• সৈয়দ মকসুদ সমীপেঃ 'স্বৈরাচার' বলে কাকে?
    মাসুদ রানা

    সৈয়দ আবুল মকসুদ বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা লেখক ও বুদ্ধিজীবী। প্রকরণের দিক থেকে তাঁকে 'প্রগতিশীল' দলভূক্ত করা হয়। বিভিন্ন বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃপক্ষ ও প্রচলনের বিরুদ্ধে লেখালখি ও বলাবলির জন্য তিনি বেশ প্রসিদ্ধ। তাঁর সাদাসিধে জীবনযাপন ও ভাষ্যের জন্য তিনি শ্রদ্ধেয় প্রত্যক্ষিত।

    সৈয়দ আবুল মকসুদের সাথে আমার পরিচয় হয় লণ্ডনের সাপ্তাহিক সুরমা অফিসে। পরিচয়টি করিয়ে দিয়েছিলেন সুরমার সম্পাদক সৈয়দ মনসুর। তো, ভদ্রলোক পরিচয়ের সাথে-সাথে নিজেই জানালেন যে, তিনি সেলাই বিহীন শ্বেতবস্ত্রধারী একজন গান্ধীবাদী লেখক এবং বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ কলামিষ্ট হিসেবে নির্বাচিত।

    তিনি যখন নিজের এই পরিচয় দিচ্ছিলেন এবং এতে যে আমি প্রথমে আশ্চার্য্যান্বিত ও পরে বিরক্ত হচ্ছিলাম, তা বুঝে মিট-মিট করে হাসছিলেন পাশেই বসা সাংবাদিক মঞ্জুরুল আজিম পলাশ। তাঁকে সাক্ষী মেনে সৈয়দ আবুল মকসুদ বললেন, “পলাশ জানে”। ভদ্রলোকের এই আত্মপ্রচারাত্মক কথা শুনে আমি নিরাশ হয়েছিলাম।

    একদিন সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেলাম যে, তথ্যত্রুটিপূর্ণ কলাম লেখার জন্য, বাংলাদশের এক বিচারপতি তাঁকে আদালতে তলব করে গালমন্দ করেছেন এবং দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখে আদালত-গৃহেই শাস্তি দিয়েছেন। আদালতে গালমন্দ ও শাস্তি পাওয়ার পর সৈয়দ আবুল মকসুদের প্রতি আমার একটা মায়া জন্মেছিলো। আর তাই, বিষয়টিকে নিয়ে একটি কলাম লিখেছিলাম।

    কিছুদিন পর লক্ষ্য করলাম, আরেক কাণ্ড। সৌদি আরবে আট বাঙালী অপরাধী মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হলে, সৈয়দ আবুল মকসুদ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ নিজের গলায় নিজের নাম লেখা একটি বড়ো পৌষ্টার ঝুলিয়ে মানুষকে এক ফোঁটা চোখের জল ফেলার অনুরোধ করছেন। বুঝলাম, ভদ্রলোকের আত্মপ্রচারের একটা বুভূক্ষা আছে। তা সত্ত্বেও কোনো গণমাধ্যমে তাঁকে লিখতে কিংবা বলতে দেখলে আকর্ষিত হই বঙ্গীয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতা অনুধ্যানের জন্য।

    গত সপ্তাহান্তে বাংলাদেশের খবর কী জানতে যেয়ে একটি বাংলা টিভি-চ্যানেল খুলতেই দেখি সৈয়দ আবুল মকসুদ। কী যেনো বলছিলেন তিনি সংবাদ কর্মীর এক প্রশ্নের জবাবে। মনোযোগী হয়ে শুনতে পেলাম, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতি নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এখনকার রাজনীতির সমালোচনা করছেন। সমালোচনার এক পর্যায়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ জানালেন, এখনকার রাজনীতি নাকি “ক্ষমতার রাজনীতি”, যা হওয়া উচিত নয়।

    আমি আবার ধাক্কা খেলামঃ ভদ্রলোক বলেন কি! রাজনীতির উদ্দেশ্যেই যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তগত করে - তা ভোটের মাধ্যেমেই হোক কিংবা বিপ্লবের মাধ্যমেই হোক  - একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুসরণ বা কার্যকর করা, সেখানে রাজনীতিকে তো ক্ষমতারই হতে হবে! রাজনীতি যদি ক্ষমতা অর্জনের উদ্দেশ্য পরিচালিত না হয়, তাহলে রাজনীতি বলা যায় না।  রাজনীতি তার সংজ্ঞানুসারে রাষ্ট্রক্ষমতা আকাঙ্খী এবং এটিই হওয়া উচিত।

    সৈয়দ আবুল মকসুদের রাজনীতি সম্পর্কিত উপরের এই বাস্তবতা বিবর্জিত কথা শুনে আমি আবার হতাশ হয়েছি এই ভেবে যে, বুদ্ধিজীবীরা কোথায় হবেন বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের ধারক, তার স্থলে দেখি তাঁরা কখনও কখনও সাধারণ জ্ঞান প্রদর্শনে নিদারুন দারিদ্রের পরিচয় দেন। যাক, আমার ভাবনা ভাবনাই ছিলো, যেটি লেখায় প্রকাশ করার মতো কোনো ঘটনা ছিলো না।

    কিন্তু আজ রাতে এসে ফেইসবুকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক শফি আহমেদের একটি স্টেইটাসে দেখলাম সৈয়দ আবুল মকসুদের কিছু কথা উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে যে, ‘স্বৈরাচার’ একটি বিশেষ্য পদ, যা কি-না কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নাম।

    প্রথমে ভাবলাম, এটি হয়তো শফি আহমেদের টাইপিইংয়ের ভুল। তাই আদি বাক্যটি কী ছিলো তা দেখার জন্য গূগোল-অনুসন্ধান করলাম। যথারীতি গোটা লেখাটি পেয়েও গেলাম। বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম দৈনিক প্রথম আলোর মতামত বিভাগে প্রকাশিত “ডিসেম্বর ‘৯০ - ডিসেম্বর ২০১৩” শিরোনামের একটি নিবন্ধে তিনি সত্যিই লিখেছেনঃ

    “স্বৈরাচার—একটি বিশেষ্য পদ। কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর নাম।”

    আমি আবার অবাক হলাম। কিন্তু ভেবে পেলাম না, যেখানে ‘স্বৈরাচার’ অর্থ হচ্ছে স্বৈরমূলক আচার বা আচরণ বা ব্যবহার, তা কীভাবে ব্যক্তি বা বস্তুর নাম হয়?

    আর, বিশেষ্য পদ মানেই ব্যক্তি বা বস্তু নাম হবে এ-কথাই বা তিনি বলেন কীভাবে? রবীন্দ্রনাথের 'সূক্ষ্মবিচার' নাটিকার পণ্ডিত চরিত্রের চণ্ডীচরণের সংলাপ ধার করে সৈয়দ আবুল মকসুদকে জিজ্ঞেস করা যায়ঃ

    “শব্দ স্বাদ বর্ণ প্রভৃতি অবস্তুর কি নাম নেই?”

    গত সপ্তাহে শহীদ ডাক্তার মিলনের স্মৃতি অনুষ্ঠানে জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনুর পক্ষ থেকে জাতীয় পার্টির নেতা প্রাক্তন স্বৈরশাসক এরশাদ-স্তুতি নিয়ে প্রকাশিত একটি লেখায় আমি প্রাসঙ্গিকভাবে জানিয়েছিলাম যে, জেনারেল এরশাদকে ‘স্বৈরাচার’ বলা হয়, সেটি ভুল। শব্দটি হবে ‘স্বৈরাচারী’। বাংলা অভিধানে ‘স্বৈরাচার’ শব্দের অর্থ নির্দেশ করে বলা হয়েছে, “নিজের ইচ্ছানুযায়ী আচরণ”। সুতরাং, স্বৈরাচার হচ্ছে একটি আচার বা আচরণ। ব্যক্তির নাম স্বৈরাচার হতে পারে না।

    সৈয়দ আবুল মকসুদ এমন একটি ভুল করবেন তা মেনে নিতে পারছিলাম না। ভাবলাম, হয়তো মুদ্রণত্রুটি হয়ে থাকবে। লিখতে গেলে যে-কোনো লেখাতেই ‘টাইপো’ বা টাইপ-ভ্রান্তি থাকতে পারে। কিন্তু আমি সত্যি ধাক্কা খেলাম, যখন কয়েক লাইন পরেই লক্ষ্য করলাম, তিনি রীতিমতো সংজ্ঞা ফেঁদে লিখেছেনঃ

    “স্বৈরাচার শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো যে শাসক তাঁর নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশ শাসন করেন—দেশের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী নয়।”

    প্রথমতঃ সৈয়দ আবুল মকসুদ বুঝতে পারেননি যে, 'স্বৈরাচার' কোনো ব্যক্তি হতে পারে না। 'স্বৈর' ও 'আচার' এর সমন্বয় 'স্বৈরাচার' হচ্ছে একটি বিশেষ ধরনের আচার বা আচরণ। ব্যক্তির আচার ও স্বয়ং ব্যক্তি এক নয়। যে-ব্যক্তি আচার করেন, তিনি আচারী হন। আর যে-ব্যক্তি স্বৈরাচার করেন, তিনি স্বৈরাচারী। সৈয়দ আবুল মকসুদ কোন্‌ অভিধান নির্দেশ করে উপরের সংজ্ঞা দিলেন, তিনিই জানেন। কিন্তু আমি তাঁকে নিশ্চিত করতে চাই যে, তিনি ও তাঁর অভিধান উভয়ই ভুল। 'স্বৈরাচার' একটি বিশেষ্য পদ বটে, কিন্তু এটি মানুষের নাম বিশেষ্য নয়। 

    দ্বিতীয়তঃ সৈয়দ আবুল মকসুদের সংজ্ঞায় মূল শব্দটি 'স্বৈরাচার' না 'স্বৈরাচারী' হলেও এ-সম্পর্কে তাঁর ধারণা দরিদ্রই থেকে যেতো। কারণ, তাঁর সংজ্ঞা দাঁড়িয়ে আছে এই বিশ্বাসের ওপর যে, শাসনতন্ত্র মানেই অস্বৈরাচারী। কিন্তু এটি ঠিক নয়। পৃথিবীতে বহুকাল আগে স্বৈরাচারী রাজারা রাজ্য শাসন করতেন নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী - শাসনতন্ত্র অনুযায়ী নয়। আধুনিক যুগে সকল স্বৈরাচারীই একটা শাসনতন্ত্র অনুযায়ীই শাসন করে।

    জার্মানীতে হিটলারের স্বৈরাচারী শাসন চলছে শাসনতন্ত্র অনুযায়ীই। বাংলাদেশের তীব্রতম স্বৈরশাসক শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁর কুখ্যাত বাকশালী শাসনতন্ত্র অনুযায়ী দেশ শাসন করেছিলেন এবং সে-জন্যে তিনি খোদ শাসনতন্ত্রকে ১৫ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে পার্লামেণ্টকে দিয়ে পরিবর্তিত করিয়ে নিতে পেরেছিলেন। একইভাবে স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান ও স্বৈরশাসক হোসেন মুহাম্মদ এরশাদও তাঁদের স্বৈরাশাসন চালিয়েছেন সংবিধানকে পরিবর্তিত করে ও পরিবর্তিত সংবিধানকে মান্য করার মধ্য দিয়েই। সুতরাং শাসনতন্ত্র অনুযায়ী শাসন করলে তা স্বৈরাচারী হবে না ভাবা ঠিক নয়। স্বৈরাচার বা স্বৈরতন্ত্রকে বুঝতে হবে গণতান্ত্রিক বিধি-বিধান, আচার-আচরণ ও মূল্যবোধের বিপরীতে।

    আজ সন্ধ্যায় পূর্ব-লণ্ডনে সাপ্তাহিক পত্রিকা অফিসে এক আড্ডায় ইউকেবেঙ্গলির এক্সিকিউটিভ এডিটর আরিফ রহমান জিজ্ঞেস করছিলেন, বাঙালী শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর লোকেরা ভুল শব্দ ব্যবহার করেন কেনো? আমার উত্তর ছিলোঃ অর্থ না বুঝে শব্দ মুখস্ত করার মধ্য দিয়ে ‘শিক্ষিত’ হয়ে উঠলে, শব্দের ব্যবহারে শব্দের অর্থে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে বাধ্য।

    সৈয়দ আবুল মকসুদ এখানে প্রসঙ্গ হলেও, আমি সাধারণভাবে সকল বাঙালী কথক ও লেখকের প্রতি অনুরোধ করছিঃ চলুন নিজের বুদ্ধির প্রতি সুবিচার করে শুদ্ধরূপে বাংলাভাষা বলতে ও লিখতে শিখি; অর্থ বুঝে শব্দ ব্যবহার করি; বাক্যের মধ্যে উদ্দেশ্য ও বিধেয় অন্তর্ভূক্ত করি; বিশেষণের ব্যবহার ও এর মাত্রা বা ডিগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্র হিসেবী  হই, নির্ভুল বানান লিখি (বিশেষ করে চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার, ই-কার ও ঈ-কারের যথাযথ ব্যবহার) এবং সঠিক যতি চিহ্ন ব্যবহার করি।

    আমাদের বুঝতে হবে, জাতির জন্য ভাষা হচ্ছে আত্মপরিচিতি ও ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এবং বাঙালী জাতির ক্ষেত্রে এ-ভিত্তি গড়-জাতির চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্যেই। তাই, ভাষার আদর্শমান রপ্ত ও রক্ষা করাটা জরুরি।

    আর সবশেষে প্রথম আলোকে বলবো, সম্পাদনা বলতে যে একটি কর্ম প্রকাশনা শিল্পে আছে, দয়া করে সেদিকে মনোযোগী হোন। আপনারা কি “বদলে যাও, বদলে যাও” স্লৌগানের ডামাডোলে সম্পাদনার কর্মটিই বদলে দিয়েছেন?  তা না হলে অভিধানের দোহাই দিয়ে অভিধানেরই বিপরীতে (সম্ভবতঃ অভিধান না দেখেই) সৈয়দ আবুল মকসুদ ‘স্বৈরাচার’কে মানুষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে প্রকাশিত হতে পারলেন কীভাবে?

    মঙ্গলবার, ৩ ডিসেম্বর ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    maudrana1@gmail.com

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন