• স্বাধীনতাঃ মত-প্রকাশ বনাম ঘৃণা-প্রচার
    মাসুদ রানা

    ইনৌসেন্স অফ মুসলিমস্‌
    ‘ইনৌসেন্স অফ মুসলিমস্‌’ নামের একটি মুভি-ট্রেইলর বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী মুসলিম প্রাধান্যের দেশে-দেশে। মূল মুভিটি কখনও ‘ইনৌসেন্স অফ বিন লাদেন’, কখনও ‘ডেজার্ট ওয়ারিয়র’, আবার কখনও ‘ডেজার্ট স্টর্ম’ নামাঙ্কিত।

    মুভিটিতে চরিত্র হনন করা হয়েছে ইসলামের প্রবর্তকের। যাঁর পুরো নাম ‘আবু আল-কাসিম মুহাম্মদ ইবন্‌ আবদ্‌ আল্লাহ্‌ ইবন্‌ আবদ্‌ আল-মুত্তালিব ইবন্‌ হাশিম’, তাঁর বংশ ও জন্ম পরিচয় অজ্ঞাত দেখানো হয়েছে মুভিটিতে। তাঁর চরিত্র চিত্রিত করা হয়েছে মুর্খ, প্রবঞ্চক, যৌনসম্ভোগী, চুক্তিভঙ্গকারী, নির্মম ও নৃশংস রূপে।

    মুভিটি তৈরী হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, মার্কিন নাগরিকের হাতে। মিশরীয় বংশোদ্ভূত কপ্টিক-খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী নাকোলা বাসিলি নাকোলা, ‘স্যাম বাসিল’ ছদ্মনাম নিয়ে এ-মুভিটি তৈরী করেছেন। তিনিই পরবর্তীতে মুভিটির বিভিন্ন অংশ থেকে একটি ‘ট্রেইলর’ তৈরী করে ইন্টারনেটে প্রকাশ করেছেন।

    ইতিপূর্বে ব্যাংক জালিয়াতিতে কারাদণ্ডভোগী এই নাকোলা তাঁর উদ্দেশ্যকে গোপন রেখে, অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরকে ‘একটি ধুমকেতুর আগমনে মরুভূমিতে সৃষ্ট সহিংসতা’র কাহিনী বলে অভিনয় করিয়ে নিয়েছেন। পরবর্তীতে, তাঁদের মুখে ইচ্ছে-মতো সংলাপ ঠেসে দিয়েছেন তিনি ‘ওভারডাবিং’ পদ্ধতিতে। অভিনয়-কালে যে চরিত্রটি ছিলো ‘মাস্টার জর্জ’, সেটি প্রদর্শন-কালে হয়ে গেলো ‘মুহাম্মদ’।

    এই মুভি-ট্রেইলরটি মুসলমানদের তো বটেই, শুভবুদ্ধির সমস্ত মানুষদের বিক্ষুদ্ধ করেছে। ইসলামী মৌলবাদীদের দ্বারা দণ্ডপ্রাপ্ত সালমান রুশদি পর্যন্ত এ-মুভিকে ‘স্পষ্টতঃ অমঙ্গলকামী একখণ্ড আবর্জনা’ এবং এর নির্মাতাকে ‘জঘন্য ও অপ্রীতিকর ও বিরক্তিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন।

    আলোচ্য মুভি-ট্রেইলরটি গত জুলাই মাসে ইন্টারনেটের ইউটিউবে উত্তোলিত হয় ‘রিয়েল লাইফ অফ মুহাম্মদ’ ও ‘মুহাম্মদ মুভি ট্রেইলর’ নামে ইংরেজি সংলাপ সহযোগে। কিন্তু তখনও পর্যন্ত কোনো অভিঘাত তৈরী করতে পারেনি এটি।

    পরে, সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে, আরবিতে ডাবিং যুক্ত হবার পর গত ৯ তারিখে মিসরের ইসলামিক টিভি চ্যানেল ‘আল-নাস’ এটি প্রচার করে। আর, সেই থেকে শুরু হয় প্রতিক্রিয়া।

    আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট ‘আনসার আল শারিয়া’ নামের একটি ইসলামবাদী জিহাদী দল গত ১১ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার বেনগাজিতে মার্কিন দূতাবাসের উপর আক্রমণ হেনে হত্যা করেন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টোফার স্টিভেন্স-সহ চার মার্কিন নাগরিককে। ইতিহাসের কৌতুক হচ্ছে, যে-মার্কিনীরা লিবিয়া জনতন্ত্রের জনক ও রক্ষক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে খুন করিয়েছিলো ইসলামী জঙ্গীদের দিয়ে, তাঁদের হাতেই প্রাণ দিতে হয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে।

    মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা আগ্রাসনে ক্ষতবিক্ষত দেশ আফগানিস্তানের ইসলামবাদী এক নারী, প্রতিশোধ স্পৃহায় আত্মঘাতিনী হয়ে হত্যা করেছেন একজন ব্রিটিশ নারী, ৮ জন দক্ষিণ আমেরিকান ও কয়েক জন স্বদেশী।

    বিক্ষোভ প্রকাশের জন্য পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে এক দিনের ছুটি ঘোষণা করার পরও প্রত্যাশিত বিক্ষোভ-কালে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে অনেক। ভারতের উত্তরে কাশ্মীর থেকে শুরু করে দক্ষিণে তামিল নাড়ু পর্যন্ত বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। বাংলাদেশে বিক্ষোভ রূপ নিয়েছে হরতালে।

    লেবাননে ৫০০,০০০ মানুষের বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শিয়া-মুসলিম নেতা নাসরুল্লাহ ইসলামের পয়গম্বরের অবমাননার বিরুদ্ধে ‘সিরিয়াস’ আন্দোলনে নামার আহবান জানান। ইরানের ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ খামেইনি বলেছেন, মুভি-ট্রেইলরটির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ‘জায়নবাদীদের’ দায়ী করেছেন।

    অন্যদিকে, রাষ্ট্রদূত-হত্যার সূত্রে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। বলাই বাহুল্য, এর ফলে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার নামে মধ্যপ্রাচ্যের যে-কোনো স্থানে, যে-কোনো সময়, যে-কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে দেশটি। কারণ, এর পক্ষে যুক্তি তৈরী করাই রয়েছে।

    এই যখন পরিস্থিতি, তখন বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে বিতর্ক হচ্ছে মানুষের ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ নিয়ে। ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ একটি হৃদয়গ্রাহী ধারণা। উচ্চারণ করা মাত্রই যে-কোনো যুক্তিশীল মানুষ এর পক্ষে রায় দেবেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেঃ এই ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ কি যা-ইচ্ছে-তাই করার জবাবদিহিতাহীন অধিকার?

    মত প্রকাশের স্বাধীনতা?
    ‘মত’ কাকে বলে? ‘মত’ হচ্ছে প্রশ্নাধীন বস্তু, ব্যক্তি, বিষয় কিংবা ঘটনা সম্পর্কে ব্যক্তির ‘কগনিশন’ বা বোধের শাব্দিক প্রতীকায়ণ। যেহেতু ব্যক্তির বোধ তাঁর শারীরিক-মানসিক অভিজ্ঞতা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস, সামাজিক অবস্থান এবং সর্বোপরি উদ্দেশ্যর দ্বারা অবয়বপ্রাপ্ত, তাই কোনো ‘মত’ই কোনো-মতেই নিরপেক্ষ হয় না।
    একমাত্র বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুধ্যানই আপেক্ষিকভাবে নিরপেক্ষ হতে পারে এই কারণে যে, এতে ব্যক্তিগত ‘ভ্যারিয়েবল্‌’ বা চল্‌গুলো নিয়ন্ত্রণ করে বস্তুনিষ্ঠ ও পরিমাপযোগ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা দেয়া হয়।

    ‘প্রকাশ’ বা ‘এক্সপ্রেশন’ ধারণাটি আপাতঃ প্রকাশক-কেন্দ্রিক মনে হলেও, বস্তুতঃ এতে প্রতীক উৎপাদক ও প্রতীক প্রত্যক্ষক বলে দুটো পক্ষ রয়েছে। যেখানে পর্যবেক্ষণের অবকাশ নেই, সেখানে প্রকাশ বলে কিছু নেই। তাই ‘এক্সপ্রেশন’-এর সাথে ‘ইমপ্রেশন’ জড়িত। এটি ঠিক নিউটনের গতির সূত্রের মতো। ক্রিয়াকে যেমন প্রতিক্রিয়া থেকে এবং প্রতিক্রিয়াকে ক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়, তেমনি ‘এক্সপ্রেশন’ ও ‘ইমপ্রেশন’ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য।

    অর্থাৎ, বস্তু-ব্যক্তি-বিষয়-ঘটনার ব্যক্তি-বোধের শাব্দিক প্রতীকায়ণ যখন অন্যের বোধে উদ্দীপন তৈরী করে, তখনই প্রকাশ তার পূর্ণতা লাভ করে। সুতরাং প্রকাশক বাস্তবে স্বাধীন নয়। প্রকাশের জন্য অন্যের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক। তাই, অন্যকে তোয়াক্কা না করে প্রকাশ সম্ভব নয়। আর এখানেই আসে স্বাধীনতা বনাম পারস্পরিক নির্ভরতার প্রশ্ন।

    শাব্দিকভাবে, স্বাধীনতা হচ্ছে ‘স্ব’-এর ‘অধীনতা’। অর্থাৎ, কোনো-না-কোনো অধীনতা ছাড়া স্বাধীনতা হয় না। যা-ইচ্ছে-তাই করার নাম স্বাধীনতা নয়। সভ্যতার ইতিহাস জুড়ে এমন স্বাধীনতার কোনো হদিস মিলে না। মাতৃগর্ভে ভ্রুণাকারে সৃষ্টি হওয়া থেকে শুরু করে, জন্ম ও বিকাশের প্রতিটি পর্যায়ে, ব্যক্তি-মানুষ অন্যের সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। উপরে যে শাব্দিক প্রতীকায়ণ তথা ভাষার কথা বলা হলো, এই ভাষাটি পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি-মানুষের পক্ষে একা-একা তৈরী করা সম্ভব নয়। মানুষের সমস্ত প্রকাশের ভিত্তিই হচ্ছে পারস্পরিক নির্ভরতা।  

    সুতরাং, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকা মানে হচ্ছে, অন্যকে অবজ্ঞা করে যা-ইচ্ছে-তাই উৎপাদন করা নয়। আমি যদি আমার মত প্রকাশের অভিঘাত তথা ‘ইম্প্রেশন’ অন্যের মধ্যে কী হবে, তা বিবেচনা না করি, তাহলে সেই ‘ইম্প্রেশন’ থেকে উৎপাদিত অন্যের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারেও আমি তাঁদেরকে দায়ী করার অধিকার রাখি না। অর্থাৎ, আমি যদি অন্যের প্রতি যা-ইচ্ছে-তাই করতে পারি, তার প্রতিক্রিয়ায় অন্যরাও আমার প্রতি যা-ইচ্ছে-তাই করতে পারেন।

    যদি তা-ই হয়, তাহলে আমরা পতিত হই একটি মহা বিশৃঙ্খলায়। আর, সামাজিক শৃঙ্খলা যেখানে ব্যর্থ হয়, তখন প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা মানুষকে শাসন করতে শুরু করে। অর্থাৎ, বোধের নয়, জয় হয় শারীরিক শক্তির।

    ঘৃণাবাদ
    যাঁরা আজ ‘সভ্যতা’র নামে কাণ্ডজ্ঞানহীন ও দায়িত্বহীন ‘মত প্রকাশ’ করছেন। তাঁরা বস্তুতঃ সামাজিক ‘এপিস্টেমোলজিক্যাল’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমণ্ডল থেকে মানুষকে প্রাকৃতিক শক্তির পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতামূলক মিথষ্ক্রিয়ায় আহবান করছেন। মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিবাদের জগত থেকে অন্ধ আবেগের জগতে টেনে নামাচ্ছেন।

    পৃথিবীর সব ধর্মেরই ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস। এমনকি সমস্ত আদর্শেরও ভিত্তি হচ্ছে কতিপয় ‘পৌস্ট্যুলেইট’ বা স্বতঃসিদ্ধ, যা মূলতঃ বিশ্বাস ছাড়া কিছুই নয়। এই বিশ্বাসকেই ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সমস্ত ধর্মবাদ ও আদর্শবাদের নিজস্ব যুক্তি। কারও কোনো ধর্মে বা আদর্শে বিশ্বাসী মানেই হচ্ছে তাঁর মৌলিক বিশ্বাস বা স্বতঃসিদ্ধে অনড় অবস্থান। সেই অর্থে, ধার্মিক ও আদর্শবাদী উভয়ই মৌলবাদী।

    যাঁরা মানুষকে ধর্মীয় ও আদর্শিক বিশ্বাসের স্তর থেকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের স্তরে উন্নীত করতে আগ্রহী, তাঁরা যদি জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবর্তনের নিয়ম-সমূহ অমান্য করে, মানুষের বিশ্বাসকে অপদস্ত ও অপমান করে, লক্ষ্য অর্জন করতে চান, বস্তুতঃ তাঁরা তাঁদের লক্ষ্যের বিপরীতে কাজ করছেন। অন্য মানুষের বোধ ও আবেগকে ‘ইগনৌর’ করার মধ্য দিয়ে ‘ইগনৌরেন্স’ তৈরী হয়, জ্ঞান লাভ হয় না - ‘ইগনৌরার’ কিংবা ‘ইগনৌর্ড’ কারও পক্ষেই না।

    মুক্তমনে সুপ্ত ঘৃণা
    প্রসঙ্গতঃ লিখি, মুক্তমনের ভান করে ইন্টানেটে কিছু বাঙালী আত্মপরিচয় গোপন রেখে, ছদ্মবেশ ধারণ করে, তাঁদের মন-গড়া ‘বিজ্ঞান’ ও ‘যুক্তি’র নামে ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণাবাদ ছড়ান। মুক্তমনে মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে তাঁরা বিভিন্ন সময়ে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে - অত্যন্ত নিম্নমানের ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও কল্পকাহিনী লিখে প্রকাশ করেন।

    তাঁদের কেউ-কেউ সেক্যুলার বামপন্থীদের দ্বারা সমালোচিত হবার কারণে, ক্ষেপে গিয়ে সেক্যুলার বামপন্থী ও ইসলামপন্থীদের এক কাতারে ফেলে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দেন। এঁদের মধ্যে কেউ-কেউ এতোই ‘প্যারানয়েড’ হয়ে উঠেছেন যে, তাঁরা ইসলামবাদীদের বিরোধিতা করতে যেয়ে জায়নবাদের এবং বামপন্থীদের বিরোধিতা করতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদের সক্রিয় সমর্থকে পরিণত হয়েছেন।

    বাস্তবে, ‘ইনৌসেন্স অফ মুসলিমস’-এর স্রষ্টা নাকোলার মতোই এঁরা কাপুরুষ। ইন্টারনেটে নাকোলা যেখানে ‘স্যাম বাসিল’ ছদ্মনামে হাজির হয়ে তাঁর মুর্খতা প্রকাশ করেছেন কুরুচিপূর্ণভাবে, উল্লিখিত বদ্ধবোধের তথাকথিত মুক্তমনারা নিজের চেহারা না দেখিয়ে কাপুরুষোচিত মূর্খতার বিপুল বিস্তার ঘটিয়ে চলেছেন।

    ব্যক্তিগতভাবে এঁদের অনেকেই অত্যন্ত কদর্য চরিত্রের অধিকারী। সম্ভবতঃ এ-কারণেই তাঁরা মল-মূত্রে জন্মিত কুৎসিত কীটের মতো কুরুচির গভীর খন্দে বাস করেন। তাঁদের কাজ হচ্ছে ঘৃণার বিষাক্ত কীটের নোংরা মুখের নিসৃত লালা সমাজ-দেহে ছড়িয়ে দেয়া। এঁরা এক ধরণের ‘স্যাডিস্ট’। কুৎসিত শব্দ ও প্রতীক ব্যবহার করে এঁরা নিজেদের মানসিক বিকৃতির উদ্দীপনা তৈরী করে এক ধরনের তৃপ্তি লাভ করেন। এঁদের চিকিৎসা প্রয়োজন।

    ইতিহাসের শিক্ষা
    নাৎসি জার্মানীতে ঘৃণার সংস্কৃতি ও ঘৃণার আদর্শবাদ তথা ‘এ্যান্টি-সেমিটিজম’ বা ‘ইহুদি বিদ্বেষবাদ’ গত শতাব্দীতে ইউরৌপে যে-নারকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলো, তা আমরা জানি। আর তাই, এর পুনরাবৃত্তি রোখার জন্য আজ পৃথিবীর দেশে-দেশে আন্দোলন ও আইন সুপ্রতিষ্ঠিত।

    কিন্তু, যে-দেশগুলো ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার আলোকে ‘এ্যান্টি-সেমিটিজম’-এর বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ও আইনী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে সভ্যতাকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো, দুর্ভাগ্যবশতঃ সে-দেশগুলোতে আজ ভিন্ন নামে ঘৃণাবাদের উত্থান ঘটেছে।

    এই ঘৃণাবাদ - যা আজ ইসলামোফোবিয়া নামে পরিলক্ষিত - তার অভিঘাতে নরওয়ের মতো ‘সভ্য’ দেশেও সৃষ্টি হয়েছে ব্রিভিকের মতো ঘৃণাবাদী। এই ব্রিভিক নিজ-দেশের ইসলামীকরণ রুখতে আপন জাতির শিশু-কিশোর-সহ ৭৭টি প্রাণ হরণ করেছেন নির্বিচারে। লক্ষ্যণীয়, তিনিও বস্তুতঃ কাপুরুষ। কারণ, তিনিও নিজ-পরিচয় গোপন করে, পুলিসের পরিচয় দিয়ে, শিশু-কিশোরদের কাছে ‘সাহায্য’ করার ভান করে, তাঁদের ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছেন।

    ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের বুঝা প্রয়োজন যে, মানুষের প্রতি মানুষের যে-কোনো ধরনের ঘৃণাবাদ সামগ্রিকভাবে মানব জাতিকে ক্ষতিগ্রস্তই করে। তাই পৃথিবী থেকে ঘৃণার অপসংস্কৃতি বিলোপের জন্য শুধু ‘এ্যান্টি-সেমিটিজম’ বা ‘ইহুদি-বিদ্বেষবাদ’-এর বিরুদ্ধে নয়, সমস্ত প্রকারের ঘৃণাবাদের বিরুদ্ধে সমগ্র মানব জাতিকে বোধে, রুচিতে, মূল্যবোধে ও সংস্কৃতিতে দাঁড়াতে হবে।

    রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১২
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন