• সেনগুপ্ত উপাখ্যান
    মাসুদ রানা

    ফাঁদে পড়েছে ইঁদুরের ল্যাজ

    কুৎসিত বাচন ও অঙ্গভঙ্গির জন্য কুখ্যাত বাংলাদেশী মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আটকে গিয়েছেন জটিল এক জালে। অনেক ভাব-ভঙ্গি করেও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না - ব্যাচারা! আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বস্ত তথাকথিত ইঁদুরের ‘ল্যাজ’ তিনি। অর্থাৎ, রাজ্জাক-আমু-তোফায়েল-সুরঞ্জিতের নামের ইংরেজি আদ্যাক্ষর দিয়ে গঠিত ‘র‍্যাটস’-এর ‘এস’ তিনি।

    কাকতালীয় ভাবে নামগুলোর আদ্যাক্ষরে গঠিত হয়েছে নাম এমন এক জীবের, যাকে গৃহস্থালীতে কুকুর-বিড়ালের মতো প্রভূভক্ত কিংবা গরু-ছাগলের মতো উপকারী মনে করা হয় না। গণ্য করা হয় ক্ষতিকর জীব হিসেবে।

    এক সময়কার বিশাল অবদান রাখা শক্তিশালী নেতাদের এহেন জীবের নামে আখ্যায়িত হবার একটি প্রেক্ষাপট বা ‘শানে নযুল’ আছে, যা কারও অজানা নয়।

    আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা খাল কেটে কুমির এনে যখন প্রতিপক্ষীয়া খালেদা জিয়ার সহ-বন্দিনী হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, তখন ঐ ইদুঁরেরা ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়িত করে ‘সংস্কার’ আনতে চেয়েছিলেন। বস্তুতঃ সম্মুখে গণতন্ত্রের দাবী নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চারিত্রিক শক্তি তাঁদের ছিলো না বলেই, গোপনে ষড়ন্ত্র করতে যেয়ে ‘ইঁদুর’ নামে ভূষিত হয়েছিলেন এঁরা।

    সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের শক্তিশালী ভারতীয় ‘ব্যাকিং’ রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। এই মনে করাটা কতোটুকু সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট, আর কতোটুকু বস্তুনিষ্ঠ, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যে ব্যতিক্রম, তা তিনি শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী হয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন।

    কিন্তু সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বুঝিয়ে দেয়াটাই শেষ বুঝা কি-না তাই বা কে জানে? ক’দিন আগে তাঁর বাড়ীর দিকে নিশীথে অর্থ-যাত্রা - অর্থাৎ, তাঁর বাড়ীর দিকে রাতের অন্ধকারে টাকার বস্তা নিয়ে যাওয়ার স্বীকৃত ঘটনা - ভদ্রলোককে বেশ বিপদেই ফেলে দিয়েছে। নিজেই বলেছেন, ‘বড়োই বিপদ’। তবে তিনি বলেছেন, এ-বিপদ তাঁর নিজের নয়, গণতন্ত্রের।

    চোর নুরুল ইসলাম ‘ইসলাম’ নয়

    বাকপটু সেনগুপ্ত প্রায়শঃ গল্প বলেন। তাই, তার প্রসঙ্গেও একটি গল্প বলা যেতে পারে, যা শুনেছিলাম ‘ধর্মব্যবসায়ী’ বলে ধিকৃত ভণ্ড ধার্মিকদের উন্মোচনার্থে।

    এক চোর ছিলো, যার নাম নুরুল ইসলাম। একদিন রাতের অন্ধকারে চুরি করতে গিয়ে তাড়া খায় নুরুল ইসলাম। পলায়নপর নুরুল ইসলাম অন্ধকারে দেখতে না পেয়ে একটি উন্মুক্ত কুয়োতে পড়ে যায়, যা থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভব ছিলো না তার পক্ষে।

    কয়েক বার ব্যর্থ চেষ্টার করার পর কুয়োতে পড়া চোরটি ভোরের দিকে উচ্চ কণ্ঠে চেঁচাতে থাকলো ‘ইসলাম ডুবছে, বাঁচাও, বাঁচাও!’

    প্রভাতের মসজিদ-যাত্রীরা গভীর জলদ কন্ঠে ‘ইসলাম ডুবছে, বাঁচাও, বাঁচাও’ শুনে ভাবলেন এটি নিশ্চয় ঐশ্বরিক নির্দেশ। সুতরাং তাঁরা ধাবিত হলেন আওয়াজের উৎসস্থলের দিকে এবং উপনীত হলেন একটি কুয়োর কাছে। নীচ থেকে তখনও আসছে সেই আহবানঃ ‘ইসলাম ডুবছে, বাঁচাও, বাঁচাও!’

    একজন যাত্রী রশি-বাঁধা বালতিটা কুয়োতে ধীরে নামিয়ে দেবার পর ক্রমশঃ দড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলো চোরটি। সবাই দেখলোঃ ‘ইসলাম কোথায়? এতো আমাদের গাঁয়ের চোর নুরুল ইসলাম!’

    আমি নিশ্চিত, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গল্পটি জানেন। তিনি এই গল্পের উপযোগিতাও জানেন। আর সে জন্যেই তিনি বলেছেন, ‘গণতন্ত্র বিপদ পড়েছে’। এর পর হয়তো বলবেনঃ এর পেছনে রয়েছে একটা বিশাল ষড়যন্ত্র। তিনি চাইলে বলতে পারেনঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্যেই এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।

    সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন যারা বলেছেন, ‘ঘুষের অর্থ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ভারতে পাচার করেন’, তাঁরা মূলতঃ পরোক্ষভাবে ‘মৌলবাদী ষড়যন্ত্র’ তত্ত্ব আমদানির পথ তৈরী করে দিচ্ছেন।

    বেহায়াকে মারলে জুতো, সে বলে ও কিছু নয়তো

    বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো উস্কে দিচ্ছে পাঠকদের একটি দাবীর দিকে। আর সেটি হচ্ছে, ‘সুরঞ্জিত বাবু, আপনি পদত্যাগ করুন।’ পত্রিকাগুলোর অনলাইন সংস্করণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের খবরের নীচে যে মন্তব্য আসছে, তা দিয়ে আবার খবর তৈরী হচ্ছে। অন্ততঃ প্রথম আলো এ-কাজটি করেছে। এর উদ্দেশ্য একটি - সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পদত্যাগ।

    সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শুনেও শুনছেন না। কারণ, বহু কষ্টে পাওয় ধন, হারাতে কি চায় মন? এছাড়াও তিনি জানেন, জনগণ কী ভাবলো, আর না ভাবলো, তাতে তাঁর রাজনীতি কিংবা তাঁর পদ প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে কোনো অভিঘাত তৈরী হবে না।

    অভিজ্ঞ রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জানেন, তাঁর জবাবদিহিতা কার কাছে। দেশের জনগণ কিংবা তাঁর নিজের কর্মীদের কাছে তাঁর জবাবদিহিতার কিছু নেই। কারণ, তাঁরা তাঁকে নেতাও বানায় না, কিংবা মন্ত্রীও বানায় না। এমনকি ভৌটেও জবাবদিহিদার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় কোটি-কোটি টাকা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের আশির্বাদ। আর সে-জন্যেই উদ্ভট গণতন্ত্রের বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর পা ছুঁয়ে প্রণাম বা সালাম করেন করেন মন্ত্রীরা।

    পদ বহাল থাকা অবস্থায় কীভাবে কাজ করা উচিত, সে-ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণের কোনো বোধ-বুদ্ধি তেমন না থাকলেও, কী করলে পদত্যাগ করতে হয়, সেটি সম্ভবতঃ ভালোই বুঝেন। তাই, পদত্যাগের দাবী জোরালো হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে।

    কিন্তু তাঁরা বুঝতে চান না যে, যে-দেশের রাজনৈতিক-সংস্কৃতিতে মন্ত্রীরা বা নেতারা নৈতিকতায় প্রশ্নবিদ্ধ হলেই পদত্যাগ করেন, সে-দেশের সামাজিক-সংস্কৃতিতে মানুষের মনুষ্য-বোধের মূলে রয়েছে ‘সেন্স অফ ডিগনিটি’ - অর্থাৎ, মর্যাদাবোধ। আর এই মর্যাদাবোধ শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যেও।

    যে-দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দলকে মনে করা হয় প্রাইভেট কোম্পানীর মতো একেকটি পরিবারের ব্যক্তি-মালিকাধীন প্রতিষ্ঠান; শীর্ষ নেতৃত্বকে মনে করা হয় রাজবংশের মতো রক্তের উত্তারাধিকার; কর্মীদেরকে মনে করা হয় কর্মচারী; আর জনগণকে মনে করা হয় প্রজা; সে-দেশের মন্ত্রী আত্মমর্যাদাবোধের কারণে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবে, তা প্রায় অসম্ভব।

    জনগণ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে যা বলেই নিন্দা করুক না কেনো, তাতে তাঁর কিছুই আসে যায় না। তারুণ্যে ও যৌবনে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সাম্যের জন্য সংগ্রাম-করা যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গণমাধ্যমের সামনে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন, তিনি যে আধুনিক অর্থে কোনো মর্যাদাবান মানুষ নন, তা বোধগম্য।

    সুতরাং এহেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে যতোই মারা হোক জুতো, তিনি বলবেন, ‘ও কিছু নয় তো’।

    সুদখোর আর ঘুষখোর কি সমান?

    মুহাম্মদ ইউনূসের খ্যাতি তথা ব্যবহারযোগ্যতার পেছনে আছে রাষ্ট্রীয় যত্নহীন বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষকে সাহায্যের নামে উচ্চ হারে সুদের মাধ্যমে শোষণ করে তাদের ‘সারপ্লাস ভ্যালু’ দেশী-বিদেশী কর্পোরেইট হাউসের সাথে ভাগ করা।

    সেবাদাসকে যেভাবে ‘সাবাস’ দেয়া হয়, ইউনূসকেও সেভাবে ‘নোবেল শান্তি পুরষ্কার’ দেয়া হয়েছিলো। ইউনূস ধরাকে সরা জ্ঞান করে ‘চাইলে যে কোনো কিছু হতে পারি’ ভেবে রাজনীতি শুরু করেছিলেন। একটি দল তৈরী প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলেন।

    শেখ হাসিনা ইউনূসকে দেখলেন এক আপদ হিসেবে। হানলেন তাঁর বিখ্যাত - শব্দান্তরে কুখ্যাত - শব্দবাণ ‘সুদখোর আর ঘুষখোর সমান’। ব্যাস্‌ কপোকাত হয়ে পড়লেন মুহাম্মদ ইউনূস। আর, সেদিনই লিখিত হয়ে গিয়েছিলো সেই মুহাম্মদ ইউনূসের ললাট-লিখন, যার পরিণতিতে তিন হারালেন তাঁর গ্রামীন ব্যাংকে সেয়ানামি করার অধিকার।

    এবার শেখ হাসিনা দেখছেন তাঁর নিজদলীয় রেইল-মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রতি জনগণের ছোড়া ‘ঘুষখোর’ তীর। নিকট ইতিহাসের কারণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রতি শেখ হাসিনার অতি সুপ্রসন্ন হবার কোনো কারণ নেই। রেইল-মন্ত্রী বানানোর পেছেনে ভারতীয় ‘শুভাকাঙ্খী’দের একটা ‘অনুরোধ’ থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বরাজনীতিতে তা হয়েই থাকে।

    শেখ হাসিনা ‘সুদখোর আর ঘুষখোর সমান’ বলে ঘুষ-গ্রহণকে সাংঘাতিক অনৈতিকতা হিসেবে দাঁড় করিয়ে নিয়ে সুদ-গ্রহণকে এর তূল্য হিসেবে বিবেচনা করে বর্জনীয় বলে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।  সুতরাং জনগণ আশা করবে, ‘সুদখোর’কে তিনি যেভাবে বর্জনীয় মনে করেছিলেন, ‘ঘুষখোর’কেও তিনি অধিক হারে না হোক, অন্ততঃ সমান হারে বর্জন করবেন।

    কোথায় সেই স্বতঃপ্রণোদিত বিচার?

    বাংলাদেশের এক বিচারপতি আছেন, যিনি হাটে-মাঠে-রাস্তায়-এ্যায়ারপৌর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কৌর্ট বসিয়ে মানুষের বিচার করে আলোচিত হয়ে উঠেছেন। তিনি একসময় লণ্ডনবাসী ছিলেন। পদধুলি দিতে মাঝে-মাঝে এখনও লণ্ডনে আসেন। এসে তিনি বিভিন্ন সভা-সমিতিতেও যোগ এবং রেডিও-টেলিভিশনে সাক্ষাতকারও দিয়ে থাকেন।

    এহেন পুণ্যবান বিচারপতিকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি আমার - সান্নিধ্য তো স্বপ্নময়। তবে স্বপ্নে না হলেও টেলিভিশনে দেখার সুযোগ হয়েছিলো আমার। তাঁর কথামৃত শুনে মনে হলো... নাহ্‌, বলবো না। বাংলাদেশের আইন বলে কথা, কখন যে ভেঙ্গে ফেলে বিপদে পড়ি!

    শুনেছি, তিনি বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদকে ‘সারাদিন’ কৌর্টে দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন কী যেনো একটা ‘বে-আইনী’ কিছু লেখার জন্য। এ-ছাড়াও ‘মুর্খ’, ‘অশিক্ষিত’, ‘জ্ঞানপাপী’ ইত্যাদি বলে গালমন্দও করেছিলেন তিনি। সেই থেকে লিখিয়েদের যে-ভয় লেগেছে ঐ বিচারপতি সম্পর্কে, তা মেটেনি এখনও।

    ভীতু লোকদের তো প্রার্থনা করতে অসুবিধা নেই। তাই কোটি-কোটি ভীতু বাঙালীর একজন হিসেবে প্রার্থনা করিঃ

    হে ধর্মাবতার, রেইল-মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ঘুষখোর কি-না জানি না। না জেনে মিথ্যা বদমানও দিতে চাই না। কিন্তু এতো রাতে যে এতো টাকা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো তাঁর বাস ভবনে, তাও কিছুই না বলে উপেক্ষা করতে পারি না।

    আমি নিশ্চিত, এ-ঘটনা আপনার মতো বিজ্ঞ ও ন্যায়-বিচারের জন্য স্বতঃপ্রণোদিত প্রাণীর (সচেতন প্রাণধারী অর্থে - জীবযন্তু অর্থে নয়) চক্ষু-কর্ণ এড়াতে পারেনি। এবার, দয়া করে স্বতঃপ্রণোদিত হোন!

    ১৫ এপ্রিল ২০১২, রোববার
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন