙ্খা ও আত্মবিশ্বাস রূপতঃ মহাকাশস্পর্শী হয়ে উঠেছে। আর, সে-কারণেই সিরিয়াকে শায়েস্তা করার ক্ষমতা রাখে বলে কাতার বিশ্বাস করতে শুরু করে। সিরিয়ার বিদ্রোহীদেরকে কাতারের বিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারের অর্থ ও অস্ত্র সাহায্যের মূলে আছে তার সেই বিশ্বাস।

    তবে, লিবিয়ার সাথে সিরিয়ার মৌলিক ঐতিহাসিক, ভৌগলিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য থাকার পাশাপাশি বহির্বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সম্পর্কের অনেক পার্থক্যও আছে। সাদ্দাম হুসেইনের ইরাক ও মুয়াম্মার গাদ্দাফির লিবিয়া ছিলো বন্ধুহীন, কিন্তু বাশার আল-আসাদের সিরিয়া তা নয়। তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে সিরিয়ার সাথে রাশিয়ার সামরিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। তাই রাশিয়ার পক্ষে সিরিয়াকে ইউরো-মার্কিন-আরব-তুর্কী-ইসরায়লের হাতে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

    আমাদের আরও বুঝতে হবে যে, সিরিয়া-সঙ্কট নিয়ে দ্বন্দ্বরত দু’পক্ষের মধ্যে অস্ত্রযুদ্ধ না হলেও মস্ত একটা স্নায়ুযুদ্ধ ইতোমধ্যে হয়ে গিয়েছে এবং সে-যুদ্ধে ইউরো-মার্কিন-তুর্কী-আরব-ইসরায়েল পক্ষ রুশ-চীন-ইরান-সিরিয়া পক্ষের কাছে পরাজিত হয়েছে। ইউরো-মার্কিন-আরব-তুর্কী-ইসরায়েলী পক্ষ পরাজিত হয়েছে বলেই ‘বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতেই হবে’ দাবি ক্রমশঃ ‘সীমিত মিসাইল মেরে আসাদের ক্ষমতা খর্ব করে তাকে শাস্তি দিতে হবে’ এবং বর্তমানে ‘আসাদকে তার সমস্ত রাসায়নিক অস্ত্র ত্যাগ করতে হবে’তে গিয়ে ঠেকেছে।

    বিশ্বের প্রায় সব রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানেন যে, গত সপ্তাহে রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে সিরিয়া আক্রমণ-অনাক্রমণ দ্বন্দ্বে ইঙ্গ-ফরাসী-মার্কিন নেতৃত্ব কী শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। গত সপ্তাহে আটলাণ্টিকের দু’পারের ডজন-ডজন পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে ইউরো-মার্কিনীদের পরাজয়ের গ্লানি ও চীন-রুশদের বিজয়-গৌরব বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করে।

    খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে, এই জয়-পরাজয়ের কারণ দ্বিবিধ। প্রথমতঃ ইউরো-মার্কিনীরা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে মিথ্যার পক্ষে দাঁড়িয়েছে বলে তারা তাদের 'কেইসটা' সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করতে পারেনি। দ্বিতীয়তঃ ও প্রধানতঃ সিরিয়া-সঙ্কট নিয়ে সম্ভাব্য যুদ্ধের কষিত সামরিক-সমীকরণে তারা তাদের পরাজয়ের অনিবার্যতা বুঝতে পেরে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে।

    বুদ্ধিমান ব্রিটেইন আগেই বুঝতে পেরেছে বলে পার্লামেণ্টে প্রধানমন্ত্রী ডেইভিড ক্যামেরোনকে থামিয়ে দিয়েছে। ব্রিটেইনের থামা লক্ষ্য করে মার্কিন প্রেসিডেণ্ট ওবামাও ‘আমাকে থামাও’ ইঙ্গিত দিয়ে কংগ্রেসের শরণাপন্ন হয়েছেন। ফরাসীরাও একই কাজ করেছে। রূপতঃ এঁদের মনের প্রকৃত কথা হচ্ছে, না থামালে নিজেই থেমে যাবো কিন্তু!

    এখানে স্থানের অভাবে আমি সিরিয়া-সঙ্কটের সামরিক সমীকরণটি আর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করছি না। তবে পাঠকদের স্মরণ করতে বলবো, গত ৩রা সেপ্টেম্বরে ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েল-মার্কিন যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিষয়টি। ইসরায়েল-মার্কিন শক্তি চুপিসারে ভূমধ্যসাগরে তাদের স্প্যারৌ ও এ্যারৌ মিসাইল ও ইণ্টারসেপশন সিস্টেম উৎক্ষেপণের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছিলো সিরিয়াতে বিজয়ী হওয়া যাবে কি-না। এটি হচ্ছে সামরিক আক্রমণের আগে শত্রুর সতর্কাবস্থা বুঝার জন্য ঝোপের মধ্যে ঢিল ছোঁড়ার মতো অনুশীলন।

    আমরা কী লক্ষ্য করলাম? লক্ষ্য করলাম, সাথে-সাথে রাশিয়া বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলো যে, তার রেইডার সিস্টেম ভূমধ্যসাগর থেকে দু’টি ‘বস্তু’ উৎক্ষিপ্ত হয়েছে বলে পাঠ করেছে। ইসরায়েলী-মার্কিনীরা প্রথমে অস্বীকার করলো, কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্বীকার করে বললো, এটি পূর্ব-নির্ধারিত স্বাভাবিক রুটিনের অংশ। বটে! এটিই হচ্ছে টার্নিং পয়েণ্ট। বাকিগুলো কথার কথা।

    ইউরো-মার্কিন-আরব-তুর্কী-ইসরায়লীর বুঝে গেলো, যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে রুশ-চীন-ইরান-ইরাক-হিজবুল্লাহ সমর্থিত সিরিয়াতে আক্রমণ করে সফল তো হওয়া যাবেই না, বরং নিশ্চিত পরাজয়ের গ্লানি বহন করে মান-মর্যাদা খোয়াতে হবে। তাই, যুদ্ধ করে নিশ্চিত পরাজিত হওয়ার চেয়ে ‘ঠিক আছে, এবারের মতো ছেড়ে দিলাম’ বলে ক্ষান্ত হওয়া ঢের ভালো।

    প্রেসিডেণ্ট পুতিন খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন যে, তাঁর ইউরো-মার্কিন প্রতিপক্ষ পরাজয় মেনে নিয়েছে। তাই তিনি ব্রিটেইন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গর্ব ধূলিসাৎ করে কথা বলেছেন। তিনি মার্কিনীদের অভব্য ও মিথ্যাবাদী বলে চিহ্নিত করেছেন। গত ৫ই সেপ্টেম্বর পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সিরিয়া বিষয়ে মার্কিন সেনিটের কাছে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির দেওয়া সাক্ষ্যে বিদ্রোহীদের মধ্যে আল-কায়েদা না থাকার দাবি নির্দেশ করে রাশিয়ার প্রেসিডেণ্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক সাক্ষাতকারে বলেছেন যে, মার্কিনীরা মিথ্যা কথা বলছে।

    পুতিনের ভাষায়ঃ  "অবশই তাঁরা সুন্দরভাবে মিথ্যা কথা বলেন...এটি আমার জন্য আশ্চর্য্যের ও পরিতাপের বিষয় যে, আমরা এঁদেরকে ভদ্রলোক মনে করে এগিয়ে যাই ও কথা বলি। কিন্তু তিনি (জন কেরি) মিথ্যা কথা বলছেন এবং তিনিও জানেন যে তিনি মিথ্যা কথা বলছেন। বিষয়টি দুঃখজনক"। পাঠক লক্ষ্য করুন, পুতিন ‘এঁরা’ বহুবচন-সর্বনাম ব্যবহার করে শুধু জন কেরিকে নির্দেশ করেননি, প্রেসিডেণ্ট ওবামা এবং সম্ভবতঃ তাঁর ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয় মিত্রদের, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ডেইভিড ক্যামেরোন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেইগকেও মিথ্যাবাদী বলে ইঙ্গিত করে থাকবেন।

    রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রকের জুনিয়র অফিসারকে দিয়ে ব্রিটেইনকে ‘ক্ষুদে দ্বীপ’ বলে বাতিল করে দিয়েছেন পুতিন। বিষয়টি নিতান্ত রসিকতা ছিলো না বলেই প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরোনের মুখ লাল ও লম্বা হয়ে গিয়েছিলো এবং তাঁর ক্ষুদ্রতা ঢাকার জন্য সম্ভবতঃ হীনতমন্যতা বশে দাঁড়িয়ে বললেন, "হ্যাঁ, হতে পারে ব্রিটেইন ক্ষুদে দ্বীপ, কিন্তু আমাদের চেয়ে অধিক গর্বিত জাতি আর কারা আছে?" শুধু তাই নয়। মায়ের কাছে মাসীর বাড়ীর গল্প বলার মতো ক্যামেরোন বললেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপকে নাকি ব্রিটেইন ফ্যাসিবাদ-মুক্ত করেছিলো।

    যে-সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে নাৎসী জার্মানীর পরাজয় হয়েছিলো এবং যে-সোভিয়েত ইউনিয়নের দু’কোটি প্রাণহানি হয়েছিলো, প্রাক্তন সে-সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্মস্থান রাশিয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এ-কথা বলাতে ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকগণই লজ্জিত হয়ে গেলেন। তাই, ক্যামেরোনের প্রতিটি দাবিকে মিথ্যা প্রমাণিত করে ব্রিটেইনের এক লেখক দৈনিক গার্ডিয়ানে কলাম লিখলেন।

    যাঁরা বিশ্বরাজনীতি ও কূটনীতি বিষয় সম্পর্কে অবহিত, তাঁরা নিশ্চয় বুঝবেন যে, রাশিয়ার প্রেসিডেণ্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে এমন সুনির্দিষ্টভাবে মিথ্যা কথা বলার অভিযোগ করতে পারেন কোন্ পরিস্থিতিতে? আর কোন্ পরিস্থিতিতেই বা বিশ্বের সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রটি সে-অভিযোগের বিরুদ্ধে টুঁ-শব্দটি করে না? এটি নিশ্চয় বাংলাদেশের হাসিনা-খালেদার কলহের মতো ব্যাপার নয়। বিষয়টি অবশ্যই গম্ভীর।

    রুশ প্রেসিডেণ্ট পুতিন মার্কিনীদের শুধু-শুধুই মিথ্যাবাদী বলেননি, তিনি সিরিয়ায় ব্যবহৃত রাসায়নিক অস্ত্রের রাশিয়ার বৈজ্ঞানিক তদন্তের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সমেত প্রতিবেদন জাতিসংঘের কাছে দাখিল করেছেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রমাণ হাজির করার জন্য চ্যালেইঞ্জ করেছেন। মার্কিনীরা সে-দিকে পা-ই বাড়ায়নি।

    গত সপ্তাহে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন চলা-কালে পুতিন বিশ্বকে শুনিয়ে কী বলেছিলেন? বলেছিলেন যে, সিরিয়াকে তো এস-৩০০ (ক্ষেপণাস্ত্র-প্রতিরক্ষা অস্ত্র) দিয়েছেন ও দিচ্ছেনই, এর অতিরিক্ত সম্প্রতি রাশিয়া যে এস-৪০০ ও এস-৫০০ তৈরী করেছে, তা তিনি পৃথিবীর ‘নির্দিষ্ট স্থানসমূহে’ পাঠাবেন। তিনি নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দিলেনঃ "[আক্রান্ত হলে] আমরা কি সিরিয়াকে সমর্থন করবো? হ্যাঁ, আমরা করবো।"

    পুতিন কী বুঝাতে চেয়েছেন, তা বুঝতে মার্কিন প্রেসিডেণ্ট ওবামা ও তাঁর জুনিয়র পার্টনারদের এতোটুকু বেগ পেতে হয়নি। এ-পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত মার্কিন প্রেসিডেণ্টের মুখ রক্ষা করতে স্বাগতিক দেশের প্রেসিডেণ্ট হিসেবে পুতিন সম্ভবতঃ ওবামার অনুরোধেই সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র জাতিসংঘের কাছে সমর্পণের বিষয়ে সম্মত হয়ে থাকবেন।

    বুদ্ধিমান ব্রিটেইন পরিস্থিতি বুঝে ফাঁকা-বুলির পথে না গিয়ে মৌনতার পথ ধরেছে। কিন্তু ফ্রান্স সিরিয়ার উপর তার পুরনো ঔপনিবেশিক শাসনের স্মৃতির ঢেকুর তুলে জাতিসঙ্ঘ সনদের চ্যাপ্টার-সেভেনের অধীনে রাসায়নিক অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি ‘এনফৌর্সেবল’ বা ‘জরবদস্তিমূলক’ করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু রাশিয়া একবিন্দুও ছাড় না দিলে সেটিও বাদ যায় এবং জিনিভাতে অন্য কাউকে জড়িত না করে রাশিয়া শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে 'ওয়ান-টু-ওয়ান' বসে সিরিয়ায় আক্রমণ-অনাক্রমণ সঙ্কটের সমাধান করে।

    এ-সমাধানের অংশ হিসেবে প্রথমতঃ সিরিয়া এক সপ্তাহের মধ্যে তার রাসায়নিক অস্ত্রের তালিকা জাতিসংঘের কাছে জমা দেবে; দ্বিতীয়তঃ নভেম্বরের মধ্যে জাতিসংঘের পরিদর্শকগণ সিরিয়া পরিদর্শন করবেন; তৃতীয়তঃ নভেম্বরের মধ্যেই সিরিয়া তার রাসায়নিক উৎপাদন ও মিশ্রণ যন্ত্রপাতি ধ্বংস করবে এবং চতুর্থতঃ ২০১৪ সালের প্রথমার্ধে সমস্ত রাসায়নিক অস্ত্র নিশ্চিহ্ন করবে।

    বস্তুতঃ সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র বিষয়ে প্রায় এক বছর আগে যখন উদ্বেগ দেখা দেয়, তখন থেকেই সিরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে এ-রকম একটি বুঝাপড়া হয়ে গিয়েছিলো এবং  রাশিয়ার পক্ষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পাচঁ-ছ'মাস আগেই এ-প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো। সেখান থেকে এখন পর্যন্ত রাশিয়া কোনো ছাড় দেয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে।

    সিরিয়া আক্রমণ করার হুমকি দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেণ্ট ওবামা বাস্তবে বেকায়দায় পড়েছিলেন। কারণ, তিনি দ্রুতই বুঝে গিয়েছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত আক্রমণ করা হয়তো সম্ভব হবে না। আর হলেও তাঁর প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে। তাই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সম্মান বাঁচাতে প্রথম ধাপে প্রেসিডেণ্ট ওবামাকে দিয়ে বিষয়টি কংগ্রেসে পাঠিয়ে বিতর্কের মাধ্যমে সমর্থন প্রাপ্তির ইচ্ছা পোষণ করিয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে কংগ্রেসের অনুষ্ঠিতব্য বিতর্ক স্থগিতের নামে বাতিল করিয়ে বাস্তবে নিজেদের দুর্বলতা লুকাতে চেয়েছে। পরিশেষে, জাতির উদ্দেশ্যে গত মঙ্গলবার প্রেসিডেণ্ট ওবামা ভাষণ দিয়ে আপার হ্যাণ্ড বা উচ্চহস্ত নিতে চেয়েছিলেন।

    কিন্তু রুশ প্রেসিডেণ্ট পুতিন উচ্চহস্ত নিতে দেননি মার্কিন প্রেসিডেণ্ট ওবামাকে। পুতিন সরাসরি মার্কিন জনগণের উদ্দেশ্যে দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটি পৌস্ট এডিটরিয়্যাল লিখে প্রেসিডেণ্ট ওবামার প্রায় প্রতিটি দাবিকে নাকচ করেছেন। এমনকি, প্রেসিডেণ্ট ওবামা মার্কিন জনগণের মধ্যে দেশাত্ববোধ জাগানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের অর্থে ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ বলে দাবি করেও রেহাই পাননি। রুশ প্রেসিডেণ্ট পুতিন মার্কিন জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এভাবে নিজেকে বিশেষ ও ব্যতিক্রম ভাবার কোনো কারণ নেই। এটি বরং ভবিষ্যতের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

    সিরিয়ার প্রেসিডেণ্ট যে বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে প্রথমে নামিয়ে দেওয়ার এবং পরবর্তীতে শাস্তি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন দৃশ্যতঃ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিধর দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেণ্ট বারাক ওবামা, তিনি বহাল তবিয়তে প্রেসিডেণ্ট হিসেবেই সম্মত হয়েছেন পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মতো জাতিসঙ্ঘের কাছে রাসায়নিক অস্ত্র ত্যাগ করতে। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির মুখে নয়, রাশিয়ার প্রস্তাবে তিনি সম্মত হয়েছেন।

    অর্থাৎ, সিরিয়া বলে দিলো বিশ্বকে ডেকেঃ এখন থেকে শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথায় আর পৃথিবী চলবে না। বিশ্বশক্তির ভারসাম্যে একমেরুতার দিন শেষ। শুরু হলো দ্বিমেরুতা কিংবা বহু-মেরুতার যুগ।

    শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


পাঠকের প্রতিক্রিয়া

অনেক তথ্য পুর্ণ আরও একটা লেখা পড়লাম।

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন