• হেফাজত-আন্দোলনঃ মজহারের শ্রেণী-জিহাদ?
    মাসুদ রানা

    পরিচয়
    অজ্ঞতা আমার! পড়া হয়নি। তবে, পড়ুয়া বন্ধুদের কাছে শুনেছি, ইসলামী জিহাদই আজকের যুগে শোষিতের শ্রেণী সংগ্রাম বলে তত্ত্বায়ন করেছেন বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার। শুনেছি, এ-তত্ত্ব চ্যালেইঞ্জ করার মতো ক্ষমতা নাকি মার্ক্সবাদী শ্রেণী-সংগ্রামীরাও দেখাতে পারেননি।

    আরও শুনেছি, তাঁর বিরুদ্ধে বুদ্ধিতে ও যুক্তিতে না পেরে, কেউ-কেউ নাকি ইতর ভাষায় গালাগাল করেন তাঁকে। তবে এ-কথা শুনে চমৎকৃত হয়েছি যে, গালাগালের উত্তর দেন না মজহার। শ্রদ্ধাবনত আমি বলি, এটি মহত্ত্বের পরিচয়।

    অদ্য এক বন্ধু আমাকে একটি অনলাইন লিংক পাঠালেন ফরহাদ মজহারের একটি লেখার। লেখাটির শিরোনাম ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’, যেখানে তিনি হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির কারণ এবং তাঁদের উপর সরকারী বাহিনীর আক্রমণের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।

    সে-ব্যাখ্যাতে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রেণী-সংগ্রাম এবং ইসলামী বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার জিহাদের ধারণা পাশাপাশি ব্যবহার করে প্রথমে অনুষঙ্গ ও পরে প্রতিস্থাপন পদ্ধতির মাধ্যেমে এই দুই ধারণার মধ্যে একটি সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস পেয়েছেন। নিচের লেখায় আমি বিষয়টি দেখাবার চেষ্টায় প্রবৃত্ত হলাম।

    অনুসন্ধান
    ফরহাদ মজহার তাঁর রচনা শুরু করেছেন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের উপর আক্রমণের পেছেন নগরবাসী শাসক শ্রেণীর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে। তিনি লিখেছেনঃ

    ‘নাম দেয়া হয়েছিল ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’ অর্থাৎ হেফাজতিদের শহর থেকে টিয়ার গ্যাস ছুড়ে গুলি মেরে বোমা ফাটিয়ে যে ভাবেই হোক তাড়িয়ে দিতে হবে। শহর সাফ করতে হবে।’

    অপারেশন বা আক্রমণের উদ্দেশ্যকে বস্তুনিষ্ঠভাবে ব্যাখ্যা করার পরিবর্তে, ফরহাদ মজহার অনেকটা গল্পের মতো লেখকের অন্তর্যামী ক্ষমতা দিয়ে শাসক-চরিত্রের চিন্তাকে ইম্পারেটিভ বাক্য রচনার মাধ্যমে প্রকাশ করে লিখলেনঃ

    ‘অপারেশান ফ্লাশ আউট টিয়ার গ্যাস ছুড়ে, নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ভীতিকর সাউন্ড গ্রেনেডের আওয়াজে দিগ্বিদিক প্রকম্পিত করে গ্রাম থেকে আসা মানুষগুলোকে মেরে কেটে তাড়িয়ে দাও। শহর নিরাপদ করো সেই গুটি কয়েকের জন্য যাদের কাছে ১৬ কোটি মানুষ তাদের জীবন ও জীবিকা জিম্মি না রেখে বেঁচে থাকতে পারে না।’

    বুঝলাম, ফরহাদ মজহার গ্রামের মানুষের প্রতি ঢাকাবাসী ধনিক শ্রেণীর ঘৃণার বর্ণনা দিয়েছেন সাহিত্যিক সৃষ্টিশীলতায়। কিন্তু তাঁর এই সৃষ্টিশীলতা যে পরিস্থিতির অবজেক্টিভিটি বা বস্তুনিষ্ঠতাকে নস্যাৎ করেছে, তা হয়তো তিনি লক্ষ্যই করেননি; কিংবা, তিনি সচেতনভাবেই একটি সাবজেক্টিভ রিপ্রেজেণ্টেশন তৈরী করেছেন। কারণ, রাষ্ট্রীয় তিন বাহিনীর যৌথ অভিযানকে শুধু গ্রামের মানুষের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ হিসেবে মেনে নিলে এটিও মেনে নিতে হবে যে গ্রামের মানুষ মাত্রই দরিদ্র এবং শহরের সব মানুষ না হলেও বেশির ভাগ মানুষই ধনিক শ্রেণীর।

    বাস্তবে বিষয়টি মোটেও তা নয়। বস্তুতঃ শহরের বাইরে গ্রাম কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। শহর ও গ্রাম মিলেই বাংলাদেশের শ্রেণী-বিভক্ত সমাজ গঠিত। আর, সে-সমাজে যে শ্রেণী-শোষণ চলছে, তা-ও গ্রামে ও শহরে মিলিয়েই চলছে।

    পুঁজিবাদী সমাজের অসম বিকাশের সাধারণ নিয়মেই শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্য আছে, কিন্তু গ্রামের মানুষ মাত্রই দরিদ্র শ্রেণীর অন্তর্গত, তা সত্য নয়। গ্রামের মানুষ মানেই দরিদ্র বুঝলে কিংবা বুঝালে বস্ততঃ গ্রামীণ শ্রেণী-বিভাজন ও শ্রেণী-শোষণকে অস্বীকার করা হয়।

    সুতরাং আমি সজোরে সন্দেহ প্রকাশ করছিঃ মার্ক্সীয় শ্রেণী-সংগ্রাম ধারণায় শ্রেণী বলতে যা নির্দেশ করা হয়, সে-সম্পর্কে ফরহাদ মজহারের উপলব্ধি হয়তো এক নয়। আমার এ-সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়, যখন দেখি তিনি শহরের বিপরীতে গ্রাম, আর গ্রামের পরিচয়ই হচ্ছে মাদ্রাসা বলে বুঝাতে চান।

    ফরহাদ মজাহার তাঁর রচনার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে শুরুতেই গ্রামের মানুষের সাথে মাদ্রাসার সমীকরণ করেছেন। তিনি লিখেছেনঃ

    ‘শহরে কি তাহলে গ্রামের মানুষের কোনো স্থান নাই? আছে। শহরেও মাদরাসা আছে। কিন্তু তার উপস্থিতি অদৃশ্য। তাকে থাকতে হবে, না থাকার মতো শহুরে ভদ্রলোকদের নজর থেকে দূরে।’

    শহরে গ্রামের মানুষ থাকে কি-না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলতে পারতেন ‘আছে, লক্ষ-লক্ষ বস্তিবাসী আছে’। কিন্তু তিনি ‘আছে’ এবং ‘শহরেও মাদরাসা আছে’ বলে, গ্রামের মানুষকে আইডেন্টিফাই করলেন মাদ্রাসার সাথে। এবং পরক্ষণেই সেই গ্রামের মানুষদেরকে শহরে শোষিত হতে দেখালেন পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অধীনেঃ

    ‘এদের ছাড়াও শহরে সহ্য করা হয় পোশাক কারখানার জন্য কিশোর ও কিশোরী সস্তা শ্রমিকদের। কিন্তু তাদের থাকতে হয় বদ্ধ বস্তিতে এক ঘরে দশ-পনেরো জন। যে মজুরি পায় তা ঘরভাড়া দিতেই চলে যায়। খাবার ঠিকমতো খায় কি না সন্দেহ। কিন্তু তারাও যখন কারখানায় কাজ করে তখন তাদের তালা মেরে রাখা হয় জেলখানার বন্দীর মতো। কারখানায় আগুন লাগলে যেকোনো দুর্ঘটনায় তারা পুড়ে মরে, হুড়োহুড়ি করে বেরোতে গিয়ে পায়ের চাপায় পিষ্ট হয়ে লাশ হয়ে যায়। ভবন ধসে পড়ে প্রায়ই। তখন তাদের জ্যান্ত কবর হয়। রানা প্লাজা ধসে গিয়ে চাপা পেয়ে মরেছে হাজারেরও বেশি মানুষ।’

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে শোষিত শ্রমিককে গ্রামের মানুষ হিসেবে চিত্রিত এবং গ্রামের মানুষকে মাদ্রাসার লোক হিসেবে আইডেণ্টিফাই করার পর ফরহাদ সাহেব তৃতীয় অনুচ্ছেদে লিখলেনঃ

    ‘যে জালিম ব্যবস্থা গরিবকে নিরন্তর গরিব করে রাখে, যে ব্যবস্থায় পুঁজির কাছে নিজেকে বেচে দিয়ে নগণ্য মজুরির ওপর জন্তু-জানোয়ারের মতো শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া আল্লাহর দুনিয়ায় মজলুমের প্রাণধারণের কোনো উপায় আর অবশিষ্ট থাকে না, সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে এসেছিল হেফাজত। কেন এসেছিল? কারণ তার জীবের জীবন থেকে এই ব্যবস্থা যা কেড়ে নিতে পারে নি তা হচ্ছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, নিজের ইমান-আকিদার প্রতি অঙ্গীকার এবং নবী করিমের (সা:) প্রতি অগাধ প্রেম। কুৎসিত ও কদর্য ভাষায় বাক ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার নামে তার জীবনের শেষ এই সম্বলটুকুরও অবমাননা, অপমানিত ও লাঞ্ছিত করেছে শহরের মানুষ। হেফাজত তার ঈমান-আকিদার জায়গা থেকেই প্রতিবাদ করেছে।’

    ফরহাদ মজহারের ভুল নিরূপণ করার জন্য তাঁর এই পাঁচ বাক্যের ব্যবহার ভালো করে লক্ষ্য করা প্রয়োজন। কারণ এর উপর নির্ভর করেই আমাদের উপলব্ধি গড়ে তুলতে হবে ফরহাদ মজহারের শ্রেণী-সংগ্রাম ও জিহাদের সমীকরণ তত্ত্ব সম্পর্কে।

    ঢাকাতে কেনো হেফাজতে ইসলাম এসেছিলো, তার উত্তর প্রথম বাক্যের সাবঅর্ডিনেইট ক্লজে দেয়া হয়েছে ‘সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে এসেছিলো হেফাজত’ দাবি করে। ‘সেই ব্যবস্থা’ যে পুঁজিবাদী শোষণ ব্যবস্থা, তাও নির্দেশ করা হয়েছে প্রথম বাক্যের মেইন ক্লজে ‘পুঁজির কাছে নিজেকে বেচে দিয়ে’ বলে। দুই ক্লজে গঠিত ৪১-শব্দের এই বাক্যটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও ফরহাদ মজহার ‘কেন এসেছিল?’ প্রশ্নবোধক দ্বিতীয় বাক্যটি ছুরির মতো বসিয়ে দিলেন প্রথম বাক্যের ঠিক পেছেনে।

    মজহার সাহেব এর মধ্য দিয়ে এক দিকে প্রথম বাক্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধ্বংস করে পরক্ষণেই তা উদ্ধার করতে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বাক্যে হেফাজতের ঢাকা আসার কারণ হিসেবে (১) ইসলামী ঈমান ও আকিদার প্রতি শহরের মানুষদের প্রদর্শিত অবমাননা এবং (২) এই অবমাননার বিরুদ্ধে হেফাজতীদের প্রতিবাদ স্পৃহার কথা উল্লেখ করলেন।

    উপরে উদ্ধৃত ফরহাদ মজহার তাঁর লেখার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে পুঁজিবাদের শোষণের নির্মম শিকার হিসেবে বস্তুনিষ্ঠভাবেই উপস্থাপন করলেন পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের (যাঁদের অধিকাংশ নারী) সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনা (যাকে হেফাজতের এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা 'আল্লাহ্‌র গজব' বলে আখ্যায়িত করেছেন)। এর মধ্য দিয়ে তিনি পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে পাঠকের একটি মানসিক অবস্থা তৈরী করলেন। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করি, তৃতীয় অনুচ্ছেদের প্রথম বাক্যে শ্রমিক উধাও হয়ে গেলো কিন্তু পুঁজিবাদী শোষণের বর্ণনা অবহ্যাত থাকলো এবং এর চ্যালেইঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হলো হেফাজতে ইসলাম। দ্বিতীয় বাক্যে চ্যালেইঞ্জার প্রশ্নাতীত কিন্তু কারণ হলো প্রশ্নবিদ্ধ। তৃতীয়-চতুর্থ-পঞ্চম বাক্যে নতুন কারণ হাজির হলোঃ ঈমান ও আকিদার প্রতিষ্ঠার লড়াই বা জিহাদ।

    এভাবেই বুদ্ধিমান ও সৃষ্টিশীল ফরহাদ মজহার ‘অপরাশেন ফ্লাশ আউট’ রচনাতে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও অন্ততঃ পরোক্ষভাবে শ্রেণী-সংগ্রাম ও ইসলামী জিহাদের মধ্যে সমীকরণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন।

    হেফাজতের ১৩-দফা
    বুদ্ধিমান ফরহাদ মজহার যতোই ইসলামী জিহাদ আর পুঁজিবাদ-বিরোধী শ্রেণী-সংগ্রামের সমীকরণ আর হেফাজতীদেরকে শ্রেণী-সংগ্রামের বীর সেনানী হিসেবে দেখাতে চান না কেনো, হেফাজতে ইসলাম নিজেদের  উত্থাপিত ১৩ দফার মধ্য দিয়ে স্ফটিক-স্পষ্ট করে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁদের দাবিগুলো কী। আলোচনার সুবিধার্থে তাঁদের দাবিগুলোর পুনরুৎপাদন করা হলোঃ

    (১) সংবিধানে ‘আল্লাহ্‌র উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরান-সুন্নাহ্‌ বিরোধী সকল আইন বাতিল করতে হবে।

    (২) আল্লাহ্‌, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করতে হবে।

    (৩) কথিত শাহবাগী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবী (সা.)-র শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী কুলাঙ্গার ব্লগার ও ইসলাম বিদ্বেষীদের সকল অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

    (৪) ব্যক্তি ও বাক-স্বাধীনতার নামে সকল বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বলনসহ সকল বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে।

    (৫) ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।

    (৬) সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সকল অপ-তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।

    (৭) মসজিদের নগরী ঢাকাকে মূর্তির নগরীতে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করতে হবে।

    (৮) জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সকল মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ে বাধা-বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করতে হবে।

    (৯) রেডিও, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় দাড়ি-টুপি ও ইসলামী কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় খল ও নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস-পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করতে হবে।

    (১০) পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও এবং খ্রিস্টান মিশনারীদের ধর্মান্তকরণসহ সকল অপ-তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।

    (১১) রাসুলপ্রেমিক প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদরাসা ছাত্র এবং তৌহিদী জনতার ওপর হামলা, দমন-পীড়ন, নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং গণহত্যা বন্ধ করতে হবে।

    (১২) সারা দেশের কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ এবং মসজিদের ইমাম-খতিবকে হুমকি-ধামকি ও ভয়ভীতি দানসহ তাদের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে।

    (১৩) অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত সকল আলেম-ওলামা, মাদরাসা ছাত্র ও তৌহিদী জনতাকে মুক্তিদান, দায়েরকৃত সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণসহ দুষ্কৃতকারীদেরকে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

    ১৩-দফার বিশ্লেষণ
    আমরা যদি বস্তুনিষ্ঠ ও বৈজ্ঞানিক নিরাসক্তি নিয়ে হেফাজতীদের ১৩-বিন্দু দাবির নিচ থেকে উপরে দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখবোঃ

    শেষের ৩টি তাৎক্ষণিক গণতান্ত্রিক দাবি। কারণ, সেখানে রাষ্ট্র কর্তৃক দমন-পীড়ন, হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং গ্রেফতারিতদের মুক্তি চাওয়া হয়েছে।

    এমনকি তার উপরের ৩টি দাবিকেও সীমিত অর্থে গণতান্ত্রিক বলা যায়। কারণ, সেখানেও নিজেদের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অন্য বিশ্বাসের লোকদের ‘অপতৎপরতা’ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

    কিন্তু উপর থেকে নিচের দিকে প্রথম ৭টি দাবিতে আমরা কী দেখি? আমি সততার সাথে বলছি, এর প্রতিটি দাবি প্রতিক্রিয়াশীল। এ-দাবিগুলো শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে তো নয়ই, বরং কোথাও প্রত্যক্ষভাবে এবং কোথাও পরোক্ষভাবে নির্যাতন-নিপীড়নের পক্ষে সক্রিয় ওকালতি।

    (১) ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সেই বিপ্লব-প্রদত্ত বৈধতায় ভিত্তিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতা এই রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে সমান মর্যাদা দান করেছে, সেখানে একটি বিশেষ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বর স্বীকৃতি চাওয়া কোনো বিচারেই ন্যায়সঙ্গত নয়। এ-রকম দাবি একটি ধর্মের জন্য সুখের হলেও অন্য ধর্মের কিংবা ধর্মহীন লোকদের জন্য জুলুম। তাই, এ-দাবি প্রতিক্রিয়াশীল।

    (২) সাধারণভাবে যে-কোনো বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচার অন্যায়। এমনকি নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধেও কুৎসা প্রচার অন্যায়। আস্তিক্য যেমন বিশ্বাস, নাস্তিক্য তেমনই বিশ্বাস। তাই, কোনো বিশ্বাসীর অধিকার নেই অন্যের বিশ্বাসকে অপমান করার। তবে যদি কেউ তা করেন, তাহলে তাঁর শাস্তি যাই হোক না কেনো, মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না। আজকের পৃথিবীতে মৃত্যুদণ্ড অত্যন্ত পশ্চাৎপদ ধারণা। বিচার প্রক্রিয়ায় ভুল হতে পারে, আর মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দেবার পর যদি বিচার প্রক্রিয়ায় ভুল প্রমাণিত হয়, তাহলে সে-ভুল শুধরানো তো যায়ই না, এর কোনো ক্ষতিপূরণও হয় না। তাই আইনতত্ত্ব বলে, অপরাধীর শাস্তি না-পাওয়া চেয়ে নিরপরাধীর শাস্তি-পাওয়া বেশি ক্ষতিকর।

    (৩) ইসলামের নবী-সহ যে-কোনো ধর্ম-প্রবর্তক বা ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচার একটি অন্যায় এবং প্রায়শঃ আইনের চোখে অপরাধ হিসেবে গণ্য। যাঁরা এই কাজ বা অপরাধ করেছেন, তাঁদের বিচার হোক। কিন্তু স্বঘোষিত নাস্তিককে শাস্তি পেতে হবে কেনো? কুৎসা রটনা অপরাধ হতে পারে, কিন্তু প্রসংশা না করা তো অপরাধ হতে পারে না। নাস্তিক মানেই ধর্মের কুৎসা রটনাকারী, এমন দাবি মুর্খতা। কারণ, প্রায়শঃ এক ধর্মের আস্তিক অন্য ধর্মের আস্তিক্যকে অপমান করে থাকেন। নাস্তিকের কোনো ধর্মের ব্যাপারে প্রীতি যেমন নেই, তেমন হিংসা ও বিদ্বেষও নেই। যিনি ঈশ্বর বা আল্লাহ বা গডকে গালি দেন, তিনি বস্তুতঃ তার অস্তিত্বকে মেনে নিয়েই গালি দেন। দৃশ্যতঃ বেশির ভাগ নাস্তিকই ইসলাম-সহ সকল ধর্মের প্রবর্তককে তাঁদের ঐতিহাসিক ভূমিকা বিবেচনা করে বড়ো মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা করে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হলোঃ একজন নাগরিকের যেমন ধর্ম-বিশ্বাসের অধিকার আছে, তার অবিশ্বাসেরও অধিকার আছে। এক ঈশ্বেরের বিপরীতে বহু ঈশ্বর কিংবা দেবদেবতায় বিশ্বাস করা যদি অপরাধ না হয়, তাহলে শূন্য ঈশ্বরে বিশ্বাস করলে অপরাধ হবে কেনো? নাস্তিকদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি অবশ্যই একটি অন্যায় নিপীড়নমূলক দাবি।

    (৪) অব্যাখ্যাত ও অসংজ্ঞায়িত ‘বেহায়াপনা’ রোখার স্বার্থে মানুষের মত প্রকাশের অধিকার ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা খর্ব করার এবং নারী-পুরুষের বাধাহীন চলাচল বন্ধ করার দাবি কোনোক্রমেই সমর্থন যোগ্য হতে পারে না। বাংলাদেশের গ্রামে ও শহরে শ্রমজীবী নারী-পুরুষ স্বাধীন বিচরণের মাধ্যেই কাজ করে থাকেন। তাই, এই দাবি শ্রমজীবীর দাবি হতে পারে না। একমাত্র পরজীবী শ্রেণীই এ-দাবি করতে পারে। নারী-পুরুষের শ্রম ছাড়া সভ্যতা ঠিকতে পারে না। তাই, এই দাবি সভ্যতা বিরোধী। এটি হচ্ছে যুগে-যুগে ও দেশে-দেশে রক্ষণশীল, অপরিশ্রমী ও পরজীবী ধর্মগুরুদের দাবি। এ-দাবির বাস্তবায়নের অর্থ হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের উপর চরম নির্যাতন ও সভ্যতার ধ্বংস সাধনের সনদ।

    (৫) পুরুষের সমান নারীর অধিকার অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে নারীর উপর পুরুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। এ-দাবি সংজ্ঞানুসারেই বৈষম্যমূলক। আর বৈষম্য হচ্ছে উৎপীড়নের পূর্বশর্ত। এই দাবিতেই যে বাধ্যতামূলক ইসলাম শিক্ষার কথা বলা হয়েছে তাও সংজ্ঞানুসারে নিপীড়নমূলক। কারণ, একটি জাতি-রাষ্ট্রে যখন বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের মানুষ সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে বসবাস করেন, তখন সবাইকে একটি বিশেষ ধর্মের শিক্ষিত তথা দীক্ষিত হতে বাধ্য করার দাবি রীতিমতো নির্যাতন।

    (৬) কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণার দাবি একটি ফ্যাসিস্ট দাবি। কাদিয়ানীরা যেখানে নিজদেরকে মুলমান মনে করেন, সেখানে রাষ্ট্রের কোনো অধিকারই থাকতে পারে না তাঁদের আত্মপরিচয় পরিবর্তন করার। এটি মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। হেফাজতে ইসলামের এই দাবি একটি নির্যাতনমূলক দাবি। এটি মেহনতি দরিদ্র শ্রেণীর দাবি নয়।

    (৭) ঢাকাকে ‘মসজিদ নগরী’ বলা হয় রূপক অর্থে, কারণ এখানে বিভিন্ন স্থাপত্য রীতির নির্দশন স্বরূপ প্রচুর মসজিদ আছে। কিন্তু ভুলে যাওয়া ঠিক নয়, যে ‘ঢাকা’ নামটি এসেছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের নাম অনুসারে। এখন যদি হিন্দু ধর্মের হেফাজতকারী নামের কোনো সংগঠন এসে দাবি করে যে, ঢাকেশ্বেরীর ঢাকা শহরে মসজিদ বানানো চলবে না, তাহলে কি এটি গ্রহণযোগ্য হবে? নিশ্চয় না। তাই, মসজিদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অন্য কোনো স্থাপত্য বা ভাষ্কর্য্য প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, এমন দাবি অন্যায়। অন্যদিকে, ভাষ্কর্য্যের সৌন্দর্য্য উপভোগীকে মূর্তিপূজারী বলা হচ্ছে আরেক অত্যাচার। কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা হলো, যদি কেউ মূর্তিপুজারী হোনও, তাতে নিরাকার উপসাকদের অধিকার নেই তাদের স্বাধীনতা খর্ব করার।

    উপরের বিশ্লেষণ দেখা যাচ্ছে যে, হেফাজতে ইসলামী সংগঠনের পতাকা তলে ব্যাপক দরিদ্র সাধারণ থাকলেও, সংগঠনটির দাবির মধ্যে কোথাও পুঁজিবাদী শোষণ ও শাসনের বিরুদ্ধে একটি শব্দও নেই। তবুও ফরহাদ মজহারকে প্রশ্ন করা যেতে পারেঃ উপরের ১৩-বিন্দু দাবির কোথায় দেখলেন ‘যে ব্যবস্থায় পুঁজির কাছে নিজেকে বেচে দিয়ে নগণ্য মজুরির ওপর জন্তু-জানোয়ারের মতো শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া আল্লাহর দুনিয়ায় মজলুমের প্রাণধারণের কোনো উপায় আর অবশিষ্ট থাকে না, সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে এসেছিল হেফাজত’?

    শ্রেণী-সংগ্রাম বলে কাকে?
    ফরহাদ মজহারকে সবিনয়ে বলিঃ জনাব, দরিদ্র শ্রেণীর মানুষের সংগ্রাম মানেই কিন্তু শ্রেণী সংগ্রাম নয়। এমনকি শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামও শ্রেণী-সংগ্রাম নয়, যদি না তা শ্রেণী নির্ধারক উৎপাদন সম্পর্কের দ্বন্দ্বে ভিত্তিষ্ঠিত হয়।

    উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ক না বুঝে শ্রেণী কিংবা শ্রেণী সংগ্রাম বুঝা যায় না। যে-উৎপাদন ব্যবস্থার উপর সমাজ দাঁড়িয়ে, তার মধ্যেই রচিত হয় মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, যা চূড়ান্ত বিচারে উৎপাদন সম্পর্ক। যে-সমাজে উৎপাদন ব্যবস্থার শ্রমদান-ডাইমেনশনে মুষ্ঠিমেয় মানুষ শ্রম-বিযুক্ত আর সিংহ ভাগ মানুষ শ্রমে নিযুক্ত এবং ভোগ-ডাইমেনশনে ঐ মুষ্ঠিমেয়রা ভোগে স্ফীত আর অধিকাংশ মানুষ ভোগ-বঞ্চিত, সে-সমাজই হচ্ছে শ্রেণী-বিভক্ত। কারণ, উৎপাদনের পাটাতনের উপর দাঁড়ানো সমাজের মানুষেরা উৎপাদনের দুই ডাইমেনশনে যে পরস্পরের বিপরীত মেরুতে বিভাজিত, তার একেকটি ভাগই হচ্ছে একেকটি শ্রেণী।

    এর কারণ কী? কারণটা হচ্ছে মালিকানা। অর্থাৎ, উৎপাদনের উপায়ের উপর মুষ্ঠিমেয় মানুষের ব্যক্তিগত মালিকানা এবং অধিকাংশ মানুষের নিঃস্বতা।

    সংজ্ঞানুসারে, এই দুই শ্রেণীর স্বার্থ পরস্পর বিরোধী হবার কারণে এদের মধ্যে শ্রেণী-দ্বন্দ্ব থাকে। আর, এই শ্রেণী দ্বন্দ্ব কেবল তখনই শ্রেণী-সংগ্রাম হয়ে ওঠে, যখন তা উৎপাদন-সম্পর্কের মাত্রা কিংবা দিক কিংবা উভয়ের পরিবর্তনের দাবি করে।

    ইতিহাসে, মোটাদাগে, দাসতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণী সংগ্রাম হয়েছিলো দাস-মালিক সম্পর্ক উৎখাতের উদ্দেশ্য, সামন্তবাদী সমাজে শ্রেণী সংগ্রাম হয়েছিলো প্রজা-রাজা সম্পর্ক বাতিলের জন্য, পুঁজিবাদী সমাজে শ্রেণী সংগ্রাম চলছে মালিক-মজুর সম্পর্ক উচ্ছেদের লক্ষ্যে।

    হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলাম, কিংবা তালিবান থেকে শুরু করে, যেখানে যতো জিহাদী আছেন, তাঁরা কি উৎপাদন সম্পর্কের প্রগতিশীল পরিবর্তন চান?

    ইসলামী জিহাদীরা কি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মালিক-মজুর সম্পর্কের বাতিল চান? ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ চান? উৎপাদনের উপায়ের উপর মালিকের ব্যক্তিগত মালিকানা উচ্ছেদ করে শ্রমিক তথা সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চান?

    যদি তাঁরা তা চান, তাহলে জিহাদকে-শ্রেণী-সংগ্রাম বলা যেতে পারে। কিন্তু, যদি তাঁরা তা না চান, তাহলে ইসলামী জিহাদকে শ্রেণী সংগ্রাম বলা যাবে না। এটি কোনো আব্দারের বিষয় নয়। বিজ্ঞানের বিষয়।

    হেফাজতীদের উপর সরকারী ম্যাসাকারের প্রতিবাদ করুন নাগরিকের উপর রাষ্ট্রের ফ্যাসীবাদী নির্যাতনের বিরোধিতা করার মাধ্যমে। কিন্তু হেফাজতীদের প্রতিক্রিয়াশীল জিহাদী দাবিকে প্রগতিশীল শ্রেণী-সংগ্রাম বলে প্রচার করলে, তা হবে ক্ষমাহীন মুর্খতা।

    রোববার, ১৯ মে ২০১৩
    নিউবারী পার্ক
    এসেক্স, ইংল্যাণ্ড
    masudrana1@gmail.com


পাঠকের প্রতিক্রিয়া

***ফরহাদ মজাহার তাঁর রচনার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে শুরুতেই গ্রামের মানুষের সাথে মাদ্রাসার সমীকরণ করেছেন। তিনি লিখেছেনঃ
‘শহরে কি তাহলে গ্রামের মানুষের কোনো স্থান নাই? আছে। শহরেও মাদরাসা আছে। কিন্তু তার উপস্থিতি অদৃশ্য। তাকে থাকতে হবে, না থাকার মতো শহুরে ভদ্রলোকদের নজর থেকে দূরে।’
শহরে গ্রামের মানুষ থাকে কি-না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলতে পারতেন ‘আছে, লক্ষ-লক্ষ বস্তিবাসী আছে’। কিন্তু তিনি ‘আছে’ এবং ‘শহরেও মাদরাসা আছে’ বলে, গ্রামের মানুষকে আইডেন্টিফাই করলেন মাদ্রাসার সাথে।***

সমালোচনাঃ

আমি রানা ভাইয়ের অবগতির জন্য বিনয়ের সাথে বলতে চাই, সমীকরণ শব্দটি প্রয়োগ অযথার্থ হয়েছে।

প্রথমেই আমাদের মনে রাখতে হবে মজহার ভাই হেফাজতের আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন কোন শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে লেখেননি। এটা তো সুস্পষ্ট, তাইনা?

মজহার সাহেবের লেখায় হেফাজতের সমাবেশে আসা মানুষগুলোকে মাদ্রাসা থেকে আগত গ্রামের মানুষ বলেছেন। কথাটা সিংহভাগ হেফাজতিদের ক্ষেত্রে সত্য, আর সংখ্যাগরিষ্ঠতাই সাধারণত (গণতান্ত্রিক পন্থায় এবং সাধারণ বিচার বিবেচনায়) কোন মিক্সড পপুলেশনের রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে থাকে। এখান থেকে যুক্তির দাবী অনুযায়ী এটাই সুস্থির পাঠোদ্ধার যে, এই মাদ্রাসা হল গ্রামের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটা অংশ, এই অর্থে তারাও গ্রামের মানুষ। গ্রামের মানুষ মানেই যে মাদ্রাসা নয়, এটা আমার ১০ বছরের ভাতিজাটাও বোঝে, আর আপনি ভেবে বসলেন- ফরহাদ মজহার সেটা বোঝেন না?

তবুও বিজ্ঞ ফরহাদ মজহার কোন ফাঁক রাখেন নি। পরক্ষণেই তিনি 'গ্রামের মানুষ'দের অন্তর্ভুক্ত শহরে বসবাস কারী আরও কয়েক প্রকারের মানুষের কথা লিখেছেন। এই বিভিন্ন প্রকার মানুষ 'সেই জালিম ব্যবস্থা' দ্বারা নিজ নিজ সেক্টরে আলাদা আলাদা ভাবে এবং কিছু কমন এসপেক্টে সমভাবে নির্যাতিত।

আপনি আবদার করেছেন, "শহরে গ্রামের মানুষ থাকে কি-না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলতে পারতেন ‘আছে, লক্ষ-লক্ষ বস্তিবাসী আছে"। হ্যাঁ তিনি বলতে পারতেন, যদি লেখাটা শুধু অর্থনৈতিক জুলুম সংক্রান্ত কোন লেখা হত, যার সাবজেক্ট হতে পারত এই বস্তির মানুষগুলো- যাঁদের কথা আপনি পেড়েছেন।

আর তিনি বলেননি এবং বলাটা এই লেখার মূল বিষয়বস্তুর সাথে অপ্রাসঙ্গিক ও হয়ে যেত, কারণ হেফাজতের মানুষ যাঁদের সিংহভাগ (মজহার সাহেবের ভাষ্যমতে) গ্রামের মাদ্রাসা থেকে এসেছে তাঁদের কে গ্রামের মানুষ বলতে গিয়ে শহরে অবস্থিত বস্তিবাসীর চেয়ে মাদ্রাসাওয়ালাদের কথা লেখাই বেশী র‍্যাশনাল নয় কী?

তাই তাঁর এই আলোচনা থেকে আপনি সমীকরণের ধারণা দিলে সেটা হবে মনোযোগী পাঠকের বুঁদ হয়ে পড়ে থাকা মনের অলক্ষ্যে তাকে ধোঁকা দেওয়া।

আপনার এখানে আইডেন্টিফাই শব্দটাও অপপ্রয়োগ বলেই মনে হচ্ছে, কেননা আপনার কথামত যদি বলতেই হয় তবে বলতে পারতেন 'ইকুয়ালাইজ করলেন' মাদ্রাসার সাথে। কারণ আপনিই এখানে ইকুয়েশান এর ধারণা টেনে এনেছেন, কিন্তু ইকুয়ালাইজ লিখতে পিছপা হয়ে আপনি যেমন ধুর্ততার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি স্ববিরোধীতার জন্ম দিয়েছেন। হ্যাঁ, সমীকরণই যদি বলতে হয় তবে নিঃসন্দেহে সমীকরণটি হবে নিম্নরূপঃ

গ্রামের মানুষ = (মাদ্রাসাওয়ালা+বাড়ীর বুয়া+ চাকরবাকর+ দারোয়ান+ গাড়ীর ড্রাইভার, হেল্পার+ মিউনিসিপ্যালিটির আবর্জনা সরাবার জন্য লোকজন ইত্যাদি)

কাজেই আমি বলব যে গণিতের ভাষায় গণিত বুঝানোই ভাল, ভূগোল বুঝানো ভালো না, ম্যালপ্র্যাক্টিস...

আজ আর হাতে সময় নেই, ৯টায় ডিউটি আছে। তবে ইনশাআল্লাহ আপনার পুরো লেখাটার উপর লিখব।

এই লেখাটা অনলাইনপত্রিকা মাধ্যমেও পড়লাম। অসাধারণ

এই লেখাটি মঙ্গলধ্বনি'তে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে।
মঙ্গলধ্বনি'র পক্ষ থেকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা রইলো লেখক ও ইউকে বেঙ্গলির জন্য।।
http://www.mongoldhoni.net/movement-of-hefazat-and-concept-of-jihad-and-...

প্রতিবারের মত এবার ও রানা ভাই তাঁর লেখায় আমাদের চিন্থার জায়গা গুলো পরিশিলীত করলো।
ধন্যবাদ , রানা ভাই /

অসাধারণ এক লেখা।
লাল সালাম

রানা ভাইয়ের লেখা বরাবরই দুর্দান্ত পাণ্ডিত্য থাকে। এ লেখাটিও তার ব্যতিক্রম না। ফরহাদ এখানে মার্কসের নামে যেসব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন এবং যে সমাজের রুপান্তর ঘটিয়ে যে 'বিপ্লবী' সমাজে আনতে চায় তা মূলত মার্কস বিরোধী কর্মকাণ্ড। অর্থ্যাৎ মার্কস যা মনে করতেন ফরহাদ তার বিপরীতেই কাজ করেন। কিন্তু আফসোস তা আবার মার্কসের নামেই হয়। এ কারণেই হয়তো বহুকাল মার্কস বলেছিলেন, মানুষ যা নির্মান করে তাই আবার মানুষের মাথার উপর চেপে বসে।'
মার্কসের নামে এই ফাজলামি হয়তো ফরহাদ বন্ধ করবেন না, কিন্তু ফরহাদের ভণ্ডামি মানুষ বুঝতে পারবে। রানা ভাইকে ধন্যবাদ

আপনার মন্তব্য

এই ঘরে যা লিখবেন তা গোপন রাখা হবে।
আপনি নিবন্ধিত সদস্য হলে আপনার ব্যবহারকারী পাতায় গিয়ে এই সেটিং বদল করতে পারবেন