• সীমানা পেরিয়ে সীমান্ত-ভাবনা
    মাসুদ রানা

    বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা খুব ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন মুর্শিদাবাদে, বাংলার মাটিতে, ইংরেজ বণিকদের হাতে বাঙালীকে মার খেতে দেখে। ইংরেজ অত্যাচারী বণিকদের তিনি চরম শাস্তি দিয়েছিলেন তাদের উদ্ধত আচরণের জন্য।

    মুর্শিদাবাদ এখন আর বাংলার রাজধানী নয়, কিন্তু মুর্শিদাবাদের মাটিতে অবাঙালীর হাতে বাঙালীর মার খাওয়া এখনও ঘটে। গতমাসে ভারতের অবাঙালী কতিপয় সীমান্তসেনা পশ্চিমবাংলার মুর্শিদাবাদ জেলায় রাষ্ট্রিক সীমান্তের কাছে পূর্ববাংলার এক গ্রামবাসীকে উলঙ্গ করে লাঠির সাথে হাত বেঁধে নির্মম ভাবে মেরেছে। এই নির্মম নির্যাতনের চলচ্চিত্র এখন ইন্টারনেটে দেখা যাচ্ছে। হতভাগ্য বঙ্গসন্তানটির প্রার্থনা-চিৎকার সীমান্তসেনাদের পাষাণ হৃদয় গলাতে পারেনি। জ্ঞান হারাবার পর হতভাগ্যটিকে সীমান্ত-চিহ্নক কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে ফেলে রেখে আসে।

    বাংলার নির্বাক মা-স্বরূপা মাটি যেনো কেঁদে-কেঁদে বললেন, ‘হে পাষাণ সেনা, আমার বুকে আমারই সন্তানকে তোরা এতো নিষ্ঠুর ভাবে মারলি!’ অতঃপর তিনি চোখ মুছে মুখে কাঠিন্য এনে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আমার বরপুত্রগণ, আমার শরীর দ্বিখণ্ডিত করে এমনই রাষ্ট্র বানালে তোমরা, যে আমারই শিশু আমার বুকের এ-স্তন থেকে ও-স্তনে গেলে তোমাদের সৈনিকেরা তাদের রক্তাক্ত করে, গুলি করে হত্যা করে এমন কি কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখে। এ কী করলে তোমারা?'

    জিজ্ঞেস করতে বিদেশী এক সাংবাদিক দু-তিন দিন আগে গিয়েছিলেন মার-খাওয়া ওই হতভাগ্য বঙ্গজটির বাড়ীতে। তখনও কষ্ট হচ্ছিলো লোকটির হাঁটতে। তিনি বলেছেন, সীমান্ত লঙ্ঘন করা ছাড়া তাঁর কোনো উপায় নেই। তাঁর এই কথাটি চিন্তাশীল মানুষকে ভাবিয়ে তোলার মতো। তিনি আইন, কানুন, দেশপ্রেমের আকুতি, পররাষ্ট্রের মার, হুমকি সব উপেক্ষা করে বলছেন, সীমান্ত লঙ্ঘন তাঁকে করতে হয়, এবং করতেই হবে। কেনো? বিষয়টি জটিল, যা হয়তো মন্তব্য প্রতিবেদনে লেখার উপযুক্ত নয়। কিন্তু পাঠককে ভাবনার উপাদান দেবার জন্য নীচে লেখার প্রয়াস পাই।

    মামুলি প্রশ্ন করতে ও শুনতে লোকেরা আরাম পায়, কিন্তু মৌলিক প্রশ্ন ভয় পায়। কারণ, মৌলিক প্রশ্ন ‘স্ট্যাটাস্কো’র বিরুদ্ধে যায় ও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি-মূলে কাঁপন ধরায়। পরিণতির কথা চিন্তা না করেই উপরের প্রশ্নটির জবাব খোঁজার চেষ্টায় একটু পেছন থেকে দেখতে হবে এবং কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে এদের জবাব খুঁজতে হবে।

    ১৯৪৭ সৃষ্টির পর পাকিস্তানীদের কাছে পাকিস্তান ছিলো ‘আল্লাহ-রাখা’। বলা হয়েছিলো কুরআন হচ্ছে এর সংবিধান আর দেশটি হচ্ছে মুসলমানদের পাক-ভূমি পাকিস্তান, যা ‘আল্লাহ রক্ষা করবেন’। এ-বিশ্বাস বাঙালীদেরই ছিলো বেশি। কারণ বাঙালীরা মুসলিম লীগের জন্ম দিয়েছিলো ঢাকায়। এবং বাঙালী নেতা ফজলুল হকই ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ করেছিলেন এবং বাঙালীরাই মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ্‌র ঘোষিত ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে’র রক্তাক্ত হানাহানির মাধ্যমে তাঁর দ্বিজাতি তত্ত্বের পক্ষে প্রমাণ জুগিয়েছিলো।

    দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বাংলাকে ভেঙ্গে তার একটুকরো জুড়ে দেয়া হয়েছিলো পাকিস্তানের সাথে - নাম করা হয়েছিলো পূর্ব-পাকিস্তান। প্রকৃতি-বিরোধী সীমান্ত তৈরী করে লক্ষ-লক্ষ বছরের গড়ে ওঠা পৃথিবীর বৃহত্তম গাঙ্গেয় বদ্বীপ বাংলাকে বিদীর্ণ করা হলো। হাজার-হাজার বছরের গড়ে ওঠা বাঙালী জনপদ ও বাঙালী সভ্যতা-সংস্কৃতিকে বিদীর্ণ করা হলো। এমনকি বাংলাভাষাকেও ভাগ করার চেষ্টা করা করা হলো বাংলার বর্ণমালার বদলে আরবি ও রোমান হরফে ‘বাংলা’ লেখার প্রস্তাব করে। বাঙালী পণ্ডিতেরাই এ-প্রস্তাব করেছিলেন।

    ১৯৫২ সালের রক্তঝরা ভাষা-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাকে রক্ষা করা গিয়েছিলো।  আর ১৯৭১ লক্ষ-লক্ষ প্রাণ-দেয়া মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ভেঙ্গে পূর্ব-বাংলাকে স্বাধীন করা করে ও প্রথমে নাম রাখা হলো ‘বাংলা দেশ’, তারপর ‘বাংলাদেশ’।

    স্বাধীনতার পর সেই একই বাঙালী বুদ্ধিজীবীরা বলতে শুরু করলেন, ‘পাকিস্তান যে থাকবে না, এটি তো জানা কথা। এগারোশো মাইলের ভিন্ন রাষ্ট্রের টেরিটোরি মাঝখানে রেখে পূর্ব-পশ্চিমে এক রাষ্ট্র হয় নাকি?  হাঃ হাঃ হাঃ অসম্ভব!’

    কিন্ত কেউ প্রশ্ন করেন না, ‘তা হলে গড়তে গেলেন কেনো? তখন কি আপনাদের ঘটে বুদ্ধি ছিলো না? নাকি আহম্মক ছিলেন?’

    ‘আল্লাহ্‌’ রক্ষা করবেন বলে বলেছিলেন কি না জানা সম্ভব নয়। তবে বাস্তব ঘটনা হলো এই যে, পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলো এই ভাঙ্গন সবারই কাছে খুব স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। এ-ভাঙ্গনকে অনিবার্য হিসেবে চিহ্নিত করার পক্ষে যে ইচ্ছা-নিরপেক্ষে কারণের কথা উল্লেখ করা হয়, তার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ভৌগলিক নিরবচ্ছিন্নতা’র অনুপস্থিতি এবং অপরটি হচ্ছে ‘ভাষা ও সাংস্কৃতিক’ অমিল। আর ধর্ম? বাঙালী জাতীয়তাবাদের মতে, ধর্ম কোনো ভিত্তি হতে পারে না। তাই, পাকিস্তান টিকেনি, টিকতে পারেনি।

    কাকতালীয় ভাবে, কুরআনের পূর্ণতা পেতে সময় লেগেছিলো ২৩ বছর, আর কুরআনের নামে গড়া পাকিস্তান ঠিক তেইশ বছর পরেই - ২৪ বছর পূর্ণ হবার আগেই পূর্ব-পাকিস্তান ‘বাংলা দেশ’ নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করলো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে।

    বুঝার ব্যাপার হলো, পাকিস্তান সৃষ্টির তত্ত্ব অর্থাৎ দ্বিজাতি তত্ত্বকে ভুল প্রমাণিত করে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, কিন্তু দ্বিজাতি তত্ত্ব যা ‘ডু’ করেছে, বাঙালী জাতীয়তাবাদী তত্ত্ব কিন্তু তা ‘আনডু’ করতে পারলো না। অর্থাৎ, দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাগ-করা বাংলা বিভক্তই থেকে গেলো।

    দেখা যাচ্ছে, দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাঙ্গনের ক্ষমতা ছিলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত গড়ার ক্ষমতা ছিলো না। একইভাবে, বাঙালী জাতীয়তাবাদী তত্ত্বও ভাঙ্গতে পেরেছে কিন্তু জোড়া দিতে পারেনি। ‘ভৌগলিক নিরবচ্ছিন্নতা’, ‘ভাষা ও সাংস্কৃতিক মিল’ কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলা’,  নজরুলের ‘বাংলাদেশ’ কিংবা জীবনানন্তের ‘রূপসী বাংলা’ গড়তে পারেনি। বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার আকাশ এবং তার সাথে বাংলার মানুষ কিন্তু সেই দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাগ-করা জায়গায়ই অটুট থাকলো।

    ধর্মকে যে ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে মানা হলো না, এই ধর্ম ছাড়া বাস্তবে আর কী পার্থক্য আছে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার মধ্যে? সুতরাং দ্বিজাতি তত্ত্ব নিহত বলে কিন্তু মনে হচ্ছে না, বড়োজোর আহত হয়েছে বলা যায়। আর সে-আশঙ্কার পক্ষেই সায় দেয় ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্র-ধর্ম করা কিংবা তারও আগে বাংলাদেশের পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ইসলামিক সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তানে যাবার ঘটনা। 

    বাংলাদেশের শাসক দলগুলো তাদের আদর্শ-নির্বিশেষে দেশটির ইসলামিক চরিত্র বা মুসলমানীত্ব মাথায় তুলে রেখেছে। আশ্চর্য্যের বিষয় হচ্ছে, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে বিপুল চিৎকার হচ্ছে কিন্তু চেতনার অর্থ বুঝার কোনো চেষ্টাই হচ্ছে না, প্রতিষ্ঠা করা তো দূরের কথা। খুব অস্বস্তির বিষয় হচ্ছে, চেতনাবাদীদের অনেকের মধ্যে নির্বোধ আবেগের প্রাবল্যই শুধু লক্ষ্য করা যায়, তাঁদের মধ্যে অন্ধত্ব পরিহার করে সত্যের সন্ধান করার তেমন কোনো চেষ্টাই পরিলক্ষিত হয় না। এঁরা এতোই অসহিষ্ণু যে, কোনো প্রশ্ন পর্যন্ত শুনতে চায় না। প্রশ্ন তুললে গালাগালি এবং হাতের কাছে পেলে মার শুরু করে দেয়, যা ফ্যাসীবাদের লক্ষণ বলে ইতিহাস থেকে চিহ্নিত করা যায়।

    তবুও প্রশ্ন করতে হবে। মানুষের মনন ও বোধ জাগাতে হবে। মানুষকে ক্রিটিক্যাল চিন্তা করার জন্য তৈরী করতে হবে। প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক ভিত্তি কী? যে-কোনো কাঠামোর একটা ভিত্তি লাগে। ভিত্তিতে যদি কোনো সঙ্কট বা সমস্যা থাকে, তাহলে তার সমগ্র দেহে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। আর, ভিত্তির সঙ্কট বিবেচনা না করে যারা শুধু উপসর্গ নিয়ে বিচলিত হয়ে ওখানে প্রতিকার করার চেষ্টা করে, তাতে সঙ্কটের মীমাংসা হয় না।

    ভিত্তি কী হওয়া উচিত তা সম্ভবতঃ ১৯৭২ সালের সংবিধানে বর্ণনা করা হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো এর চার স্তম্ভ - জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরেপক্ষতা ও সমাজতন্ত্র।

    এবার আসা যাক প্রথমটিতে (বাকী তিনটি অন্যত্র আলোচনা করা যাবে)। জাতীয়তাবাদ বলতে বাঙালী জাতীয়তাবাদ বুঝনো হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট ভাবে উল্লেখ করাও হয়েছে। জাতীয়তাবাদ পৃথিবীতে সব সময় জাতিকে চিহ্নিত করে তার জন্য একটি জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এবং জাতীয়তাবাদের পণ্ডিতদের গুরু আর্নেস্ট গেলনার জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তাঁর বিখ্যাত ‘ন্যাশন এ্যাণ্ড ন্যাশনালিজম’ বইয়ের শুরুতেই  বলেছেন, ‘জাতীয়তাবাদ মূলতঃ একটি রাজনৈতিক প্রিন্সিপল যার দাবী হচ্ছে, রাষ্ট্রিয় ইউনিট ও জাতীয় ইউনিটকে খাপে-খাপে মিলতে হবে’।

    আমাদের ন্যাশনাল ইউনিট কী? ইতিহাস বলে, বাঙালী। আর, রাষ্ট্রীয় ইউনিট কী? দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশ। প্রশ্ন হচ্ছে তাতে কি গেলনার-প্রিন্সিপল ‘মেট’ হচ্ছে? সাহসের সাথে বলি, না, হয়নি। ইসরায়েল রাষ্ট্র যেমন ইউরোপীয় ইহুদী, মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদী, আফ্রিকার ইহুদী-সহ সকল ইসরায়েলীয় সন্তান ও তস্য সন্তানদের জন্য গঠিত একটি জাতি-রাষ্ট্র, বাংলাদেশ কিন্তু পৃথিবীর সকল বাঙালীর জন্য গঠিত রাষ্ট্র হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার ঐতিহাসিক ভূমি বাংলাকেও ধারণ করতে পারেনি।

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি হয়েছে বাংলার একটি অংশ নিয়ে। এর নাগরিকেরা হচ্ছেন প্রাক্তন পাকিস্তানী বাঙালী এবং তাঁদের বংশধরগণ। পাকিস্তানী বাঙালীদের মধ্যে যাঁরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হবার পর এক হাজার মাইল দূরের পাকিস্তান থেকে ফিরেছেন, তাঁদের সবাইকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। এমনকি, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযান চালাবার পরও, বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধের সক্রিয় বিরোধিতাকারী গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু পশ্চিম বাংলা বা আসাম-ত্রিপুরার বাঙালীদের জন্য বাংলাদেশের নাগরিক হবার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি পূর্ব-বাংলায় জন্ম নেবার সূত্রেও নয় কিংবা রাজনৈতিক অপশনের সূত্রেও নয়।

    বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে গেলনার-প্রিন্সিপলের যে ভায়োলেশন হয়েছে, এটি হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যার তাত্ত্বিক কারণ। এটি বুঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা গভীরে ভাবেন আবেগ সংযম করে, তাঁদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

    মানুষ প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতির নিয়মকে যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি মানুষের আচরণের মধ্যে যে প্রাকৃতিক নিয়ম আছে, তাকেও অস্বীকার করা যায় না। মানুষের অর্থনৈতিক আচরণ সেই নিয়মের অংশ। অর্থনীতিতে যে ‘ডিম্যাণ্ড এ্যান্ড সাপ্লাই’র নিয়ম আছে, এর ভায়োলেশন করা সম্ভব নয়।

    ডিমাণ্ড এ্যাণ্ড সাপ্লাই নীতির ভায়োলেশন ঈশ্বরের নির্দেশেও সম্ভব নয়। সে-জন্যেই দেখি রমজান মাসকে ‘সিয়াম’ বা সংযমের মাস বলে মহিমান্বিত করা সত্ত্বেও এ-মাসেই দ্রব্যমূল্য সবচেয়ে বেড়ে যায়। কারণ কী? কারণ, তখন মুসলমানেরা কম খায় না, বাস্তবে বেশি খায়। তাই বাজারে ডিমাণ্ড বেড়ে যায়, আর ডিমাণ্ড বাড়লে মূল্যও বেড়ে যায়। যদিও ওয়াজ-নসিহত চলে সংযমের, কিন্তু এতে কাজ হয় না। কারণ, মানুষের আচরণ ঈশ্বেরর নিয়ম চলে না, চলে মানব-প্রকৃতির নিয়মে।

    প্রাকৃতিক ভাবে বাংলা হচ্ছে একটি ভৌগলিক ইউনিট। প্রাকৃতিক ভাবেই সমস্ত বাঙালী জাতি হচ্ছে একটি ন্যাশনাল ইউনিট। পূর্ব-পাকিস্তান ছিলো ভূল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে কৃত্রিম রাজনৈতিক বৃহত্তর ইউনিটের একটি সাব-ইউনিট। স্বাধীন হবার পর সেই সাব-ইউনিট হয়েছে একটি পূর্ণ রাজনৈতিক ইউনিট। যে-কোনো রাষ্ট্রের মতোই বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি প্রাকৃতিক নয় - মানুষের তৈরী কৃত্রিম প্রতিষ্ঠান, যা আমরা পলিটিক্যাল ইউনিট বলছি। কিন্তু এই কৃত্রিম ইউনিটটি কিন্তু প্রাকৃতিক ইউনিটের সঙ্গে কনগ্রুয়েন্ট নয়, অর্থাৎ বেখাপ্পা। আর এখানেই সমস্যা, কারণ এখানে প্রাকৃতিক নিয়মের ভায়োলেশন হয়েছে।

    গেলনার-প্রিন্সিপল ধারণ করার জন্য বাংলাদেশের জাতির পরিচয় সংশোধন করে বাঙালীর বদলে ‘বাংলাদেশী’ করা হয়েছে। প্রকৃত প্রস্তাবে বাংলাদেশী হচ্ছে মুসমান বাঙালী, যা সেনা-উদ্ভূত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আবিষ্কার। এই আবিষ্কার দরকারী-আবিষ্কার বলেই জিয়াউর রহমানকে শতো ঘৃণা করার পরও শেখ হাসিনার সরকার ও তাঁর দল মেনে নিয়েছে। ধারণা করা যায়, শেখ মুজিবুর রহমানও বেঁচে থাকলে তিনি নিজেই তাই করতেন, যদিও তিনি চাকমা জাতিসত্ত্বার লোকদেরকে ‘বাঙালীত্বে উন্নীত’ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রতত্ত্বে শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের মধ্যে কার্যতঃ তেমন কোনো পার্থক্য নেই। সময়ের কারণ প্রথমোক্ত নেতার মধ্যে যা ভ্রুণাকারে দেখা দিয়েছিলো, শেষোক্তজনের মধ্যে তা চারা হিসাবে দেখা যায়, এবং তার পরের জন অর্থাৎ পরবর্তী সেনা-উদ্ভূত রাষ্ট্রপতি হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদ তাকে পূর্ণ পত্র-পল্লবে বিকশিত করেছেন।

    অর্থাৎ, শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামী সম্মলনে গিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ব-দরবারে একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জিয়াউর রহমান বিসমিল্লাহ যুক্ত করে এবং ধর্মনিরপেক্ষতা কেটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির মুসলিম পরিচিতিকে সাংবিধানিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে সমস্ত বিষয়টি পাকাপোক্ত করেছেন। এর ফলে যে ইতিহাসের বিকৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লঙ্ঘিত হয়েছে, তা মেরামত করার জন্য শেখ হাসিনা সব কয়টিই রাখলেন, তার সাথে জিয়ার ছুঁড়ে ফেলে দেয়া ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’ তুলে এনে সংবিধানে বসিয়ে দিয়েছেন। এগুলো সব হয়েছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির গেলনার-প্রিন্সিপল ভায়োলেশন সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। কিন্তু কাজ হচ্ছে না।

    আজ বাংলাদেশের মানুষ যে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পশ্চিম বাংলায় যাচ্ছে, তাতে তাঁরা রাষ্ট্রীয় নিয়ম অর্থাৎ আইন লঙ্ঘন করছেন, কিন্তু তাঁরা এগুলো করছেন প্রকৃতির নিয়মে। এদেরকে যতোই ‘ক্রিমিন্যালাইজড’ করা হোক, প্রকৃতির কাছে ওরা অপরাধী নন। কারণ এই সীমান্ত হয়েছে ১৯৪৭ সালে, যা বাংলাদেশ পেয়েছে ভ্রান্ত পাকিস্তানের কাছ থেকে উত্তারাধিকার সূত্রে। কিন্তু এ-সীমান্ত কৃত্রিম। এখন যেটাকে সীমান্ত বলা হচ্ছে, সেখানকার জনপদ গড়ে উঠেছে শতো-শতো কিংবা হাজার-হাজার বছর আগে। মানুষের অর্থনৈতিক আচরণ ও অভ্যাস গড়ে উঠেছে সেই সাথে। এখন রাষ্ট্র কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকৃতির বিরুদ্ধে। মানুষ প্রকৃতির অংশ হিসেবে তার স্বাভাবিক নিয়মে এ-বেড়া লঙ্ঘন করবেই এবং করছে।

    সমস্যার সমাধান দিতে না পারলে সমস্যার কথা উল্লেখ করা যাবে না, এ-রকম ভাবনা ঠিক নয়। তাই লেখাটাকে সমাধানের প্রেস্ক্রিপশন না মনে করে সমস্যার বিবরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।  

    রোবরার, ২২ জানুয়ারী ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন