• হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্যঃ মুক্তিযুদ্ধের অচেতনা
    মাসুদ রানা

    বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রকৃত অর্থে সেক্যুলার ছিলো কি-না সে-বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের অন্তে সংবিধানে এলেও, প্রস্তুতিতে ও চলন্তিতে সেক্যুলারিজম তো দূরের কথা, ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও উচ্চারিত হয়নি।

    যে ৬-দফা দাবীকে মুক্তির সনদ বিবেচনা করা হয়, সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা নেই; যে ১১-দফাকে প্রগতির পরাকাষ্ঠা মানা হয়, সেখানে নেই; যে স্বাধীনতার ইশতেহারকে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা মনে করা হয়, সেখানেও নেই। ধর্মনিরপেক্ষতা তাহলে হঠাৎ করে সংবিধানে এলো কীভাবে?

    এটি প্রায় অসম্ভব যে, কোনো এক ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি তাঁর ইচ্ছামতো এটি সংবিধানে প্রবিষ্ট করেছেন। এটিও হতে পারে না যে, কোনো একটি রাজনৈতিক দল এটি একান্ত আদর্শবাদের সুবাদে সংবিধানে প্রতিষ্ঠা করেছে। উত্তর এটিও নয় যে, কোনো একটি বৈদেশিক রাষ্ট্র এটি চাপিয়ে দিয়েছে।  

    ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে - যাকে আমি বাঙালী জাতীয়তাবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গ বলি - ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দে প্রকাশিত না হলেও মর্মে বিকশিত হয়েছিলো। তাই, সে-সময়ে একটি জনপ্রিয় স্লৌগান ছিলোঃ

    বাংলার হিন্দু
    বাংলার খ্রিষ্টান
    বাংলার বৌদ্ধ
    বাংলার মুসলমান
    আমরা সবাই বাঙালী

    এটি অভিন্ন বাঙালী সত্তার স্লৌগান। একটি পরোক্ষ হলেও মর্মে ধর্মনিরপেক্ষতার স্লৌগান। এ-স্লৌগান ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সূচিত ও বিকশিত বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রথম তরঙ্গে ছিলো না। সেই জাতীয়তাবাদ হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ-মুসলমানকে এক ও অভিন্নভাবে দেখতে পারেনি। দেখতে পারার সেই বোধ সেদিন বিকশিত হয়নি।  

    বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রথম তরঙ্গ যেখানে গীত হয়েছিলো হিন্দুত্ববাদী ‘বন্দেমাতরম’, দ্বিতীয় তরঙ্গে সেখানে উচ্চকিত হলো ‘জয় বাংলা’। অর্থাৎ, বাঙালী জাতীয়তাবাদকে একটি ঐতিহাসিক সৌশ্যাল কগনিটিভ প্রোসেস বা সমাজ-বোধিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে একটি বিকাশ লক্ষ্য করা যায়।

    দ্বিতীয় তরঙ্গের অন্য প্রকার সীমাবদ্ধতা আছে, যা এখানে আলোচ্য নয়। এখানে যেটি হৃদয়ঙ্গম্য তা হচ্ছে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে রাষ্ট্রটির ভিত্তি যে ধর্মবাদ, তার লেজিটিমিসি বা বৈধতা নস্যাৎ করা প্রয়োজনীয় ছিলো। তাই, ধর্মকে এক পাশে রেখে ‘আমরা’র অভিন্ন আইডেণ্টিটি বা আত্মপরিচয় হিসেবে ‘বাঙালী’ সামনে এলো।

    দুঃখের বিষয় নেতৃত্বের দার্শনিক দারিদ্রের কারণে নব প্রতিষ্ঠিত বাঙালী জাতি-রাষ্ট্রটি ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধারণ করে বিকশিত করতে পারলো না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগ ও এর নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ধর্মনিরপেক্ষতা অচিরেই অর্থহীন হয়ে ওঠে।

    শেখ মুজিবুর রহমান “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়” তত্ত্ব দিয়ে রাষ্ট্রের মধ্যে সব ধর্ম ‘সমান’ বলে বাস্তবে ইসলাম ধর্মকে ‘বেশি সমান’ হিসেবে হাজির করলেন। বাংলাদেশে ইসলমিক ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে পাকিস্তানে গিয়ে বাঙালী ঘাতক টিক্কা খানের সাথে করমর্দন ও বাঙালী ঘৃণক জুলফিকার আলি ভুট্টোর সাথে কোলাকুলি করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশকে ইসালমি সম্মেলন সংস্থার সদস্যে পরিণত করলেন।

    তখন থেকেই বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতার মৃত্যু হলো। অর্থাৎ, বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ হিসেবে বিশ্বসভায় অভিষিক্ত হলো। অর্থাৎ, বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতোই রাষ্ট্র হলো।

    স্বভাবতঃ অন্য ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই রূপান্তর আদরণীয় হতে পারে না। শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বসভায় গিয়ে কার্যতঃ বললেন, বাংলাদেশের পরিচয় হচ্ছে ‘মুসলমান’। ফলে বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ বিশ্বাসঘাতিত হলেন। ফলে এই তিন ধর্মের মানুষের মধ্যে একটি স্বাভাবিক বঞ্চনাবোধ এবং সে থেকে ঐক্যের ক্ষেত্র তৈরী হলো।

    বাংলাদেশের পরবর্তী রহমান যখন সংবিধানের শুরুতে কুরআনের পংক্তি স্থাপন করে ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটি পর্যন্ত মুছে দিলেন এবং হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন, তখন হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধদের আর ভরসা করার মতো কিছুই থাকলো না। বোধিক পর্যায়ে এই বঞ্চনাবোধ, আবেগের পর্যায়ে বিশ্বাসঘাতিত হওয়ার যন্ত্রণা এবং সামাজিক ও শারীরিকভাবে প্রায়শঃ আক্রান্ত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তাদের মননে উচ্চারিত হয়ঃ

    বাংলার হিন্দু
    বাংলার খ্রিষ্টান
    বাংলার বৌদ্ধ
    আমরা সবাই সংখ্যালঘু

    নিজের দেশে নিজে সংখ্যালঘু হয়ে থাকা যে কতো বেদনার, এটি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ব্যক্তির পক্ষে উপলব্ধি করা প্রায় অসম্ভব। তাই, অনেক মুসলমান বুঝতে চান না, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে ‘হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ’ নামের সংগঠন কেনো হবে।

    ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলার হিন্দু-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ-মুসলমান মিলে যে ’আমরা সবাই বাঙালী’ চেতনার উদ্ভব হয়েছিলো, তার সাথে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ত্রয়ী ঐক্যের চেতনা স্পষ্টতঃ বিরোধাত্মক। সেই অর্থে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সৃষ্টি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-বিরোধী, যদিও এ-বিরোধিতা হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিক্রিয়া মাত্র।

    বাঙালী জাতির মধ্যে সাম্প্রদায়িক ক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সেই ১৯০৫ সাল থেকে হয়ে আসছে। বাঙালী জাতীয়তাবাদের প্রথম তরঙ্গে হিন্দুত্ববাদী দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে ১৯০৬ সালেই ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্ম হয়। ‘বন্দেমাতরম’ স্লৌগানের বিপরীতে উচ্চারিত হয় ‘আল্লাহু আকবর’।

    এখনও সে-প্রতিক্রিয়া জীবন্ত। কিন্তু একটি প্রতিক্রিয়া আরও একটি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে বলে এর কোনো শেষ নেই। এটি একটি ভিশ্যাস সার্কেল বা দুষ্টচক্র। তাই, এ-চক্রের মধ্যে বাস করে এই চক্র ভেদ করা সম্ভব নয়।

    আমি মনে করি, এখন বুঝতে পারার সময় এসেছে যে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য করে বাস্তবে সমস্যা বেড়েছে বৈ কমেনি। কারণ, সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষেরা এর কারণটা উপলব্ধি না করে ফলটাকেই পাল্টা প্রতিক্রিয়ার কারণ মনে করেন। তাঁরা ভাবেন, এই ত্রয়ী ঐক্য নিশ্চয় তাঁদের বিরুদ্ধে। তাই এই ত্রয়ী ঐক্য সমাজে আবেদন তৈরি করতে পারে না।

    তাছাড়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যখন আক্রমণ নেমে আসে, তখন এর বিরুদ্ধে যখন সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে ওঠে, সেটি কি সংখ্যাগুরু মুসলমানকে বাদ দিয়ে হয়? না, তা নয়। তাহলে দেখা যাচ্ছে, সমস্যার তাত্ত্বিক ঐক্যের সাথে প্রায়োগিক ঐক্যের দ্বন্দ্ব রয়েছে।

    তাই উচিত হবে, ঐক্যের প্রশ্নে ১৯৭১ সালের সেই সৌগানে ফিরে যাওয়া এবং বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙালী বলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

    আমি প্রস্তাব করেছিঃ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের নাম পরিবর্তন করে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ রাখা এবং রিএ্যাক্টিভ বা প্রতিক্রিয়াপ্রবণ না হয়ে প্রোএ্যাক্টিভ বা প্রক্রিয়াপ্রবণ হওয়া। এই পরিষদের উচিত হবে এর কেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রতিটি শাখায় সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মুসলমানদের সক্রিয়ভাবে সংযুক্ত করা।

    গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয়দের একটি বৈঠক হয়েছে। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষ এ্যাক্টিভিষ্ট ডাঃ পিনাকী ভট্টাচার্য নিমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি আমার উপরের প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি পরে জানালেন, এ-প্রস্তাব শুনে উপস্থিত সবাই করতালি দিয়ে সমর্থন জানিয়েছেন। তবে, তা গৃহীত হয়েছিলো কি-না সেটি এখনও জানা যায়নি।

    পিনাকী ভট্টাচার্যের এ-অভিজ্ঞতাটা আমি লণ্ডনে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান পরিষদের সাথে যুক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন দু’জন ছাত্রের কাছে বললাম। তাঁরা দু’জনেই রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে জানালেন, লণ্ডনেই এটি শুরু করতে হবে।

    ধারণা করা যায়, লণ্ডনে এ-পদক্ষেপ গৃহীত হলে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে তা দ্রুত অনুসৃত হবে। আর তাই যদি হয়, বাংলাদেশে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

    সোমবার, ২০ জানুয়ারী ২০১৪
    নিউবারী পার্ক, এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com

     

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন